কলকাতার ময়দানে দুর্নীতির নানা চক্র সক্রিয় হয়ে উঠছে, এমন অভিযোগ উঠছে বহুদিন ধরেই। দুর্নীতিপরায়ণ কিছু কর্মী ও কর্মকর্তা কলকাতা ময়দানের দখল নিয়েছেন এবং তারা বাংলার খেলাধুলার ভবিষ্যৎ অন্ধকারে ঢেকে দিয়েছেন, এই নিয়ে চর্চাও চলে ময়দানের আনাচে কানাচে। এই কর্মকর্তাদের মধ্যে বিখ্যাতও অনেকে আছেন বলে অভিযোগ করেন অনেকে। ছোট থেকে বড় অনেক খেলার সংস্থাতেই এই দুর্নীতির জাল ক্রমশ ছড়াচ্ছে বলে খবর পাওয়া যায় প্রায়ই।
এ বার এই অভিযোগগুলি জানিয়ে স্বয়ং রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রী ডা. ইন্দ্রনীল খাঁ-কে চিঠি দিলেন রাজ্য ক্রিকেট সংস্থা সিএবি-র প্রাক্তন সভাপতি অভিষেক ডালমিয়া। আর্জি জানালেন, এই ক্রমবর্ধমান দুর্নীতি রুখতে রাজ্য সরকার যেন বিশেষ উদ্যোগ নেয়। না হলে বাংলার খেলাধুলো চরম ক্ষতিগ্রস্থ হবে।
এই চিঠিতে অভিষেক লিখেছেন, “বিগত কয়েক বছরে বিভিন্ন ক্রীড়া ক্ষেত্রে দুর্নীতি, স্বজনপোষণ, যোগ্যতা সংক্রান্ত জালিয়াতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে বারবার অভিযোগ উঠেছে। প্রায়ই অভিযোগ করা হয় যে সুযোগ, নির্বাচন, অ্যাকাডেমিতে ভর্তি কিংবা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য খেলোয়াড় ও তাদের পরিবারকে টাকা দিতে বাধ্য করা হয়। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হল, যোগ্যতা নির্ধারণের নিয়মে কারসাজির অভিযোগ উঠছে। যার ফলে প্রকৃত স্থানীয় প্রতিভারা সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং ক্রীড়া প্রতিযোগিতার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।”
অভিষেক এই চিঠি সম্প্রতি সদ্য দায়িত্ব নেওয়া ক্রীড়ামন্ত্রীকে পাঠান। পরে তিনি এটি সোশ্যাল মিডিয়াতেও প্রকাশ করেন। দু’পাতার এই চিঠিতে ভারতের কিংবদন্তি ক্রিকেট প্রশাসক জগমোহন ডালমিয়ার পুত্র এক রাজ্য ক্রীড়া সংস্থার বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ করে এই চিঠিতে লেখেন, “বিশেষভাবে উদ্বেগজনক একটি ঘটনা হল রাজ্যের একটি স্বনামধন্য ক্রীড়া সংস্থার এক কমিটি সদস্যের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ। অভিযোগ করা হয়েছে যে, প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ এবং দলভুক্তির বিনিময়ে ক্রীড়াবিদ ও তাঁদের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে।“
ওয়াকিবহাল মহলের ধারণা, এই অভিযোগ সিএবি-র বিরুদ্ধেই আনা হয়েছে। এই বিষয়ে অভিষেক আরও লেখেন, “আরও জানা গিয়েছে যে, অর্থপ্রদানের নথি এবং সরাসরি ব্যাঙ্ক ট্রান্সফারের স্ক্রিনশটসহ বিভিন্ন তথ্যপ্রমাণ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনা হয়েছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্ট মহলে ধারণা তৈরি হয়েছে যে, কোনও স্বচ্ছ তদন্ত হয়নি। বরং অভিযোগকারীকে অভিযোগ প্রত্যাহার করতে রাজি করানোর চেষ্টা করা হয়েছে।”
