ভাস্বতী বন্দ্যোপাধ্যায়
অনেক রাতে পরী নেমে আসে। রোজ নয়, যেদিন রিমি ডাকে সেদিনও নয়। পরী আসে তার নিজের ইচ্ছেমতো। ভিক্টোরিয়ার কালো পরী। পিঠে দুটি সুঠাম ডানা। এক হাতে ফুলের স্তবক, অন্য হাতে উঁচু করে ধরা ট্রাম্পেট। ভিক্টোরিয়ার চূড়ায় দাঁড়িয়ে এতদিন ধরে সে কার জয়ডঙ্কা বাজিয়ে চলেছে কে জানে!
ছোটবেলা থেকে রিমি অগুনতিবার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল বেড়াতে গিয়েছে। ওই সুবিশাল মার্বেলসৌধ, তার রাজকীয় হল, মিউজিয়াম, বাগান, মূর্তি, জলাশয়— সব কেমন নিখুঁত সুন্দর। তবে রিমি এই ভিক্টোরিয়াকে একেবারে নিজের মতো করে পেয়েছিল এক বৈশাখের বিকেলে। ‘মা’ ফ্লাইওভারের ওপর তাদের গাড়িটা সেদিন যানজটে আটকে ছিল অনেকক্ষণ। অন্যদিনের মতো সে নিজের মোবাইল স্ক্রিনে আটকে রেখেছিল চোখ। হঠাৎ কী কারণে চোখ তুলে তাকাতেই দেখল, আকাশ জুড়ে ঘন মেঘ আর মেঘের বুকে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মায়াজ্যোৎস্নার মত মার্বেলে মোড়া সেই মহিমময় সৌধ, চারপাশে ইতিউতি সবুজের আল্পনা। সেই দৃশ্যের অভিঘাতে চারদিকে যত হাইরাইজ চুরচুর করে ভেঙে পড়ল তখনই! গর্তে মুখ লুকোলো সাপের মত এঁকেবেঁকে চলা ফ্লাইওভার! আর রিমি, আঠারোর তরুণী, যেন নিরালম্ব ভেসে রইল আকাশে।
এই মগ্নমুহূর্ত কত দীর্ঘ ছিল সে নিজেও জানে না। নিয়মিত তাকে ওই পথ দিয়ে যেতে হয় টিউশন নিতে, কিন্তু এমনটি আর কখনো ঘটেনি। এরপর গুগল করে জানা হল ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল বিষয়ক সমস্ত তথ্য এবং ইতিহাস। তখনই তার মন কেড়ে নিল ওই কালো পরী। কী আশ্চর্য! পরীরা কি কালো হয়? তারা তো সৌন্দর্যের প্রতিমূর্তি!
কেন হবে না? সেই কবেই তো অবনীন্দ্রনাথ এঁকে গিয়েছেন কালোপরী আর নিদ্রাপরী। সে ছবিও তো গুগল করে দেখিয়েছেন আঁকার মাস্টারমশাই শ্যামলকাকু। জলরঙে আঁকা দুই শ্যামাঙ্গী পরীর মুখ পাশ থেকে আঁকা, ভেসে আছে নরম কালো মেঘের মধ্যে, বিরাট এক দুধসাদা চাঁদের বিলোনো অকাতর জ্যোৎস্নায়। যেন এক অপূর্ব স্বপ্ন!
