অবশেষে দীর্ঘ সময় ধরে চলা অনিশ্চয়তার অবসান হতে চলেছে। সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন (এআইএফএফ) এবং ইন্ডিয়ান সুপার লিগের (আইএসএল) ক্লাবগুলির মধ্যে চার বছরের জন্য একটি বিশেষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যবস্থার (এসপিভি) চুক্তি চূড়ান্ত করা হল। এর ফলে ভারতীয় ফুটবলের সর্বোচ্চ লিগ পরিচালনার ক্ষেত্রে এক নতুন যুগের সূচনা হতে চলেছে। গত কয়েক মাস ধরে ফেডারেশন এবং আইএসএল ক্লাবগুলির মধ্যে আইএসএলের বাণিজ্যিক অধিকার ও লিগ পরিচালনা নিয়ে টানাপোড়েন অব্যহত ছিল। সেই জট কাটিয়ে বুধবার দুই পক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তিতে সই করেছে। এর ফলে আগামী চার বছর একটি স্পেশাল পারপাস ভেহিকল বা বিশেষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যবস্থার মাধ্যমে আইএসএল পরিচালিত হবে।
এই নতুন প্রশাসনিক কাঠামো অনুযায়ী, লিগের বাণিজ্যিক এবং দৈনন্দিন পরিচালনার দায়িত্ব মূলত ক্লাবগুলির হাতে থাকবে। অন্য দিকে, ফেডারেশন নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে প্রতিযোগিতার উপর নজরদারি করবে এবং ভারতীয় ফুটবলের সামগ্রিক স্বার্থ রক্ষার ভূমিকা পালন করবে। এই মডেলকে ভারতীয় ফুটবলে আরও পেশাদার ও ক্লাব-কেন্দ্রিক প্রশাসনের পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলেই মনে করা হচ্ছে। এই চুক্তির ফলে আইএসএলের ধারাবাহিকতা নিয়ে যে সংশয় তৈরি হয়েছিল, আগামী চার বছরের জন্য তা কার্যত আর থাকবে না। গত মরসুমে মাস্টার রাইটস এগ্রিমেন্ট বা এমআরএ-র মেয়াদ শেষ হওয়ার পর লিগের ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছিল। এমনকি নতুন মরসুমের সূচি নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। সেই পরিস্থিতিতে এই চুক্তি ভারতীয় ফুটবলের জন্য বড় স্বস্তির খবর বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
এই নয়া চুক্তি স্বাক্ষরের পরে ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক সত্যনারায়ণ বলেন, “আইএসএল যত শক্তিশালী হবে, আমাদের জাতীয় দলও তত শক্তিশালী হবে। আমাদের হাতে এখন প্রতিভাবান তরুণ ফুটবলারদের একটি ভালো প্রজন্ম উঠে আসছে। আশা করি, আগামী পাঁচ থেকে সাত বছরের মধ্যে আমরা আরও শক্তিশালী ভারতীয় দল দেখতে পাব।” তবে একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, বিশ্বকাপের মূলপর্বে যোগ্যতা অর্জনকে এখনই লক্ষ্য হিসেবে দেখা উচিত নয়। ফেডারেশন বিদেশে থাকা ভারতীয় ফুটবলারদের (ওসিআই) বিষয়টিও স্পষ্ট করেছে। যদিও এ বিষয়ে এখনও কোনও নিয়মে পরিবর্তন আনা হয়নি, তবু যোগ্য ওসিআই ফুটবলারদের দলে নেওয়ার ব্যাপারে ক্লাবগুলিকে উৎসাহ দিয়েছে ফেডারেশন।
এই প্রসঙ্গে সত্যনারায়ণ বলেন, “এই মুহূর্তে আমরা ক্লাবগুলিকে বলছি, তারা চাইলে লিগে খেলার জন্য ওসিআই ফুটবলারদের অন্তর্ভুক্ত করতে পারে। এর বাইরে খেলোয়াড় নথিভুক্ত করার পদ্ধতিতে কোনও পরিবর্তন হয়নি। আগের মতোই ছ’জন বিদেশি ফুটবলার রাখার নিয়ম বহাল রয়েছে। ক্লাবগুলিকে কী করতে হবে, সেই ব্যাপারে ফেডারেশন হস্তক্ষেপ করে না। আমরা শুধু সামগ্রিক নীতিগত কাঠামো তৈরি করে দেব। ভবিষ্যতে ক্রীড়ামন্ত্রক থেকে কোনো নির্দেশ এলে, আমরা তা কার্যকর করব।” তবে আগামী মরসুমে আইএসএলে ভারতীয় স্ট্রাইকার খেলানো বাধ্যতামূলক করার যে প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছিল, তা কার্যকর করা হচ্ছে না। অর্থাৎ, বিদেশি ও ভারতীয় ফুটবলার নির্বাচনের ক্ষেত্রে ক্লাবগুলি আগের মতোই নিজেদের কৌশল অনুযায়ী দল গঠন করতে পারবে।
