অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ভারতের অনূর্ধ্ব-১৯ দলের আসন্ন সিরিজে খেলার জন্য নির্বাচিত হয়েছিলেন বাংলার লেগস্পিনার রোহিত যাদব। কিন্তু তাঁর নথিপত্র খতিয়ে দেখতে গিয়ে সামনে আসে তাঁর বয়স নিয়ে একাধিক অসঙ্গতি। তার পরেই কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ঘরোয়া ক্রিকেটে দু’বছরের জন্য রোহিতকে নির্বাসিত করেছে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড।
ঘটনাটি অবশ্য রোহিতকে ঘিরেই থেমে নেই। বয়স ও নথিপত্রে অসঙ্গতির অভিযোগে মোট ৬২ জন ক্রিকেটারকে ২০২৬-২৭ এবং ২০২৭-২৮ মরসুমে যে কোনও প্রতিযোগিতায় খেলার অযোগ্য ঘোষণা করেছে বাংলার ক্রিকেট সংস্থা সিএবি।
সেই তালিকায় রয়েছেন ভারতের ২০২২ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্য রবি কুমারও। ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে অনুষ্ঠিত সেই বিশ্বকাপে ভারতের খেতাব জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল এই বাঁহাতি পেসারের। পরে ২০২২-এ বাংলার হয়ে সিনিয়র ক্রিকেটে অভিষেকও হয় তাঁর। তবে তাঁর বয়সের নথিতেও ৪০ মাসের বেশি অসঙ্গতি পাওয়া গিয়েছে বলে জানা গিয়েছে। সিএবি জানিয়েছে, বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে অভিষেক থেকে ২০২৫-২৬ মরসুম পর্যন্ত তাঁর নথির বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ফলে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, এত দিন ধরে এই ভাবে বয়স ভাঁড়িয়ে এত ক্রিকেটারকে বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে খেলতে দিল কেন সিএবি? সিএবি-র একটি সূত্র জানিয়েছে, আগে যেহেতু আধার কার্ডে তথ্য বদলানোর ইতিহাস পরীক্ষা করে বের করা যেত না, তাই এগুলো সঠিক প্রমাণ-সহ ধরা যেত না। কিন্তু এখন যেহেতু আধার কার্ডের আপডেট হিস্ট্রি জানা যায়, তাই কোনো ভাবেই আর এই অপরাধ করেও পার পেয়ে যাওয়ার উপায় নেই ক্রিকেটারদের।
শুধু বয়স ভাঁড়ানো নয়, বাসস্থান নিয়েও অনেকেই ভুল তথ্য পেশ করে বিভিন্ন রাজ্যে খেলে বেড়াচ্ছে। বাংলাতেও এমন ক্রিকেটারের সংখ্যা কম নয়। তারা আধার কার্ডে কখন কোথায় ঠিকানা বদল করেছে, তাও এখন জানা সম্ভব। রোহিত যাদবের ক্ষেত্রেও এমন হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। তিনি আসলে উত্তর প্রদেশের ছেলে। কিন্তু পরে ঠিকানা বদলে হাওড়া করেছেন এবং এই নথি পেশ করেই বাংলার হয়ে খেলেন। তখন এই তথ্য বদলের খবর জানা না থাকায় তাঁকে খেলতে দেওয়া হয়েছিল, এমনকী, তিনি শ্রীলঙ্কায় গিয়েও ভারতের যুব দলের হয়ে খেলে আসেন। কিন্তু এখন আর তা হবে না।
অস্ট্রেলিয়া সম্ভাবনাময় কেরিয়ারের দরজা খোলার ঠিক আগে রোহিতের সামনে বন্ধ হয়ে গেল ক্রিকেটের রাস্তা। এ শুধু একটি সম্ভাবনাময় অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেটারের শাস্তি নয়, বাংলার ক্রিকেটে বয়স ও নথিপত্র যাচাই নিয়ে সিএবি-র আরও কঠোর হওয়ার বার্তাও স্পষ্ট হয়ে গেল।
বোর্ডের এক সূত্র জানিয়েছে, রোহিতকে দু’বছরের জন্য নির্বাসিত করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, বয়স সংক্রান্ত তথ্য সঠিক ভাবে দেওয়া হয়নি। বিষয়টি সামনে আসার পরে বোর্ডের অনুমোদিত সব রাজ্য সংস্থাকেও এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
রোহিত উত্তরপ্রদেশের বাসিন্দা হয়েও বাংলার হয়ে বয়সভিত্তিক ক্রিকেট খেলেছেন। গত জুলাইয়ে ভারতীয় অনূর্ধ্ব-১৯ দলের শ্রীলঙ্কা সফরেও গিয়েছিলেন তিনি। সেখানে ছ’টি উইকেট নিয়ে নজর কেড়েছিলেন এবং শেষ টেস্টে ভারতের জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন।
সেই পারফরম্যান্সের জন্যই অস্ট্রেলিয়ার অনূর্ধ্ব-১৯ দলের বিরুদ্ধে ভারতের ঘরের মাঠের সিরিজে তাঁকে দলে রাখা হয়েছিল। কিন্তু ততদিনে সিএবি তাঁর আধার আপডেটের ইতিহাস জেনে গিয়েছে এবং তাঁকে দু’বছরের জন্য নির্বাসিত করার সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেলেছিল।
অথচ বোর্ডের জুনিয়র নির্বাচক কমিটিতে থাকা বাংলার প্রতিনিধি রণদেব বোসের কাছে এই তথ্যই ছিল না কেন, এটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। সিএবি না রণদেবকে এই খবর জানিয়েছিল, না বোর্ডের কাছে এই খবর পাঠিয়েছিল। যদি এই তথ্য জানানো হত, তা হলে রোহিতকে অস্ট্রেলিয়া সিরিজের দলেই নেওয়া হত না এবং এতটা হেনস্থাও হতে হত না। এখন তাঁকে সারা জীবন এই কালো দাগ বয়ে বেড়াতে হবে। যদিও যে অপরাধ তিনি করেছেন, সে জন্য এটাই তাঁর প্রাপ্য।
রোহিতের নামে তিনটি আলাদা জন্ম শংসাপত্র পাওয়া গিয়েছে, যেখানে জন্মসাল যথাক্রমে ২০০৭, ২০০৯ এবং ২০১০। অর্থাৎ একই ক্রিকেটারের জন্মের তিন রকম সাল! বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে খেলার যোগ্যতা নিয়েই তাই প্রশ্ন উঠে যায়। সিএবি-র হিসাব অনুযায়ী, তাঁর বয়সে প্রায় ২৭ মাসের অসঙ্গতি ধরা পড়েছে।
শুধু জন্ম শংসাপত্র নয়, আধার কার্ডের নথিতেও অসঙ্গতি রয়েছে। সিএবি-তে নাম নথিভুক্ত করার সময় রোহিতের জন্মসাল ছিল ২০০৭। পরে ২০১৭ এবং ২০২০ সালের আপডেটে আধারে জন্মসাল ২০০৬ দেখানো হয়। আবার ২০২১ সালে সেটি বদলে করা হয় ২০০৯। এই একাধিক পরিবর্তনই তদন্তকারীদের সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দেয়।
তবে শুধু একা রোহিতই নন, এমন ভাবে বয়স ভাঁড়িয়েছে অনেকেই। সেই সংখ্যাটাই ৬২। এ বার তাদের ক্রিকেট জীবন বিপন্ন হয়ে পড়েছে নিজেদের কৃতকর্মের জন্যই।