‘বাদল সরকার’ নামটা যখন শুনি তখন আমার কত আর বয়স হবে ষোলো কী সতেরো। পাঁচু মুখোপাধ্যায় মানে আমার স্যর একদিন বললেন কাছের একটি স্কুলে নাটক হবে, দেখতে যাওয়ার জন্য। খুব সাধারণ ঘরের মেয়ে। বাড়িতে নাটক চর্চা বা সাংস্কৃতিক চর্চা কোনটাই সেভাবে হতো না। মধ্যবিত্ত ছাপোষা পরিবার গুলো যেমন হয় আর কী! স্যরের হাত ধরে এক বিকেলে নাটকের মুখোমুখি হওয়া। বাদল সরকার ছিলেন না। তবে ‘আয়না’ নামে একটি নাটকের দল ছিল। তাঁরা বাদল সরকারের ‘বগলা চরিত মানস’ নাটকটি অভিনয় করেন।
সেটাই আমার জীবনে দেখা প্রথম নাটক এবং বাদল সরকারকে চেনা। ‘আয়না’ বাদল সরকারের তৃতীয় থিয়েটার করে। সেদিনই প্রথম শুনলাম ‘থার্ড থিয়েটার’ বা ‘তৃতীয় থিয়েটার’ । তারপর কী ভাবে যেন এই থিয়েটার আর থিয়েটারের মানুষগুলোর সঙ্গে জুড়ে গেলাম। আসলে এই থিয়েটার বা এই থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত মানুষগুলো ম্যাজিক জানে। যে কোনও মানুষকে সহজে কাছে টেনে নিতে পারে। আমিও একদিন এই মানুষগুলির কাছাকাছি বৃত্তে ঢুকে পড়লাম।
ঢুকতে কি পেরেছি? বাদল সরকারের এই দর্শন ধারন করা কি অতোই সহজ? যা তিনি আজীবন বিশ্বাস করেছেন, জীবন দিয়ে প্রতিনিয়ত প্রমাণ করেছেন তা কি আমার মতো ক্ষুদ্র তুচ্ছ মানুষের বোঝা সহজ, গ্রহণ করা সহজ? আজকের এই পুঁজিবাদী সমাজে দাঁড়িয়ে থিয়েটার নিয়ে তাঁর এই বলিষ্ঠ পদক্ষেপ মোটেও সহজ নয়। অথচ তিনি তা করে দেখিয়েছিলেন। থিয়েটারকে বাণিজ্যিকীকরণের জাঁতাকল থেকে মুক্ত করেছিলেন। আর তাঁর এই পদক্ষেপে সৈনিক হিসেবে এমন কিছু মানুষ পেয়েছিলেন, যাঁরা আজীবন বাদলদার হাত ধরে রেখেছেন। একশো বছরের জন্মদিনে তাঁর আদর্শকে নিজেদের জীবনের পাথেয় করে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন। তাঁর এই মতাদর্শ আজও বহন করে চলেছে তাঁর গড়া দল ‘শতাব্দী’, ‘পথসেনা’ এবং ‘আয়না’।
বাদল সরকারকে প্রথম দেখি কাঁচরাপাড়ায়। ‘পথসেনা’-র নাট্য উৎসব চলছিল কাজী নজরুল ইনস্টিটিউটে। শতাব্দী সেদিন ক্যাপ্টেন ‘হুররা’ নাটকটি অভিনয় করে। নাটক শুরুর আগে প্রেক্ষাগৃহের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন বাদল সরকার। আমার স্যর পাঁচু মুখোপাধ্যায় একটি কলেজ ছাত্রীর সঙ্গে তাঁর পরিচয় করিয়ে দেন। নিতান্ত বালিকার উচ্ছ্বাস থেকে তাঁর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করা এবং তার জন্য বকা খাওয়া। তিনি তৎক্ষণাৎ ধমক দিয়ে বলেছিলেন, ‘এই মেয়ে পায়ে কেন হাত দিচ্ছো, পায়ে কারও হাত দেবে না। আমরা সবাই সমান।’ এই সাম্যর বার্তা আজও বিশ্বাস করে নাটক করে চলেছে ‘পথসেনা’ ‘আয়না’ এবং ‘শতাব্দী’।
