‘অপরাধীদের মুখোশ খুলতেই হবে’— ফের ময়দানে ‘অপারেশন ক্লিন-আপ’-এর ডাক দিলেন অভিষেক ডালমিয়া

‘আবারও বলছি, অপারেশন ক্লিন-আপ — খেলাধুলায় পবিত্রতা ফিরিয়ে আনার সময় এসেছে’– এ ভাবেই তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট শুরু করেছেন সিএবি-র প্রাক্তন সভাপতি অভিষেক ডালমিয়া।

স্থানীয় ক্রিকেটে যে ভাবে ঝাঁকে ঝাঁকে দুর্নীতির অভিযোগ আসছে, তা দূর করতে এ বার এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানালেন অভিষেক। বৃহস্পতিবার রাতে তাঁর এই সোশ্যাল পোস্ট দেখে বাংলার ক্রিকেট মহলে অনেকেই বলাবলি শুরু করেছেন, এ বার কি তা হলে সৌরভ গাঙ্গুলি ও অভিষেক ডালমিয়ার মুখোমুখি লড়াই আসন্ন?

এর আগে রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রী ইন্দ্রনীল খাঁ-কে এক দীর্ঘ চিঠিতে ক্রিকেট মাঠের দুর্নীতি নিয়ে জানিয়েছিলেন অভিষেক। এইসব দুর্নীতি নিয়ে যাতে সরকারের কাছে নিয়মিত অভিযোগ জানাতে পারে সাধারণ মানুষ, সে জন্য হেল্পলাইন বা নির্দিষ্ট ই-মেল আইডি-র ব্যবস্থা করারও আর্জি জানিয়েছিলেন তিনি।


এর পরেই সিএবি সভাপতি সৌরভ গাঙ্গুলিও ক্রীড়ামন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে তাঁকে একটি চিঠি দিয়ে আসেন, যাতে দাবি করা হয়, স্থানীয় ক্রিকেট দুর্নীতিমুক্ত ও তাতে স্বচ্ছতা বজায় রাখার জন্য যা যা পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন, তা সবই নেওয়া হয়ে থাকে রাজ্য ক্রিকেট সংস্থার তরফ থেকে। অভিষেক ডালমিয়ার চিঠিতে সিএবি-কে সরাসরি অভিযুক্ত করা না হলেও সিএবি-র চিঠিতে অভিষেকের চিঠির প্রসঙ্গে টানা হয়। এ বার আর চিঠি দিয়ে নয়, সরাসরি সামাজিক মাধ্যমে নিজের বক্তব্য পেশ করেছেন প্রাক্তন সিএবি সভাপতি।

এই পোস্টে ঠিক কী লিখেছেন অভিষেক ডালমিয়া? তাঁর বক্তব্য, “এমন এক পরিবেশ তৈরি করার সময় এসেছে, যেখানে খেলোয়াড় বা তাঁদের অভিভাবকদের কাছ থেকে দলে সুযোগ করে দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ দাবি করার আগে মানুষ দু’বার ভাবতে বাধ্য হয়।”
ময়দানে ভুয়ো পরিচয়পত্র তৈরি করে অনেকে অনৈতিক ভাবে সুযোগ আদায় করে নিচ্ছে, এই অভিযোগও তুলেছেন অভিষেক। তাঁর মন্তব্য, “ভুয়ো পরিচয়, জাল নথি বা অন্য কোনো কারসাজির মাধ্যমে যদি প্রকৃত যোগ্য স্থানীয় খেলোয়াড়দের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়ে থাকে, তাহলে সেই সত্য সামনে আসতেই হবে। ভুয়ো পরিচয় তৈরি করা শুধু অনৈতিকই নয়, আইন অনুযায়ী, এটি অপরাধও”।

এই প্রসঙ্গে তিনি আরও লেখেন, “অন্যায্য সুবিধা আদায়, প্রতারণা করা বা তথ্য বিকৃতভাবে উপস্থাপনের উদ্দেশ্যে এমন কাজ করা হলে তার আইনি পরিণতিও ভোগ করতে হতে পারে। খেলোয়াড়, অভিভাবক, কোচ এবং কর্মকর্তাদের এমন স্বাধীনতা থাকতে হবে, যাতে তাঁরা কোনো রকম ভয় ছাড়াই অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ জানাতে পারেন। আমি আগেও বলেছি, আবারও বলছি—অপারেশন ক্লিন-আপ শুরু করার সময় এসে গিয়েছে”।

