অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন! ফের মেসি-ম্যাজিক, দু’গোলে পিছিয়ে গিয়েও ৩-২-এ মিশরকে হারিয়ে শেষ আটে আর্জেন্টিনা

Photo: Representational Image

চোখের জলে কার্যত ভেসে যাওয়ার উপক্রম আটলান্টা স্টেডিয়াম। এক দিকে হাউ হাউ করে কাঁদছেন বিশ্ব ফুটবলের রাজপুত্র ও তাঁর বেশিরভাগ সতীর্থই। তাঁদের দেখে নিজেকে সামলাতে পারলেন না তাঁদের কোচ লিওনেস স্কালোনিও। এতটাই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি যে টিভি ক্যামেরার সামনে মাঝপথে ইন্টারভিউ থামিয়ে বলে দেন, ‘আর পারছি না, এ বার ছেড়ে দিন’।

অন্যদিকে লাল জার্সিধারী মিশরের ফুটবলারদেরও চোখের জল বাধা মানছে না। অঝোর ধারায় বয়ে চলেছে। কে যে কাকে সান্ত্বনা দেবেন, বুঝে উঠতে পারছেন না। একটু আগেই বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে তারা ৭৯ মিনিট পর্যন্ত ২-০-য় এগিয়ে ছিল। আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে এই প্রথম বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন দেখা যখন শুরু করেছেন সবে, তখনই যেন আকাশ ভেঙে পড়ে তাদের মাথায়। যেন মিনিট ১৫-র
একটা সাইক্লোন এসে তাদের সব স্বপ্ন, যাবতীয় পরিশ্রম ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে চলে যায়।
৭৯ মিনিটের মাথায় ক্রিশ্চিয়ান রোমেরোর গোল। ৮৩ মিনিটে ফের মেসি ম্যাজিক এবং সংযুক্ত সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে এনজো ফার্নান্ডেজের গোলেই মিশরের যাবতীয় স্বপ্ন শেষ। সারা বিশ্ব দেখল বিশ্বকাপের ইতিহাসে অন্যতম সেরা প্রত্যাবর্তনের ঘটনা। যা এক সময় অসম্ভব মনে হচ্ছিল, পরপর তিনটি গোলে, তা-ই সম্ভব করে দেখাল চার বছর আগের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।

তিন দিন আগে এ ভাবেই নরওয়ের বিরুদ্ধে দু’গোলে পিছিয়ে গিয়ে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছিল বিশ্বফুটবলের আর এক দৈত্য ব্রাজিল। সান্ত্বনা পুরস্কার হিসেবে একটি শোধ করতে পেরেছিল ঠিকই, কিন্তু তাতে ঘুরে দাঁড়িয়ে জয় ছিনিয়ে নেওয়ার মরিয়া চেষ্টা ছিল না। সেই রাতে ঠিক এ ভাবে অঝোরে কাঁদতে দেখা গিয়েছিল ফুটবল দুনিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় তারকাদের মধ্যে অন্যতম নেইমারকে। গত রাতে স্পেনের কাছে হেরে, বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গিয়ে চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোও।


এ দিন মেসিকেও কাঁদাল ফুটবল। তবে অন্যদের মতো এ বুকফাটা কান্না নয়, এ আনন্দে আত্মহারা হয়ে আবেগে ভেসে যাওয়া কান্না, যা দেখে গ্যালারিতে সমর্থকেরাও কান্নায় ভেসে যান। দুই দলেরই সমর্থকেরা আবেগে ভেসে যান। কেউ আনন্দে, কেউ দুঃখে। ফাইনালেরও অনেক আগে বিশ্বকাপের কোনো ম্যাচে এমন আবেগে পরিপূর্ণ দৃশ্য কখনো দেখা গিয়েছে বলে মনে পড়ে না।

এ দিন ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলা মিশর ১৫ মিনিটের মাথায় ইয়াসের ইব্রাহিমের গোলে এগিয়ে যায়। এর পর দ্বিতীয়ার্ধে দ্রুত পাল্টা আক্রমণ থেকে মোস্তাফা জিকো গোল করে ব্যবধান ২-০ করেন।ম্যাচের ঘণ্টাখানেক পূর্ণ হওয়ার ঠিক আগে মিশর আরও একবার জালে বল জড়িয়ে দেয়। তারা ভেবেছিল তারা ব্যবধান ২-০ করে ফেলেছে। ডান উইং দিয়ে দুরন্ত গতিতে এগিয়ে গিয়ে হাইসেম হাসান বল বাড়ান মোহাম্মদ সালাহর উদ্দেশে। সালাহর পাস থেকে মুস্তাফা জিকো বল জালে জড়িয়ে দেন।