নকশাল আন্দোলন শেষ হয়েছে। তবে তার রেশ তখনও রয়ে গেছে সমাজের বুকে, মানুষের মধ্যে। নকশাল আন্দোলনের ধিক ধিক করে জ্বলতে থাকা আগুন তখনও কিছু যুবকের বুকে আছাড়ি-পিছাড়ি খাচ্ছে। তাঁরা কিছু করতে চাইছিল। দু’চোখে তখন সমাজ বদলের স্বপ্ন। কিন্তু কী উপায়ে এই বদল করা যায় তা তাঁদের জানা ছিল না। কিছু একটা করতেই হবে এটা শুধু জানা ছিল। সংস্কৃতির বদল তো সমাজ বদলেরই হাতিয়ার। অমিত মৈত্র তাঁর বন্ধু শ্যামল মুখোপাধ্যায়কে একদিন বললেন, ‘চল নাটক করি’।
সেই শুরু হল ‘পথসেনা’র পথচলা। প্রথম দিকে কিছুটা অগোছালো, এলোমেলো হলেও পরে তা ধীরে ধীরে রূপ নেয় নাট্যদলের। ৪০ বছর পরেও হেঁটে চলেছে সেই দল।‘রজনীকান্ত গল্পো বলো’ দিয়ে পথসেনার হাতেখড়ি। অতোটা পরিপক্ক ছিল না। তবে বাদল সরকার সেই নাটক মন দিয়ে দেখেছিলেন। দলের সবাইকে ওয়ার্কশপ করতে বলেছিলেন। বাদল সরকারের উদ্যোগে সেই সময় কার্জন পার্কে নাটক হত। সেখানে এই নাটক অভিনয় করে পথসেনার অভিনেতারা। এরপর বাদল সরকারের ‘স্পার্টাকুস’ তোলা হয় এবং বাদল সরকারের সামনে অভিনয় করা হয়।
বাদল সরকার সব সময়ই যে কোনও নাটকের ক্ষেত্রেই ওয়ার্কশপের উপর ভীষণ ভাবে জোর দিতেন। সেই মত পথসেনার অভিনেতাদেরও ওয়ার্কশপ করতে বলেন এবং তাতে তাঁরা রাজিও হয়ে যান। বাদলবাবুও সুদূর কলকাতা থেকে কাঁচরাপাড়া চলে আসেন কিছু অচেনা-অজানা ছেলেদের ওয়ার্কশপ করাতে। হই হই করে চলে সেই ওয়ার্কশপ। এরপর থেকে পথসেনার সঙ্গে বাদল সরকারের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়ে ওঠে। শ্যামল মুখোপাধ্যায়, দুলাল কর, সুমিত বিশ্বাস, জয় গোপাল চক্রবর্তী, অতনু মজুমদার, অনুপ রায় এবং আরও অনেকে মিলে এগিয়ে চলে নাটকের কাজ।
বাদল সরকারের ‘গণ্ডি, ‘হট্টমেলার ওপারে’, ‘ক চ ট ত প’-র মত নাটক করে পথসেনা। বাদল সরকার ‘রক্তকরবী’ সম্পাদনা করেছিলেন। সে কথা কানে যায় পথসেনার অভিনেতাদের কাছে। দলের সবাই সেটি অভিনয় করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। রাজী হয়ে যান বাদল সরকার। তারপর বাদল সরকারের মানিকতলার বাড়িতে দিনের পর দিন চলে ওয়ার্কশপ। ধৈর্য ধরে বাদল সরকার একের পর এক ওয়ার্কশপ করাতে থাকেন। ‘সম্পাদিত রক্তকরবী’ একদিন অঙ্গনমঞ্চে করে ফেলে পথসেনা। আর এই নাটক জন্ম দেয় অন্য এক ‘নন্দিনী’র। বাংলা ভাষা পড়তে না পারা, না জানা একটি মেয়ে ‘নন্দিনী’ চরিত্রে অভিনয় করে ফেলে।
