এশিয়াড দল থেকে বাদ দেওয়ার জবাব, কমনওয়েলথ টেবল টেনিসে চ্যাম্পিয়ন বাংলার অঙ্কুর, জিতে কী বললেন?

Photo: X

এশিয়ান গেমসে তাঁকে ভারতীয় দল থেকে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়। এমনকী কমনওয়েলথ টেবল টেনিসের দলগত ইভেন্টেও ভারতীয় দলের হয়ে খেলার সুযোগ পাননি তিনি। সেই কমনওয়েলথ টিটি-তে চ্যাম্পিয়ন হয়ে বাংলার অঙ্কুর ভট্টাচার্য দেখিয়ে দিলেন, ভারতীয় দল থেকে তাঁকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত ভুল ছিল। তিনি যে যোগ্য, সেটাই আরো একবার প্রমাণ করে দিলেন তিনি।

দিল্লিতে ২২তম কমনওয়েলথ টেবল টেনিস চ্যাম্পিয়নশিপে ছেলেদের সিঙ্গলসে সোনা জিতলেন বাংলার অঙ্কুর, আর মেয়েদের সিঙ্গলসে চ্যাম্পিয়ন হলেন যশস্বিনী ঘোরপাড়ে। দুই তরুণের সাফল্যে প্রায় সব ক’টি সোনার পদকই নিজেদের দখলে রাখল ভারত।

পুরুষদের ফাইনাল ছিল রীতিমতো রুদ্ধশ্বাস। অঙ্কুরের প্রতিপক্ষ ছিলেন তাঁরই ডাবলস পার্টনার পায়াস জৈন। সাত গেমের টানটান লড়াই শেষে ১১-৮, ৯-১১, ৭-১১, ১১-৮, ৪-১১, ১১-৪, ১১-৯-এ জিতে চ্যাম্পিয়নের মুকুট মাথায় তোলেন বাংলার এই প্রতিভাবান প্যাডলার। প্রথমে এগিয়ে থেকেও পিছিয়ে পড়তে হয়েছিল তাঁকে। কিন্তু শেষ দুই গেমে দুর্দান্ত ভাবে ঘুরে দাঁড়ান এবং সোনা নিশ্চিত করেন তিনি।


অন্য দিকে, মহিলাদের ফাইনালে যশস্বিনী ঘোরপাড়ে শুরু থেকেই প্রভাব বিস্তার করেন। ভারতেরই তারকা শ্রীজা আকুলাকে ১১-৬, ১১-১, ৮-১১, ১১-৭, ১৩-১১-এ হারিয়ে শিরোপা জেতেন তিনি। প্রথম দুই গেমে কার্যত একতরফা আধিপত্যের পর তৃতীয় গেমে শ্রীজা লড়াইয়ে ফিরলেও শেষ পর্যন্ত যশস্বিনীর আগ্রাসী খেলায় ভর করেই সোনা আসে ভারতের ঝুলিতে।

পুরুষদের সিঙ্গলসে ৭০ মিনিটের রুদ্ধশ্বাস ফাইনালে জয় তুলে নিয়ে অঙ্কুর ভারতীয় টেবল টেনিস মহলকে নিজের পারফরম্যান্সেই জবাব দেন। কমনওয়েলথ চ্যাম্পিয়নশিপ এবং আরও গুরুত্বপূর্ণ এশিয়ান গেমস— দুই প্রতিযোগিতারই ভারতীয় দল থেকে সম্প্রতি বাদ দেওয়া হয়েছে এই বাঙালি খেলোয়াড়কে। সেই হতাশাকে পিছনে ফেলে কেরিয়ারের অন্যতম সেরা সন্মান ছিনিয়ে নিলেন তিনি। দেখিয়ে দিলেন, তিনি যোগ্য এবং তাঁকে অন্যায় ভাবে ভারতের দল থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

সাফল্যের পর অঙ্কুর সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার কাছে এটাই জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতা ছিল। আমি যে ভারতীয় দলে জায়গা পাওয়ার যোগ্য, এশিয়ান গেমসের দলেও আমার থাকারই কথা ছিল, তা প্রমাণ করার ছিল আমার’। বিদ্রূপটা যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার মতোই ছিল।

আয়োজক দেশ হিসেবে ভারত সিঙ্গলসে ১৬ জন খেলোয়াড় নামিয়েছিল। সেই কারণে অনেকেই মজা করে এই প্রতিযোগিতাকে ‘ইন্ডিয়া ওপেন’ বলে ডাকেন। অথচ অঙ্কুর দলে সুযোগই পেয়েছিলেন শুধুমাত্র আয়োজক দেশের অতিরিক্ত কোটার সুবাদে। কিন্তু সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে খেতাব জেতার পথ মোটেও সহজ ছিল না।