রিমির গায়ের রঙও কালো। ছোটবেলায় দিদা যখন আদর করতে করতে জোর গলায় বলতেন, ‘কালো জগতের আলো’, তখনই রিমির মনে হত, তার গায়ের রঙে নিশ্চয়ই কোনও গলদ আছে। তার এ বিশ্বাস বদ্ধমূল হয়েছিল বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই, প্রতিবেশী, পরিজন এমনকি বন্ধুদের নানা কথায়। প্রথম যেদিন সেই কালো পরী তার স্বপ্নে এল, তার ডানায় হীরের কুচি, এক হাতে কাশফুল অন্য হাতে বিরাট এক তুলি। সেই তুলি মেঘে ডুবিয়ে পরী আকাশের বুকে ছবি আঁকছিল। একবার কাছে এসে কাশফুল বুলিয়ে দিল রিমির চোখেমুখে। ডানার হিরেকুচি থেকে ঠিকরে পড়ছিল আলো। সেই আলোতে রিমি দেখল পরীর মুখের হাসি কেমন চেনা চেনা। ঘুম ভাঙার পরেও সেই হাসি মনের মধ্যে রয়ে গিয়েছিল অনেকক্ষণ। অনেক পরে মনে হয়েছিল, আসলে ওই হাসি সে দেখেছে ছবিতে এবং আয়নায়।
কী যে হল রিমির, একেবারে বুকের মধ্যে জায়গা করে নিল ভিক্টোরিয়ার কালো পরী। চর্মচক্ষে দেখা যায় না তাকে। সে তো থাকে সাধারণের সীমার বাইরে। আসলে সে বাজ পরিবাহী এবং বিপুলকায় হাওয়া পরী। বাতাসের বেগ ঘণ্টায় পনেরো কিলোমিটারের বেশি হলে তার হাওয়ার দিক নির্দেশ করার কথা। যদিও প্রযুক্তিগত কারণে পরী এখন আর ঘোরে না। এত সব তথ্য জানার পাশাপাশি রিমি আঁকার খাতা ভরে তার কালো পরীর ছবি এঁকে ফেলল নানা বিভঙ্গে।
রিমি ছবি আঁকতে চায়, কিন্তু মা যেমন চায় তেমন করে নয়। আবার শ্যামলকাকু যেমনটা শেখায় তেমনটাও নয়। তার মন অনেক কিছু বলতে চায়, হাত সবসময় পেরে ওঠে না। শ্যামলকাকু কিছু পদ্ধতি শেখাচ্ছেন, যেগুলো ব্যবহার করে সে মনের ভাবনাগুলোর রূপ দিতে পারবে। কয়েকটা ক্যানভাসে তুলির আঁচড় পড়েছিল, একেবারে নিজের মতো করে আঁকবে বলে, কিন্তু কিছুদূর এগিয়ে থেমে গিয়েছে। সে ছবি ভালোবাসে, উপভোগ করে, কিন্তু বড় শিল্পী হতে হয়ত সে কোনদিনই পারবে না। শ্যামলকাকু যাকে বলেন, ইমাজিনেশন, ক্রিয়েটিভিটি, ছবিটা আঁকার আগেই তাকে মনের ক্যানভাসে ফুটে উঠতে দেখতে পাওয়া, সেখানে অনেক খামতি আছে তার।
তবুও, ক্লাস টুয়েলভের পর সে আর্ট কলেজে ভর্তি হবে— এ একরকম ঠিক হয়ে আছে। মায়ের ইচ্ছা রিমিকে আর্টিস্ট হতে হবে। রিমিও আপত্তি করেনি। রিমি বোঝে, তাকে নিয়ে বাবা-মায়ের অনেক দুশ্চিন্তা। বাবা ব্যস্ত ডাক্তার, দাদা সিএ পাশ করে এখন ম্যানেজমেন্টের ছাত্র, মা শখের শিল্পী। রিমির ধরনটা যেন কারো সঙ্গেই মেলে না। কাউকেই খুশি করতে পারবে না হয়ত। আঁকা ছাড়া আর কোনও বিষয়ই সেরকমভাবে টানে না তাকে। সে যে কী করতে চায়, কেমনভাবে নিজের জীবনটা কাটাতে চায়, সে ভেবেই পায় না। মনে হয়, কেউ ঠিকঠাক বুঝবেও না তাকে। মাঝেমাঝে কেমন একটা মনখারাপ ঘিরে ধরে তাকে। নিজেকে কেমন নিঃসঙ্গ মনে হয়। যেন তার চারপাশে কেউ নেই, কিছু নেই, একেবারে শূন্য। ওই কালো পরীটার মত।
রিমির মা যে ছবি আঁকেন রিমির ধারণায় তা একেবারেই গতানুগতিক। এমন ছবি আঁকতে ভালো লাগে না রিমির। যে কথা বহুবার বলা হয়ে গিয়েছে, প্রায় একই রঙ-রেখার অলঙ্করণে, তার পুনরুক্তি করে লাভ কী! কিন্তু একথা মাকে কখনো সোজাসুজি বলতে পারবে না সে। স্বভাবগতভাবে রিমি অন্তর্মুখী। তা ছাড়া সে জানে, তার মা সেকথা মানতেও পারবেন না। এ শহরে বিভিন্ন আর্ট গ্যালারিতে মায়ের ছবি মাঝেমধ্যেই প্রদর্শিত হয়, পত্র-পত্রিকার আর্ট কলামে সেই ছবির কিছু কিছু আলোচনাও হয়েছে। মা চান তাঁকে অনুসরণ করেই রিমিও চেষ্টা করুক ছবি আঁকতে। মায়ের মতে আঁকার ক্ষেত্রে আশানুরূপ উন্নতি হচ্ছে না রিমির। তার আগ্রহ এবং উদ্যমের অভাব। রিমি আসলে নিজের পথ খুঁজে চলেছে, নিজের মতো করে। পায়নি এখনও। কে জানে, হয়ত পাবেও না কখনো!