বাদল সরকারের যাদু স্পর্শে সে হয়ে ওঠে ‘রবীন্দ্রনাথের নন্দিনী’। নাটক বলতে আমাদের চোখের সামনে যে চিত্রটা ফুটে ওঠে তার থেকে একদম আলাদা থার্ড থিয়েটারের অভিনয়। এই থিয়েটার কেউ পরিচালনা করেন না। দলের অভিনেতারাই সম্মিলিত ভাবে নাটকটি প্রযোজনা করে থাকেন। ওয়ার্কশপের মাধ্যমে এক একটি চরিত্রকে গড়ে তোলা হয়। আর তাঁর কাণ্ডারি হিসেবে পাশে থাকেন বাদল সরকার। ‘রক্তকরবী’র নন্দিনী রূপী ‘পুতুল’ কিছুতেই পারছিলেন না চরিত্রটা তুলতে। প্রথমত পথসেনাও বিশ্বাস করতে পারেনি ‘পুতুল’ এই চরিত্রটি করতে পারবে। কিন্তু বাদল সরকার তাঁর উপর আস্থা রেখেছিলেন। তাঁকে পরম যত্নে নাটকের সংলাপ থেকে টেক্সট বুঝিয়েছিলেন এবং ওয়ার্কশপের মাধ্যমে পুতুলকে ‘নন্দিনী’ করে গড়ে তুলেছিলেন।
বাদল সরকার যে কোনও নাটক করার আগেই ওয়ার্কশপের উপর ভীষণ জোর দিতেন। ওয়ার্কশপের মধ্যে দিয়ে একজন অভিনেতা তাঁর সমস্তটা উজাড় করে দিতে পারেন। মুখোশ খুলে সেই চরিত্রটা হয়ে উঠতে পারেন। চরিত্রকে বুঝতে, চরিত্রকে অনুভব করতে এবং চরিত্র হয়ে উঠতে ওয়ার্কশপ অনেকটাই সাহায্য করে বলে মনে করে তৃতীয় থিয়েটারের সমস্ত সদস্যরা। আসলে থার্ড থিয়েটার অভিনয় নয়। থার্ড থিয়েটার একটি আদর্শ। একটি আদর্শকে তুলে ধরতে কোনও মুখোশের দরকার পড়ে না। তুমি যা বুঝছো, তোমার চেতনায় যা নাড়া দিচ্ছে তার বহিঃপ্রকাশই হল থার্ড থিয়েটার।
থার্ড থিয়েটার অবশ্যই সমাজে ঘটে চলা অসাম্যকে আঙুল তুলে দেখায়। তা নিয়ে প্রতিবাদ করতে শেখায়। বাদল সরকার যে শুধু নাটকের জন্যই ওয়ার্কশপ করেছেন তা নয়। মানুষ গড়ার কারিগর ছিলেন তিনি। তিনি ওয়ার্কশপের মাধ্যমে একটি সুস্থ চেতনা, সুস্থ সংস্কৃতি গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। মানিকতলা, খিদিরপুর, মেটিয়াবুরুজ-সহ শহরের বিভিন্ন বস্তির মেয়েদের নিয়ে ওয়ার্কশপ করতেন। শুধুমাত্র নাটকের তাগিদে নয়। একজন মানুষ হিসেবে নিজেকে উপলব্ধি করা, নিজের উপর আস্থা রেখে জীবনের পথে এগিয়ে যাওয়ার জন্য এই ওয়ার্কশপ ছিল অনেকটাই জাদুকাঠির মতো।
যৌনকর্মীদের নিয়েও ওয়ার্কশপ করেছেন বাদল সরকার। ওঁদের নিয়ে নাটক লিখেছেন ‘অন্ধকারে’। আসানসোলের পরের স্টপেজ সীতারামপুরের একটি যৌনপল্লি রয়েছে। সেখানেও নাটক করেন তিনি। থার্ড থিয়েটারকে মানুষের দরবারে হাজির করেছিলেন বাদল সরকার।থার্ড থিয়েটার বা তৃতীয় থিয়েটার কী বা কেন তা নিয়ে বলার বোধ হয় আজ আর কিছু নেই। সবাই কম বেশি জানে। আসলে তিনি প্রসেনিয়ামের বেড়া ভাঙতে চেয়েছিলেন। দর্শক এবং অভিনেতার মধ্যের দূরত্ব ভেঙে মুখোমুখি বসাতে চেয়েছিলেন।
