বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা যে নিখুঁত দল নয়, (ভারতীয় সময় অনুযায়ী) শনিবার তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল ফিফার বিশ্ব ক্রমতালিকায় ৬৭ নম্বরে থাকা আফ্রিকান দেশ কেপ ভার্দে। মিয়ামিতে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে বিশ্বের দুই নম্বর লিওনেল মেসির দলকে নির্ধারিত ৯০ মিনিটের শেষে ১-১ গোলে আটকে দেয় বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ওঠা সবচেয়ে ছোট দেশটি।
এমন নয় যে আর্জেন্টিনা একের পর এক গোলের সুযোগ নষ্ট করেছে। বরং তারা গোলের সুযোগই খুব কম তৈরি করতে পেরেছে এই ম্যাচে। কেপ ভার্দের দৃঢ় ও শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণভাগ লিওনেল মেসি, লাউতারো মার্তিনেজ এবং জুলিয়ান আলভারেজদের কার্যত নিষ্ক্রিয় করে রাখে। আর যখনই আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগ তাদের রক্ষণে ফাটল ধরাতে সক্ষম হয়, তখনই তাদের সামনে দুর্ভেদ্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছেন ৪০ বছর বয়সি গোলরক্ষক ভোজিনিয়া, যিনি একের পর এক অনবদ্য সেভে দলকে ম্যাচে টিকিয়ে রাখেন।
মিয়ামির প্রচণ্ড গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় টানা ১২০ মিনিট কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে হয় আর্জেন্টিনাকে। শেষ পর্যন্ত হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে কেপ ভার্দেকে ৩-২ গোলে হারিয়ে শেষ ষোলোয় জায়গা নিশ্চিত করে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। তাও আফ্রিকানদের নিজ গোলে ম্যাচের নিষ্পত্তি হয়। না হলে হয়তো ম্যাচের ফয়সালা হত টাই ব্রেকারে। এই ম্যাচে আর্জেন্টিনার জিতেছে ঠিকই। তবে তাদের পারফরম্যান্সে বেশ কিছু দুর্বলতাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বিশেষ করে আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগ। লিওনেল মেসিকে কড়া নজরবন্দি করে রাখা হলে অনেকটাই নিষ্প্রভ হয়ে পড়েছে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের অ্যাটাক। অনেক সময়েই দেখা গিয়েছে মাঝমাঠে নেমে এসে মেসিকে বল নিয়ে যেতে হয়েছে। একাধিকবার দেখা যায়, পেনাল্টি বক্সের সামনে আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার ঠিকভাবে বল বাড়াতে না পারায় বিরক্তি প্রকাশ করছেন অধিনায়ক মেসি। সেই সুযোগে কেপ ভার্দের রক্ষণভাগ প্রতিপক্ষের আক্রমণগুলো ভেস্তে দেয়।
ম্যাচের পর মেসি কেপ ভার্দের শৃঙ্খলাবদ্ধ পারফরম্যান্সের প্রশংসা করেন এবং স্বীকার করেন, শুরু থেকেই তারা কঠিন লড়াইয়ের প্রত্যাশা করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘সত্যি বলতে, আমরা আগে থেকেই জানতাম ম্যাচটা অত্যন্ত কঠিন হবে। আর এই জাতীয় দল যে স্পেন বা উরুগুয়ের মতো শক্তিশালী দলগুলোর কাছেও হারেনি, সেটা মোটেও কাকতালীয় নয়,’ বলেন মেসি।