প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালে অঙ্কুরের সামনে ছিল কঠিন পরীক্ষা। প্রতিপক্ষ ছিলেন মালয়েশিয়ার ওয়ং কি শেন, যিনি দলগত প্রতিযোগিতায় ভারতের মানব ঠক্কর ও মনুশ শাহ— দু’জনকেই হারিয়ে কার্যত একাই ভারতের আধিপত্যে ধাক্কা দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই ওয়ংকে কোনও সুযোগই দেননি অঙ্কুর। দুরন্ত পারফরম্যান্সে ৪-০-য় একতরফা জয় তুলে নিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে যান তিনি।

এরপর সামনে ছিল আরও কঠিন চ্যালেঞ্জ। প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়ার নিকোলাস লাম, বিশ্বের ৪৪ নম্বর এবং প্রতিযোগিতার তৃতীয় বাছাই। এই বাঁ-হাতি প্যাডলারের কাছে শেষ সাক্ষাতে হেরেছিলেন অঙ্কুর। তবে এ বার ছবিটা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। গতির লড়াইয়ে লামের সঙ্গে সমান তালে পাল্লা দেন তিনি। নিজের ট্রেডমার্ক ব্যাকহ্যান্ড উইনার এবং সোজাসাপ্টা, জোরালো ফ্ল্যাট শটের সাহায্যে বারবার অস্ট্রেলীয় প্রতিপক্ষের ছন্দ নষ্ট করে শেষ পর্যন্ত জয় ছিনিয়ে নেন বাংলার ছেলেটি।

সেই ম্যাচ নিয়ে অঙ্কুর বলেন, ‘শেষ বার নিকোলাস লামের বিরুদ্ধে আমি হেরে গিয়েছিলাম। তাই জানতাম, এই প্রতিযোগিতা জিততে হলে আমাকে নিজের সেরাটা খেলতেই হবে’।

কোয়ার্টার ফাইনালের সেই কঠিন পরীক্ষা উতরে যাওয়ার পর সেমিফাইনালে তাঁর সামনে ছিলেন ভারতের অন্যতম সেরা এবং খেতাবের সবচেয়ে বড় দাবিদার মানব ঠক্কর। তবে এই ম্যাচে নামার আগে সুবিধাজনক জায়গায় ছিলেন অঙ্কুর।তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি ইউটিটিতে মানবের বিরুদ্ধে খেলেছিলাম। তাই ওর বিরুদ্ধে কীভাবে খেলতে হবে, তা আমার জানা ছিল’।

গত ছ’মাসে নিজের খেলার যে দিকটিতে সবচেয়ে বেশি উন্নতি করেছেন, সেটাই সেমিফাইনালে তুলে ধরেন অঙ্কুর। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি ভারতের অন্যতম সেরা ব্যাকহ্যান্ড খেলোয়াড় হিসেবে পরিচিত। কিন্তু মানবের বিরুদ্ধে শুধু ব্যাকহ্যান্ড নয়, ধারালো ফোরহ্যান্ডের সাহায্যেও বারবার প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেঙে দেন তিনি। বাবা ও কোচ অংশুমান ভট্টাচার্যের তত্ত্বাবধানে যে তাঁর খেলায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে, সেই প্রমাণই মেলে এই ম্যাচে।

অঙ্কুর বলেন, ‘পায়াস আমার ডাবলস পার্টনার। আমরা খুব ভালো বন্ধু। সব সময় একসঙ্গে অনুশীলন করি। ও আমার দুর্বল জায়গাগুলো জানে, আমিও ওর দুর্বলতা জানি। এমনকী, আমাদের মানসিক প্রস্তুতির কোচও (বীর সরণ) একই। ফাইনালে ওর বিরুদ্ধে খেলতে পেরে আমি খুবই খুশি ছিলাম। আর খেতাব জিততে পেরে তো আরও বেশি আনন্দ হচ্ছে’।

বঞ্চনার জবাব দিতে পেরেও খুশি অঙ্কুর বলেন, ‘আমি কমনওয়েলথ টিটি-র টিম ইভেন্টে ছিলাম না। আমি এখানে শুধু সিঙ্গলসেই খেলতে এসেছি। তাই প্রথম লক্ষ্য ছিল, আমি যে ভারতীয় দলে থাকার যোগ্য, সেটা প্রমাণ করা। তবে আমি এশিয়ান গেমসের দলে আছি কি নেই, সেটা নিয়ে খুব একটা ভাবি না। আমি যে প্রতিযোগিতাতেই খেলি না কেন, জিততে চাই। প্রতিটি টুর্নামেন্টকেই আমি সমান গুরুত্ব দিই’।

তবে তিনি স্বীকার করেন, সমালোচনা এবং সংশয়ই তাঁকে আরো জেদী করে তুলেছিল। বলেন, ‘মানুষ যখন আমাকে নিয়ে সন্দেহ করে, সেই চ্যালেঞ্জটাই আমার ভালো লাগে। হয়তো অনেকেই ভেবেছিল, আয়োজক দেশের অতিরিক্ত কোটার জন্যই আমি সুযোগ পেয়েছি। কিন্তু আমার বিশ্বাস, যদি ধারাবাহিক ভাবে নিজের সেরাটা খেলতে পারি, তা হলে আমি যে কাউকে হারাতে পারি’।