দূরত্বের বেড়া, স্তরের বেড়া সরিয়ে ফেলতে চেয়েছিলেন। প্রসেনিয়াম মঞ্চকে নামিয়ে এনেছিলেন ‘অঙ্গনমঞ্চে’ আর ‘মুক্তমঞ্চে’। তিনদিক খোলা আর দর্শক দিয়ে ঘেরা অভিনেতাদের নিয়ে চলত ‘অঙ্গনমঞ্চ’-এর অভিনয়। আর ‘মুক্ত মঞ্চ’ নিয়ে অভিনেতারাই পৌঁছে যেতেন দর্শকের কাছে। আটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে বাদল সরকার ‘গ্রাম পরিক্রমা’ শুরু করেছিলেন। তাঁর দল ‘শতাব্দী’কে নিয়ে বিভিন্ন গ্রামে চলে যেতেন। যেখানে নাটক পৌঁছতে পারত না, তিনি সেখানেও নাটককে সহজে পৌঁছে দিয়েছিলেন। নাটক গিয়েছিল দর্শকের কাছে। যা সেই সময় দাঁড়িয়ে ভাবাটাই ছিল অবাস্তব। চার দেওয়ালের ঘেরাটোপ থেকে থিয়েটারকে মুক্ত করেছিলেন। সেই সঙ্গে দর্শকদের জন্য ছিল অবাধ প্রবেশ।
বাদল সরকারে কথায় – ‘থিয়েটারের দামি ভারী জিনিসগুলো আর দরকার হচ্ছে না। সেট খাটাবার আর দরকার নেই, তাতে দর্শকের দৃষ্টি আরও ব্যাহত করবে। প্রসেনিয়ামে বারবার বোঝানোর চেষ্টা করা হয় এটা নয় মঞ্চ, এটা চায়ের দোকান কিংবা শোবার ঘর – এই সব অঙ্গনমঞ্চে আর দরকার নেই। তার মানে দর্শকের কল্পনাশক্তিকে ব্যবহার করা আরম্ভ হল। এক ধরনের অর্ডিয়েন্স পার্টিসিপেশন শুরু হল তার কল্পনাশক্তিকে ব্যবহার করতে। তাতে ওই সেট, স্পটলাইটের জাদুর আর প্রয়োজন হল না বরং প্রয়োজন হল অভিনেতার দেহ ও মনকে ব্যবহার করা।‘
নাটককে দর্শকের মাঝে এনে উপস্থিত করা গেল, অনেক বেশি অন্তরঙ্গ হওয়া গেল। আসল সত্য উপলব্ধি করা গেল। তাঁর ভাষায়, ‘সিনেমার পরিপ্রেক্ষিতে থিয়েটারের দূরবস্থা আমাকে খুব এফেক্ট করেছিল। মনে হত সিনেমা এত শক্তিশালী মিডিয়াম, কিন্তু থিয়েটারের কি কোনও জোরই নেই যে থিয়েটার লোক টানতে পারে? তখন আমি কোথায় থিয়েটারের বৈশিষ্ট্য সেটা খুঁজে বের করার তাগিদ অনুভব করি। বুঝতে পারি যে থিয়েটার এক জীবন্ত কলামাধ্যম এবং এখানেই তার জোর। এখানে সিনেমা কিছুতেই নকল করতে পারবে না থিয়েটারকে।‘
তাঁর নাটক পোর্টেবল ও ফ্লেক্সেবল হওয়ায় ইনএক্সপেনসেবল হয়ে উঠল। যেখানে খুশি দলই বহন করে নিয়ে যেতে পারে অতি সহজে। রাতে, দিনে, শহরে কিংবা গ্রামে যেমন খুশি সুবিধা মতো থিয়েটার করা যায়। ফলে খরচ কমে গেল। টিকিট কাটতে না হওয়ায় অনেক মানুষ অংশ নিতে পারল। থিয়েটার মানুষের মধ্যে মানুষের মানবিক সম্পর্ক তৈরি করল যেমনটা বাদল সরকার চেয়েছিলেন। অভিনয়ের পর ঝোলা পেতে দর্শকদের থেকে টাকা নেওয়া হত। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ’যখন ফ্রি হয়ে গেল তখন দর্শক অভিনয়ের পরে যে পয়সাটা দিচ্ছে সেটা কিন্তু দামও নয়, দানও নয়। সেটা তাদের অংশগ্রহণ।
