আজই কি চলতি বিশ্বকাপের নক আউট পর্বে জায়গা করে নেবে আজেন্টিনা? আজই কি বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় শীর্ষে পৌঁছে যাবেন লিওনেল মেসি? এই দুই প্রশ্ন নিয়েই সারা দুনিয়া আজ তাকিয়ে থাকবে ডালাসে আর্জেন্টিনা বনাম অস্ট্রিয়া ম্যাচের দিকে, ভারতীয় সময়ে যা শুরু হবে রাত সাড়ে দশটায়।
এই ম্যাচেরই অনুশীলন চলছিল রবিবার কানসাস সিটিতে। কখনও রদ্রিগো দে পলের সঙ্গে হাসিঠাট্টা করছিলেন মেসি, আবার ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে যখন তাঁকেই ‘পিগি ইন দ্য মিডল’ বা মাঝখানে দাঁড়িয়ে বল কাড়ার ভূমিকায় থাকতে হচ্ছিল। শয়ে শয়ে জোড়া চোখ ছিল তাঁর দিকে। ক্যামেরার শাটার অবিরাম ক্লিক করছে, মোবাইল ফোনগুলো প্রায় অতিরিক্ত ব্যবহারে গরম হয়ে উঠছে। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা মানুষ দড়ির বেড়ার পেছনে দাঁড়িয়ে শুধু এক ঝলক দেখার অপেক্ষায় ছিলেন, কীভাবে অনুশীলনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বিশ্বসেরা ফুটবলার।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা এতটাই কঠোর যে আর্জেন্টিনা দলের বাস যেদিক দিয়ে যায়, সেখানকার হাইওয়ে পর্যন্ত সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। স্থানীয় এক ব্যক্তি মজা করে বলছিলেন, লিওনেল স্কালোনির বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দল যখন অনুশীলনে নামে, তখনই সম্ভবত ব্যাঙ্ক ডাকাতির সবচেয়ে উপযুক্ত সময়—কারণ সবার নজর তখন অন্যদিকে থাকে।
বিশেষ অতিথিদের জন্য যেমন রাজকীয় অভ্যর্থনার আয়োজন করা হয়, কানসাস সিটিতেও তেমনই পরিবেশ। আন্তর্জাতিক ফুটবলে সম্ভবত এটাই হতে চলেছে মেসির শেষ বিশ্বকাপ। পুরো শহরজুড়ে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের ঢল নেমেছে। কানসাস সিটিগামী বিমান বুকিংয়ের সংখ্যা বেড়েছে অবিশ্বাস্য ২,১৪৩ শতাংশ। শুধু তাই নয়, দক্ষিণ আমেরিকা থেকে তিনজন সমর্থক ন’মাস ধরে ১৭টি দেশ পেরিয়ে সাইকেল চালিয়ে এখানে পৌঁছেছেন।
আর্জেন্টিনা শিবিরে সামগ্রিকভাবে শান্ত পরিবেশ থাকলেও গত সপ্তাহে দু’টি ঘটনায় সেই শান্তি কিছুটা বিঘ্নিত হয়েছিল। প্রথম ঘটনা ঘটে যখন ম্যাচ দেখতে যাওয়া সমর্থকে ঠাসা একটি উবার গাড়ি একাধিক বন্দুক হামলার ঘটনার মধ্যে পড়ে যায়।
এরপর আরও বড় বিতর্ক তৈরি হয়, যখন আর্জেন্টিনার কিছু গণমাধ্যম ভুলবশত খবর প্রকাশ করে যে মেসির বাবা, জর্জ মেসি মারা গেছেন। এই ভুয়ো খবর দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে দ্রুত ক্ষমা প্রার্থনা এবং পদত্যাগের ঘটনাও ঘটে, তবে সেই ক্ষত পুরোপুরি সারতে পারে তখনই, যখন সাদা-নীল বাহিনী নক আউট পর্বে জায়গা পাকা করে নেবে এবং আরও একটি গোল দিয়ে বিশ্বকাপের সেরা গোলদাতাদের তালিকায় এক নম্বরে পৌঁছে যাবেন মেসি।
ডালাসের এই ম্যাচের আগে সাংবাদিক সম্মেলনে অবশ্য খোলামেলা কথা বললেন আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি।শিবিরের বর্তমান অবস্থা নিয়ে তিনি বলেন, “দল ভালো অবস্থায় আছে এবং আগামীকালের ম্যাচের জন্য প্রস্তুত।” প্রতিপক্ষ অস্ট্রিয়াকে হালকাভাবে নিতে নারাজ বিশ্বকাপজয়ী কোচ। তিনি বলেন, “অস্ট্রিয়া কঠিন প্রতিপক্ষ, তাদের দলে খুব ভালো ভালো খেলোয়াড় রয়েছে। তারা যথেষ্ট চাপ সৃষ্টি করতে পারে এবং বাছাইপর্বেও অসাধারণ খেলেছে। নিঃসন্দেহে এটা কঠিন ম্যাচ হবে। এই বিশ্বকাপে কোনো ম্যাচই সহজ নয়।” দলের খেলোয়াড়দের ফিটনেস নিয়েও সুখবর দিয়েছেন তিনি। স্কালোনির মন্তব্য, “কাল মাঠে নামার জন্য সবাই তৈরি রয়েছে।”