সেদিন একটা ছবির প্রদর্শনীতে মায়ের সঙ্গে যেতে হয়েছিল। মা অনেকের সঙ্গে কথা বলছিল, আর রিমি গ্যালারিতে একটা চক্কর দিয়ে বেরিয়ে এসেছিল বাইরে। প্রদর্শনীর কোনও ছবিই বিশেষভাবে চোখ টানেনি তার। বাইরে সবুজ লন পেরোলেই ‘গ্রিন হাউস ক্যাফে’। কাচের দেওয়াল, কাচের দরজা। সেন্ট্রালি এসি। সন্ধে হবার মুখে ক্যাফের ভিতরের সব আলোগুলো জ্বলে উঠেছে। হঠাৎই চোখে পড়ল, স্বর্ণাভ আর সুহৃতা মুখোমুখি বসে একটা টেবিলে। সামনে কফির কাপ।
স্বর্ণাভ বলেছিল, আজ বিকেলে তার টিউশন আছে। তবে কি মিথ্যে বলেছিল? না কি টিউশন ফাঁকি দিয়ে সুহৃতার সঙ্গে কফি খেতে এসেছে? এই নিয়ে তিনদিন স্বর্ণাভকে সুহৃতার সঙ্গে একান্তে দেখল রিমি। তখন আবছা অন্ধকার নেমে এসেছে, কাচের দেওয়াল ভেদ করে রিমিকে ওদের দেখতে পাওয়ার কথা নয়। তা ছাড়া দু’জনে মগ্ন হয়ে কথা বলছিল তখন। কোনোদিকে খেয়ালই ছিল না। রিমি এগিয়ে-পিছিয়ে, ডাইনে-বাঁয়ে নানা দিক থেকে দেখছিল ওদের। বিশেষ করে সুহৃতাকে। কী সুন্দর ছিপছিপে চেহারা মেয়েটার। শ্বেতচন্দনের মত গায়ের রঙ। কী সুন্দর স্ট্রেট চুলে পনিটেল। কপালের ওপর বারে বারে এসে পড়ছে যত্নে কাটা লকস, আর বারে বারে তাদের হাত দিয়ে সরাচ্ছে সুহৃতা। কী সুন্দর লম্বা সরু আঙুল। নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে দেখল রিমি, নখগুলোর কোনও ছিরিছাঁদ নেই, হাতের চামড়াও অমন মসৃণ নয়। তার ভারি চেহারায় ঢিলেঢালা কামিজ। আর সুহৃতার ছিপছিপে শরীরে একটা ক্রপটপ। ফর্সা মসৃণ পেট ও পিঠের কিছু অংশ দৃশ্যমান। সুন্দর! রিমি কখনও অমন ক্রপটপ পরতে পারবে না। ছোট টপের নিচে টায়ারের মত বেরিয়ে থাকবে কালো চামড়া মোড়া চর্বির স্তর। স্বর্ণাভ তাকে ‘গোলুমোলু’ বলে ডাকে। আদরের ডাক, তাই রাগ করত না রিমি। কিন্তু এখন মনে হল, কেনই বা স্বর্ণাভ ওই ছিপছিপে সুন্দর সুহৃতাকে নিয়ে কফি ডেটে আসবে না?