সেইজন্য খুব গরিব জায়গাতে শো করলেও আমরা কিন্তু পয়সা তোলার চাদরটা ঘোরাই। তাদের কেন বঞ্চিত করব অংশগ্রহণ থেকে? তারা দশপয়সা দিক, পাঁচ পয়সা দিক, দেওয়ার সুযোগ পাক। এটা না করে জমিদারি সুলভ মনোভাবে যদি ভাবতাম তাদের পয়সা নেই, তাই পয়সা নেব না তাহলেই কিন্তু ওদের ও আমাদের মধ্যে একটা স্তর বিভেদ চলে এল। ওরা নিম্নস্তর আমরা উচ্চস্তর।‘ এই স্তর ভাঙতেই তিনি থার্ড থিয়েটারে নেমেছিলেন। শুধু তাই নয়, নাটকের জন্য কখনও কোনও কাগজে বিজ্ঞাপন দেওয়া হত না। এমন কী সরকারি অনুদানও নেওয়া হত না। তিনি নাটকে এক বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন। থার্ড থিয়েটারের আগে মানুষ একমাত্র প্রসেনিয়ামকেই থিয়েটার হিসেবে মান্যতা দিয়েছিল। যেখানে দর্শককে যেতে হত থিয়েটারের কাছে। এবার থেকে অভিনেতাও দর্শকদের কাছে খুব সহজেই পৌঁছে যেতে পারলেন।
তাঁর এই ভাবনাকে, আদর্শকে বাস্তবায়িত করতে যেমন নিজের দল ‘শতাব্দী’কে পেয়েছিলেন তেমনি ‘পথসেনা’ বা ‘আয়না’র মতো দলকেও পেয়েছিলেন। এই দলগুলির মাধ্যমে তিনি তাঁর সুদূরপ্রসারী ভাবনাকে আরও প্রসারিত করতে পেরেছিলেন। আটের দশকে উত্তর চব্বিশ পরগনার কাঁচরাপাড়ায় একদল যুবক ‘পথসেনা’ গড়ে যেমন থার্ড থিয়েটার করছিল ঠিক সেই সময় বেহালার সরসুনাতেও একদল যুবক মুকুল চট্টোপাধ্যায় এবং তরুণ দে-র তত্ত্বাবধানে ওয়ার্কশপ করে। সালটা ১৯৮৮। তখনও বাদল সরকারের নাটক তাঁরা কেউ পড়েননি, দেখেনওনি। ওয়ার্কশপের পর বিভিন্ন নাটক চলতে থাকে।
এখানে বলে রাখা দরকার, এই যে ওয়ার্কশপের কথা বললাম, বাদল সরকার যে পদ্ধতিতে ওয়ার্কশপ করাতেন তা মান্যতা দিয়েই তাঁদের করানো হয়েছিল। মুকুল চট্টোপাধ্যায় এবং তরুণ দে এঁরা দু’জন সেই সময় খিদিরপুরে বাদল সরকারের ওয়ার্কশপ করেছিলেন। সেই ধারণা থেকেই তাঁরা পাড়ার ছেলেদের ওয়ার্কশপ করিয়েছিলেন। আয়নার প্রথম নাটক ‘নকশি কাঁথার মাঠ’। এরপর ‘চক্রব্যূহ’ নাটকের শো করতে গিয়ে বাদল সরকার আয়নার ছেলে-মেয়েদের ‘গণ্ডি’ নাটক করার প্রস্তাব দেন। বাদল সরকারের কাছ থেকে পাওয়া এই প্রস্তাব লুফে নেয় ‘আয়না’র ছেলে-মেয়েরা। শুরু হয় ‘গণ্ডি’র রিহার্সাল। সময়টা নয়ের দশক। ৯১ কী ৯২ সাল। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি নাটকে আয়নার ছেলে-মেয়েরা অভিনয় করে ফেলেছেন।