রাজ্য ক্রিকেট সংস্থার অধীনে থাকা বিভিন্ন ক্লাবে এমন ঘটনা ঘটছে বলে বেশ কয়েক মাস ধরে সমাজ মাধ্যমে শয়ে শয়ে অভিযোগ করা হয়েছে। এমনকী সিএবি-র অন্দরমহলেও এই নিয়ে বহু অভিযোগপত্র জমা পড়েছে বলে শোনা যায়। কিন্তু অনেকেরই অভিযোগ, এইসমস্ত অভিযোগকে কোনও গুরুত্বই দেওয়া হয় না।
অভিষেক ডালমিয়ার প্রস্তাব, এ বার সরাসরি সরকারের কাছে যাতে অভিযোগ জানানো যায়, সেই ব্যবস্থা করা হোক। তিনি এই চিঠিতে এই প্রস্তাব দিয়ে লিখেছেন, “আমি পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে অনুরোধ করছি একটি নিবেদিত ও গোপনীয় ‘স্পোর্টস ইন্টিগ্রিটি অ্যান্ড অ্যান্টি-করাপশন হেল্পলাইন’ চালু করা হোক। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ক্রীড়াবিদ, অভিভাবক, কোচ, কর্মকর্তা, হুইসেলব্লোয়ার এবং সাধারণ মানুষ ক্রীড়াক্ষেত্রে দুর্নীতি, জবরদস্তি, স্বজনপোষণ, যোগ্যতা সংক্রান্ত জালিয়াতি, আর্থিক অনিয়ম এবং অন্যান্য অসদাচরণের অভিযোগ জানাতে পারবেন। এই ব্যবস্থায় অভিযোগকারীদের পরিচয় গোপন রাখা এবং ভয়ভীতি বা প্রতিহিংসামূলক আচরণ থেকে সুরক্ষার নিশ্চয়তা থাকতে হবে, একই সঙ্গে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতাও নিশ্চিত করতে হবে”।
চিঠির শেষে তিনি আবেদন করেছেন, “পশ্চিমবঙ্গ বহু প্রজন্ম ধরে এমন সব কৃতী ক্রীড়াবিদ সৃষ্টি করেছে, যারা রাজ্য ও দেশের গৌরব বৃদ্ধি করেছেন। তাঁরা এমন একটি ক্রীড়া পরিবেশ পাওয়ার যোগ্য, যেখানে সুযোগ নির্ধারিত হবে প্রতিভা ও পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে—প্রভাব, কারসাজি বা আর্থিক বিবেচনার ভিত্তিতে নয়। সুতরাং আমি আপনার সম্মানিত দপ্তরের কাছে আবেদন জানাচ্ছি, ক্রীড়াক্ষেত্রে সততা রক্ষার উদ্দেশ্যে একটি শক্তিশালী অভিযোগ গ্রহণ ও নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তুলুন। এমন একটি উদ্যোগ স্পষ্ট বার্তা দেবে যে পশ্চিমবঙ্গের ক্রীড়া পরিমণ্ডলে দুর্নীতি ও অসদাচরণের কোনও স্থান নেই।আসুন, আমরা সবাই মিলে এমন একটি ক্রীড়া সংস্কৃতি গড়ে তুলি, যার ভিত্তি হবে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, ন্যায্যতা এবং সকলের জন্য সমান সুযোগ।”
ইতিমধ্যেই নতুন দায়িত্ব নেওয়া ক্রীড়ামন্ত্রী রাজ্যের দুই নামী ক্রীড়াবিদ জ্যাোতির্ময়ী শিকদার ও দিব্যেন্দু বড়ুয়ার সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এ বার প্রাক্তন সিএবি সভাপতির কাছ থেকেও এই চিঠি পেলেন। এ বার তিনি এর পরিপ্রেক্ষিতে কী পদক্ষেপ নেন সেটাই দেখার।