ছোট থেকেই গোলগাল চেহারা রিমির। একটু বড় হবার পর যোগাতে ভর্তি হল, কখনও একটু মর্নিং ওয়াক, সাইক্লিং। কিন্তু নিজেকে ফিট মনে হলেও বাহ্যত রিমির চেহারা যেমন ছিল তেমনই থেকে গিয়েছে। স্বর্ণাভ তার বন্ধু থেকে ‘বিশেষ’ বন্ধু হয়ে উঠেছে ক্রমশ। অন্তত রিমি সেরকমই ভাবত। আজ মনে হচ্ছে, সেও যদি ওরকম ছিপছিপে ফর্সা সুন্দর হত, তাহলে কি আজ সুহৃতার জায়গায় সে বসে থাকত এই নিরিবিলি ক্যাফেতে?
—রিমি! মাই গড! তুই এখানে, আমি ওদিকে খুঁজে খুঁজে হয়রান।
মায়ের বিরক্ত স্বর,
—ফোন সুইচড অফ কেন?
—চার্জ ফুরিয়েছে বোধহয়।
—এখানে কী করছিস? কফি খাবি? চল তাহলে।
—না, না!
প্রায় ছিটকে পিছিয়ে গেল রিমি,
—আমি বাড়ি যাব।
বাড়ির পথে গাড়িতে মা কথা বলেই চলল,
—ইন্দিরাদির ছবিগুলো দেখলি ভালো করে? কী অসম্ভব ভালো ডিটেইলিং! সামনের মাসে আর একটা এক্সিবিশন আছে দু’সপ্তাহের। আমারও দুটো ছবি থাকছে, জানিস!
—বাহ্!
—থিম হল ‘উইমেন ইমানশিপেশন’। ছবি এখনও সিলেক্ট করিনি। করে নেবো। এবারে স্পেশ্যালি ‘নিউ ট্যালেন্ট’ বলে একটা সেকশন রাখছে ওরা। দু’জন ইয়াং আর্টিস্টের চারটে ছবি ডিসপ্লে করবে। তোর আঁকা গোটা দুয়েক ছবি বেছে নেবো। আমি জানি এই থিমের সঙ্গে ম্যাচ করে যাবে এরকম ছবি তোর আছে। শিউলিদিকে অনেক বলে রাজি করিয়েছি। বড় একটা ডোনেশন দিয়েছি এবার। এটুকু তো এক্সপেক্ট করতেই পারি, কী বল!
মা যে ছবিগুলোর কথা বলছে তার একটা ছবিও পুরোপুরি রিমির আঁকা নয়। শ্যামলকাকুর হাতের অনেক কাজ আছে ছবিগুলোতে। সংশোধন করতে গিয়ে ছবিগুলো অনেক বদলে গিয়েছে। যে কেউ দেখলে ভালোই বলবে, কিন্তু ওগুলো যে রিমির ছবি নয়, সেটা তার থেকে ভালো আর কেউ জানে না। মা এখন ওই ছবিগুলোকেই তার আঁকা বলে চালাতে চায়। মা যে কী সব বলে যাচ্ছে নিজের মনে, রিমি মন দিচ্ছিল না। মায়ের মনে অনেকরকম হিসেবনিকেশ চলতে থাকে। খুব মেপে হিসেব করে জীবনটা কাটাতে চায় মা। কিন্তু সব হিসেব কি মেলে? রিমির চোখের সামনেই তো কত হিসেব তছনছ হয়ে গিয়েছে মায়ের।
রিমির মনে তখন মেঘ জমেছে অনেক। স্বর্ণাভ কি কখনও বলেছিল ওর সঙ্গে একটা স্টেডি রিলেশনশিপে যেতে চায়? না, বলেনি। ভেবে দেখল রিমি, সেরকম কিছু কমিট করেনি স্বর্ণাভ। কিন্তু তাহলে তাদের ওই একান্ত সময়গুলো কি মিথ্যে? তাহলে এত লুকোচুরির দরকার হচ্ছে কেন? বারবার সুহৃতার ফর্সা সুন্দর ছিপছিপে চেহারাটা চোখে ভেসে উঠছিল রিমির। রিমির মত এইরকম কালো মোটা চেহারার মেয়েদের কি কেউ সত্যি ভালবাসে? কিন্তু রিমি তো এগোয়নি প্রথমে! স্বর্ণাভই তো তাকে ‘গোলুমোলু’ বলে, ‘মাই প্লাম্পি টেডি’ বলে প্যাম্পার করেছে এই ক’মাস!