লিওনেল মেসিকে নিয়ে প্রশ্নের উত্তরে দলের অধিনায়ককে নিয়ে স্কালোনি বলেন, “আমি চাই লিও ভাল ও আনন্দে থাকুক। ওর জন্য এটাই আমার স্বপ্ন, আর আমি বিশ্বাস করি সবাইতা-ই চায়।”
অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে মেসির সামনে অপেক্ষা করছে আরও তিনটি বড় মাইলফলক। প্রথমটি বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে একটি গোল করলেই ১৭ গোল নিয়ে এককভাবে শীর্ষে পৌঁছে যাবেন তিনি। দ্বিতীয় রেকর্ডটিও ক্লোজের সঙ্গে সম্পর্কিত। আলজেরিয়ার বিপক্ষে জয়টি ছিল বিশ্বকাপে মেসির ১৬তম জয়। ক্লোজের বিশ্বকাপ জয়ের সংখ্যাও সমান। এবারের আসরে আর একটি ম্যাচ জিতলেই বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ জেতা খেলোয়াড়ের রেকর্ড নিজের নামে করে নেবেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।
তৃতীয় মাইলফলকটি দূরপাল্লার শটে গোল করার। আলজেরিয়ার বিপক্ষে তাঁর প্রথম গোলটি আসে দূরপাল্লার শটে। এর ফলে বিশ্বকাপে পেনাল্টি বক্সের বাইরে থেকে মেসির গোলসংখ্যা দাঁড়ায় পাঁচ। এতদিন এই রেকর্ড এককভাবে ছিল ব্রাজিলের কিংবদন্তি রিভালডোর দখলে। আলজেরিয়ার বিপক্ষে গোল করে মেসি তাঁর পাশে নাম লিখিয়েছেন। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে বক্সের বাইরে থেকে আর একটি গোল করতে পারলেই এই তালিকারও শীর্ষে পৌঁছে যাবেন তিনি।
এর আগে ২০১৪ বিশ্বকাপে—বসনিয়া, ইরান ও নাইজেরিয়ার বিপক্ষে এবং ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে মেক্সিকো ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বক্সের বাইরে থেকে দূরপাল্লার শটে যথাক্রমে দুটি গোল করেন তিনি। সবশেষে এই বিশ্বকাপে আলজেরিয়া ম্যাচেও দূরপাল্লার শটে গোল করে সেই তালিকায় আরও এগোন মেসি। এ বার শ্রেষ্ঠত্বের দোরগোরায়।
মেসিকে বা দলর অন্য খেলোয়াড়দের চিন্তা বিশ্বকাপে গরম আবহাওয়ার কারণে চালু হওয়া অতিরিক্ত হাইড্রেশন ব্রেক নিয়েও নিজের মতামত তুলে ধরেন আর্জেন্টিনা কোচ। তিনি বলেন, “গরম আবহাওয়া এবং বারবার খেলা থামানোর ফলে খাতায়-কলমে দুর্বল দলগুলো সুবিধা পেয়ে যায়। তারা নিজেদের গুছিয়ে নেওয়ার এবং এমন কিছু প্রস্তুতি নেওয়ার সময় পায়, যা হয়তো আগে সম্ভব হতো না। অতিরিক্ত সময় দেওয়ার জন্যই এটা করা হয়েছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত খেলার ধারাবাহিকতা কিছুটা ভেঙে যায়। চারবার খেলা থামানোর বিষয়টি এখন নিয়ম করা হয়েছে, আর এখন আমাদের তার সঙ্গে মানিয়ে নিয়েই কাজ করতে হবে।”
তবে এই বিরতিগুলো শুধু যে দুর্বল দলের জন্য নয়, আক্রমণাত্মক দলগুলোর জন্যও কাজে আসে তাও স্বীকার করেন স্কালোনি। বলেন, “আমাদের বিশ্লেষকরা ওপর থেকে ম্যাচ পর্যবেক্ষণ করেন, আর আমরা বেঞ্চে বসে থাকি। আমরা সমাধান খুঁজি এবং সাধারণ বিরতিতে যা করা হয়, সেই কাজগুলোই করি। কখনও কখনও আমি ভুল করে বলি যে এটা শুধু দুর্বল প্রতিপক্ষের জন্য সুবিধাজনক, কিন্তু আসলে যে দল আক্রমণ করতে চায়, তাদেরও নিজেদের কৌশলে ব্যালান্স আনার সময় দেয়।”