ভারতীয় ‘নম্বর ৯’ (স্ট্রাইকার) বাধ্যতামূলক করার প্রসঙ্গে AIFF-এর বক্তব্য “ক্লাবগুলিও জানে যে আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতাগুলির মধ্যে একটি হলো মানসম্মত স্ট্রাইকারের অভাব। আশা করি, তারা এই সমস্যার সমাধানে সাহায্য করবে। তবে এটি এমন কোনও বিষয় নয়, যা আমরা বাধ্যতামূলক করতে পারি। আমরা ক্লাবগুলিকে বলতে পারি না যে তাদের অবশ্যই একজন নম্বর ৯ খেলাতে হবে, কারণ শেষ পর্যন্ত দল নির্বাচন এবং কৌশল নির্ধারণ করা সম্পূর্ণভাবে কোচের সিদ্ধান্ত। প্রতিটি ম্যাচই আলাদা। কখনও কোচ জয়ের লক্ষ্য নিয়ে নামেন, আবার কোনও কোনও ম্যাচে ড্র করেও সন্তুষ্ট থাকতে পারেন। তাই আমাদের পক্ষে, এমনকি ক্লাবগুলির পক্ষেও, এ ধরনের কোনও বাধ্যবাধকতা কার্যকর করা খুবই কঠিন।
ভারতীয় ‘নম্বর ৯’ (স্ট্রাইকার) বাধ্যতামূলক করার প্রসঙ্গে এক ফেডারেশন কর্তার বক্তব্য, “ক্লাবগুলিও জানে যে আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতাগুলির মধ্যে একটি হলো ভাল মানের স্ট্রাইকারের অভাব। আশা করি, তারা এই সমস্যার সমাধানে সাহায্য করবে। তবে এটি এমন কোনও বিষয় নয়, যা আমরা বাধ্যতামূলক করতে পারি। আমরা ক্লাবগুলিকে বলতে পারি না যে তাদের অবশ্যই একজন নম্বর ৯ খেলাতে হবে, কারণ শেষ পর্যন্ত দল নির্বাচন এবং কৌশল নির্ধারণ করা সম্পূর্ণভাবে কোচের সিদ্ধান্ত।
প্রতিটি ম্যাচই আলাদা। কখনও কোচ জয়ের লক্ষ্য নিয়ে নামেন, আবার কোনও কোনও ম্যাচে ড্র করেও সন্তুষ্ট থাকতে পারেন। তাই আমাদের পক্ষে, এমনকি ক্লাবগুলির পক্ষেও, এ ধরনের কোনও বাধ্যবাধকতা কার্যকর করা খুবই কঠিন। আমরা এটা চাপিয়ে দিচ্ছি না। তবে ক্লাবগুলি বোঝে যে আমাদের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হলো মানসম্মত স্ট্রাইকার তৈরি করা এবং তুলে আনা। সেই লক্ষ্যেই আমরা আমাদের কাজ চালিয়ে যাব। আমরা এটি চাপিয়ে দিচ্ছি না। তবে ক্লাবগুলি বোঝে যে আমাদের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হলো মানসম্মত স্ট্রাইকার তৈরি করা এবং তুলে আনা। সেই লক্ষ্যেই আমরা আমাদের কাজ চালিয়ে যাব।”
ভারতীয় ফুটবলের উন্নয়নে ক্লাবগুলির আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের দাবি দীর্ঘদিনের। নতুন এসপিভি মডেলের মাধ্যমে সেই দাবিরই বাস্তবায়ন হতে চলেছে বলে মনে করা হচ্ছে। এর ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া আরও দ্রুত হবে, বাণিজ্যিক পরিকল্পনায় ক্লাবগুলির অংশগ্রহণ বাড়বে এবং লিগ পরিচালনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতাও বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে, বহু দিনের অচলাবস্থার অবসান ঘটিয়ে ফেডারেশন এবং আইএসএল ক্লাবগুলির এই ঐতিহাসিক সমঝোতা ভারতীয় ফুটবলের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে দেশের ফুটবল মহল। এই নতুন বাণিজ্যিক বোঝাপড়ায় আইএসএলের আগামী চারটি মরসুম কতটা সফলভাবে পরিচালিত হবে এবং ভারতীয় ক্লাব ফুটবলকে ফের নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া যাবে কি না, সেটাই দেখার।