বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে কেপ ভার্দের বিরুদ্ধে হতাশাজনক গোলশূন্য ড্রয়ের পর স্পেনকে ঘিরে যে সমালোচনার ঝড় উঠেছিল রবিবার রাতে তার কড়া জবাব দিয়ে দিলেন লামিনে ইয়ামালরা। সৌদি আরবকে ৪-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে সেই সমালোচনার জবাব মাঠেই দেয় তারা। ম্যাচের পর বেশ ক্ষোভ মেশানো প্রতিক্রিয়া শোনা গেল স্পেনের কোচ লুই দে লা ফুয়েন্তের সাংবাদিক বৈঠকে।
সৌদি আরবের বিরুদ্ধে দাপুটে জয়ের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে দে লা ফুয়েন্তে বলেন, ‘ এই দলকে নিয়ে সন্দেহ করা পাগলামি ছাড়া আর কিছুই না।’কেপ ভার্দের বিরুদ্ধে ড্রয়ের পর স্পেনের খেলা, দল নির্বাচন এবং কৌশল নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠেছিল। দে লা ফুয়েন্তের দাবি, সেই সমালোচনাই ফুটবলারদের আরও উজ্জীবিত করেছে। তিনি বলেন, ‘পেশাদারিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলে ফুটবলাররা কেউই তা পছন্দ করে না। যদি সাহস থাকে, তা হলে সমালোচনার জবাব এ ভাবেই দেওয়া উচিত।’
স্পেন কোচের মতে, তাঁর দল নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা টানা ৩৩ ম্যাচে অপরাজিত রয়েছি এবং এই দলই সেই সম্মান অর্জন করেছে। লোকে বোধহয় সেটা ভুলে গিয়েছিল। সমালোচনা নিয়ে আমরা ভাবি না। কিন্তু এই দলটার নিন্দে করা ঠিক না। কখনও ভাল দিন আসে, কখনও খারাপ দিনও আসে। কিন্তু খারাপ দিন এলেই নিন্দা শুরু করে দেব, এটা ঠিক নয়। এই তরুণ প্রজন্ম ফুটবলার হিসেবে এ দেশের রোল মডেল। সব সময়ই ওরা নিজেদের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করে।’
“প্রথমার্ধে আমাদের প্রতিপক্ষকে চাপে রেখেছি, বারবার বল ছিনিয়ে নিয়েছি এবং সরাসরি আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলেছি, যা ছিল অসাধারণ,” বলেন ইয়ামালদের কোচ, ‘গত ম্যাচের তুলনায় অনেক ভালো খেলেছি আমরা।’
প্রথম ম্যাচে গোলশূন্য ড্রয়ের পর স্পেন যে কৌশলগত পরিবর্তন এনেছিল, তাও প্রমাণ করে রবিবারের এই ম্যাচের ফলাফল। দে লা ফুয়েন্তে ব্যাখ্যা করেন, পেদ্রি ও রদ্রিকে মাঠের মাঝখানে একসঙ্গে খেলানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। আক্রমণের গতি বাড়ানোর জন্য এই কৌশল। প্রতিপক্ষ অনেক পিছনে গিয়ে ডিফেন্স করবে, এমন আশা করেই এই কৌশল নেওয়া হয়েছিল।
তিনি বলেন, “প্রতিপক্ষ যেহেতু লো ব্লকে রক্ষণ সাজিয়ে খেলছিল, তাই পেদ্রি ও দানি ওলমোর মাধ্যমে দ্রুত বল বক্সে পৌঁছে দেওয়ার প্রয়োজন ছিল। আমরা সব সময় ম্যাচের পরিস্থিতিকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করি। এটা অনেকটা দাবা খেলার মতো—আপনাকে পরিস্থিতি বুঝতে হবে এবং তাকে নিজের সুবিধার জন্য ব্যবহার করতে হবে।”
এ দিন মিকেল আটলান্টায় ওইয়ারসাবাল জোড়া গোল করেন এবং তরুণ তারকা লামিনে ইয়ামাল স্পেনের প্রথম এগারোয় ফিরে এসেই দারুণ প্রভাব ফেলেন। প্রথম ম্যাচে বিশ্বকাপে অভিষেক হওয়া কাবো ভার্দের বিরুদ্ধে অপ্রত্যাশিত ০-০ ড্র করার পর, ‘লা রোহা’ শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে এবং প্রতিপক্ষকে তাদের নিজেদের রক্ষণভাগে প্রায় কোণঠাসা করে দেয়।
লুই দে লা ফুয়েন্তের দল প্রথম ‘হাইড্রেশন ব্রেক’-এর আগেই ৩-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায়। ওইয়ারসাবালের ক্রস থেকে লামিনে ইয়ামাল বল জালে জড়িয়ে উদ্বোধনী গোলটি করেন। এর পর স্পেনের লাগাতার আক্রমণের চাপে সৌদি আরবের রক্ষণভাগ বল ক্লিয়ার করতে ব্যর্থ হলে সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে মাত্র তিন মিনিটের ব্যবধানে দ্বিতীয় গোল করে নিজের জোড়া গোল পূর্ণ করেন ওইয়ারসাবাল।
প্রথমার্ধেই হ্যাটট্রিকের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন তিনি। প্রতিপক্ষের দুর্বল ক্লিয়ারেন্সের পর তাঁর এক সাহসী শট ক্রসবারের ওপরের অংশে লেগে ফিরে আসে। এর পর আরও একবার তিনি জোরালো শট নেন, যা অল্পের জন্য গোলের বাইরে চলে যায়।
বিরতির পরও স্পেনের আক্রমণের ধার কমেনি, যদিও দুই গোলদাতা ইয়ামাল ও ওইয়ারসাবালকে মাঠ থেকে তুলে নেওয়া হয়েছিল। ম্যাচের ৫৩ মিনিটে মার্ক কুকুরেয়ার ভলিতে নেওয়া শট সৌদি গোলরক্ষক মোহাম্মদ আলওয়াইস প্রতিহত করলেও, ফিরতি বল হাসান আলতামবাকতি নিজের জালেই বল পাঠিয়ে দেন।
এ দিন এই গ্রুপের অন্য ম্যাচে উরুগুয়ে ও কেপ ভার্দে ২-২ ড্র করে, যা উরুগুয়ের সমর্থকদের কাছে ছিল অপ্রত্যাশিত। ২১ মিনিটে গোল করে কেভিন পিনা কেপ ভার্দেকে এগিয়ে দেন। ৪৪ মিনিটের মাথায় সমতা আনেন ম্যাক্সি আরাউজো। তার মিনিট সাতেক পরেই, প্রথমার্ধের সংযুক্ত সময়ে অগাস্টিন কানোবিও উরুগুয়েকে এগিয়ে দেন। ৬১ মিনিটের মাথায় হেলিও ভারেলা ফের সমতা আনেন। তবে এরপর তাদের রক্ষণ ভেদ করে আর গোল করতে পারেনি উরুগুয়ে।
স্পেনের এই জয় ও উরুগুয়ের ড্রয়ের ফলে যা অবস্থা দাঁড়াল, তাতে গ্রুপপর্বের শেষ ম্যাচে উরুগুয়ের বিরুদ্ধে একটি ড্র পেলেই শেষ ৩২-এ জায়গা নিশ্চিত করে ফেলবে স্পেন। অন্যদিকে, শেষ ম্যাচে সৌদি আরবকে যদিও হারিয়ে দেয় কেপ ভার্দে, তা হলে তারাও নক আউট পর্বে জায়গা করে নিতে পারবে।