নির্মল ধর
শতবর্ষে ফিরে দেখা
পরিচালক ও অভিনেতা গুরু দত্তর ফিল্ম কেরিয়ারটি একে অপরের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে যে ‘চৌধবী কা চাঁদ’ এবং ‘সাহেব বিবি গোলাম’ ছবি দু’টি তিনি পরিচালনা না করলেও ছবি দু’টির আলোচনায় বারবার তাঁর নামটিই ঘুরেফিরে চলে আসে। ‘চৌধবী’ ছবিটি পরিচালনা করেন এম সাদিক, গল্প ও চিত্রনাট্যের দায়িত্বে ছিলেন সাগির উসমানি। আর ‘সাহেব বিবি গোলাম’-এর চিত্রনাট্য লেখার জন্য ছবির প্রযোজক নায়ক গুরু দত্ত আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন বিমল মিত্রকে। চিত্রনাট্য লেখায় তাঁকে সাহায্য করেছিলেন পরিচালক আবরার আলভি।
এই সত্যটা বহুসময়েই গুলিয়ে যায় দু’টি ছবির প্রযোজনার দায়িত্ব এবং প্রধান পুরুষ চরিত্রে গুরু দত্তর অভিনয়ের জন্য। এই দু’টি ছবিতেই নারী চরিত্রের প্রাধান্য চোখে পড়ার মতো। অবশ্য গুরু দত্তর আগের দু’টি ছবি ‘প্যায়সা’ এবং ‘কাগজ কে ফুল’-এও নারী চরিত্রের পাশাপাশি দু’টি পুরুষ চরিত্রও ছিল যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ শুধু নয়, ‘প্যায়সা’র নায়ক কবি বিজয় ও ‘কাগজ’-এর পরিচালক- নায়ক সুরেশ ছিল দু’টি ছবিরই
প্রধান চরিত্র।
প্রতিষ্ঠিত সিনেমা বিশেষজ্ঞ-সমালোচক-বিশ্লেষক লেখক সোমা এ চ্যাটার্জি তাঁর প্রায় পঞ্চাশ বছরের লেখক জীবনে সম্প্রতি প্রকাশ করলেন তাঁর বত্রিশতম বই ‘গুরু দত্ত : এ স্টাডি অফ উইমেন ইন হিজ ফিল্মস’। তাঁর অন্যান্য বইয়ের চেয়ে তুলনামূলকভাবে অনেকটাই ছোট বই হলেও তাঁর একান্ত নিজস্ব লিখনশৈলী এবং বিশ্লেষণী দৃষ্টিতে কোনও ঘাটতি নেই। সোমাদি শুধু ছোটি বহুর (সাহেব-বিবি-গোলাম) বাঙালি জমিদার বাড়িতে পুরুষশাসিত অন্তঃপুরে থাকার কষ্ট ও যন্ত্রণার দিকটা দেখেননি, সামাজিক পরিস্থিতি ও ‘ছোটি বহু’র অবস্থান বিশ্লেষণও করেছেন। বইটিতে সবচেয়ে বেশি জায়গা তিনি দিয়েছেন ‘সাহেব বিবি গোলাম’-এর ছোটি বহুকেই। অবশ্য ‘প্যায়সা’ ছবির গুলাবো ও মীনা কিংবা ‘কাগজ কে ফুল’-এর শান্তি তাঁর কলমে উপযুক্ত স্পেস নিয়েই আলোচিত হয়েছে। ফিল্ম পরিচালক সুরেশ অভিনেত্রী শান্তিকে যতটা ভালোবেসেছিলেন, নারী বা মহিলা শান্তিকে ততটা নয়। বিরোধাভাস ছিল লেখিকার এই বিশ্লেষণ পর্বে, সোমাদি কিসলজওস্কির ‘ক্যামেরা বাফ’, মধুর ভাণ্ডারকরের ‘হিরোইন’, ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘বাড়িওয়ালি’ ছবিগুলোর প্রসঙ্গও শুধু নয়, ছবিগুলোর কাহিনী এবং কাঠামোর সমতা নিয়েও আলোচনা করেছেন।
সোমাদির কলমে ইংরেজি ভাষার সাহেবিপনার চাইতে মধ্যশিক্ষিতের বাঙালিয়ানাই বেশি— যে কারণে তাঁর অধিকাংশ বই-ই পড়তে শুরু করলে শেষ না করে থামা যায় না। গুরু দত্ত তাঁর জীবৎকালে সাফল্য-অসাফল্যের ঢেউয়ে উথালি-পাথালি করেছেন, তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের মতোই। কিন্তু তাঁর সৃজনের প্রকৃত মূল্যায়ন ঘটল প্রয়াণের পর। সোমাদি বইটির শেষ পর্বে অমোঘ সত্যটিই লিখেছেন— ‘…A true artiste is often valued only after his death…’
