ব্রাজিল-উরুগুয়ে-পানামা ম্যাচে বিপুল ক্ষতি পূরণে ফেডারেশনের স্থায়ী আমানত ভাঙার পরিকল্পনাও ভেস্তে গেল

Photo: X

সম্প্রতি বিশ্বের সেরা ফুটবল শক্তিগুলির বিরুদ্ধে ভারতীয় দলের ম্যাচ আয়োজন করে প্রশংসা কুড়োলেও সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন বড়সড় আর্থিক সমস্যায় পড়তে চলেছে, যার আশু সমাধান কার্যত অসম্ভব বলেই মনে হচ্ছে। সংস্থার ফিক্সড ডিপোজিট ভেঙে এই বিপুল আর্থিক ক্ষতি পূরণের চেষ্টা করেও অন্যান্য সদস্যদের প্রবল আপত্তিতে তা ভেস্তে যায়।

ব্রাজিল, উরুগুয়ে ও পানামার মতো দেশের বিরুদ্ধে ভারতের ম্যাচ আয়োজন করেছিল কল্যাণ চৌবের নেতৃত্বাধীন সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন। কিন্তু সেই উদ্যোগের আর্থিক খেসারত দিতে গিয়ে এ বার বড়সড় বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছে তারা। জানা গিয়েছে, তিনটি আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ আয়োজন করতে গিয়ে প্রায় ৮৫ কোটি টাকার ঘাটতির মুখে পড়েছে ভারতীয় ফুটবলের নিয়ামক সংস্থা।

রবিবার ফেডারেশনের সভায় এই বিপুল ঘাটতি মেটাতে ফেডারেশনের স্থায়ী আমানত (ফিক্সড ডিপোজিট) ভাঙার প্রস্তাব দিয়েছিলেন সভাপতি কল্যাণ চৌবে। কিন্তু তাঁর এই প্রচেষ্টায় কার্যত জল ঢেলে দিয়েছেন ফেডারেশনের সদস্যেরা।


রবিবার ফেডারেশনের এক বিশেষ ভার্চুয়াল সভায় কল্যাণের এই প্রস্তাব ঘিরে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়। সদস্যদের একাংশের বক্তব্য, জরুরি পরিস্থিতি ছাড়া ফেডারেশনের স্থায়ী আমানতে হাত দেওয়া সম্ভব নয়। শুধু তাই নয়, মনে করিয়ে দেওয়া হয়, ফেডারেশনের কার্যকরী কমিটির আগের সভাতেও স্থায়ী আমানত না ভাঙার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তাই কোনো ভাবেই সভাপতির এই প্রস্তাব মেনে নেওয়া সম্ভব না।

ভারতের মাটিতে ব্রাজ়িল, উরুগুয়ে ও পানামার বিরুদ্ধে তিনটি আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজনের জন্য প্রায় ৮০-৮৫ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে বলে অনুমান। অথচ এর আগে কল্যাণ জানিয়েছিলেন, এই ম্যাচগুলি আয়োজনের জন্য ফেডারেশনকে কোনও আর্থিক বোঝা বহন করতে হবে না। বাইরের বিভিন্ন উৎস (বেশিরভাগই স্পনসর) থেকেই প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করা হবে, এমনই আশ্বাস দিয়েছিলেন তিনি।

সেই অবস্থান থেকে সরে এসে স্থায়ী আমানত ভাঙার প্রস্তাব দেওয়ায় কল্যাণের আর্থিক পরিকল্পনা নিয়েই প্রশ্ন উঠে গিয়েছে। এমনকী, তাঁর ও তাঁর বিশ্বস্ত ফেডারেশন কর্তাদের দূরদর্শিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করে দিয়েছে।

রবিবারের এই সভায় উপস্থিত এক রাজ্য সংস্থার পদস্থ কর্তা বলেন, ‘আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচগুলি আয়োজনের ফলে যে আর্থিক ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা মেটাতে ফেডারেশনের স্থায়ী আমানত ভাঙতে চান বলে জানিয়েছিলেন কল্যাণ’।

