বেলজিয়ামের মহা প্রত্যাবর্তন, শেষ মুহূর্তের নাটক, দুই শিবিরেই অশান্তি, সেনেগালের বিদায়, ঘটনাবহুল ম্যাচে ঠিক কী কী হল?

Photo: X

৮৬ মিনিট পর্যন্ত ০-২-এ পিছিয়ে ছিল বেলজিয়াম। কিন্তু ম্যাচের শেষে দেখা যায় তারা ৩-২-এ জিতেছে। এমন অবিশ্বাস্য ফলই হয়েছে বুধবার সিয়াটলে, বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এর ম্যাচে।

প্রায় নিশ্চিত বিদায়ের মুখ থেকে অবিশ্বাস্যভাবে ফিরে আসার পর এ বার শেষ ষোলোয় তাদের প্রতিপক্ষ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এ দিন আগের ম্যাচে ইংল্যান্ড যে ভাবে পিছিয়ে থেকে ফিরে এসে জয় ছিনিয়ে নেয়, তার চেয়েও রোমহর্ষক প্রত্যাবর্তনে নক আউটে এক ধাপ এগিয়ে যায় বেলজিয়াম।

ম্যাচের শুরু থেকেই ছন্দে থাকা সেনেগাল প্রথমার্ধে এগিয়ে যায় হাবিব দিয়ারার গোলে। দ্বিতীয়ার্ধে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন ইসমায়লা সার। দুই গোলে এগিয়ে থেকে সেনেগাল যখন ইতিহাস গড়ার অপেক্ষায়, তখনই শুরু হয় বেলজিয়ামের অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন।
৮৬তম মিনিটে বেলজিয়ামকে ম্যাচে ফেরান রোমেলু লুকাকু। কয়েক মিনিটের মধ্যেই সমতা ফেরান ইউরি তিয়েলমানস। নির্ধারিত সময় শেষ হয় ২-২-এ এবং ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। অতিরিক্ত সময়ের একেবারে শেষ মুহূর্তে নাটকীয় মোড় নেয় ম্যাচ।


ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (VAR) পর্যালোচনার পর বেলজিয়ামকে পেনাল্টি দেওয়া হয়। সিদ্ধান্তটি নিয়ে সেনেগাল খেলোয়াড়দের তীব্র আপত্তি থাকলেও রেফারি নিজের সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন। ১২৫তম মিনিটে স্পট-কিক থেকে গোল করে বেলজিয়ামকে অবিশ্বাস্য জয় এনে দেন তিয়েলমানস। এটি বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বশেষ সময়ে করা জয়সূচক গোলগুলোর অন্যতম।

ম্যাচ শেষে নিজের অধিনায়কের ভূয়সী প্রশংসা করেন বেলজিয়ান কোচ রুডি গার্সিয়া। বলেন, “সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইউরি তিয়েলমানস অসাধারণ ধৈর্য ও মানসিক দৃঢ়তা দেখিয়েছে, পাশাপাশি নিজের গুণগত মানেরও প্রমাণ দিয়েছে। আরেকবার আমরা দেখলাম, এমন চাপের মুহূর্তে পেনাল্টি নেওয়ার মতো অভিজ্ঞতা আমাদের আছে। কারণ এমন পেনাল্টি নেওয়া মোটেও সহজ নয়।”
তিনি আরও বলেন, “স্কোর যখন ২-২, ম্যাচের ১২০তম মিনিট কিংবা তারও পরে, শরীর যখন ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ে এবং ইউরিও শারীরিকভাবে সেই ক্লান্তি অনুভব করছিল, তখন গিয়ে সেই পেনাল্টি থেকে গোল করা খুবই কঠিন কাজ। কিন্তু সে সেটা করে দেখিয়েছে। আর তার ফলেই আমরা শেষ ষোলোয় উঠে গেছি। আমাদের অধিনায়ককে অভিনন্দন। আমার মনে হয়, আজ সে ছিল অসাধারণ।”
পরের রাউন্ডের আগে এই নাটকীয় প্রত্যাবর্তন দলকে কতটা উজ্জীবিত করতে পারে, সে বিষয়েও কথা বলেন বেলজিয়াম কোচ। তিনি বলেন, “২-০ গোলে পিছিয়ে পড়ার পর সেখান থেকে ফিরে এসে ২-২ করা দলকে ভীষণ আত্মবিশ্বাস দেয়। আর এখন আমাদের যাত্রা অব্যাহত থাকল।”

