দল নিয়ে মাঠে নামবেন তো পরে। তার আগে কলকাতার ঐতিহাসিক ম্যাচ ঘিরে যে উন্মাদনা দেখতে পেলেন শুক্রবার সারা দিন ধরে, তাতে মুগ্ধ এবং অবাক ব্রাজিলের কোচ কার্লো আনসেলোত্তি। শুধু তিনিই নন, পুরো ব্রাজিল শিবিরই হকচকিয়ে গিয়েছে কলকাতায় তাদের খেলা নিয়ে আগ্রহ দেখে।
শনিবার যুবভারতীর গ্যালারিতে কত দর্শক হবে, তা জানা নেই। কিন্তু তার ২৪ ঘণ্টা আগে ব্রাজিলের কোচ কার্লো আনসেোলোত্তির সাংবাদিক বৈঠকে আগ্রহী মিডিয়া প্রতিনিধির সংখ্যা দেখে অবাক সবাই। দলের মিডিয়া টিমের এক কর্তা এই জমায়েত দেখে বললেন, ‘অস্ট্রেলিয়া বিশ্বকাপ খেলা দেশ হলেও ওখানে আমাদের খেলা নিয়ে মিডিয়ার এত আগ্রহ দেখিনি। সত্যিই কলকাতা ফুটবল পাগল’।
বিকেলে ব্রাজিলের ফুটবলাররা যখন অ্নুশীলনে নামলেন, তখনও সাংবাদিক, চিত্রসাংবাদিকদের উপচে পড়া ভীড়। যার ভিডিও ক্যামেরাবন্দি করে রাখতে রীতিমতো দৌড়োদৌড়ি শুরু করে দিলেন ব্রাজিল থেকে আসা ‘ও গ্লোবো’ টিভির প্রতিনিধিরা।
ব্রাজিল কোচ আনসেলোত্তি তো সাংবাদিক বৈঠকে এসে বলেই দিলেন, ‘আমাদের স্বাগত জানাতে এখানে এত মানুষকে দেখে সেটা খুব ভালো লাগছে। গতকাল, এখানে আসার প্রথম দিন থেকেই আমরা অত্যন্ত উষ্ণ অভ্যর্থনা পেয়েছি। এখানে আসতে পেরে আমি খুবই আনন্দিত। সবাইকে নমস্তে’।
এ বছর বিশ্বকাপের শেষ চারেও পৌঁছতে পারেনি। ২০০২-এর পর আর বিশ্বকাপ হাতে তুলতে পারেনি সে দেশের কোনো প্রজন্মের ফুটবলাররাই। তাই আনসেলোত্তি বেশ চাপে। নতুন একটা স্কোয়াড তৈরি করার পরিকল্পনা করেছেন, যে দলকে তিনি তৈরি করবেন এই চার বছর ধরে। সেই দল তৈরির কাজ তিনি শুরু করলেন চলতি অস্ট্রেলিয়া ও ভারত সফর দিয়েই।
তবে কলকাতায় দল নিয়ে আসার লক্ষ্যটা একটু অন্যরকম। ব্রাজিলের কোচ বললেন, ‘আমাদের মূল লক্ষ্য থাকবে ভালো একটি ম্যাচ খেলা এবং ম্যাচটি জেতা। কিন্তু একইসঙ্গে এখানে আসাটা ভারতীয় জনগণ এবং এখানকার সমস্ত মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোরও সুযোগ পাওয়া। এত বছর ধরে ব্রাজিল জাতীয় দলকে যে ভালবাসা, সমর্থন এবং আন্তরিকতার সঙ্গে আপনারা অনুসরণ করে আসছেন, তার জন্য আমরা সবাইকে ধন্যবাদ জানাতে চাই’।
দলের সেন্টার ব্যাক মারকুইনহোসও এদিন সাংবাদিক বৈঠকে আসেন। জানান, কলকাতায় পৌঁছনোর পর গতকাল যে উষ্ণ অভ্যর্থনা পেয়েছেন, তাতে তিনি অত্যন্ত খুশি এবং ভারতীয়দের ধন্যবাদও জানান। বলেন, ‘ভারতের মাটিতে এটাই আমার প্রথম আসা এবং এখনও পর্যন্ত এই অভিজ্ঞতা আমি উপভোগ করছি। জাতীয় দলের বিরুদ্ধে ম্যাচে নিজেদের সেরাটা দেওয়ার পাশাপাশি যতটা সম্ভব ভালো ম্যাচ খেলারই চেষ্টা করব আমরা’। এটাই হবে তাদের ধন্যবাদ জ্ঞাপন।
