মাস খানেক আগে ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশন (সিবিএফ) থেকে আসা প্রতিনিধিরা যুবভারতীর (Yuva Bharati) ঘাস দেখে আঁতকে উঠেছিলেন। সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, মাঠের এই অবস্থায় আমূল পরিবর্তন না হলে ব্রাজিল দলের পক্ষে এখানে খেলা সম্ভব নয়। একথা শুনে জোর ধাক্কা খেয়েছিলেন সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন কর্তারা এবং রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রী ইন্দ্রনীল খাঁ।
ধাক্কা সামলে তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন, এই চ্যালেঞ্জটা নিতেই হবে। না হলে তো ম্যাচটাই করা যাবে না। চ্যালেঞ্জটা নিয়েছিলেন তাঁরা এবং এখন যুবভারতীর মাঠের যা অবস্থা, তাতে তাকে শুধু মনোমুগ্ধকর বললে ভুল হবে, বলতে হবে ঝকঝকে, স্মার্ট এক স্টেডিয়ামও, যে রকম আমরা দেখে থাকি আন্তর্জাতিক ফুটবলেও।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় যুবভারতীর (Yuva Bharati)টানেল দিয়ে মাঠে ঢুকে দেখা গেল চোখ জোড়ানো ঝকঝকে সবুজ মাঠ। যেন মখমলের বিশাল কোনো কার্পেট বিছানো হয়েছে সারা মাঠ জুড়ে। এই মাঠ দেখে ব্রাজিলের ফুটবলারারা নিশ্চয়ই খুশি হবেন। গত কয়েক দিনের আবহাওয়াও বেশ ঝকঝকে রয়েছে। এমনই আবহাওয়া যদি শনিবার ম্যাচের সন্ধ্যা ও রাতেও থাকে, তা হলে যে এক অকল্পনীয় পরিবেশ তৈরি হবে যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে, কল্পনা করেই শরীরে শিহরণ জাগছে।
একদিকে নীলবাহিনি ভারত, অন্যদিকে হলুদ জার্সিতে চিরকালের চেনা সেই ব্রাজিল ফুটবল দল, যাদের প্রতিবার বিশ্বকাপ বা কোপা আমেরিকায় পাগলের মতো সমর্থন করেন এ বঙ্গের প্রায় অর্ধেক ফুটবলপ্রেমী। বাকিরা বেশিরভাগই আর্জেন্টিনার ভক্ত। একটা গোটা ম্যাচ খেলবে ব্রাজিলের ফুটবল তারকারা, তাও আবার ভারতের বিরুদ্ধে—এও তো এক ঐতিহাসিক ঘটনা।
ম্যাচের ফল যাই হোক, ভারত হয়তো এই ম্যাচে জিততে পারবে না। কিন্তু শনিবার রাতে জিতবে বাংলা। এমন একটা অসাধ্য সাধন করে দেখিয়ে দেওয়ার জন্য বাংলাকে মনে রাখবে সারা দেশ।
আরও পড়ুন: এশিয়ান গেমসে জোড়া সোনা, ট্র্যাপ মিক্সড টিমে নতুন এশিয়ান রেকর্ড নীরু-কিনানের
ভোলবদলের নেপথ্যকাহিনী
ব্রাজিলের ফুটবল কনফেডারেশনের প্রতিনিধিদল যুবভারতীর মাঠ পরিদর্শন করে কিছু সমস্যা চিহ্নিত করার পরই সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের তরফে সিবিএফ-কে অনুরোধ করা হয়, এক জন বিশেষজ্ঞ পাঠানোর জন্য। ব্রাসিলিয়া থেকে কলকাতায় আসেন সেই বিশেষজ্ঞ ইভান নাসিমেন্তো। স্থানীয় গ্রাউন্ড স্টাফদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে শুরু হয় মাঠ সংস্কারের কাজ।
