বাংলাদেশের কাছে লজ্জার হারের পর অস্ট্রেলিয়া দলে আমূল বদলের ডাক রিকি পন্টিংয়ের

অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর পর (Pic: X/@BCB)

ঘরের মাঠে বাংলাদেশের কাছে ন’উইকেটে হার! যার পরে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটে রীতিমতো ভূমিকম্প শুরু হয়েছে। দফায় দফায় হচ্ছে সেই ভূমিকম্প। হারের পরেই টেস্ট দলে বড়সড় বদলের দাবি তুললেন প্রাক্তন অধিনায়ক রিকি পন্টিং। তাঁর মতে, অস্ট্রেলিয়ার এই ফল শুধু হতাশাজনক নয়, ‘অত্যন্ত লজ্জারও’। সময় এসেছে দলের ব্যাটিংয়ে নতুন মুখ আনার।

ডারউইনে পূর্ণ শক্তির দল নিয়েও বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অসহায় আত্মসমর্পণ করেছে অস্ট্রেলিয়া। প্রথম ইনিংসে মাত্র ১৯৮ রানে গুটিয়ে যাওয়ার পর ম্যাচের রাশ চলে যায় বাংলাদেশের হাতে। দ্বিতীয় ইনিংসে ক্যামেরন গ্রিন সেঞ্চুরি করলেও অন্য ব্যাটারদের কাছ থেকে প্রায় কিছুই পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যন্ত ৫৭ রানের লক্ষ্য অনায়াসে টপকে এক উইকেটে ঐতিহাসিক জয় তুলে নেয় বাংলাদেশ।

এই হারের পরেই চ্যানেল ৭-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে পন্টিং বলেন, ‘এটা অত্যন্ত লজ্জার একটা হার। আমার মনে হয়, এখন পরিবর্তন করাটা অবশ্যম্ভাবী। গত গ্রীষ্মের শেষ থেকেই আমি বলে আসছি, কয়েক জন ক্রিকেটারের পারফরম্যান্স দেখার পরে এই দলটিকে নতুন করে গড়ে তোলার এটাই আদর্শ সময় ছিল’।


অস্ট্রেলিয়ার প্রাক্তন অধিনায়ক জানান, তিনি সহজে দল থেকে কাউকে বাদ দেওয়ার পক্ষে নন। তবু বর্তমান পরিস্থিতি তাঁকে সেই কথাই বলতে বাধ্য করছে। পন্টিংয়ের বক্তব্য, ‘দেখুন, পরিবর্তন আনার কথা বলার আমিই সম্ভবত শেষ ব্যক্তি। অধিনায়ক বা ক্রিকেটার হিসেবে আমি সব সময় দলটাকে একসঙ্গে রাখতে চেয়েছি। পরিস্থিতি খুব খারাপ জায়গায় না পৌঁছলে আমি সাধারণত কাউকে বাদ দেওয়ার কথা বলি না’।

তার পরেই তাঁর সংযোজন, ‘কিন্তু এখানে আসার আগেই যথেষ্ট প্রমাণ ছিল যে, নতুন করে দল গড়ার প্রক্রিয়া শুরু করলে অস্ট্রেলিয়ার তেমন কিছু হারানোর ছিল না। হয়তো আর এক জন ওপেনার, হয়তো তিন নম্বরে নতুন কাউকে আনা যেত। আমার মনে হয়, এখন সেটা করতেই হবে’।

অজিদের জরিমানা, কাটা পড়তে পারে পয়েন্টও

এই টেস্ট হারের পর আবার শোনা যাচ্ছে ৪২ লক্ষ টাকার জরিমানা হতে পারে কামিন্সদের। এর সঙ্গে পয়েন্টও কাটা হতে পারে অস্ট্রেলিয়ার। যার জেরে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের দৌড়ে সমস্যা হতে পারে এবং অস্ট্রেলিয়ার পয়েন্ট কাটা গেলে ভারতেরও সুবিধা হতে পারে।

ডারউইনে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে টেস্টের দ্বিতীয় দিন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পুরো ৯০ ওভার বোলিং করতে পারেনি অস্ট্রেলিয়া। ৪ ওভার কম ছিল। আইসিসির নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি ওভার কম থাকলে ক্রিকেটারদের ম্যাচ ফির ৫ শতাংশ হারে জরিমানা করা হয়।

অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটাররা প্রতি টেস্টে ২০ হাজার ডলার ফি পান। ফলে ৪ ওভারের জন্য ১১ জন ক্রিকেটারের প্রত্যেককে ৪ হাজার ডলার করে জরিমানা গুণতে হবে। অর্থাৎ মোট ৪৪ হাজার ডলার জরিমানা হতে পারে। ভারতীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৪২ লক্ষ টাকা।

চার ওভার কম থাকার জন্য টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ টেবলে অসিদের চার পয়েন্ট কাটা হতে পারে। এর আগে ২০২০ সালে মেলবোর্ন টেস্টে স্লো ওভার রেটের জন্য ৪ পয়েন্ট কাটা গিয়েছিল অস্ট্রেলিয়ার। তার ফলেই সেবার ফাইনালে উঠতেই পারেনি তারা। তবে এই ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আবহাওয়া ও বারবার উইকেট পড়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে বলে শোনা গিয়েছে।

টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ টেবলে অস্ট্রেলিয়ার পয়েন্ট ৮৪। পয়েন্ট শতাংশ ৭৭.৭৮। দ্বিতীয় স্থানে দক্ষিণ আফ্রিকা। ভারত বেশ কিছুটা পিছিয়ে। ৪৮.১৫ পয়েন্ট শতাংশ নিয়ে তারা পঞ্চম স্থানে। শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে ভারত ১-০ ব্যবধানে জিতলে ১৬ পয়েন্ট পাবে। পয়েন্ট শতাংশ হবে ৫১.৫১। দু’টি ম্যাচই জিতলে হবে ৫৭.৫৮। ফলে অস্ট্রেলিয়ার এই ক্ষতি থেকে লাভ পেতে হলে টানা দুটি জয় পেতেই হবে ভারতকে। বাংলাদেশ অবশ্য টেস্ট জিতে ৬৬.৬৭ পয়েন্ট শতাংশ নিয়ে চতুর্থ স্থানে আছে।

টগবগে বাংলাদেশের নজর দ্বিতীয় টেস্ট জয়ে

অস্ট্রেলিয়াকে তাদের মাটিতে টেস্ট হারিয়ে এখন আত্মবিশ্বাসে টগবগ করে ফুটছে বাংলাদেশ শিবির। তাদের স্পিনার-অলরাউন্ডা মেহেদি হাসান মিরাজের বিশ্বাস, অস্ট্রেলিয়াকে দ্বিতীয় টেস্টেও হারানোর মতো অবস্থায় রয়েছে বাংলাদেশ। সে দেশের সংবাদমাধ্যমে মিরাজ বলেছেন, ‘অবশ্যই আমরা সেভাবেই (সিরিজ জয়) ভাবছি এবং আমরা যে প্রক্রিয়ায় এগোচ্ছি, তাতেই মনোযোগ বজায় রাখতে চাই।’

এ ছাড়াও মিরাজ বলেন, ‘যেহেতু আমরা প্রথম ম্যাচ জিতেছি, এখন সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ। তবে টেস্ট ম্যাচ জেতা কখনোই সহজ নয়। এ মুহূর্তে আমরা শুধু ছন্দ ধরে রাখতে চাই, আর পরের ম্যাচ নিয়ে আমরা এ বার পরিকল্পনা শুরু করব।’ ম্যাকাইয়ে আগামী শনিবার শুরু হবে সিরিজের দ্বিতীয় ও শেষ টেস্ট।

বাংলাদেশের প্রাক্তন ক্রিকেট তারকা ও বর্তমানে নির্বাচকদের প্রধান হাবিবুল বাশার তাঁদের দলের এই অপ্রত্যাশিত সাফল্যের নেপথ্যের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, ‘এই টেস্টে আমাদের ক্রিকেটাররা খুব ভালো খেলেছে, তবে আমি কৃতিত্ব দেব তাদের চাপমুক্ত থাকার মানসিকতাকে। এটাই তাদের শেষ পর্যন্ত এগিয়ে রেখেছে। তারা সব সময় টেনশন ফ্রি ছিল।’ বাংলাদেশের সংবাদপত্র ‘প্রথম আলো’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এই কথাগুলি বলেন বাশার।

ম্যাচের সেরা খেলোয়াড় হাসান মাহমুদ, ‘দলের সতীর্থ ও কোচদের সঙ্গে বসে ভিডিও বিশ্লেষণ করে আমরা আমাদের পরিকল্পনা ঠিক করেছি। মাঠে আমরা ঠিক সেটিই বাস্তবায়ন করেছি।’ তিনি দুই ইনিংসে ন’উইকেট নিলেও সতীর্থ বোলারদেরও কৃতিত্ব দিয়ে বলেন, ‘আমাদের সব বোলারই দারুণ ধৈর্য দেখিয়েছে। তারা সঠিক প্রক্রিয়া মেনে নির্দিষ্ট লাইন-লেংথ ধরে রেখে বোলিং করেছে, যার সুফল দল পেয়েছে।’

এশিয়ার টেস্ট খেলিয়ে দেশগুলির মধ্যে শ্রীলঙ্কা আজ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে তাদের টেস্টে হারাতে পারেনি। পাকিস্তান সর্বশেষ সে দেশে টেস্ট জিতেছে ১৯৯৫ সালে। এশিয়ার দলগুলোর মধ্যে এই শতাব্দীতে এত দিন একমাত্র ভারতই ছিল, যারা অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়াকে টেস্টে হারাতে পেরেছে। এবার হারাল বাংলাদেশ। তাও এমন এক সময়ে, যখন টেস্ট র‍্যাঙ্কিংয়ের সবার ওপরে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া। তাই বাংলাদেশের গর্ব ও আনন্দ একটু বেশিই।