সোমবার বিশ্বকাপের আসরে সবচেয়ে চর্চিত বিষয়গুলির অন্যতম ছিল শক্তিশালী বেলজিয়ামকে রুখে ইরানের গোলশূন্য ড্র। এবং যতবার এই আলোচনা হয়েছে, ততবার উঠে এসেছে এই ম্যাচের নায়ক ইরানের গোলরক্ষক আলিরেজা বেইরানভান্দের নাম। লস অ্যাঞ্জেলিসে রবিবারের এই ম্যাচে সাতটি দুর্দান্ত সেভ করে বেলজিয়ামের আক্রমণভাগকে কার্যত নিষ্ক্রীয় করে দেন আলিরেজা। স্বাভাবিক ভাবেই ম্যাচের সেরা তারকার পুরস্কারও ওঠে তাঁর হাতেই। ফিফা ক্রমতালিকায় বিশ্বের ন’নম্বরে থাকা বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে এই এক পয়েন্টই ইরানের নকআউট পর্বে ওঠার স্বপ্ন বাঁচিয়ে রেখেছে।
তবে আলিরেজার গল্প শুধু ফুটবল মাঠের নয়, এটি সংগ্রাম, ত্যাগ এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তির এক অসাধারণ কাহিনি। ইরানের লোরেস্তান অঞ্চলের এক দরিদ্র যাযাবর কুর্দি-লাক পরিবারে জন্ম তাঁর। শৈশবে তাঁর পরিবারে অর্থাভাব এতটাই ছিল যে ফুটবল খেলা ছিল বিলাসিতা। গোলকিপারের গ্লাভস কেনাও তাঁর পরিবারের কাছে ছিল অপ্রয়োজনীয় খরচ। তবু ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন ছাড়েননি আলিরেজা। সেই স্বপ্ন সফল করার চ্যালেঞ্জ নিয়েই কিশোর বয়সেই বাড়ি ছেড়ে তেহরানে চলে যান।
রাজধানীতে এসে তাঁকে কাটাতে হয়েছিল চরম কষ্টের জীবন। কখনও গৃহহীন অবস্থায় দিন কাটিয়েছেন, কখনও গাড়ি ধোয়ার কাজ করেছেন, কখনও পোশাক তৈরির কারখানায়, পিৎজার দোকানে কিংবা রাস্তা পরিষ্কারের কাজ করেও পেট চালাতে হয়েছে। জীবনযুদ্ধের সেই কঠিন সময়গুলোই তাঁকে আরও দৃঢ়চেতা করে তোলে। তা সত্ত্বেও তাঁর অসাধারণ শারীরিক সক্ষমতা ও গোলরক্ষক হিসেবে তাঁর দক্ষতা দেশের ফুটবল কর্তা ও কোচেদের নজর কাড়ে। ছোটবেলায় গ্রামের বন্ধুদের সঙ্গে ‘দালপারান’ নামের এক ধরনের খেলা খেলতেন আলিরেজা। এই খেলায় ভেড়াদের বাঁচানোর জন্য অনেক দূর পর্যন্ত ভারী ভারী পাথর ছুঁড়তে হয়। এই দক্ষতাই শেষ পর্যন্ত তাঁকে একজন কার্যকরী গোলরক্ষক হয়ে উঠতে সাহায্য করে।
শুধু জাতীয় দলের নির্ভরযোগ্য গোলকিপারই নন, আলিরেজার ঝুলিতে রয়েছে দুটি গিনেস রেকর্ডও। ২০১৬-য় দক্ষিণ কোরিয়ার বিরু্দ্ধে ম্যাচে ২০০.১৪ ফুট দূরে বল ছুড়ে ফুটবলে সবচেয়ে দীর্ঘ থ্রোয়ের নজির গড়েন তিনি। এরপর ২০১৯-এ ২৫৫.৯৫ ফুট দীর্ঘ ড্রপ-কিক করে আরেকটি বিশ্বরেকর্ডের অধিকারী হন। তবে গতকাল বিশ্বকাপের ম্যাচে তাঁর সেই বিশাল থ্রো বা ড্রপ কিক নিয়ে বেশি চর্চা হয়নি। বরং এই ম্যাচে তিনি চর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন তাঁর শট বাঁচানোর ক্ষমতার জন্য। বেলজিয়ামের বিপক্ষে তাঁর সাতটি সেভ যেন সেই দীর্ঘ সংগ্রামেরই প্রতিফলন। যখন বেলজিয়াম একের পর এক আক্রমণ শানাচ্ছিল, তখন ৬ ফুট ৪ ইঞ্চি উচ্চতার এই গোলরক্ষকই মানবপ্রাচীরে পরিণত হন। তাঁর দৃঢ়তা ও আত্মবিশ্বাসের সামনে বারবার ব্যর্থ হয়েছে বেলজিয়ান তারকারা।
ম্যাচের পর আলিরেজা বলেন, “ম্যাচটা খুবই কঠিন ছিল। বেলজিয়াম বিশ্বের অন্যতম সেরা দল। বিশেষ করে প্রথমার্ধে তারা আমাদের ওপর অবিশ্বাস্য চাপ সৃষ্টি করেছিল। তবে ১০ জনের দলে পরিণত হওয়ার পর কিছুটা রক্ষণাত্মক হয়ে যায় ওরা। আমাদের পাস ছিনিয়ে নেওয়া এবং আমাদের ভুলের সুযোগ নিয়ে পাল্টা আক্রমণ গড়ে তোলাই ছিল ওদের লক্ষ্য। আমরা যদি আরও বেশি মনোযোগী হতে পারতাম, তাহলে ম্যাচটা জিততেও পারতাম। তবে আপনারা সবাই দেখেছেন—আজ যারা খেলেছে, সেই সব খেলোয়াড়দের প্রতি আমার শ্রদ্ধা। তারা হৃদয় উজাড় করে খেলেছে।”
ইরানের কোচ আমির ঘালেনোই বলেন, “অত্যন্ত রোমাঞ্চকর একটা ম্যাচ খেললাম আমরা। দুই দলই জয়ের দাবিদার ছিল। উভয় দলই তিন পয়েন্ট নিয়ে মাঠ ছাড়তে পারত। আমি প্রতিটি খেলোয়াড়কে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাতে চাই, বিশেষ করে আলিরেজা বেইরানভান্দকে।”
বিশ্ব ফুটবলে অনেক গোলরক্ষকের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখা যায়, কিন্তু আলিরেজার সংগ্রামের কাহিনিই তাঁকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে। দারিদ্র্য, গৃহহীনতা আর চরম প্রতিকূলতাকে হারিয়েও যে বিশ্বকাপের মঞ্চে নায়ক হয়ে ওঠা যায়, তা দেখিয়েছেন তিনি। এই ইরানি গোলকিপারই এখন লক্ষ লক্ষ তরুণ ফুটবলারের কাছে অনুপ্রেরণার একমাত্র নাম।