<blockquote class=”twitter-tweet”><p lang=”bn” dir=”ltr”>মহারণের আগে ঝকঝকে যুবভারতী, ভারত-ব্রাজিল ম্যাচে কী থাকছে নতুন?<a href=”https://x.com/hashtag/IndiaBrazil?src=hash&ref_src=twsrc%5Etfw”>#IndiaBrazil</a> <a href=”https://x.com/hashtag/YuvaBharati?src=hash&ref_src=twsrc%5Etfw”>#YuvaBharati</a> <a href=”https://x.com/hashtag/FootballNews?src=hash&ref_src=twsrc%5Etfw”>#FootballNews</a> <a href=”https://t.co/UcrL3XOohn”>pic.twitter.com/UcrL3XOohn</a></p>— Dainik Statesman (@StatesmanDainik) <a href=”https://x.com/StatesmanDainik/status/2105253430231261621?ref_src=twsrc%5Etfw”>September 30, 2026</a></blockquote> <script async src=”https://platform.x.com/widgets.js” charset=”utf-8″></script>
কাজ শুরু করার সময় মাঠের মাটি পুরোপুরি সমান ছিল না। কোথাও কোথাও ঢেউ খেলানো অংশ ছিল। তার উপর ঘাসও প্রয়োজনের তুলনায় অনেকটা লম্বা হয়ে গিয়েছিল। ব্রাজিলের এক ফুটবল পত্রিকাকে নাসিমেন্তো বলেছেন, ‘আমাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল মাটি এবং মাঠের প্রক্রিয়াগুলিকে ঠিকঠাক করা। আমরা মাটিতে কিছু অসমান জায়গা পেয়েছিলাম, উপরিভাগে ঢেউ ছিল এবং ঘাসও বেশ লম্বা হয়ে গিয়েছিল’।
এর পরেই শুরু হয় ‘অ্যাগ্রোনমি’-র কাজ। মাটির উচ্চতা ঠিক করা, শক্ত হয়ে যাওয়া অংশে কাজ করা, মাটিতে বাতাস ঢোকানোর জন্য অ্যারেশন এবং প্রয়োজনীয় সার প্রয়োগ— ধাপে ধাপে বদলাতে থাকে যুবভারতীর চেহারা। নাসিমেন্তো বলেন, ‘আমরা প্রথমে মাটির সমতল ঠিক করার কাজ করেছি। ড্রিলিং বা অ্যারেশনের মাধ্যমে মাটিতে বাতাস ঢোকার ব্যবস্থা করা হয়। তার পরে রোলার ব্যবহার করে অসমান অংশগুলিকে আরও সমতল করা হয়’।
মাঠের সাদা দাগের জায়গাগুলিও বিশেষ ভাবে নজরে ছিল। দীর্ঘদিনের জমে থাকা রঙের কারণে ওই অংশের মাটি শক্ত হয়ে গিয়েছিল। সেই সমস্যা দূর করতে শুরু হয় ঘাস ছাঁটার কাজ। পাশাপাশি সার দেওয়া এবং ছত্রাক ও পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাও করা হয়। পরে মাঠে তৈরি হয়েছে সেই পরিচিত হালকা-গাঢ় সবুজ ডোরাকাটা নকশা।
দশ বছর পর পরিবর্তন
এই পুরো কাজে স্থানীয় কর্মীদের প্রশংসাও করেছেন ব্রাজিলীয় বিশেষজ্ঞ। তাঁর কথায়, ‘আমরা ব্রাজিল থেকে দু’টি দল নিয়ে এসেছিলাম। আমার সঙ্গে ছিল অ্যাগ্রোনমিক দল এবং স্টেডিয়াম বিভাগের একটি দল। প্রতিদিন কাজের ধরন প্রয়োজন অনুযায়ী বদলেছি। স্থানীয় যে দলটি নিয়মিত মাঠের দেখভাল করে, তারাও অসাধারণ ভাবে আমাদের সাহায্য করেছে’।
২০১৭-য় অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপের আগে কৃত্রিম টার্ফ সরিয়ে এখানে প্রাকৃতিক রিভিয়েরা বারমুডা ঘাস বসানো হয়েছিল। তার পরে নিয়মিত আইএসএল-সহ একাধিক ম্যাচ হয়েছে। ফলে দীর্ঘদিনের ব্যবহারে মাঠের উপর প্রবল চাপ পড়ে। সেই অবস্থা থেকে সংস্কার করে মাঠকে এখন ক্রমশ নতুন চেহারায় আনা হয়েছে।