সৌরভ গাঙ্গুলির নেতৃত্বাধীন রাজ্য ক্রিকেট সংস্থা যেখানে রীতিমতো ক্রীড়ামন্ত্রীর কাছে চিঠি দিয়েছে গত তিন দশকে কোনও সিএবি কর্তা এই ধরনের অভিযোগ জনসমক্ষে করেননি, সেখানে বারবার অভিষেক ডালমিয়া পাবলিক প্ল্যাটফর্মে যে ভাবে নিজের বক্তব্য তুলে ধরছেন, তা বেনজির ঘটনা। এর আগে ক্রীড়ামন্ত্রীকে যে চিঠি দিয়েছিলেন তিনি, সেই চিঠিও সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেন তিনি।

তিনি নিজে যে সময়ে সিএবি-র সভাপতি ছিলেন, সেই সময়ের প্রসঙ্গ টেনে এনে এই পোস্টে অভিষেক লিখেছেন, “আমি যখন সিএবি সভাপতি ছিলাম, তখন শৃঙ্খলা ও সততা বজায় রাখার জন্য ব্যক্তিগত উদ্যোগে তদন্ত শুরু করেছিলাম এবং প্রায় পঞ্চাশজনকে সাময়িক বরখাস্ত করার মতো পদক্ষেপ নিয়েছিলাম। সেই ঘটনাই প্রমাণ করে যে, সদিচ্ছা থাকলে অর্থবহ ও কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব”।
ফের তিনি দুর্নীতির অভিযোগ জানানোর জন্য হেল্পলাইনের দাবি তুলে লিখেছেন, “কোনো ক্রীড়া সংস্থা একা এই লড়াই লড়তে পারে না। তাই উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের অধীনে একটি ‘স্পোর্টস ইন্টেগ্রিটি অ্যান্ড অ্যান্টি-করাপশন হেল্পলাইন’ গঠন করা অত্যন্ত জরুরি, যাতে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও হুইসেলব্লোয়াররা ভয়মুক্ত হয়ে অনিয়মের অভিযোগ জানাতে পারেন। যাঁরা কিশোর-তরুণ খেলোয়াড়দের শোষণ করেন, দলে সুযোগ দেওয়ার জন্য অর্থ দাবি করেন, সুযোগ-সুবিধা নিয়ে কারসাজি করেন বা ভুয়ো পরিচয় তৈরি করেন, তাঁদের মুখোশ খুলতেই হবে”।

সাম্প্রতিক অতীতে প্রকাশ্যে এতটা আগ্রাসী মেজাজে ব্যাট চালাতে দেখা যায়নি অভিষেক ডালমিয়াকে। কয়েক দিনের মধ্যেই মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়া যুগ্মসচিব মদন ঘোষের পরিবর্তে কোনও কর্তাকে সেই আসনে বসানোর প্রক্রিয়া শুরু হবে। এর পরে সচিব বাবলু কোলেকেও বয়স পেরিয়ে যাওয়ার কারণে জায়গা ছেড়ে দিতে হবে। সেই জায়গা পূরণের প্রক্রিয়াও হবে। হয় নির্বাচন, নয় বাছাই পদ্ধতিতে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।

এই দুই পদের জন্য অভিষেকের প্রতিনিধিরা লড়াই করবে, এমন সম্ভাবনাও দেখতে পাচ্ছেন কেউ কেউ। প্রশ্ন উঠছে, সে জন্যই কি এমন টি-২০-র মেজাজে ব্যাটিং করছেন প্রাক্তন সিএবি প্রেসিডেন্ট এবং বর্তমান আইপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের অন্যতম সদস্য? এর উত্তর সময়ই দেবে। তবে সিএবি-তে বর্তমান ও প্রাক্তন প্রেসিডেন্টের সংঘাতের সম্ভাবনা যে অনেকেই দেখতে পারছেন, এই নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।