‘তাঁকে ছাড়া ক্রিকেট আজ খুব দরিদ্র’—সোবার্সের প্রয়াণে শোকস্তব্ধ ভারতীয় ক্রিকেট তারকারা

Photo: X

ক্রিকেট বিশ্বের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন হল শুক্রবার। প্রয়াত হলেন ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার স্যার গারফিল্ড সোবার্স। তাঁর মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে আসে গোটা ক্রিকেট দুনিয়ায়। ভারতীয় ক্রিকেটের দুই মহাতারকা বিরাট কোহলি এবং শচীন তেন্ডুলকর আবেগঘন বার্তায় স্মরণ করেছেন সদ্যপ্রয়াত ওয়েস্ট ইন্ডিজ কিংবদন্তিকে।

স্যার সোবার্সকে শ্রদ্ধা জানিয়ে সমাজমাধ্যমে কোহলি লেখেন, ‘ক্রিকেট তার অন্যতম সেরা কিংবদন্তিকে হারাল। শান্তিতে বিশ্রাম নিন, স্যার গারফিল্ড সোবার্স। আপনার উত্তরাধিকার আগামী প্রজন্মের ক্রিকেটারদের অনুপ্রাণিত করবে’।

শুধু কোহলি নন, আবেগে ভাসলেন শচীনও। দীর্ঘ ক্রিকেট জীবনে সোবার্সের সঙ্গে কাটানো নানা মুহূর্ত মনে করে তিনি লেখেন, ‘স্যার গ্যারি আর আমাদের মধ্যে নেই— এই সত্যিটা মেনে নেওয়া ভীষণ কঠিন। বছরের পর বছর ধরে আমাদের একসঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলোর কথা বারবার মনে পড়ছে। ২০০৩ বিশ্বকাপে তিনি আমার হাতে ‘প্লেয়ার অব দ্য টুর্নামেন্ট’ পুরস্কার তুলে দিয়েছিলেন। পরে আমি শততম আন্তর্জাতিক সেঞ্চুরি করার পরও তিনি যে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন, তা আজও মনে আছে। তিনি বরাবর অসাধারণ ভদ্র, আন্তরিক এবং উদার মানুষ ছিলেন’।


এরপর আরও একটি স্মৃতিচারণ করেন শচীন লেখেন, ‘কয়েক বছর আগে লন্ডনে আমাদের শেষ দেখা হয়েছিল। আমরা বসে ক্রিকেট নিয়ে গল্প করছিলাম। এখন বারবার মনে হচ্ছে, সে-ই ছিল আমাদের শেষ সাক্ষাৎ’।

শেষ শ্রদ্ধা জানিয়ে সচিন বলেন, ‘তিনি সত্যিই ছিলেন ‘অনন্য’। তাঁকে ভীষণ মিস করব। শান্তিতে বিশ্রাম নিন, স্যার গ্যারি’।

এক দীর্ঘ বার্তায় সোবার্সকে শ্রদ্ধার্পণ করেছেন ভারতের আর এক ক্রিকেট কিংবদন্তি সুনীল গাভাসকরও। তিনি লেখেন, ‘শান্তিতে বিশ্রাম নিন, স্যার গ্যারি। আপনার মতো আর কেউ কোনও দিন, কোনও ভাবেই হবে না। অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে জানতে পারলাম সর্বকালের সেরাদের সেরা, স্যার গারফিল্ড সোবার্স আর আমাদের মধ্যে নেই। এই সুন্দর খেলাটিকে যাঁরা ভালোবাসেন, তাঁদের কাছে স্যার গ্যারি শুধু একজন ক্রিকেটার ছিলেন না, একজন ক্রিকেটারের সর্বোচ্চ মানদণ্ড ছিলেন’।

Photo: X

গাভাসকর আরো লেখেন, ‘আমরা অলরাউন্ডার বলতে এখন সাধারণত এমন ক্রিকেটারদেরই বুঝি, যারা দুটি বিভাগে সমান দক্ষ। কিন্তু স্যার গ্যারি? তিনি ছিলেন পাঁচটি ক্ষেত্রেরই অপ্রতিদ্বন্দ্বী ওস্তাদ। স্বপ্নের মতো ব্যাট করতেন, নতুন বলে ফাস্ট-মিডিয়াম বোলিং করতেন, অনায়াসে বদলে ফেলতে পারতেন বাঁ-হাতি অর্থোডক্স স্পিনে, আবার কব্জির জাদুতে রিস্ট স্পিনও করতেন। আর শর্ট লেগ বা স্লিপে চিতাবাঘের মতো ক্ষিপ্রতায় ফিল্ডিং করতেন। ক্রিকেট মাঠে তাঁর সেই ঢিলেঢালা, ছন্দময় ক্যারিবীয় ভঙ্গিতে হেঁটে আসা, জামার কলার তোলা— সব মিলিয়ে মনে হত যেন চলমান রাজকীয়তারই সাক্ষী হচ্ছি। তিনি খেলতেন এক অপার্থিব আনন্দ নিয়ে, আর সেই সঙ্গে ছিল প্রবল খেলোয়াড়সুলভ মানসিকতা ও মর্যাদাবোধ, যা একটি পুরো যুগকে সংজ্ঞায়িত করেছে’।