Guru Dutta : A study of women in his film। Soma A. Chatterjee। Story Well Books, New Delhi-25। Price: Rs. 499/-
১৯৫২ সালে বিশ্বভারতীর আমন্ত্রণে উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ শান্তিনিকেতন গিয়েছিলেন ‘দীনেন্দ্রনাথ অধ্যাপক’ পদে সাময়িক সঙ্গীতশিক্ষক হিসেবে। ছিলেন মাত্র দু’মাস। ওই অল্প সময়েই তিনি শান্তিনিকেতনে প্রায় সব ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে ‘গুরু’ হয়ে উঠেছিলেন। দারুণ বলিয়ে কইয়ে, আড্ডাপ্রিয় মানুষ ছিলেন সঙ্গীতের এই মহান গুরু। পূর্ববঙ্গীয় টানে কথা বলতেন। নিজের জীবনখাতাটি ছিল খোলা বইয়ের মতো।
মাত্র দু’টি সন্ধ্যায় উপস্থিত আশ্রমিক ও ছাত্রের সামনে একেবারেই আপন মনে নিজস্ব ঢংয়ে বলে গেছেন তাঁর ‘আমার কথা’। সেই দুই-সন্ধ্যায় উপস্থিত ছিলেন শুভময় ঘোষ। তিনিই রেকর্ড করে নিয়েছিলেন সেই দুই সন্ধ্যার প্রতিবেদন এবং সেই নাতিদীর্ঘ প্রতিবেদনই বই আকারে ‘আমার কথা’ নামে প্রকাশিত হয় ১৯৫৭ সাল নাগাদ দেবকুমার বসুর প্রকাশনায়। পরে ১৯৮১ সালে রবিশংকরের ভূমিকাসহ দ্বিতীয়বার প্রকাশ করে আনন্দ পাবলিশার্স। বর্তমান ইংরেজি সংস্করণটি তারই ইংরেজি অনুবাদ, কাজটি করেছেন নৃত্যশিল্পী তরুণী হেমাশ্রী চৌধুরী। তাঁর বাবা ছিলেন বড়ে ওস্তাদের শিষ্যের শিষ্য, কত্থক নাচের পাশাপাশি সঙ্গীত নিয়েও তাঁর আগ্রহ শুভময় ঘোষের বইটি অনুবাদে আগ্রহী করেছে। আর তাঁর সেই আগ্রহের ফসল এই বইটি অবাঙালি সঙ্গীত শ্রোতার কাছে উস্তাদের একমাত্র লিখিত (নাকি কথিত) আত্মজীবনী।
হেমাশ্রীর সরল সাবলীল ইংরেজি অবশ্যই পাঠকের কাছে একটি আকর্ষণ। তার চেয়েও বেশি আগ্রহের বিষয় হল উস্তাদজির নিজের মুখ থেকে শোনা তাঁর দীর্ঘ জীবনের ঘটনাবহুল বিবরণ। তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন, ‘আমরা তো মূলত হিন্দুই।’ ত্রিপুরার মুকুলগ্রামের বাসিন্দা দীননাথ দেবশর্মার উত্তরসূরী তিনি। প্রকৃত অর্থে আলাউদ্দিন হচ্ছেন দীননাথের চতুর্থ প্রজন্ম। দীননাথের একমাত্র সন্তান মুসলিম ধর্ম গ্রহণ করে নাম নেন সিরাজু ডাকাত। সত্যিই তিনি বুক ফুলিয়ে ডাকাতি করতেন। এই সিরাজুই হচ্ছেন আলাউদ্দিনের ঠাকুরদা। বাবার নাম সোধু খান, তাঁর তৃতীয় সন্তান বিশ্বস্বীকৃত ‘উস্তাদ’! ত্রিপুরার শিবপুরে পূর্বপুরুষের বাড়ি ছিল। বাবা সোধু খান ছিলেন সঙ্গীতপ্রিয়।