তিনি আরও জানান, ‘পরে কল্যাণ জানান, বাইরের উৎস থেকে টাকা জোগাড় করে স্থায়ী আমানত থেকে যত টাকা তোলা হবে, তা আবার ফিরিয়ে দেওয়া হবে। তবে ঠিক কত টাকার ঘাটতি হয়েছে, তা সভায় স্পষ্ট করে জানানো হয়নি। চুক্তিতে আর্থিক বিষয় নিয়ে গোপনীয়তার শর্ত রয়েছে বলেও জানানো হয়েছে’।

কল্যাণের প্রস্তাবের বিরোধিতায় সরব হয়েছেন ফেডারেশনের প্রাক্তন সভাপতি প্রফুল প্যাটেল। আগের বিশেষ সাধারণ সভায় কল্যাণ যে আশ্বাস দিয়েছিলেন, তা মনে করিয়ে দেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বাইরের উৎস থেকেই জোগাড় করার কথা বলেছিলেন বর্তমান সভাপতি।

শুধু তাই নয়, ফেডারেশনের কত টাকা বকেয়া রয়েছে এবং কাদের কত টাকা দিতে হবে, সেই হিসাবও জানতে চান প্রফুল প্যাটেল। সভায় তিনি প্রশ্ন করেন, ‘এআইএফএফকে কবে কত টাকা মেটাতে হবে ঋণদাতাদের, সেই হিসাব সমস্ত সদস্যকে জানানো হোক।’

ফেডারেশনের সহ-সভাপতি এন এ হ্যারিসও স্থায়ী আমানত ভাঙার প্রস্তাবে আপত্তি জানান। তাঁর বক্তব্য, ‘ফেডারেশনের কার্যকরী কমিটি আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে, স্থায়ী আমানত ভাঙা যাবে না।’ অন্য সদস্যেরাও একই সুরে বলেন, ‘সংস্থার স্থায়ী আমানতে হাত দেওয়া যাবে না। ওই টাকা শুধুমাত্র জরুরি পরিস্থিতির জন্য রাখা হয়েছে।’

বেশিরভাগ সদস্যদের বিরোধিতায় রবিবারের সভায় কল্যাণের প্রস্তাব অনুমোদন পায়নি। ঠিক হয়েছে, হ্যারিস সাধারণ সভার কয়েক জন সদস্যকে নিয়ে আলাদা বৈঠক করবেন। সেখানে আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হবে। তার পরে বিষয়টি ফের কার্যকরী কমিটির কাছে পাঠানো হবে। স্থায়ী আমানত ভাঙা হবে কি না, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে সেই কমিটিই।

এই আর্থিক সঙ্কটের প্রভাব শুধু তিনটি আন্তর্জাতিক ম্যাচের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সভায় এক সদস্য প্রশ্ন তোলেন, বিপুল আর্থিক ঘাটতি সামলানোর পাশাপাশি কী ভাবে ঘরোয়া প্রতিযোগিতা, ফুটবলের উন্নয়নমূলক কর্মসূচি এবং সন্তোষ ট্রফির মতো টুর্নামেন্ট আয়োজন করবে ফেডারেশন?

এই বিতর্ক নিয়ে একটি শব্দও বলতে রাজি নন কল্যাণ চৌবে। এক সংবাদসংস্থাকে তিনি শুধু বলেন, ‘এটা ফেডারেশনের আভ্ন্তরীন বিষয়। এই নিয়ে কোনো মন্তব্য করব না’।

ব্রাজিলের মতো পাঁচ বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নকে কলকাতায় খেলানো নিঃসন্দেহে ভারতীয় ফুটবলের কাছে বড় প্রাপ্তি। কিন্তু সেই ঐতিহাসিক ম্যাচ আয়োজন করতে গিয়ে যদি দেশের ফুটবলের ভবিষ্যৎই অন্ধকারে ঢেকে যায়, বিপুল আর্থিক ক্ষতি হয় দেশের ফুটবলের প্রশাসকদের, তা হলে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই এবং ফেডারেশনকে প্রবল সমালোচনার মুখেও পড়তে হবে। কিন্তু কী ভাবে এই অন্ধকার সরিয়ে আলোয় ফেরা সম্ভব হবে, তারই কোনো হদিশ পাওয়া যাচ্ছে না।