সোবার্সের ৩৬৫ রানের ঐতিহাসিক ইনিংস নিয়ে গাভাসকর লেখেন, ‘তাঁর অপরাজিত ৩৬৫ রানের ইনিংস বহু দশক ধরে এক পর্বতের মতো দাঁড়িয়ে ছিল। আর এক ওভারে ছ’টি ছক্কা? তা তো ক্রিকেটের লোককথারই অংশ হয়ে গিয়েছে। অথচ মাঠের বাইরে তিনি ছিলেন প্রকৃত অর্থেই একজন ভদ্রলোক— আন্তরিক, জ্ঞানে অত্যন্ত উদার এবং ক্রিকেটের সেরা ঐতিহ্যগুলিকে রক্ষা করার ব্যাপারে ভীষণ গর্বিত’।

সোবার্সহীন ক্রিকেট দুনিয়া নিয়ে প্রাক্তন ভারত অধিনায়ক লেখেন, ‘আজ ক্রিকেট তার সবচেয়ে উজ্জ্বল রত্নকে হারাল। গ্যালারিগুলো যেন একটু বেশিই নীরব হয়ে গেল। তাঁকে ছাড়া ক্রিকেটও আজ খুব দরিদ্র। তাঁর পরিবার, বন্ধু এবং সমগ্র ক্যারিবিয়ান-সহ বিশ্বের প্রতিটি ক্রিকেটপ্রেমীর প্রতি আমার গভীর সমবেদনা রইল, যাঁরা এই অপূরণীয় ক্ষতিতে শোকাহত’।

আর এক প্রাক্তন ভারতীয় অধিনায়ক ও বোর্ড সভাপতি সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় স্যার গ্যারি সোবার্সের স্মৃতিতর্পণ করে লিখেছেন, ‘ক্রিকেটবিশ্বের জন্য এ এক অপূরণীয় ক্ষতি। তাঁর সময়ে তাঁর দক্ষতাই ছিল এমন এক মানদণ্ড, যার সঙ্গে নিজেদের প্রতিভার তুলনা করতেন অসংখ্য ক্রিকেটার। তিনি ছিলেন সত্যিই বিরলতমদের একজন। তাঁর আত্মা শান্তিতে বিশ্রাম নিক’।

ভারতীয় ক্রিকেটের আর এক কিংবদন্তি কপিলদেব বলেছেন, ‘ক্রিকেট সম্পর্কে যাঁদের সামান্যতম ধারণাও আছে, তাঁদের সবারই তাঁর সম্পর্কে জানা উচিত। তিনি এই পৃথিবীর ইতিহাসে জন্ম নেওয়া সর্বকালের সেরা ক্রিকেটারদের অন্যতম। তিনি যেভাবে ক্রিকেট খেলতেন, তা দেখে আমার মতো অসংখ্য মানুষ অনুপ্রাণিত হয়েছে। হ্যাঁ, আজ সত্যিই খুব দুঃখের দিন। তিনি আর আমাদের মধ্যে নেই। কিন্তু ক্রিকেটকে তিনি যা দিয়ে গিয়েছেন, তাঁর অসাধারণ প্রতিভা এবং অবিশ্বাস্য দক্ষতা— সেগুলিই আমাদের সারা জীবন পথ দেখাবে এবং অনুপ্রেরণা জোগাবে’।

প্রাক্তন তারকা ওপেনার বীরেন্দ্র শেহবাগ লিখেছেন, ‘তিনি তাঁর সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিলেন। এই আইপিএল যুগে তিনি যদি খেলতেন, তা হলে সবচেয়ে ধনী ক্রিকেটার হতেন। কোনো সন্দেহ নেই। ক্রিকেট তার সবচেয়ে পরিপূর্ণ খেলোয়াড়কে হারালো’।

বাদ যাননি এ যুগের নয়া তারকা বৈভব সূর্যবংশীও। তিনিও সোবার্সের মৃত্যুতে মর্মাহত হয়ে লিখেছেন, ‘স্যার গ্যারি সোবার্সের খেলা দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই বাবার মুখে তাঁর অসাধারণ কৃতিত্বের গল্প শুনে বড় হয়েছি। তিনি এমন এক কিংবদন্তি, যাঁর মাহাত্ম্য প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সমানভাবে ছড়িয়ে রয়েছে। ওঁ শান্তি’।

ক্রিকেট ইতিহাসে স্যার গারফিল্ড সোবার্সের নাম উচ্চারিত হয় সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডারদের তালিকার একেবারে শীর্ষে। ব্যাট হাতে যেমন বিধ্বংসী, তেমনই পেস, সুইং ও স্পিন— তিন ধরনের বোলিংয়েই ছিলেন সমান কার্যকর। তাঁর অলরাউন্ড দক্ষতা ক্রিকেটের সংজ্ঞাকেই যেন নতুন করে লিখেছিল। তাই তাঁর প্রয়াণকে শুধু একজন প্রাক্তন ক্রিকেটারের মৃত্যু হিসেবে দেখছে না ক্রিকেট বিশ্ব; বরং এক স্বর্ণযুগের অবসান হিসেবেই দেখছে সবাই।