মারকুইনহোস আরো বলেন, ‘আমার মনে হয়, সমর্থকদের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল মাঠের মধ্যে ভালো পারফরম্যান্স দেখানো— ভালো ম্যাচ খেলা, বড় জয় পাওয়া এবং দারুণ পারফরম্যান্স করা। ভারতের মতো একটি দেশে আসার সুযোগ পাওয়া গেলে সেটা সত্যিই বিশেষ অনুভূতি। এমনকী, আমার মতো একজন খেলোয়াড়ের কাছেও, যে বহু বছর ধরে জাতীয় দলের সঙ্গে রয়েছে। এখানে আসাটা প্রথমবার। আর প্রথমবার এসে ভারতীয় সমর্থকদের ব্রাজিল জাতীয় দলকে নিয়ে যে ভালোবাসা এবং আগ্রহ দেখছি, তা সত্যিই অবিশ্বাস্য’।
ব্রাজিলীয় ডিফেন্ডারের বক্তব্য, ‘ব্রাজিলের বাইরে যারা ব্রাজিলকে অনুসরণ করেন, তাঁদের মধ্যে ভারত অবশ্যই অন্যতম একটি দেশ, যেখানে জাতীয় দলের প্রতি এতটা ভালোবাসা ও সমর্থন রয়েছে। তাই আজ এখানে থাকার এই সুযোগ আমরা অত্যন্ত আনন্দ এবং গর্বের সঙ্গে গ্রহণ করছি’।
এ বারের বিশ্বকাপে ব্যর্থতা নিয়ে আক্ষেপ থাকলেও আর যে পিছন ফিরে তাকাতে চান না, তা সাফ জানিয়ে দিয়ে মারকুইনহোস বলেন, ‘আমরা জানি, বিশ্বকাপে আমাদের ফল প্রত্যাশামতো হয়নি। আমরা খেলোয়াড়রা জানি, একটা বিশ্বকাপে ভালো কিছু অর্জন করা কতটা কঠিন। তাই এখন আমরা বর্তমানের দিকে তাকিয়ে কাজ করছি। অবশ্যই আমাদের ইতিহাস এবং অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা শিক্ষা নেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু এখন আমাদের সামনে নতুন একটি শুরু। আগামীকালকের ম্যাচটিও সেই প্রক্রিয়ারই একটি অংশ। একইসঙ্গে কোচের জন্যও এটি নতুন ও পুরনো খেলোয়াড়দের দেখে নেওয়ার একটি সুযোগ— যাদের তিনি ভবিষ্যতে দলে রাখতে চান, তাঁদের নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সুযোগ’।
যাদের বিরুদ্ধে খেলবেন, সেই ভারত সম্পর্কে যে ভালমতোই হোম ওয়ার্ক হয়েছে ব্রাজিল শিবিরে, তা মার্কুইনহোসের কথাতেই স্পষ্ট। বলেন, ‘ভারত এ বছর যে শেষ ছ’টি ম্যাচে খেলেছে। হয়তো তার মধ্যে একটি ম্যাচে জয় এসেছে, কিন্তু প্রতিটি ম্যাচের নিজস্ব একটা গল্প থাকে, তাই সেই পরিসংখ্যান মাথায় না রেখে আমরা এই ম্যাচের জন্য ভালোভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছি। আমরা ভারতীয় দলের খেলোয়াড়দের নিয়ে বিশ্লেষণ করছি, পুরো দলটাকে দেখেছি এবং বোঝার চেষ্টা করেছি কোথায় আমরা নিজেদের শক্তি কাজে লাগাতে পারি এবং কীভাবে প্রতিপক্ষের শক্তিকে যতটা সম্ভব নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
ভারতীয় দলের কিছু খেলোয়াড় অবশ্যই রয়েছেন, যাঁদের আমাদের সম্মান করতে হবে। তাঁদের মধ্যে গোলকিপারও রয়েছেন, যিনি জাতীয় দলের হয়ে প্রায় ৯০টি ম্যাচ খেলতে চলেছেন। এটা অবশ্যই অত্যন্ত সম্মানের এবং তাঁর পাশাপাশি আরও কয়েকজন খেলোয়াড় রয়েছেন, যাঁরা দলের জন্য দারুণ কাজ করছেন’।