রীতিমতো দাপুটে ফুটবল খেলে এক মাস আগের ডার্বিতে হারের বদলা নিয়ে নিল ইস্টবেঙ্গল এফসি। রবিবার প্রায় হাজার ষাটেক দর্শকে ঠাসা যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে ১৭তম ডুরান্ড কাপ খেতাব জিতে নিল লাল-হলুদ বাহিনী। মোহনবাগান সুপার জায়ান্টকে ৪-১-এ হারিয়ে তাদের এতদিনের ১৭টি ডুরান্ড খেতাব জয়ের রেকর্ড ছুঁয়ে ফেলল তারা।
এ দিন ইস্টবেঙ্গলের এই অসাধারণ জয়ের নায়ক হয়ে ওঠেন এডমন্ড লালরিন্ডিকা। যিনি প্রথমার্ধেই এক ঐতিহাসিক হ্যাটট্রিক করে দলকে ৪-১-এ এগিয়ে দিয়ে জয়ের ভিত গড়ে দেন। দশ মিনিটের মাথায় প্রথম গোল করে দলকে এগিয়ে দেন বিপিন সিং। মোহনবাগান কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুমিনিটের মধ্যে ফের গোল করেন এডমন্ড।
এটাই অবশ্য চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় জয় নয় ইস্টবেঙ্গলের। ১৯৭৫-এর আইএফএ শিল্ড ফাইনালে ৫-০ জয়ই এখন পর্যন্ত ডার্বিতে তাদের সবচেয়ে বড় ব্যবধানে জয়। রবিবার প্রায় সেই অঙ্ক ছুঁয়ে ফেলার উপক্রম হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত তা পারেনি তারা।
এর আগে একাধিক ডার্বিতে ইস্টবেঙ্গলকে হারানো কোচ আন্তোনিও লোপেজ হাবাস এ বার ইস্টবেঙ্গলেরই দায়িত্বে। তিনি তাঁর দলের ছেলেদের মাথা ঠাণ্ডা রেখে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে খেলার পরামর্শ দেন। তাঁর পরামর্শ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন এডমন্ডরা এবং প্রথমার্ধে শেষের বাঁশি বাজার আগে আরো দু’বার বল জালে জড়িয়ে দেন, দু’বারই গোলে বল ঠেলেন সেই ২৭ বছর বয়সি মিজো ফরোয়ার্ড এডমন্ড।
এর মধ্যে মনবীর সিং একটি গোল শোধ করেন বটে। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে ইস্টবেঙ্গল হাবাসের বিখ্যাত ‘ডিফেন্সিভ লো ব্লক’ কৌশল অনুযায়ী নিজেদের গোল এরিয়ায় যে দুর্ভেদ্য দেওয়াল তুলে দেয়, তাতে ফাটল ধরিয়ে আর গোল করা সম্ভব ছিল না সবুজ-মেরুন ফুটবলারদের পক্ষে।
তবে আগের ডার্বিতে যাঁর গোলে জিতেছিল মোহনবাগান, সেই সহাল আব্দুল সামাদকে কেন প্রথম থেকে নামানো হল না, কেন তাঁকে ম্যাচের বয়স এক ঘণ্টা পেরিয়ে যাওয়ার পর নামানো হল, কেনই বা ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড মিগুয়েল ফেরেরা-কে শুধু দ্বিতীয়ার্ধে খেলানো হল, সে প্রশ্ন রয়েই যায় হতাশ হয়ে বাড়ি ফেরা মোহনবাগান সমর্থকদের মনে।
মাস খানেক আগে এই যুবভারতীতেই এই ডুরান্ড কাপেরই উদ্বোধনী ম্যাচে লাল-হলুদ বাহিনীকে ১-০-য় হারিয়েছিল সবুজ-মেরুন ব্রিগেড। রবিবার তার বদলা তো নিলই ইস্টবেঙ্গল, সঙ্গে ডুরান্ড কাপের খেতাবটাও গতবারের চ্যাম্পিয়ন নর্থইস্ট ইউনাইটেড এফসি-র কাছ থেকে ছিনিয়ে নিল তারা।