এ দিন পেনাল্টি বক্সের ভেতরে বল নিয়ন্ত্রণে এনে অসাধারণ প্রথম টাচে কাছের পোস্ট দিয়ে ভোজিনিয়াকে পরাস্ত করে জালে বল জড়ান আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। তবে এই গোলের বড় কৃতিত্ব প্রাপ্য ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্তিনেজের, যার বাঁ-পায়ের নিখুঁত লং পাস মেসিকে গোলের সুবর্ণ সুযোগ পেতে সাহায্য করে।
এই গোল নিয়ে মেসি বলেন, ‘প্রথম গোলটা করাই আমাদের কাছে সবচেয়ে কঠিন ছিল। আমরা ভেবেছিলাম এর পর নিজেদের স্টাইলে খেলতে পারব এবং ঠাণ্ডা মাথায় খেলতে পারব। কিন্তু বাস্তবে ঠিক উল্টোটাই ঘটে।’
তবে এগিয়ে যাওয়ার পরই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে আর্জেন্টিনা। মেসির মতে, গোল করার পর তাঁর দল অযথা আত্মতুষ্ট হয়ে পড়ে। ফলে সহজেই বল হারায় এবং ধীরে ধীরে নিজেদের অর্ধেই গুটিয়ে যেতে শুরু করে। বল ছাড়া অবস্থাতেও লিওনেল স্কালোনির দলের পরিচিত তীব্র ও সংগঠিত প্রেসিং এই ম্যাচে দেখা যায়নি।
আগ্রাসনের অভাব, তার সঙ্গে বারবার সহজ পাসে ভুল—এই দুইয়ের মাশুলই শেষ পর্যন্ত দিতে হয় আর্জেন্টিনাকে। নিজেদের রক্ষণে দুর্বল ডান উইংকে লক্ষ্য করে গড়ে তোলা এক আক্রমণ থেকেই সমতা আনার গোলটি আদায় করে নেয় কেপ ভার্দে।
মেসি বলেন, ‘ওরা নিজেদের সবচেয়ে বড় অস্ত্রটা দারুণভাবে কাজে লাগিয়েছে এবং গোল করেছে। আমরা জানতাম, এই ম্যাচের চ্যালেঞ্জ মোটেও সহজ হবে না। এগুলো নকআউট পর্বের ম্যাচ। এখানে কেউ কাউকে বিনা লড়াইয়ে কিছু ছেড়ে দেয় না। অনেকেই হয়তো শুধু নাম দেখে কিছু দলকে হালকাভাবে নেয়। কিন্তু আমরা জানতাম, এই ম্যাচ মোটেও সহজ হবে না,’ বলেন মেসি।
আর্জেন্টিনা অধিনায়ক আরও বলেন, এবারের বিশ্বকাপে প্রতিটি ম্যাচই ভীষণ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রতিপক্ষ যে-ই হোক না কেন, প্রতিটি লড়াই জিততে সমান পরিশ্রম করতে হচ্ছে এবং কোনো দলকেই হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।তিনি বলেন ‘এ বারের বিশ্বকাপে এটাই বৈশিষ্ট। এখানে সব দলই একে অপরের খুব কাছাকাছি মানের, আর প্রতিটি ম্যাচই ভীষণ কঠিন।’
তা হলে কেপ ভার্দের বিরুদ্ধে ম্যাচ থেকে ইতিবাচক কী পেল আর্জেন্টিনা? মিয়ামির তীব্র গরমে টানা ১২০ মিনিটের কঠিন লড়াই শেষে দলের মানসিক দৃঢ়তারও প্রশংসা করেন মেসি। তিনি বলেন, নিজেদের সেরা ফুটবল খেলতে না পারলেও কঠিন পরিস্থিতি সামলে জয়ের পথ খুঁজে নিতে পেরেছে আর্জেন্টিনা। বলেন, ‘আমরা বরাবরের মতোই সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। ভালো খেলি বা নিজেদের সেরা ছন্দে না-ই থাকি, দলের পরিশ্রমে কোনো ঘাটতি ছিল না।’
এবার আর্জেন্টিনার লক্ষ্য শেষ ষোলোর ম্যাচ, যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ আফ্রিকা থেকে আসা আর এক দল মিশর। মেসি সতীর্থদের দ্রুত শারীরিকভাবে সতেজ হয়ে ওঠার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিশ্রাম নেওয়া, পরের ম্যাচের কথা ভাবা এবং আজকের লড়াই থেকে ইতিবাচক দিকগুলো তুলে নিয়ে সেগুলো কাজে লাগানো’। এই ম্যাচের শিক্ষা কাজে লাগিয়েই পরের ম্যাচে আরও ভালো খেলতে মরিয়া মেসি ও তাঁর দল।