এত কিছু করার পরেও অবশ্য নাসিমেন্তো পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন। তাঁর বক্তব্য, ‘মাঠ এখনও ১০০ শতাংশ তৈরি নয়। প্রায় ৯০ শতাংশে তৈরি হয়ে গিয়েছে। মাটির সমতল এখন আগের চেয়ে গ্রহণযোগ্য, রং ভাল এবং ঘাসের ঘনত্বও আগের চেয়ে অনেক ভাল হয়েছে। আশা করি দুর্দান্ত একটি ম্যাচ আয়োজন করা যাবে’।
বদল আরো অনেক কিছুতেই
শুধু মাঠের ঘাস নয়। বদল এসেছে আরো অনেক কিছুতে। আগে যুবভারতীতে একটি জায়ান্ট স্ক্রিন ছিল। এই ম্যাচের জন্য আরো দুটি জায়ান্ট স্ক্রিন বসানো হয়েছে দুটি গোলের পিছনে। যেমন আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়ামে থাকে। এ ছাড়াও নতুন নীল রঙের ডাগ আউট বসানো হয়েছে, যেখানে দুই দলের কোচ, পরিবর্ত ফুটবলাররা ও সাপোর্ট স্টাফ বসবেন।
যুবভারতীর যে টানেল দিয়ে খেলোয়াড়রা মাঠে ঢুকবেন, সেই টানেলেও পড়েছে নতুন রঙের প্রলেপ। স্টেডিয়ামের মূল প্রবেশ পথ দিয়ে ঢুকেই যে ভিআইপি লাউঞ্জ রয়েছে, যেখান দিয়ে বিশিষ্ট ব্যক্তিরা খেলা দেখার জন্য ঢুকবেন, সেই লাউঞ্জকেও করে তোলা হয়েছে ঝাঁ-চকচকে।
যুবভারতীর বাইরেও রঙ বদলে করা তাতে গেরুয়া বা কমলা রঙের প্রলেপ দেওয়া হয়েছে। যাঁর নামে এই স্টেডিয়াম, সেই স্বামী বিবেকানন্দের মূর্তিতেও নতুন করে রঙের প্রলেপ পড়ছে, চলছে শেষ তুলির টান।
মেয়েদের জোড়া আন্তর্জাতিক ম্যাচও হবে
শুধু ভারত-ব্রাজিল ও ভারত-উরুগুয়ে ম্যাচ নয়, ৮ ও ১১ অক্টোবর এই যুবভারতীতেই হবে ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে দুটি মহিলাদের আন্তর্জাতিক ম্যাচ। এই ম্যাচ দুটি হওয়ার কথা ছিল কিশোরভারতী স্টেডিয়ামে। কিন্তু যুবভারতীতে এত ভাল সংস্কার দেখে রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রীর অনুরোধে এই ম্যাচদুটিও সরিয়ে আনা হয়েছে সল্টলেকের মাঠেই।
সব মিলিয়ে, ব্রাজিল, উরুগুয়ে ও রাশিয়ার মহিলা দলের আগমনকে কেন্দ্র করে যে ভাবে নতুন রূপে সেজে উঠেছে যুবভারতী, তা দেখার মতো। এতে আখেরে লাভবান হবে দেশের ক্লাবগুলোও। সামনেই ইস্টবেঙ্গলের এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ২-এর ম্যাচ। তার পরে শুরু হয়ে যাবে আইএসএলের ম্যাচও। এমন আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম ও মাঠে খেলার জন্য মুখিয়ে থাকবেন আইএসএলের বিভিন্ন ক্লাবের ফুটবলাররা। বলা যেতেই পারে বঙ্গ ফুটবলে এক নয়া জোয়ার আসন্ন। সৌজন্যে, রাজ্যের নতুন সরকার, সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন।
দেখুন: বিদ্যাসাগরের জন্মভূমিতে বিশেষ অনুষ্ঠান, বাবা-মায়ের আবক্ষ মূর্তি উন্মোচন শুভেন্দুর