এই ফলই প্রত্যাশিত ছিল। শনিবার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে ব্রাজিলের বিরুদ্ধে যে ভারত জিতবে, এমন আশা বোধহয় অতি বড় ভারতীয় সমর্থকও আশা করেননি। কিন্তু ভারত লড়াই করে হারবে, না অসহায় আত্মসমর্পণ করবে, এটাই ছিল সবার প্রশ্ন।
কিন্তু অসহায় আত্মসমর্পণ হয়নি। ভারত লড়াই করল। একাধিক গোলের সুযোগও তৈরি করল। কিন্তু কোনো সুযোগই কাজে লাগাতে পারেনি। সব মিলিয়ে তিনটি গোল খেল। খেতে পারত আরো অনেক গোল। কিন্তু তাদের রক্ষণের শক্তি তাদের আর বেশি গোল খেতে দেয়নি।
প্রায় ৪০ হাজার দর্শকে পরিপূর্ণ যুবভারতী মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, চিত্রতারকা মিঠুন চক্রবর্তী এবং আরো একঝাঁক বিশিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে শনিবার রাতে দেখল ভারতের চার গোলে হার। যারা ভেবেছিল সাত-আট গোল খাবে খালিদ জামিলের ভারত, তাদের এ দিন দুঃখের দিন ঠিকই। তবে ব্রাজিলের কাছে এই হারকে আর যাই হোক লজ্জার হার বলা যাবে না।
এ দিন ভারতের ২৭ মিনিট পর্যন্ত ব্রাজিলকে আটকে রাখাটাও কম কৃতিত্বের নয়। এর মধ্যে ভারতীয় দলের একাধিক রীতিমতো চমকে দিয়েছে। বিশ্বের পাঁচ নম্বর দলের বিরুদ্ধে এমন সাহসী ফুটবল দেখানোর জন্য যে দম থাকা দরকার, মনবীর সিংদের খেলা দেখে মনে হচ্ছিল, সেই দম, সত্যিই তাদের আছে।
প্রথম মিনিটেই বাঁদিক দিয়ে ওঠা ভিনিসিয়াসের ক্রস দুরন্ত দক্ষতায় আটকে দেন অনিরুদ্ধ থাপা, যিনি গত ম্যাচে প্রথম এগারোয় না থাকলেও এই ম্যাচে ফিরে আসেন। একাধিকবার ব্রাজিলিয়ানদের পা থেকে বল কাড়তেও দেখা যায় আকাশ মিশ্র, আনোয়ার আলিদের। পরপর দুটি কর্নারও আদায় করে নেয় ভারত। ভিনিসিয়াসকে কড়া পাহাড়ায় রেখেছিলেন থাপা ও অভিষেক সিং, যা অনেকেই প্রত্যাশা করেনি।
পানামার বিরুদ্ধে শুরুর দিকে যে কৌশল নিয়েছিল ভারত, এই ম্যাচেও সেই কৌশল নিতেই দেখা যায় তাদের। দুই প্রান্তে থাকা ফুটবলারদের দীর্ঘ পাস দিয়ে খেলাটাকে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা। তাতে সফলও হয় তারা। কিন্তু বেশিরভাগ পাসই নিখুঁত ছিল না।
বাঁদিক থেকে সমানে ভারতের বক্সে ঢুকে গোলের চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন ভিনিসিয়াস। প্রতিবারই তাঁকে আটকে দেন ভারতীয় ডিফেন্ডাররা। শেষ পর্যন্ত ভারতের রক্ষণের প্রাচীরে ভাঙন ধরান এস্তেভাও। ২৮ মিনিটের মাথায় ডান দিকের উইংয়ে বল পান চেলসির এই ফরোয়ার্ড। সেখান থেকে ধীরে ধীরে বক্সে ঢুকে উঠে বাঁ পায়ে শট নেন। গুরপ্রীত সিং ঠিক জায়গাতেই ছিলেন এবং বলটি আটকানোর জন্য হাতও বাড়িয়েছিলেন। কিন্তু শটের গতি এতটাই ছিল যে, গুরপ্রীতের হাতে লেগে বল দিক বদলে জালে জড়িয়ে যায়।
প্রথম ২৭ মিনিটে ভারতের খেলায় যে গতি ও তীব্রতা দেখা গিয়েছিল, এই গোল খাওয়ার পর থেকে দুটোই ক্রমশ কমে যেতে শুরু করে এবং ব্রাজিলও ক্রমশ ম্যাচে জাঁকিয়ে বসে। সেই সুযোগে পেদ্রো প্রায় গোল পেয়েই গিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁৎ হেডে বলটি গোলে পাঠানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু তাঁর হেড ডান দিকের পোস্টে লেগে ফিরে আসে।