বাবা মেজোভাই আফতাউদ্দিনের জন্য তবলা ও বেহালা শেখার জন্য দু’জন মাস্টার নিযুক্ত করলে আলাউদ্দিন বাড়ির কাছে শিববাড়িতে সাধুদের সেতার বাজানো শুনতে যেতেন। দাদার বেহালার সঙ্গে তাল দিয়ে মায়ের বুকে বসে ‘তবলা’ সঙ্গত করতেন কিশোর বয়সী আলাউদ্দিন। ওই ছোট্ট বয়সেই আলাউদ্দিন ঘুমন্ত মায়ের আঁচল থেকে চাবি নিয়ে আলমারি থেকে মাত্র বারো টাকা চুরি করে সেই রাতেই চলে যান কাছেই মানিক গ্রাম রেলস্টেশনে। তারপর ভায়া নারায়ণগঞ্জ— সোজা শিয়ালদহ। বেশ কিছুদিন কাটে তাঁর নিমতলা ঘাটের কাছে এক লঙ্গরখানায় একবেলা খেয়ে আর পানীয় বলতে কলের জল এবং শয়নং জনৈক ডা. কেদারনাথের বারান্দায়।
এরপর তাঁর দেখা হয় স্বামী বিবেকানন্দর ভাই অমৃতলাল দত্তর সঙ্গে। ন্যাশনাল থিয়েটারে সেতার ক্ল্যারিওনেট বাজাতেন। ডাক নাম হাবু দত্ত। তাঁর সঙ্গে গিয়েই মিনার্ভা থিয়েটারে গিরিশ ঘোষের পরিচয়। আলাউদ্দিনের তবলা বাজানো দেখে গিরিশ বলেছিলেন, ‘এই নেড়েটা তো ভালোই তবলা বাজাচ্ছে! তবে আমাদের সঙ্গে থাকলে তো আর তুই নেড়ে থাকবি না!’
এভাবেই কলকাতা শহর চষে বেড়িয়ে অগণিত গুরুর কাছে বাদ্যসঙ্গীতের চর্চা করেছেন আলাউদ্দিন খান। নানা ঘাটের জল খেতে খেতে একসময় পৌঁছলেন ছোট্ট মাইহার রাজ্যে। রাজা ব্রিজনাথ সিং ওঁর সঙ্গীতজ্ঞানের পরীক্ষা নিলেন বিচিত্র পদ্ধতিতে। একঘর বাজনার যন্ত্রের মধ্যে ঢুকিয়ে বাঁশি, সেতার, সানাই, এস্রাজ, সরোদ, মৃদঙ্গ, তবলা সবই বাজাতে বললেন রাজা। শুনলেন নামমাত্র। পরীক্ষা শেষে পরদিনই আলাউদ্দিনকে ‘গুরু’ পদে বরণ করলেন স্বয়ং রাজা। কিন্তু বিনয়ী আলাউদ্দিন বলেছিলেন— ‘আমিই যে এখনও ছাত্র। গুরু হওয়ার যোগ্যতা আমার নেই!’ কিন্তু কে শোনে কার কথা! ওই মাইহারেই রাজার নির্দেশে অনাথ বালকদের নিয়ে তৈরি হল ‘মাইহার ব্যান্ড।’
বইয়ের পরের অংশ ‘সেকেন্ড সিটিং’— সেখানে ধরা আছে উদয়শংকর-রবিশংকরের দলের সঙ্গে দীর্ঘ প্রায় এক বছর পুরো ইউরোপ ভ্রমণ এবং অনুষ্ঠানের দীর্ঘ বিবরণ। হেমশ্রীর আন্তরিক মনন ও অনুবাদের সাবলীলতায় উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর আত্মকথন এতদিন পর সব ভাষাভাষী পাঠকের কাছে পৌঁছল বলতে পারি। প্রকাশক নিয়োগী বুকসকে এই বিরল কাজটির জন্য ধন্যবাদ জানাতেই হয়। প্রায় পঞ্চাশ পাতা জুড়ে রয়েছে রামকিংকর বেইজের তৈরি উস্তাদের মূর্তি-সহ প্রায় চল্লিশ-বিয়াল্লিশটি বিরল ছবির আর্ট প্লেট। রয়েছে আলাউদ্দিনের বাবা সোধু খান ও মা হরসুন্দরী খাতুনের ছবিও। উস্তাদের বাজনা ও জীবন নিয়ে ভারী ওজনের একাধিক বই থাকলেও ক্ষীণকায় (মাত্র ১২০ পৃষ্ঠা) এই বইটি এক মূল্যবান সম্পদ ভারতীয় সঙ্গীত জগতের। বাংলা বইটির মুখবন্ধ লিখেছিলেন স্বয়ং রবিশংকর। তিনি লিখেছেন ‘বাবা যে এমন সহজ ভাষায় নিজের কথা বলেছেন— জানতামই না। ‘…Now… you can hear about everything in his own words.’
My Life : Story of an Imerfect Musician : Ustad Allauddin Khan।
Translation: Hemasri Chaudhuri।
Niyogi Books, New Delhi।
Price: Rs. 499/-