একের পর এক চোটে কার্যত ক্ষতবিক্ষত শরীর। সেই অবস্থা থেকেও মাঠে ফেরার লড়াই করা যায়!
হ্যাঁ, যায়। দেখিয়ে দিয়েছেন বাংলার জিমন্যাস্ট প্রণতি নায়েক। সেই কঠিন এবং দুঃসহ সময় পেরিয়ে এ বারও এশিয়ান গেমসে পদকের স্বপ্ন দেখছেন প্রণতি।
পশ্চিম মেদিনীপুরের পিংলা থেকে উঠে আসা ৩১ বছরের এই জিমন্যাস্টের কাছে এশিয়াডের মঞ্চ নতুন নয়। এ বার জাপানের আইচি-নাগোয়ায় নামবেন চতুর্থ এশিয়ান গেমসে। তবে এখনও এই প্রতিযোগিতা থেকে কোনো পদক জেতা হয়নি তাঁর। সেই অধরা সন্মান অর্জন করতেই এ বার ফের নামছেন ভারতের একমাত্র জিমন্যাস্ট হিসেবে।
চলতি মরসুমের শুরুর দিকে ‘প্ল্যান্টার ফ্যাসাইটিস’-এর সমস্যায় ভুগছিলেন প্রণতি। পায়ের এই চোটের কারণে কমনওয়েলথ গেমসে মহিলাদের ভল্টের ফাইনালেও উঠতে পারেননি। তার আগে ২০২৫-এ গোড়ালির লিগামেন্টে গ্রেড-২ চোট পান । সেই চোট সারিয়ে ফিরে মে মাসে তাসখন্দে বিশ্ব চ্যালেঞ্জ কাপে ভল্টে রুপো জিতেছিলেন তিনি।
এখন তিনি একশো শতাংশ ফিট। প্রণতি নিজেই বলছেন সে কথা। তাঁর মতে, ‘এখন আমি ১০০ শতাংশ ফিট। চোট জিমন্যাস্টদের জীবনেরই অংশ। জিমন্যাস্টদের অনেক চোট হয়। আমাদের সেগুলির যত্ন নিতে হয়’।
গ্লাসগোতে নিজের ভুলেই সমস্যা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন তিনি। প্রণতির কথায়, ‘দৌড়নোর সময় আমি একটা ভুল করেছিলাম। তবে সেটা চোটের জন্য হয়নি। কমনওয়েলথ গেমস থেকে ফেরার পরে আমি নিখুঁত ভাবে নামা, ল্যান্ডিং এবং নমনীয়তার উপর জোর দিয়েছি। এখন আর অতীত নিয়ে কিছু করার বা ভাবার নেই। সময়টা খুব কঠিন ছিল। এখন আমি তৈরি এবং মনোযোগীও’।
চোটের পরে দ্রুত অনুশীলনের চাপ বাড়াননি কোচ অশোক মিশ্র। ওড়িশায় তাঁর তত্ত্বাবধানেই অনুশীলন করেন প্রণতি। তিনি জানিয়েছেন, কমনওয়েলথ গেমসের পর প্রণতিকে তিন সপ্তাহ পুরো বিশ্রাম দেওয়া হয়েছিল। তার পরে ধীরে ধীরে প্রস্তুতি শুরু হয়।
কোচের কথায়, ‘ওর পায়ে সামান্য চোট ছিল। তাই কমনওয়েলথ গেমসের পরে আমরা ওকে পুরো তিন সপ্তাহ বিশ্রাম দিয়েছিলাম। বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটিয়েছে। তার পরে আমরা সরাসরি পুরো ভল্টিং করাইনি। প্রস্তুতির প্রাথমিক ধাপগুলির উপর জোর দিয়েছিলাম। ঘোরা এবং টুইস্টিংয়ে অভ্যস্ত হওয়ার পরে, পা সেরে গেলে ভল্টিং শুরু করাই’।