গার্সিয়া আরও যোগ করেন, “এ ধরনের পরিস্থিতি একটি দলকে আরও বেশি ঐক্যবদ্ধ করে তুলতে পারে। এতে খেলোয়াড়রা উপলব্ধি করে যে ম্যাচ শেষ না হওয়া পর্যন্ত, শেষ বাঁশি না বাজা পর্যন্ত, যেকোনো কিছুই ঘটতে পারে—আজ আমরা সেটাই প্রমাণ করেছি।”
স্বাভাবিক ভাবেই এই হারে ভেঙে পড়েন সেনেগালের খেলোয়াড়রা। ম্যাচ শেষে কোচ পাপে থিয়াও বলেন, এমনভাবে বিদায় নেওয়া অত্যন্ত কষ্টের। তাঁর মতে, ফুটবল কখনও কখনও নিষ্ঠুর হতে পারে।

কিন্তু আড়াই মিনিটের মধ্যে পরপর দুগোল হজম করে বিধ্বস্ত সেনেগাল শিবিরে শুরু হয়ে যায় জোর অশান্তি। সেনেগালের তারকা ফুটবলার পাপে গুইয়ে জাতীয় দল থেকে সাময়িক অবসর ঘোষণা করে কোচের সঙ্গে নতুন বিতর্কের জড়িয়ে পড়েন।
ভিয়ারিয়েলের এই মিডফিল্ডার জানিয়েছেন, বর্তমান কোচিং ও টেকনিক্যাল টিম দায়িত্বে থাকা পর্যন্ত তিনি জাতীয় দলের বাইরে থাকবেন। ঘণ্টা খানেক খেলা হয়ে যাওয়ার পর গুইয়েকে মাঠ থেকে তুলে নেন কোচ। তাঁকে তুলে নামান মিডফিল্ডার লামিনে কামারাকে। এই নিয়েই বিতর্ক শুরু হয়েছে সে দেশের ফুটবলে।

ঝগড়া বাধে বেলজিয়াম শিবিরেও। তবে তা ম্যাচ চলাকালীন, মাঠের মধ্যেই। যখন তারা দু’গোলে পিছিয়ে এবং বেলজিয়াম গোল শোধ করার জন্য মরিয়া, তখন দলের তিয়েলমানস আক্রমণে উঠে প্রায়ই বলের দখল হারিয়ে ফেলছিলেন। বারবার বক্সে ক্রস করতে গিয়ে বলের ‘পজেশন’ হারিয়ে ফেলছিলেন, যা মোটেই মেনে নিতে পারেননি অধিনায়ক লিনদ্রো ট্রসার্ড এবং মাঠেই তিয়েলমানসকে ধমক দিতে শুরু করে দেন। রীতিমতো উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় শুরু হয়ে যায় দু’জনের মধ্যে।

ম্যাচের একেবারে শেষে ভুলটা নিজেই শুধরে দেন অধিনায়ক ট্রসার্ড। ঠিক কীভাবে বক্সের দিকে ক্রস তুলতে হয়, নিজেই তা দেখিয়ে দিলেন অধিনায়ক। বক্সের দিকে বাড়ানো তাঁর সেই নিখুঁত ক্রস থেকে গোলটা করে সমতা ফেরালেন সেই সতীর্থ তিয়েলসমান, যাঁর সঙ্গে একটু আগেই ঝামেলায় জড়িয়েছিলেন তিনি। তারপর- কয়েক মিনিট আগের ঝগড়া ভুলে একসঙ্গে উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠেন দুই সতীর্থ। শেষে পেনাল্টিতে গোল করে দলকে জেতান সেই তিয়েলসমানই।

শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মানসিকতা বেলজিয়ামকে এনে দিয়েছে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে নাটকীয় জয়গুলোর একটি। এই অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের সুবাদে তারা এখন শেষ ষোলোয় যুক্তরাষ্ট্রের মুখোমুখি হওয়ার অপেক্ষায়। যুক্তরাষ্ট্র এ দিন বসনিয়া ও হারজাগোভিনাকে ২-০-য় হারিয়ে শেষ ষোলোয় জায়গা পাকা করে নেয়।