তাদের গাড়িটা জ্যামে আটকে আছে। মা কার সঙ্গে যেন ফোনে কথা বলে চলেছে। খুব একা লাগছে রিমির। খুব কান্না পাচ্ছে। ইচ্ছে করছে দু’পাশে আটকে থাকা সারসার গাড়িগুলোর আড়ালে হারিয়ে যেতে। রিমি সিটে হেলান দিয়ে বসে চোখ বন্ধ করল। সত্যিই একদিন ঠিক হারিয়ে যাবে রিমি। তার চেনা জগতের বাইরে। কেউ তাকে খুঁজে পাবে না। নিজেকে বদলে ফেলবে একেবারে। সবরকমভাবে। তা যদি না পারে তবে নিজেকে শেষ করে দেবে। লাভ কী এভাবে বেঁচে থেকে? লক্ষ্যহীন, ভালবাসাহীন!
হঠাৎই পরী নেমে এল। তার কালো পরী। কিন্তু এ কেমন পরী? যেন মাখনের তৈরি, কেমন গলে যাচ্ছে পরী! ডানা, হাত-পা গলে গলে যাচ্ছে, গলা ভেঙে যাচ্ছে পরীর। পরী কাঁদছে! ‘আমাকে তুমি ভালোবাসছ না আর?’
রিমি আপ্রাণ চেষ্টা করল বলতে, ‘ভালোবাসি তো! বাসি বাসি বাসি! সত্যি!’
পরী কি শুনল? বুঝল? কেমন ছায়ায় মিলিয়ে গেল পরী।
মায়ের ডাকে যখন ঘুম ভাঙল রিমির, দেখল বাড়ি পৌঁছে গিয়েছে। বাড়ি ফিরে চোখেমুখে জল দিয়ে এক কাপ চা নিয়ে জানলার পাশে বসল। আবার ভাবনারা শিমুল তুলোর মত ভাসতে ভাসতে টুপ টুপ জমা হতে থাকল মনে। পরীও তাহলে কাঁদে! কেন সে বলল, ভালো না বাসার কথা? রিমি যে নিজেকে ভালবাসতে পারছিল না, সেই জন্যেই কি?
স্বর্ণাভর ফোন এল। কথা বলতে ইচ্ছে করল না। টুং টুং করে দুটো মেসেজ ঢুকল, ‘কাল আসছিস তো? কথা আছে।’ সন্ধে গড়িয়ে রাত নামছে ক্রমে। রাতে জেগে থাকে কত মানুষ, রাতচরা পাখি, রাতে ফোটা ফুল আর পরীরা। রাতের গভীরে নিজের সঙ্গে নিজের কথোপকথনের পবিত্র মুহূর্তে কখনো খুলে যায় বুকের মধ্যে ঘুমিয়ে থাকা সহস্রদল পদ্মের সমস্ত পাপড়ি। শুক্তির বুকে স্বাতী নক্ষত্র থেকে ঝরে পড়ে এক ফোঁটা জল।
সেই মুক্তোজন্ম বেঁচে নেবে ঠিক, ভেবে নেয় রিমি। তার কালো পরী যেন আর কখনো না কাঁদে। কাল স্বর্ণাভ যাই বলুক তাকে, স্পষ্ট করে সে জানিয়ে দেবে নিজের কথা। আর, মায়ের বেছে দেওয়া কোনও ছবিই সে কখনো কোনও একজিবিশনে দেবে না।
তারও পরে রাত্রির শেষ যামে ঘুম এসে আলিঙ্গন দেয়। তখনও তো জেগে থাকে পরী। ভিক্টোরিয়ার চুড়ায় দাঁড়িয়ে সে জয়ডঙ্কা বাজায়, কে জানে সে কার?