বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ওঠার দৌড়ে ভারত কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে। শেষ পর্যন্ত শুভমান গিলের দল ফাইনালে পৌঁছতে পারবে কি না, এই নিয়ে বিস্তর জল্পনা শুরু হয়েছে। প্রাক্তন ক্রিকেটাররা ও বিশেষজ্ঞরা অনেকেই একমত, ভারতের ফাইনালে পৌঁছনোর রাস্তা বেশ কঠিন। এ বার সেই আলোচনায় ঢুকে পড়লেন প্রাক্তন ভারতীয় অধিনায়ক ও কোচ রাহুল দ্রাবিড়।
বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ২০২৫-২৭ চক্রে আপাতত পঞ্চম স্থানে রয়েছে ভারত। প্রথম দুই দলই আগামী বছর ফাইনালে খেলবে। ফলে বাকি ম্যাচগুলিতে প্রায় নিখুঁত পারফরম্যান্স করতে হবে শুভমান গিলের দলকে। শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে প্রথম টেস্ট জিতে ভারত সিরিজে ১-০ এগিয়ে রয়েছে। দ্বিতীয় টেস্টেও ভালো জায়গায় রয়েছে তারা। কিন্তু দ্রাবিড় মনে করিয়ে দিয়েছেন, সামনে নিউজ়িল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে কঠিন সিরিজ রয়েছে। ফাইনালে উঠতে এই সিরিজগুলোতেও ভারতকে ভালো ফল করতে হবে।
তবে আশা ছাড়ার মতো পরিস্থিতি হয়নি বলেই মনে করছেন প্রাক্তন ভারতীয় কোচ। তাঁর মতে, শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে চলতি সিরিজে ভালো শুরুটা ইতিবাচক হলেও সামনে কঠিন পরীক্ষা অপেক্ষা করছে ভারতের জন্য।
জিও হটস্টারের এক অনুষ্ঠানে দ্রাবিড় বলেন, ‘আমি আশা করছি ভারত পারবে। এখান থেকে ডব্লুটিসি ফাইনালে পৌঁছতে পারলে দারুণ ব্যাপার হবে। ভারত কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে ঠিকই। কিন্তু এই ভারতীয় দলের যে মান, তাতে কোনও ভাবেই তাদের হিসাবের বাইরে রাখা যায় না। শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে ওরা ভাল শুরু করেছে। এটা অবশ্যই একটা ভালো পদক্ষেপ’।
শ্রীলঙ্কা সফর শেষ হলেই অক্টোবর-নভেম্বরে নিউজ়িল্যান্ডে যাবে ভারত। সেখানে দু’টি টেস্ট খেলবে গিলের দল। তার পর ২০২৭-এর জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে ভারতের মাটিতে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে পাঁচ টেস্টের সিরিজ। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালের দৌড়ে এই দুই সিরিজই কার্যত ভারতের আসল পরীক্ষা।
নিউজ়িল্যান্ড সফর নিয়ে যথেষ্ট চিন্তিত দ্রাবিড়। সেখানকার পরিবেশ এবং পরিস্থিতি তরুণ ভারতীয় ক্রিকেটারদের কাছে বড় পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে। দ্রাবিড়ের কথায়, ‘নিউজ়িল্যান্ডে গিয়ে খেলা সব সময়ই কঠিন। ঘরের মাঠে নিউজ়িল্যান্ড খুব শক্তিশালী দল। ভারতীয় দলের অনেক তরুণ ক্রিকেটারই ওই পরিস্থিতিতে খেলেনি। তাই এটা বড় চ্যালেঞ্জ হতে চলেছে’।
শুধু পরিবেশ নয়, অভিজ্ঞতার অভাবও ভাবাচ্ছে দ্রাবিড়কে। টেস্ট ক্রিকেট থেকে বিরাট কোহলি, রোহিত শর্মা, অজিঙ্ক রাহানে এবং চেতেশ্বর পুজারার মতো ক্রিকেটাররা সরে যাওয়ায় নিউজ়িল্যান্ড সফরে ভারতের তরুণ দলের সামনে বড় দায়িত্ব থাকবে।
দ্রাবিড় বলেন, ‘আশা করি আগামী কয়েক মাসে ক্রিকেটারদের ফিট রাখতে পারবে ভারত এবং খুব বেশি চোট-আঘাত হবে না। আমরা বিরাট, রোহিত, রাহানে এবং পুজারার মতো ক্রিকেটারদের অভিজ্ঞতা মিস করব। শেষ বার ভারত যখন সেখানে খেলেছিল, এই ক্রিকেটারদের অনেকেই দলে ছিলেন। তাই এ বার সিরিজটা বেশ আকর্ষণীয় হতে চলেছে’।
