কমনওয়েলথ গেমসের অষ্টম দিনে ভারতের ঝুলিতে এল আরও দু’টি পদক। ভারোত্তোলনে লভপ্রীত সিং গেমস রেকর্ড গড়ে জিতলেন রুপো, আর মহিলাদের ডিসকাস থ্রোয়ে সীমা কালিরামনা এনে দিলেন ব্রোঞ্জ। এই দুই পদকের সুবাদে ভারতের মোট পদকসংখ্যা দাঁড়াল ১৭। আপাতত পদক তালিকায় ভারতের অবস্থান দশম।
পুরুষদের ১০২ কেজি ভারোত্তোলনে লভপ্রীত সিং দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখান স্ন্যাচে ১৭৬ কেজি এবং ক্লিন অ্যান্ড জার্কে ২১২ কেজি তুলে মোট ৩৮৮ কেজি ওজন তুলে গেমস রেকর্ড গড়লেও সোনা হাতছাড়া হয় অল্পের জন্য। তবুও তাঁর রুপো ভারতের জন্য দিনের অন্যতম বড় সাফল্য।
পঞ্জাবের অমৃতসর সীমান্ত জেলার বাল সিকন্দর গ্রামের বাসিন্দা লভপ্রীত সিং অত্যন্ত সাধারণ এক পরিবার থেকে উঠে এসেছেন। তাঁর বাবা পেশায় দর্জি, আর দাদু জীবিকা নির্বাহ করতেন সবজি বিক্রি করে। পারিবারিক পেশায় না গিয়ে খেলাধুলায় মন দেওয়ার জন্য পরিবারের উৎসাহেই মাত্র ১৩ বছর বয়সে ডিএভি গ্রাউন্ডে ভারোত্তোলন শুরু করেন তিনি। এরপর ধীরে ধীরে ভারতের অন্যতম সেরা হেভিওয়েট ভারোত্তোলক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন লভপ্রীত।
এই ইভেন্টে সোনার অন্যতম দাবিদার সামোয়ার সানেলে মাও স্ন্যাচে ১৭৫ কেজি তোলার তিনটি চেষ্টাতেই ব্যর্থ হয়ে আগেভাগেই প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে যান। ফলে লভপ্রীতের সোনা জয়ের পথ আরও মসৃণ হয়ে যায়।
পিএইচডি, মাতৃত্ব, ডিসকাস— তিন লড়াই একসঙ্গে!
অ্যাথলেটিক্সেও এসেছে সুখবর। মহিলাদের ডিসকাস থ্রোয়ে সীমা কালিরামনা ব্রোঞ্জ জিতে নজর কাড়লেন। ব্রোঞ্জ জয়ের পর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন ডিসকাস থ্রোয়ার সীমা। তবে তাঁর সাফল্যের গল্প শুধু অ্যাথলেটিক্স ট্র্যাকেই সীমাবদ্ধ নয়। একদিকে তিনি একজন মা, অন্যদিকে পিএইচডি গবেষক— সেই সঙ্গে দেশের অন্যতম সেরা ডিসকাস থ্রোয়ার। এই তিনটি পরিচয়কে একসঙ্গে সামলে এগিয়ে চলেছেন হরিয়ানার এই ক্রীড়াবিদ।
হরিয়ানার ভিওয়ানি জেলার দিনোদ গ্রামের মেয়ে সীমার ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইলের নামই ‘ড. সীমা কালিরামনা’। কারণ, খেলাধুলার পাশাপাশি তাঁর লক্ষ্য ডক্টরেট সম্পূর্ণ করা। ২০২২ সালে তিনি পিএইচডি শুরু করেন। তাঁর গবেষণার বিষয়— একজন অ্যাথলিটের পারফরম্যান্সে ‘ইমেজারি’ (মানসিক কল্পনা) এবং ‘সেলফ-টক’ বা নিজের সঙ্গে ইতিবাচক কথোপকথনের প্রভাব কতটা।
সম্প্রতি পোল্যান্ডের স্পালায় অনুশীলন শিবিরে থাকাকালীন সীমা জানান, অনেক সময় অ্যাথলিটরা নেতিবাচক চিন্তায় ভুগতে শুরু করেন, যা তাঁদের পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলে। সেই কারণেই তিনি এই বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করছেন। তাঁর বিশ্বাস, ইতিবাচক মানসিকতা এবং কল্পনাশক্তির সঠিক ব্যবহার একজন ক্রীড়াবিদকে আরও সফল করে তুলতে পারে।
তবে পড়াশোনা আর খেলাই নয়, মাতৃত্বের দায়িত্বও সামলাতে হয় তাঁকে। সন্তান জন্মের পর দীর্ঘ বিরতি নিয়ে আবার মাঠে ফিরতে হয়েছে। সেই প্রত্যাবর্তন সহজ ছিল না। অনুশীলন, গবেষণা এবং পরিবারের দায়িত্ব— সবকিছুর ভারসাম্য বজায় রাখতে গিয়ে বহু কঠিন সময়ের মুখোমুখি হতে হয়েছে সীমাকে। তবুও হার মানেননি তিনি।
সীমার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর স্বামী তথা কোচ রবিন্দর কালিরামনা। তাঁর উৎসাহ এবং পরিবারের সমর্থনই কঠিন সময়ে সীমাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। কমনওয়েলথ গেমসে ব্রোঞ্জ জয়ের পর সেই পদকও স্বামীকে উৎসর্গ করেছেন ভারতীয় অ্যাথলিট।
প্রত্যাবর্তনের পর থেকেই দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছেন সীমা। ২০২৫ সালের জাতীয় গেমসে সোনা জেতেন, এরপর জাতীয় চ্যাম্পিয়নও হন। এ বছর নিজের ব্যক্তিগত সেরা ৫৯.৭৩ মিটার থ্রো করে কমনওয়েলথ গেমসের যোগ্যতা অর্জন করেন।
গ্লাসগোতে সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে মহিলাদের ডিসকাস থ্রো ইভেন্টে ৫৮.৬৫ মিটার ছুড়ে ব্রোঞ্জ জিতে নেন সীমা। এই সাফল্য শুধু একটি পদক নয়, বরং মাতৃত্ব, উচ্চশিক্ষা এবং আন্তর্জাতিক ক্রীড়া— তিনটি কঠিন পথ একসঙ্গে পাড়ি দেওয়ার এক দৃষ্টান্ত হয়ে রইল। এখন তাঁর পরবর্তী লক্ষ্য ২০২৮ লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকে ভারতের হয়ে পদক জয়।