আপাত দৃষ্টিতে এটা গোলই ছিল। কিন্তু টিভি রিপ্লে-তে দেখা যায় আক্রমণ শুরুর সময় ফাউল হয়েছিল। সেই কারণে গোলটি বাতিল করে মিশরের বক্সের বাঁ দিকে আর্জেন্টিনাকে ফ্রি-কিক দেন রেফারি।কিন্তু এতেও দমে যাননি অসম সাহসী মিশরের ফুটবলাররা। কিছুক্ষণ পর, ৬৭তম মিনিটে দ্রুতগতির এক পাল্টা আক্রমণে সালাহ ও হাসানের চমৎকার সমন্বয়ের পর জিকো আর ভুল করেননি। নিখুঁত ফিনিশে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন তিনি। এবং জয়ের একেবারে দোরগোড়ায় পৌঁছে যায় মিশর।

দু’গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর নিজেদের গোল এরিয়াকে রীতিমতো লাল-দূর্গে পরিণত করে মহম্মদ সালাহ-রা। তাদের গোলপ্রহরী মোস্তাফা শুবির হয়ে ওঠেন সবচেয়ে দুর্ভেদ্য প্রাচীর। সারা ম্যাচে এ দিন সাতটি শট লক্ষ্যে রেখেছিল আর্জেন্টিনা, সেখানে মিশরের দু’টি শট ছিল তিনকাঠির মধ্যে। আর সেই দু’টি থেকেই গোল ছিনিয়ে নেন আফ্রিকানরা।

দ্বিতীয়ার্ধের বেশিরভাগ সময় জুড়েই খেলা হয় মিশরের গোল এরিয়ায়। ২২ জন ফুটবলারের মধ্যে অন্তত ১৯-২০ জনকে দেখা যাচ্ছিল মিশরের বক্সের ভিতরে-বাইরে। লাতিন ফুটবলাররা গোল করবেনই আর আফ্রিকানরা কিছুতেই তাদের গোল করতে দেবেন না। এই লড়াইয়ে উত্তেজনার পারদ চরমে ওঠে। ওই সময়েই ফুটবলের আসল লড়াই উপভোগ করে সারা দুনিয়া।

আর্জেন্টিনা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। তাদের পরিকল্পনা যে অন্যদের চেয়ে আলাদা হবেই, এটাই স্বাভাবিক। তারা সমানে প্রতিপক্ষকে তাদের এলাকায় কোণঠাসা করে রেখে মানসিক ও শারীরিক ভাবে ক্লান্ত করে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে সমানে আক্রমণ করে যায়। এবং তারা যেটা চাইছিল, সেটাই হয়।
ম্যাচের মোড় ঘুরতে শুরু করে ম্যাচের ৭৮ মিনিট পর থেকেই। প্রথমে ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো একটি গোল শোধ করেন। তারপর লিওনেল মেসির দুর্দান্ত ফিনিশে সমতা ফেরে। শেষ পর্যন্ত এনজো ফার্নান্দেজের জয়সূচক গোলেই উচ্ছ্বাসের বিস্ফোরণ ঘটে আটলান্টা স্টেডিয়ামে। আর্জেন্টিনার এই অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের গল্প ফুটবলের ইতিহাসে এক আলাদা অধ্যায় হয়ে থাকবে।

ম্যাচ শেষে আবেগাপ্লুত মেসিকে অঝোর ধারায় কাঁদতে দেখা যায়। তুমুল পরিশ্রমের ঘাম ও চোখ থেকে নেমে আসা আনন্দধারা মিলেমিশে একাকার। সতীর্থদের সঙ্গে উদ্‌যাপনের সময় শুধুই কাঁদছিলেন তিনি, বলার মতো ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলেন না। এই জয়ে বিশ্বকাপে তাঁর স্বপ্নের অভিযান আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল। একই সঙ্গে বিশ্বকাপে নিজের গোলসংখ্যাও আরও বাড়িয়ে নিলেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।
তবে ম্যাচের শেষে বিতর্ক আর্জেন্টিনার সঙ্গ ছাড়েনি।

মিশরের ফুটবলার ও কোচিং স্টাফের অভিযোগ, দুটি পেনাল্টি দেওয়া হয়নি তাঁদের। বিশেষ করে আর্জেন্টিনার জয়সূচক গোলের আগে একটি ফাউলের দাবি তোলেন তাঁরা। ম্যাচ শেষে বেশ আগ্রাসী প্রতিক্রিয়াও দেখান মিশরের কোচ ও কর্মকর্তারা। তাঁদের নিয়ন্ত্রণে আনতে একাধিক কার্ডও দেখাতে হয় রেফারিকে।

ম্যাচের আগে আর্জেন্টিনার কোচ স্কালোনি সতর্ক করেছিলেন যে, বিশ্বকাপে কোনও প্রতিপক্ষকেই হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। সেই সতর্কবার্তাই যেন সত্যি প্রমাণ করে দেয় মিশর। কিন্তু আর্জেন্টিনা দলে যে লিওনেল মেসি নামের একজন কিংবদন্তি আছেন। যাঁর ম্যাজিকে ওলোট-পালোট হয়ে যায় অনেক কিছুই। শেষ পর্যন্ত তাঁরই অনুপ্রেরণায় কঠিন পরীক্ষায় উতরে কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা পাকা করে নিল বিশ্বসেরারা। রবিবার ভোরের সেই ম্যাচে তাদের মুখোমুখি হবে সুইৎজারল্যান্ড।