ভাগ্য একদিন না একদিন দরজায় কড়া নাড়বেই— সেই বিশ্বাস নিয়েই বছরের পর বছর লড়াই চালিয়ে গিয়েছিলেন অকিব নবি। অবশেষে সেই অপেক্ষার অবসান। চোটের কারণে যশপ্রীত বুমরাহ শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে দুই টেস্টের সিরিজ থেকে ছিটকে যাওয়ার পর ভারতীয় দলে প্রথম বার ডাক পেলেন জম্মু-কাশ্মীরের ২৯ বছর বয়সি এই পেসার।
কিন্তু এই সাফল্য হঠাৎ করে আসেনি। গত দুই রঞ্জি ট্রফি মরসুমে ধারাবাহিকভাবে দুর্দান্ত বোলিং করে নির্বাচকদের নজর কেড়েছিলেন অকিব। এই দুই মরসুমে তাঁর ঝুলিতে রয়েছে মোট ১০৪টি উইকেট। শুধু ২০২৫-২৬ রঞ্জি ট্রফিতেই তিনি নিয়েছিলেন ৬০টি উইকেট, যা জম্মু-কাশ্মীরের প্রথম রঞ্জি ট্রফি জয়ের অন্যতম প্রধান উপাদান হয়ে ওঠে।
শুধু ঘরোয়া ক্রিকেট নয়, সম্প্রতি ভারত ‘এ’ দলের হয়ে শ্রীলঙ্কা সফরেও নিজেকে প্রমাণ করেন অকিব। গল-এ শ্রীলঙ্কা ‘এ’-র বিরুদ্ধে দুটি চার দিনের ম্যাচে তিনি নেন ছ’টি উইকেট, যার মধ্যে একটি ইনিংসে চার উইকেটও ছিল। সেই পারফরম্যান্সই তাঁর জাতীয় দলে আসার রাস্তা আরও প্রশস্ত করে দেয়।
ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘জম্মু-কাশ্মীরের এই পেসার গত দুই রঞ্জি মরসুমে ১০৪টি উইকেট নিয়েছেন। ২০২৫-২৬ মরসুমে ৬০ উইকেট নিয়ে জম্মু-কাশ্মীরের প্রথম রঞ্জি ট্রফি জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন’।
অকিবের ভারতীয় দলে সুযোগ পাওয়াকে স্বাগত জানিয়েছেন প্রাক্তন ক্রিকেটার থেকে শুরু করে বিশেষজ্ঞরাও। জম্মু-কাশ্মীরেরই প্রাক্তন ভারতীয় অলরাউন্ডার পারভেজ রসুল সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, ‘যা তোমার প্রাপ্য, তা তোমার কাছেই আসবে। যতই উপেক্ষা করা হোক, ভাগ্যকে আটকানো যায় না। ভারতীয় টেস্ট দলে সুযোগ পাওয়ার জন্য অভিনন্দন’।
হরভজন সিংহের মতে, অকিব নবি ভারতীয় টেস্ট দলে সুযোগ পাওয়ার যোগ্যতা অনেক আগেই অর্জন করেছিলেন।
হরভজন বলেন, ‘অকিবের মতো একজন ক্রিকেটার, যে রঞ্জি ট্রফিতে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছে এবং এত উইকেট নিয়েছে, সে অবশ্যই ভারতের হয়ে খেলার যোগ্য। আইপিএলের পারফরম্যান্স দেখে টেস্ট দলের জন্য ক্রিকেটার বেছে নেওয়া উচিত নয়। যদি তারা সত্যিই ভালো হয়, তা হলে আগে টি-টোয়েন্টি ও এক দিনের ক্রিকেটে খেলুক। তারপর বিচার করা হোক, আন্তর্জাতিক স্তরে টেস্ট খেলার মতো যোগ্যতা তাদের রয়েছে কি না’।
গত মরসুমে সাত বার পাঁচ উইকেট নেওয়ার কৃতিত্ব দেখান অকিব। ফাইনালে কর্নাটকের বিরুদ্ধে ৫৪ রানে পাঁচ উইকেট নেওয়ার পাশাপাশি ব্যাট হাতে করেন ২৪৫ রান। সেই দুর্দান্ত অলরাউন্ড পারফরম্যান্সের জন্য সর্বসম্মতিক্রমে তাঁকেই টুর্নামেন্টের সেরা ক্রিকেটার নির্বাচিত করা হয়।
গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলোতেই নিজের সেরাটা তুলে ধরেছিলেন অকিব। মরসুমের উদ্বোধনী ম্যাচে মুম্বইয়ের বিরুদ্ধে পাঁচ উইকেট, কোয়ার্টার ফাইনালে মধ্যপ্রদেশের বিরুদ্ধে ম্যাচে মোট ১২ উইকেট এবং সেমিফাইনালে বাংলার বিরুদ্ধে ৯ উইকেট নিয়ে দলকে জয়ের পথে এগিয়ে দেন তিনি।
তবু বিস্ময়কর ভাবে নির্বাচকদের আস্থা অর্জন করতে পারেননি অকিব। জুন মাসে আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে একমাত্র টেস্টের জন্য তাঁকে দলে নেওয়া হয়নি। পরিবর্তে অভিষেক-অপেক্ষায় থাকা দুই পেসার প্রিন্স যাদব এবং গুরনূর ব্রারকে সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।
সেই সময় প্রধান নির্বাচক অজিত আগরকর বলেছিলেন, ‘নবি অবশ্যই এমন একজন ক্রিকেটার, যার মরসুম দুর্দান্ত কেটেছে। শুধু এ বার নয়, গত মরসুমেও সে অসাধারণ খেলেছে। তাকে নিয়ে অবশ্যই আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু ভারতে টেস্ট দল বাছাইয়ের সময় সাধারণত খুব বেশি পেসার নেওয়া হয় না’।
তবে আগরকরের এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট ছিলেন না ভারতের প্রাক্তন পেসার ইরফান পাঠান, যিনি অতীতে অকিবের সঙ্গে কোচ হিসেবে কাজও করেছেন।
ইরফান তখন বলেছিলেন, ‘নির্বাচন প্রক্রিয়াটা আমি বুঝতে পারিনি। মহম্মদ সিরাজ তো আপনার প্রধান বোলার। বুমরাহ না থাকলে সিরাজই এক নম্বর পেসার হয়ে যায়। তা হলে আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে এমন একটি টেস্টে, যা বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের অংশই ছিল না, এত অভিজ্ঞ বোলারকে খেলানোর প্রয়োজন কী ছিল?’
তিনি আরও বলেন, ‘যদি ঘরোয়া ক্রিকেটের পারফরম্যান্সের মূল্য সত্যিই দেওয়া হয়, তা হলে অকিবকে পুরস্কৃত করা হল না কেন? ওকে সুযোগ দিয়ে সেই স্তরে পরীক্ষা করার এটাই ছিল সেরা সুযোগ’।
ভারতীয় দলে সুযোগ না পেলেও প্রথম বার জাতীয় দলের নেটে বোলিং করার সুযোগ পেয়েছিলেন অকিব। আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে সেই টেস্টের আগে ভারতীয় ব্যাটারদের প্রস্তুতিতে সাহায্য করার জন্য তাঁকে নেট বোলার হিসেবে দলে রাখা হয়েছিল।
এবার শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে টেস্ট সিরিজে নির্বাচকেরা অকিবকে ভারতীয় দলে প্রথম বার সুযোগ দিলেন। তিনি জম্মু-কাশ্মীর থেকে জাতীয় দলে নির্বাচিত হওয়া তৃতীয় ক্রিকেটার।
এক সময় যিনি নেট বোলার হিসেবে ভারতীয় দলকে সাহায্য করেছিলেন, সেই অকিব এখন জাতীয় দলের সদস্য। নেট বোলার থেকে ভারতের জার্সি গায়ে চাপানোর এই যাত্রা তাঁর দীর্ঘ পরিশ্রম, ধৈর্য এবং অধ্যবসায়েরই স্বীকৃতি।