সৌরজগতের সীমানা ছাড়িয়ে প্রায় ৬৩ আলোকবর্ষ দূরের এক দানবাকৃতি গ্রহ থেকে ভেসে আসছে একটানা বেতার তরঙ্গ (radio signals)। বিজ্ঞানের ইতিহাসে এই প্রথম সৌরজগতের বাইরে অবস্থিত কোনও দূরগ্রহ বা এক্সোপ্ল্যানেট (exoplanet) থেকে এমন সুনির্দিষ্ট বেতার তরঙ্গ সরাসরি শনাক্ত করতে পারলেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। দক্ষিণ আফ্রিকার ‘মিরক্যাট’ (MeerKAT) রেডিও টেলিস্কোপে ধরা পড়া এই আবিষ্কার মহাকাশ গবেষণার দুনিয়ায় আলোড়ন ফেলে দিয়েছে। তবে কি এলেয়নরা আছে? বিজ্ঞানীরা যদিও জানাচ্ছেন, এই তরঙ্গ কোনও ভিনগ্রহী সভ্যতার পাঠানো বার্তা নয়, বরং ওই অচেনা গ্রহের অতি শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্রের (magnetic field) প্রত্যক্ষ প্রমাণ।
ভিনগ্রহী জীবের সঙ্কেত?
দূরগ্রহ থেকে বেতার তরঙ্গ আসার খবর পেলেই সাধারণ মানুষের মনে স্বাভাবিক ভাবেই কৌতূহল তৈরি হয়, তবে কি মহাকাশের অগাধ, অজানা বিস্তার থেকে কোনও বুদ্ধিমান প্রাণী যোগাযোগ করতে চাইছে? বিজ্ঞানীরা অবশ্য শুরুতেই সেই জল্পনায় জল ঢেলেছেন। পৃথিবী থেকে মানুষ যেমন কৃত্রিম ভাবে টিভি, রেডিও বা মোবাইল তরঙ্গের বিকিরণ মহাকাশে পাঠায়, মহাবিশ্বও কিন্তু নানা প্রাকৃতিক ঘাত-প্রতিঘাতে নিজস্ব বেতার তরঙ্গ তৈরি করে থাকে। এটাও সেরকমই কোনও মহাজাগতিক বিস্ময়।
বিটা পিকটোরিস বি (Beta Pictoris b) নামের এই গ্রহটি আসলে আমাদের সৌরজগতের বৃহস্পতির চেয়ে প্রায় দশ গুণ বেশি ভারী এক দৈত্যাকার গ্যাসীয় পিণ্ড (gas giant)। সেখানে যে তরঙ্গ শনাক্ত হয়েছে, তাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হচ্ছে অরোরাল রেডিও এমিশন (auroral radio emission)। সহজ কথায়, গ্রহের নিজস্ব বায়ুমণ্ডলের আয়নোস্ফিয়ারের সঙ্গে তীব্র চৌম্বকক্ষেত্রের ঘর্ষণে এই তরঙ্গের জন্ম। পৃথিবীর মেরু অঞ্চলে যেমন চোখধাঁধানো মেরুজ্যোতি বা অরোরা বোরিয়ালিস (aurora borealis) দেখা যায়, ঠিক তেমনই বিটা পিকটোরিস বি-র আকাশেও আলো ও তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গের এক মহাজাগতিক খেলা চলছে।
কেন এই আবিষ্কার মাইলফলক?
আমাদের সৌরজগতের বৃহস্পতি থেকেও এই ধরনের প্রাকৃতিক বেতার তরঙ্গ পাওয়া যায়। কিন্তু সৌরজগৎ-বহির্ভূত কোনও নক্ষত্রমণ্ডলীর গ্রহ থেকে এই তরঙ্গ সরাসরি মেপে দেখা আগে কখনও সম্ভব হয়নি।
শুরুতে বিজ্ঞানীদের মনে সন্দেহ ছিল, সঙ্কেতটি হয়তো গ্রহের মূল নক্ষত্র বিটা পিকটোরিস (Beta Pictoris) থেকে আসছে। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার কারু মরুভূমিতে বসানো ৬৪টি অ্যান্টেনার সমন্বয়ে তৈরি মিরক্যাট অবজারভেটরির হাই-রেজোলিউশন রেডিও ছবি বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা নিশ্চিত হয়েছেন, তরঙ্গের উৎস খোদ ওই গ্যাসীয় গ্রহটিই। সংগৃহীত তথ্য থেকে জানা গিয়েছে, বিটা পিকটোরিস বি-র চৌম্বকক্ষেত্র পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রের তুলনায় অন্তত হাজার গুণ বেশি শক্তিশালী। এই প্রথম কোনও বহির্গ্রহের চৌম্বকক্ষেত্রের তীব্রতা সরাসরি অঙ্ক কষে মেপে দেখা সম্ভব হল।
খুলে গেল নতুন দরজা
বিশাল গ্যাসীয় দানব হওয়ার কারণে বিটা পিকটোরিস বি-তে প্রাণের কোনও সম্ভাবনা নেই। তবে এই পর্যবেক্ষণ ভবিষ্যৎ গবেষণার ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী দিগন্ত খুলে দিল।
গবেষণাপত্রের অন্যতম সহ-লেখক জ্যোতির্বিজ্ঞানী ইভেতে সেন্ডেস (Yvette Cendes) জানিয়েছেন, কোনও গ্রহে বায়ুমণ্ডল এবং প্রাণ টিকে থাকার জন্য চৌম্বকক্ষেত্র বা ম্যাগনেটোস্ফিয়ার (magnetosphere) থাকা অত্যন্ত জরুরি। কারণ এই চৌম্বক দেওয়ালই নক্ষত্রের ধ্বংসাত্মক সৌরঝড় ও মহাজাগতিক তেজস্ক্রিয় বিকিরণ থেকে গ্রহের উপরিভাগকে রক্ষা করে। এত দিন পর্যন্ত দূরগ্রহগুলির চৌম্বকক্ষেত্র মাপার কোনও সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর উপায় বিজ্ঞানীদের হাতে ছিল না। এই সফল পরীক্ষার পর ভবিষ্যতে পৃথিবীর মতো পাথুরে ও বাসযোগ্য ‘সুপার আর্থ’ (super-Earth) খুঁজে পাওয়ার কাজটি বিজ্ঞানীদের কাছে অনেক সহজ ও নিখুঁত হয়ে উঠবে।