শুধু শরীর নয়, চোটের পরে মানসিক ভাবে ফিরে আসাটাও সহজ ছিল না। মনোবিদদের সাহায্য নিয়েছেন প্রণতি। তাঁর কথায়, ‘আমি অনেক মনোবিদের সঙ্গে কাজ করেছি। তাঁরা বলেছেন, যা করছি সেটাতেই মন দিতে। ভাল ভাবে ভাবলে ভাল ফল পাওয়া যাবে। মনকে প্রশিক্ষণ দিতে হয়। বেশি অনুশীলন করতে না পারলেও মনে মনে ড্রিলটা বার বার করতে পারি’।
এশিয়ান গেমসের লড়াই যে কঠিন হবে, তা ভালই জানেন প্রণতি। তিনি বলেছেন, ‘এশিয়ান গেমস খুব কঠিন হবে। সব সেরা জিমন্যাস্ট এবং অনেক অলিম্পিক পদকজয়ীরা অংশ নেবে এখানে। এশিয়ান গেমসের যোগ্যতা অর্জন পর্বে আমি ওদের দেখেছি’।
প্রণতির অস্ত্র কঠিন ‘সুকাহারা ৭২০’ ভল্ট। কিন্তু প্রথমেই সেই ঝুঁকি নিতে চাইছেন না কোচ। অশোকের লক্ষ্য আগে যোগ্যতা অর্জন করে ফাইনালে ওঠা। তিনি বলেছেন, ‘আমাদের প্রথম লক্ষ্য ফাইনালে ওঠা। ও আগে সুকাহারা ৭২০ করেছে। কিন্তু যদি নিখুঁত ভাবে ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে, ভাল এক্সিকিউশন এবং নির্ভুল ল্যান্ডিং করতে পারে, তা হলে ফাইনালে উঠবে’।
ফাইনালে ওঠার পরে পরিস্থিতি বুঝে ঝুঁকি বাড়ানো হবে। কোচের কথায়, ‘ফাইনালে উঠলে আমাদের হাতে দু’দিন থাকবে। তখন ভাবব আমরা কতটা ঝুঁকি নেব। ওর হাতে দুটো ভল্ট রয়েছে— ৭২০ এবং ফরোয়ার্ড ৫৪০। জাপানের সরঞ্জাম ওর কেমন লাগছে এবং সেগুলোতে ও কী ভাবে পারফরম্যান্স করছে, সে সব দেখে সিদ্ধান্ত নেব’।
এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে তিনটি পদক রয়েছে প্রণতির। বিশ্বকাপেও রয়েছে দু’টি ব্রোঞ্জ। কিন্তু এশিয়ান গেমসের পদক এখনও অধরা। এ বার তাই নিজের উপরেই ভরসা রাখছেন তিনি।
প্রণতির মন্ত্র কী? ‘আমার লড়াই নিজের সঙ্গে। আমি নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করব। কী ভাবে ল্যান্ডিং হচ্ছে, কী ভাবে জাম্প করছি, সেটা দেখেই ঠিক করব কোন ভল্ট করব’।
অলিম্পিকের স্বপ্নও এখনও ছাড়েননি ৩১ বছরের প্রণতি। ডান হাতে অলিম্পিক রিংয়ের ট্যাটু রয়েছে তাঁর। লস অ্যাঞ্জেলেসে আরও এক বার অলিম্পিকের মঞ্চে উঠতে চান। তাঁর স্পষ্ট বার্তা, ‘যত দিন ফিট থাকব, তত দিন হাল ছাড়ব না’।
এই মন্ত্রেই লড়ে যাচ্ছেন বাংলার মেয়ে। সাফল্য আসবে কি না, তা সময়ই জানে। কিন্তু তাঁর হাতে যে সময় বেশি নেই, তা নিজেও জানেন প্রণতি। একজন ভারতীয় জিমন্যাস্টের কাছে ৩১ বছরটা নেহাতই একটা সংখ্যা বলে উড়িয়ে দেওয়ার মতো তো নয়।