নিউজ়িল্যান্ড সফরের পরই ভারতের সামনে আরও বড় পরীক্ষা— ঘরের মাঠে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে পাঁচ টেস্টের সিরিজ। জানুয়ারি ২০২৭-এ শুরু হবে সেই সিরিজ। ঘরের মাঠে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে খেলা হলেও সেটিও যে সহজ হবে না, মনে করিয়ে দিয়েছেন দ্রাবিড়। তাঁর মতে, ভারতের মাটিতে ভাল করার জন্য অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটাররাও যথেষ্ট মরিয়া থাকবে’।
অর্থাৎ, শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে ভাল শুরুটা কিছুটা স্বস্তি দিলেও বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালের রাস্তা এখনও যথেষ্ট কঠিন। পিছিয়ে পড়েছে ভারত, কিন্তু দৌড় থেকে ছিটকে যায়নি— দ্রাবিড়ের বার্তায় আপাতত সেটাই সবচেয়ে বড় আশার জায়গা।
কলম্বোয় জিতলে ফাইনালে উঠতে কী করতে হবে ভারতকে?
কলম্বোয় শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে দ্বিতীয় টেস্টে জয়ের দোরগোড়ায় ভারত। প্রথম টেস্টে ১৬৫ রানের জয়ের পর দ্বিতীয় ম্যাচেও চালকের আসনে শুভমান গিলের দল। আর এই ম্যাচ জিতলেই শুধু সিরিজ ২-০ হবে না, বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ওঠার দৌড়েও বড় সুবিধা পাবে ভারত।
বর্তমানে ডব্লুটিসি পয়েন্ট তালিকায় পাঁচ নম্বরে রয়েছে ভারত। প্রথম টেস্ট জয়ের পর তাদের পয়েন্ট শতাংশ (PCT) হয়েছে ৫৩.৩৩। কলম্বো টেস্টও জিতলে সেটি বেড়ে হবে প্রায় ৫৭.৫৭। অর্থাৎ, ফাইনালের দৌড়ে সরাসরি শীর্ষ দুইয়ে উঠে না এলেও গিলদের অবস্থান অনেকটাই শক্ত হবে।
৬টি জয় পেলেই ৬৮ শতাংশের ঘরে
তবে এখানেই শেষ নয়। শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে সিরিজ শেষ হওয়ার পরে ভারতের হাতে থাকবে আরও সাতটি টেস্ট— নিউজ়িল্যান্ডের বিরুদ্ধে তাদের দেশে দু’টি এবং অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ঘরের মাঠে পাঁচটি। এই সাত ম্যাচই ঠিক করে দেবে ভারতের ডব্লুটিসি ভাগ্য।
কলম্বোয় জয়ের পরে ভারত যদি বাকি সাতটি টেস্টের মধ্যে ছ’টিতে জেতে, তা হলে তাদের PCT পৌঁছবে প্রায় ৬৮ শতাংশে। অতীতে এই ধরনের শতাংশ ফাইনালে ওঠার পক্ষে যথেষ্ট হয়েছে। তবে এ বার লড়াই অনেক বেশি কঠিন। অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউজ়িল্যান্ডের পাশাপাশি বাংলাদেশও ভাল জায়গায় রয়েছে। তাই শুধু নির্দিষ্ট কোনও শতাংশকে ‘নিরাপদ’ ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। অর্থাৎ, শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে দ্বিতীয় টেস্টটি ভারতের কাছে নিছক সিরিজ জয়ের ম্যাচ নয়। সামনে যে কঠিন WTC দৌড়, সেখানে প্রতিটি জয়ই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তাই আপাতত হিসাব খুব সহজ— কলম্বোয় জয়, তার পর নিউজ়িল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে বড় লড়াই। শ্রীলঙ্কাকে ২-০ হারাতে পারলে ফাইনালের দরজা খুলবে ঠিকই, কিন্তু সেই দরজা দিয়ে ঢুকতে হলে বাকি সাত টেস্টে প্রায় নিখুঁত ক্রিকেট খেলতেই হবে।