তবে পরের সুযোগটা আর ছাড়েননি পেদ্রো। এস্তাভিওর অসাধারণ এক থ্রু থেকে বল পেয়ে যান তিনি। গোলে বল পাঠাবার অনেক সময়ও পান তিনি। এ বারও নিজের সেরাটা দিতে পারেননি গুরপ্রীত। পেদ্রোর শট তাঁর ডান হাত ছুঁয়ে জালে জড়িয়ে যায়।
এর দুমিনিট পরে ফের ভিনিসিয়াসের শট গুরপ্রীতের হাত থেকে ছিটকে আসায় গোলের সুবর্ণ সুযোগ পেয়ে যায় ব্রাজিল। কিন্তু সেই বল ক্লিয়ার করে দলকে তৃতীয় গোল খাওয়া থেকে বাঁচান আপুইয়া। না হলে প্রথমার্ধেই তিন গোলে পিছিয়ে থেকে সাজঘরে যেতে হত ভারতকে।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই একঝাঁক পরিবর্তন করে দুই দলই। ভারত গুরপ্রীত, আকাশ মিশ্র এবং আশিকের পরিবর্তে মাঠে নামায় প্রভসুখন, সানান এবং জয় গুপ্তকে। ব্রাজিল মারকুইনোস, ডগলাস সান্তোস, ভিনিসিয়াস, গ্যাব্রিয়েল বি এবং মাথেউজিনিয়োর পরিবর্তে মাঠে নামায় ভান্দেরসন, ব্রুনো গিমারায়েস, সামুয়েল লিনো, ডগলাস লুইস এবং গ্যাব্রিয়েলকে।
প্রথম গোল খাওয়ার পর ভারত যতটা নেতিয়ে গিয়েছিল, দ্বিতীয়ার্ধে ততটা নেতিয়ে থাকতে দেখা যায়নি। ভারতীয় ফুটবলের নয়া তারকা রায়ান উইলিয়ামস একটু দেরিতে হলেও ক্রমশ জেগে উঠতে শুরু করেন। তাঁর একটি নীচু গোলমুখী শট ব্রাজিলের গোলকিপার পেদ্রো মরিসকো কোনো মতে বাঁচান। এর মধ্যে দুটি সুযোগ তৈরি করেন মনবীর সিংও। কিন্তু প্রতিবারই আটক হয়ে যান।
৬৭ মিনিটের মাথায় মনবীরের ক্রসে বক্সের মধ্যে থেকে যে সুবর্ণ সুযোগ পান রায়ান উইলিয়ামস, এটাই ছিল সম্ভবত ভারতের সবচেয়ে সহজ সুযোগ। কিন্তু রায়ানের শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।
ভারত আবার জাগতে শুরু করলেও ৫৮ মিনিটের মাথায় ভিনিসিয়াসের পরিবর্তে নামা লিনোর গোলে ফের পিছিয়ে যায় ভারত। বিজয় ভার্গিস পা থেকে বল খুইয়ে ফেলায় সুযোগ পেয়ে যান এবং সেই সুযোগ ভরপুর কাজে লাগান তিনি। ডাইভ দিয়েও গোল বাঁচাতে পারেননি প্রভুসুখন।
৬০ মিনিটের মাথায় ফের পরিবর্ত খেলোয়াড় নামায় দুই দলই। সহাল ও অভিষেকের জায়গায় নামেন এডমন্ড লালরিন্ডিকা ও ভালপুইয়া। অন্যদিকে, মারকুইনোস, পেদ্রো, দিয়াস এবং আন্দ্রে সান্তোসের পরিবর্তে মাঠে নামেন এন্দ্রিক, মাতেউস মার্তিনেল্লি, জাইর এবং মাওরো জুনিয়র।
৬৪ মিনিটের মাথায় ফের রায়ান বাঁ দিক দিয়ে উঠে ফের গোলে বল ঠেলেন। কিন্তু এবার তাঁর শট গোল লাইনে সেভ করেন পরিবর্ত মাউরো। ম্যাচটা ক্রমশ ভারতের অর্ধেই হতে শুরু করে এবং ভারত কোণঠাসা হতে শুরু করে।
তবু ব্রাজিলের হাইলাইন ফুটবলের সুযোগ নিয়ে একাধিকবার ব্রাজিলের অর্ধে প্রায় ফাঁকা বা ওয়ান টু ওয়ান পরিস্থিতিতে বল পেয়ে যান মনবীর, রায়ান দুজনেই। কিন্তু কেউই কাজে লাগাতে পারেননি।
ম্যাচ শেষ হওয়ার আগে ভারতীয় দলে আরও পরিবর্তন হয়। একসাথে পাঁচজনকে রিজার্ভ বেঞ্চ থেকে নামানো হয়। কিন্তু তাতে ভারতের ফল বদলায়নি। বরং শেষ মিনিটে লিনো তাঁর দ্বিতীয় গোল করে ফল বদলে দেন ৪-০-য়।