ডুরান্ড কাপের বড় ম্যাচে এটাই প্রথম হ্যাটট্রিক। ১৯৯৭-এ ফেডারেশন কাপ সেমিফাইনালের বাইচুং ভুটিয়ার স্মরণীয় হ্যাটট্রিকের পর এই প্রথম ইস্টবেঙ্গলের কোনো ফুটবলার জাতীয় ক্লাব স্তরের টুর্নামেন্টে হ্যাটট্রিক করলেন। রবিবার ডার্বির এই হ্যাটট্রিকে অমিয় দেব (১৯৩৪), অসিত গঙ্গোপাধ্যায় (১৯৩৭), বাইচুং (১৯৯৭), চিডি এডে (২০০৯) ও কিয়ান নাসিরি (২০২২)-দের ক্লাবে ঢুকে পড়লেন। এঁদের প্রত্যেকেরই ডার্বিতে হ্যাটট্রিক করার কৃতিত্ব রয়েছে।
মাত্র ১২ মিনিটের মধ্যে দু-দু’গোল করে মোহনবাগান সমর্থকদের মুখে কার্যত কুলুপ এঁটে দেয় ইস্টবেঙ্গল। দু’মিনিটের মধ্যে দু’টি গোল করেন যথাক্রমে বিপিন ও এডমন্ড। প্রথমটি রশিদের পাস থেকে ও পরের গোলটি আসে বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া এডমন্ডের জোরালো দূরপাল্লার শট থেকে। আলবার্তো রড্রিগেজ ও রাহুল ভেকের মাঝখান দিয়ে বল গোলের দিকে পাঠিয়ে দেন তিনি।
এই দু’গোলেই মোহনবাগান ডিফেন্ডারদের ব্যর্থতা ছিল চোখে পড়ার মতো। গোলকিপার বিশাল কয়েথকেও ম্লান লেগেছে। বিপিন গোল করে টিভি ক্যামেরার সামনে ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দেন, কেমন ছোবল মারলাম। এডমন্ড গোলের পর বোঝানোর চেষ্টা করেন, ম্যাচ কতক্ষণ গড়াল দেখে নাও।
এখানেই থেমে থাকেনি ইস্টবেঙ্গল। ফের এডমন্ড গোল করেন ২২তম মিনিটে। হার্দিক, রামিরেজের পা হয়ে বল আসে এডমন্ডের কাছে। তিনি বক্সে ঢুকে এগিয়ে আসা বিশাল কয়েথকে ধোঁকা দিয়ে ফাঁকা গোলের দিকে এগিয়ে গিয়ে বল ঠেলে দেন সঠিক জায়গায়। শেষ মুহূর্তে রাহুল ভেকে তাঁকে ঠেলে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করলেও পারেননি। এবারেও গোল করে সময়ের কথা মনে করিয়ে দেন এডমন্ড। বড় ম্যাচে শেষ কবে একটা দল ২২ মিনিটের মধ্যে তিন গোলে এগিয়ে গিয়েছিল, মনে পড়ে না।
তবে প্রথম গোল শোধ করতে বেশি সময় নেয়নি সবুজ-মেরুন বাহিনী। ৩৩ মিনিটের মাথায় মনবীরের অনবদ্য গোল ব্যবধান কমায়। বক্সে ঢুকে হালকা কাট করে ঢুকে দূরের পোস্টের দিক দিয়ে তাঁর শট জালে জড়িয়ে দেন মনবীর।
কিন্তু এর দশ মিনিটের মধ্যে ফের এডমন্ড যে একই ব্যবধান তৈরি করে দেবেন, তা বোধহয় কেউই ভাবতে পারেননি। রশিদের দূরপাল্লার ফ্রি কিক বক্সের বাঁদিকে গিয়ে ল্যান্ড করলে জয় গুপ্তা তা পাঠিয়ে দেন দ্বিতীয় পোস্টের দিকে, যেখানে ছিলেন এডমন্ড। জোড়া গোলের স্বাদ পেয়ে যাওয়া এডমন্ড বিদ্যূৎ গতিতে গোলের দিকে এগিয়ে গিয়ে নিখুঁত ভাবে বল ঠেলে দেন, যা গোটা স্টেডিয়ামে শব্দের বিষ্ফোরণ ঘটায়।
প্রথমার্ধ যেন ছিল আগুন ঝরানো! বলের দখল কম থাকলেও প্রতিপক্ষকে কার্যত উড়িয়ে দেয় ইস্টবেঙ্গল। শুরুর দিকে মোহনবাগানকে তুলনায় বেশি গুছিয়ে খেলতে দেখা গিয়েছিল। কিন্তু প্রতি-আক্রমণে দুরন্ত হয়ে ওঠে ইস্টবেঙ্গল। একের পর এক দ্রুতগতির ফরোয়ার্ড পাসে সবুজ-মেরুন রক্ষণকে বিপাকে ফেলে তারা।
