আইএসএল থেকে জামশেদপুর এফসি সরে দাঁড়ানোর খবর প্রকাশ্যে আসতেই প্রাক্তন ও বর্তমান ফুটবলার, কোচ, সমর্থক-সহ ভারতীয় ফুটবল মহলের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি টাটা গোষ্ঠীর শীর্ষকর্তাদের কাছে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আবেদন জানিয়েছেন।
মঙ্গলবার রাঁচির বিরসা মুন্ডা স্টেডিয়ামে ডুরান্ড কাপে এসসি দিল্লির কাছে হেরে যায় হতাশ জামশেদপুর এফসি-র ফুটবলাররা। ম্যাচের আগে বিপুল সংখ্যায় হাজির হন জামশেদপুর এফসির সমর্থকেরা। ক্লাবকে বাঁচানোর দাবিতে তাঁরা গ্যালারিতে টিফো ও ব্যানার প্রদর্শন করেন, যাতে টাটা ম্যানেজমেন্টের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায়।
এ ছাড়া জামশেদপুরেও জমায়েত হন ‘সেভ ইন্ডিয়ান ফুটবল’ সংস্থার সদস্যরা। তাঁরাও টাটা কর্তাদের সঙ্গে দেখা করে ও তাঁদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের হাতে একটি আবেদনপত্র তুলে দিয়ে আসেন।
জামশেদপুর এফসির সরকারি সমর্থক গোষ্ঠী ‘দ্য রেড মাইনার্স’ ক্লাবের চেয়ারম্যান ডি বি সুন্দর রামনের উদ্দেশে একটি আবেগঘন খোলা চিঠি লিখেছে। সেই চিঠিতে ক্লাবটির অস্তিত্ব রক্ষার আবেদন জানিয়ে টাটা গোষ্ঠীর শীর্ষ কর্তৃপক্ষকে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করা হয়েছে।
চিঠিতে সমর্থকেরা কেন জামশেদপুর এফসিকে আইএসএলে চালিয়ে রাখা জরুরি এবং ক্লাবকে বাঁচাতে তাঁদের কী কী দাবি রয়েছে, তা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
এই চিঠিতে লেখা হয়েছে, ‘কলকাতা, চেন্নাই, দিল্লি বা মুম্বইয়ের মতো বড় মহানগরের ক্লাবগুলির থেকে একেবারেই আলাদা ছিল জামশেদপুর এফসি। ছোট শহর জামশেদপুরকে প্রতিনিধিত্ব করা এই ক্লাবই ছিল ইস্পাতনগরীর লক্ষ লক্ষ মানুষের আনন্দ, আবেগ এবং গর্বের অন্যতম প্রধান উৎস।
শুধু ফুটবল নয়, জামশেদপুর এফসির ঘরের মাঠ ‘দ্য ফার্নেস’-এ প্রতিটি ম্যাচ ছিল বহু মানুষের জীবিকারও অবলম্বন। স্টেডিয়ামের বাইরে জার্সি ও বিভিন্ন সামগ্রী বিক্রি করা পথবিক্রেতা থেকে শুরু করে সাফাই কর্মী, নিরাপত্তারক্ষী—অসংখ্য মানুষের রোজগারের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল ক্লাবটি। তাই জামশেদপুর এফসির সম্ভাব্য বিদায় শুধু একটি ফুটবল ক্লাবের অবসান নয়, স্টিল সিটির বহু মানুষের জীবিকা ও আবেগের উপরও বড় ধাক্কা’, মনে করছেন সমর্থকেরা।
আইএসএল ছাড়ার নেপথ্যের কারণ নিয়ে মুখ খুলল টাটা স্টিল
দেশের ফুটবল মহলে আলোড়ন ফেলে দেওয়া এই সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিল টাটা স্টিল। সংস্থার দাবি, এটি হঠাৎ নেওয়া কোনও পদক্ষেপ নয় বা আইএসএলের বর্তমান অনিশ্চয়তার ফলও নয়। বরং বহু দিন ধরেই পরিকল্পিত একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত, যার লক্ষ্য দেশের তৃণমূল স্তরে ফুটবলের উন্নয়নে আরও বেশি জোর দেওয়া।
টাটা স্টিলের ভাইস প্রেসিডেন্ট (কর্পোরেট সার্ভিসেস) ডি বি সুন্দর রামম জানান, ২০২৬-২৭ মরসুম থেকে জামশেদপুর এফসি আর ইন্ডিয়ান সুপার লিগে (আইএসএল) অংশ নেবে না। তবে এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে আইএসএলের বাণিজ্যিক ভবিষ্যৎ বা লিগকে ঘিরে চলা অনিশ্চয়তার কোনও সম্পর্ক নেই বলে তিনি জানান। তাঁর কথায়, সংস্থার পরিচালন পর্ষদ অনেক আগেই ফুটবলের মূল ভিত্তি শক্তিশালী করার লক্ষ্যে নতুন রূপরেখা তৈরি করেছিল।
সুন্দর রামমের দাবি, গত প্রায় এক দশকে জামশেদপুর এফসি ভারতীয় ফুটবলে নিজেদের লক্ষ্য অনেকটাই পূরণ করেছে। এবার সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ঝাড়খণ্ড এবং আশপাশের অঞ্চলে প্রতিভা অন্বেষণ, অ্যাকাডেমি উন্নয়ন এবং বয়সভিত্তিক ফুটবলে আরও বেশি বিনিয়োগ করতে চায় টাটা স্টিল। তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে ভারতীয় ফুটবলের স্বার্থে এই পথই বেশি ফলপ্রসূ হবে।
ক্লাব বন্ধের সিদ্ধান্তে ফুটবলার, কোচ এবং সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক হতাশা তৈরি হয়েছে। ভারতীয় ফুটবলের একাধিক তারকা এবং সমর্থক সংগঠন ইতিমধ্যেই টাটা গোষ্ঠীর কাছে এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আবেদন জানিয়েছে।
টাটা স্টিল অবশ্য আশ্বস্ত করেছে, ক্লাবের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ ফুটবলার এবং সাপোর্ট স্টাফদের স্বার্থ রক্ষা করা হবে। যাঁদের সঙ্গে বৈধ চুক্তি রয়েছে, সেই সমস্ত চুক্তির শর্ত পূরণ করবে সংস্থা। পাশাপাশি খেলোয়াড়দের নতুন ক্লাবে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
যদিও টাটা স্টিলের এই ব্যাখ্যা বিতর্ক পুরোপুরি থামেনি। কারণ, জামশেদপুর এফসি শুধু একটি আইএসএল ক্লাব নয়, ঝাড়খণ্ডের ফুটবল সংস্কৃতি এবং হাজার হাজার সমর্থকের আবেগের প্রতীক। ফলে ক্লাবের বিদায় ভারতীয় ফুটবলের জন্য বড় ধাক্কা বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহলের একাংশ।