ফের শেষ বেলায় ঝড় তুলে বাজিমাত আর্জেন্টিনার, গোল না পেলেও গোল করিয়ে নায়ক সেই মেসি

Image: ANI

৮৫ মিনিট পর্যন্ত ০-১ গোলে পিছিয়ে পড়েও ম্যাচের শেষ দিকে দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে ২-১-এ জয় ছিনিয়ে নিল লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা। টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ ফাইনালে তারা। চলতি বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে তাদের পুরো অভিযানের মতোই, সেমিফাইনালেও ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে রুদ্ধশ্বাস নাটকীয় প্রত্যাবর্তন ঘটাল আলবিসেলেস্তেরা।

ম্যাচের ৮৬ মিনিটে দূরপাল্লার অসাধারণ এক শটে সমতা ফেরান এনজো ফার্নান্দেজ। এরপর সংযুক্ত সময়ে হেডে জয়সূচক গোল করেন লাউতারো মার্তিনেজ। আর্জেন্টিনার এই অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের নেপথ্যে ছিলেন সেই মেসি-ই। দলের দুই গোলেই অ্যাসিস্ট করে তিনি বুঝিয়ে দিলেন, প্রতিপক্ষ তাঁকে গোল করতে না দেওয়ার পরিকল্পনা করলেও কোনো লাভ নেই, গোল করাতেও তিনি ওস্তাদ।

১৯৬৬-র পর এই প্রথম বিশ্বকাপের ফাইনালের দোরগোড়ায় পৌঁছে গিয়েছিল ইংল্যান্ড। আটলান্টায় ৬৮,২৩৯ দর্শকের সামনে দ্বিতীয় সেমিফাইনালের দ্বিতীয়ার্ধের ১০ মিনিটের মাথায় অ্যান্থনি গর্ডনের গোলে এগিয়ে যায় তারা। এই সেই আটলান্টার মাঠ, যেখানে শেষ ষোলোয় মিশরের বিরুদ্ধে ০-২ গোলে পিছিয়ে পড়েও অবিশ্বাস্যভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে জিতেছিল আর্জেন্টিনা।


তবে বিশ্বকাপের মঞ্চে আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ডের দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বরাবরই উপহার দিয়েছে বহু স্মরণীয় ম্যাচ। সেই তালিকায় এবার যোগ হল আরও একটি অধ্যায়। ম্যাচের শেষ মুহূর্তে পরপর দুই ‘সাকার পাঞ্চ’-এ ইংল্যান্ডের স্বপ্ন ভেঙে দিয়ে আর্জেন্টিনা ইতিহাস গড়ল, যা সে দেশের ফুটবল ইতিহাসে সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে।

ম্যাচের ৮৫ মিনিটে লিওনেল মেসির বাড়ানো বল থেকে জোরালো শটে সমতা ফেরান এনজো ফার্নান্দেজ। এর পর যখন ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে গড়ানোর অপেক্ষায় সবাই, ঠিক তখনই সংযুক্ত সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে মেসির নিখুঁত ক্রস থেকে হেডে জয়সূচক গোল করে দলকে ফাইনালে তুলে দেন পরিবর্ত ফুটবলার লাউতারো মার্তিনেজ।

মেসির এই ম্যাজিক হয়তো ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে দিয়েগো মারাদোনার ঐতিহাসিক পারফরম্যান্সের সমকক্ষ নয়। তবে এবার আর্জেন্টিনাকে খাদের কিনারা থেকে ফিরিয়ে আনে এই দুই গোল এবং টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নও বাঁচিয়ে রেখেছে।

১৯৬২ সালে ব্রাজিলের পর আর কোনো দল বিশ্বকাপ খেতাব ধরে রাখতে পারেনি। এবার সেই ইতিহাস বদলানোর সুযোগ আর্জেন্টিনার সামনে। একই সঙ্গে লিওনেল মেসিও ব্রাজিলের কিংবদন্তি কাফুর পর মাত্র দ্বিতীয় ফুটবলার হিসেবে তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলার নজির গড়তে চলেছেন।

৩৯ বছর বয়স পর্যন্ত অপেক্ষা করার পর অবশেষে বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন মেসি। ফাইনালে এই প্রথম তাঁর সামনে প্রতিপক্ষ হিসেবে থাকবে স্পেন। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে খেতাব জিতিয়ে অনেকেরই মনে হয়েছিল, মেসির ফুটবল জীবন সম্পুর্ণ হল। কিন্তু তিনি যে এখনও থামতে রাজি নন, সেটাই আবারও প্রমাণ করে দিলেন।

তবে ইংল্যান্ডের আক্ষেপের সীমা নেই। শনিবার মায়ামিতে তৃতীয় স্থান নির্ধারক ম্যাচে ফ্রান্সের মুখোমুখি হবে ইংল্যান্ড। এমন একটি ম্যাচ, যেখানে বাস্তবে কোনও দলই খেলতে চায় না। ফাইনালের এত কাছে গিয়েও শেষ মুহূর্তে হারের হতাশাই এই ম্যাচে সঙ্গী হবে হ্যারি কেনদের।

অন্যদিকে, রবিবার নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে হবে ফাইনাল। ৪৮ দলের প্রথম বিশ্বকাপের সমাপ্তি ঘটবে ইউরোপ এবং দক্ষিণ আমেরিকার বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের দ্বৈরথে।

এ দিন আর্জেন্টিনার ফুটবলাররা শুরু থেকেই দারুণ উজ্জীবিত ফুটবল খেলেন। এর পেছনে যেমন টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন ছিল, তেমনই ছিল ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক লড়াইয়ের উত্তাপ।

প্রথমার্ধ জুড়ে একাধিক ফাউল, কড়া ট্যাকলের ছড়াছড়ি দেখা যায়, যার মধ্যে লিওনেল মেসিকে বিপজ্জনকভাবে ফাউল করায় হলুদ কার্ড দেখেন ইংল্যান্ডের এলিয়ট অ্যান্ডারসন।

৫৫ মিনিটে গোল খাওয়ার পর আর্জেন্টিনা যেন সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে ইংল্যান্ডের ওপর। নিকো গনজালেসের শক্তিশালী হেড দুর্দান্ত সেভ করে দলকে রক্ষা করেন জর্ডান পিকফোর্ড। এরপর ৭৬ মিনিটে অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের শট পোস্টে লেগে ফিরে এলে আরেকবার বেঁচে যায় ইংল্যান্ড।

কিছুক্ষণ পর দূরপাল্লার শটে এনজো ফার্নান্দেজকে রুখে দেন পিকফোর্ড। তবে সেই স্বস্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। কয়েক মুহূর্ত পরই সমতা ফেরান ফার্নান্দেজ। প্রথম গোলের পরই আর্জেন্টিনা বুঝে যায়, ম্যাচ তাদের হাতের নাগালে। ম্যাক অ্যালিস্টারের আরেকটি শট পোস্টে লেগে ফিরে আসে। এরপর ইংল্যান্ডের রক্ষণ বল পুরোপুরি ক্লিয়ার করতে ব্যর্থ হলে লিওনেল মেসির অসাধারণ এক ক্রস থেকে হেডে জয়সূচক গোল করেন লাউতারো মার্তিনেজ।

শেষ বাঁশি বাজার আগেই স্টেডিয়াম জুড়ে শুরু হয় আর্জেন্টিনার বেলাগাম উদ্‌যাপন। অন্যদিকের ছবিটা ছিল পুরো উল্টো, চোখের সামনে ফাইনালের স্বপ্ন ভেঙে যেতে দেখে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়, সমর্থকেরা।