বিশেষ করে এডমন্ড ছিলেন দুর্দান্ত। বক্সের বাইরে থেকে প্রথম গোলটি করার পর বক্সের ভিতরে অসাধারণ তৎপরতা দেখান তিনি এবং আরও দু’বার জালে বল জড়ান। ফলে প্রথমার্ধেই হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন এডমন্ড।
ড্রিঙ্কস ব্রেকের পর গোল করে মোহনবাগান সমর্থকদের মনে কিছুটা আশার আলো জ্বালান মনবীর সিং। তবে ম্যাচে ঘুরে দাঁড়িয়ে কিছু করতে হলে দ্বিতীয়ার্ধে সবুজ-মেরুন বাহিনীকে আরও লড়াই করতে হত, যা তাঁদের মধ্যে সে ভাবে দেখা যায়নি। মাঠের মাঝখান দিয়ে রশিদকে প্রায় বিনা বাধায় বল নিয়ে এগিয়ে যেতে দিচ্ছিল মোহনবাগান। ফলে খুব সহজেই ফাঁকা জায়গা পেয়ে যায় ইস্টবেঙ্গল।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই সামির জেলকোভিচের জায়গায় মিগুয়েল ফিগেরাকে নামান মোহনবাগান কোচ প্যানাগিওতিস দিলমপেরিস। কিন্তু ৪-১-এ এগিয়ে থাকা ইস্টবেঙ্গল দ্বিতীয়ার্ধে রক্ষণ আরো জমাট করে তোলে। মোহনবাগানের আক্রমণের অপেক্ষায় ছিল তারা, যাতে দ্রুত পাল্টা আক্রমণে গিয়ে ব্যবধান বাড়াতে পারে।
কিন্তু নীচের দিকেই একের পর এক পাস খেলে সময় কাটাতে থাকে মোহনবাগান। সহালের মতো বল নিয়ে দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার মতো ফুটবলার মাঠে না থাকায় গোলের সামনে ভালো সুযোগ তৈরি করতেও হিমশিম খাচ্ছিল সবুজ-মেরুন বাহিনী।
৫৭ মিনিটের মাথায় একটি ভালো সুযোগ পায় সবুজ-মেরুন বাহিনী। বক্সের বাঁদিক থেকে আপুইয়ার নেওয়া ফ্রিকক পেয়ে গোলে শট নেন লিস্টন কোলাসো। কিন্তু অনবদ্য দক্ষতায় তা সেভ করেন গিল।
ম্যাচ শেষ হতে যখন আধ ঘণ্টা বাকি, তখন সহালকে মাঠে নামায় মোহনবাগান। সঙ্গে কিয়ান নাসিরি ও দীপক টাঙ্গরি। তুলে নেওয়া হয় লিস্টন, আপুইয়া ও অনিরুদ্ধ থাপাকে। লালিয়ানজুয়ালা ছাঙতেকেও মনবীর সিংয়ের জায়গায় নামানো হয়। কিন্তু তখন অনেক দেরী হয়ে গিয়েছে।
৬৫ মিনিটের মাথায় বক্সের মাথা থেকে বিপিন সিং গোলে একটি দুর্দান্ত শট নেন, যা বিশাল কয়েথ দুর্দান্ত ভাবে না বাঁচালে ব্যবধান আরো বাড়ত।
৭০ মিনিট নাগাদ রামিরেজ ও এডমন্ডকে তুলে নিয়ে জেসিন টিকে ও মহম্মদ আসিফকে নামান ইস্টবেঙ্গল কোচ হাবাস। দ্বিতীয়ার্ধের ড্রিঙ্কস ব্রেকের পর বল পুরোপুরি মোহনবাগানের দখলে চলে যায়। সুযোগ পেলেই গোল লক্ষ্য করে শট নেন সবুজ-মেরুন ফুটবলাররা। কিন্তু ইস্টবেঙ্গলের রক্ষণ ছিল দারুণ শৃঙ্খলাবদ্ধ। শরীর দিয়ে প্রতিপক্ষের শট আটকাতে একের পর এক ফুটবলার সামনে চলে আসছিলেন। ম্যাচের শেষ মিনিট পর্যন্ত মোহনবাগানের কোনও চেষ্টাই সফল হতে দেননি তাঁরা।