‘গণ্ডি’ দিয়েই শুরু হয় প্রথম বাদল সরকারের নাটক করা। ‘গণ্ডি’র পর ‘বগলা চরিত মানস’, ‘কচটতপ’, ‘বাঘ’ একের পর এক নাটকের অভিনয় চলতে থাকে। লেখার শুরুতেই বলেছিলাম বাদল সরকার ওয়ার্কশপের উপর বিশেষভাবে জোর দিতেন। শুধুমাত্র অভিনয় দিয়ে এই থিয়েটার করা যায় না বলেই বিশ্বাস করেন তৃতীয় থিয়েটারের কর্মীরা। সেই কারণেই মানস. মৌ, টুকুন, বব, সুখেন, অম্লান, সায়ন্তন, শুক্লারা এই থিয়েটারকে ভালোবেসে থেকে যায়। আর্থিক সুরাহা হবে না জেনেও ভালোবাসায় আষ্টে-পৃষ্ঠে নিজেদের বেঁধে নেয়।
এতক্ষণ ধরে ‘পথসেনা’ আর ‘আয়না’র কথাই বলে গেলাম। বাদল সরকারেরর নিজের দল ‘শতাব্দী’র কথা বলাই হল না। লরেটোতে প্রথম দেখি ‘শতাব্দী’ প্রযোজিত নাটক ‘মিছিল’। কার্জন পার্কে পুলিশি সন্ত্রাসে খুন হলেন এক যুবক। নাম প্রবীর দত্ত। বাদল সরকার নাটক লিখলেন ‘মিছিল’। মঞ্চস্থ হল কার্জন পার্কে। ‘খোকা’ নামের একটি চরিত্রের মাধ্যমে প্রান্তিক মানুষের যন্ত্রণার প্রতিচ্ছবি দেখানো হল। যা প্রতীকী চরিত্র ও কোরাস ব্যবহারের মাধ্যমে একটি বৃহত্তর মানবিক অভিজ্ঞতার বার্তা দিল। শেষ দৃশ্যে মিছিলে পা মেলান দর্শকেরাও। মূল অভিনেতাদের আর খুঁজে পাওয়া যায় না। আমিও সেই মিছিলে পা মিলিয়ে ছিলাম। নাটক দেখতে দেখতে নাটকের একটি অংশ হয়ে ওঠার অভিজ্ঞতা এই প্রথম হল।
সেই সময় শিয়ালদহের লরেটো স্কুলে শতাব্দী শুধু রিহার্সালই দিত না প্রতি তিনমাস অন্তর নাট্যোৎসবও করত। শুক্র, শনি এবং রবিবার এই তিন দিন হত ‘নাট্যোৎসব’। ‘পথসেনা’, ‘আয়না’ এবং ‘শতাব্দী’ তিনদিন ধরে নাটক পরিবেশন করত। লরেটো স্কুলে ঢুকেই সোজা ছিল গাড়ি বারান্দা। তার পাশেই একতলায় হত তিনদিনের নাট্যোৎসব। তিনদিক খোলা, একদিকে আটকানো জায়গায় চলত নাটক। তিনদিক ঘিরে বসত দর্শক। লরেটো স্কুলে সেই সময় পথশিশুরা থাকত। তারা গোল করে সবার সামনে বসে নাটক দেখত। যতদিন লরেটোতে নাট্যোৎসব চলেছে ততদিন এই পথশিশুরাও নাটকের সঙ্গী ছিল। লরেটোর তিনতলাতেই রিহার্সাল দিত শতাব্দী।
দীপঙ্কর দত্ত, কল্যাণদা (কল্যাণ ঘোষ), তপুদি (শান্তা দত্ত), কৃষ্ণাদি (কৃষ্ণা ঘোষ) ঋতদীপ, বিভাস, সুছন্দা এঁদের দেখতাম রিহার্সাল দিতে। বর্তমানে আর লরেটোতে রিহার্সাল বা নাট্যোৎসব হয় না। তালতলায় একটি বাড়িতে রিহার্সাল দেয় শতাব্দী। তবে নন্দন চত্বরে এখনও প্রতি মাসের প্রথম ও তৃতীয় রবিবার নাটক করে ‘পথসেনা’, ‘আয়না’ এবং ‘শতাব্দী’।মোটামুটি সবারই জানা ১৯৫৭ সালে বাদল সরকার লন্ডনে গিয়েছিলেন টাউন প্ল্যানিং পড়তে। ১৯৫৭ সাল থেকে ১৯৫৯ এই দু’বছর সেখানে খাকাকালীন প্রচুর নাটক দেখেন। বিদেশী নাটকের সংস্পর্শে এসে তাঁর নাটক নিয়ে ভাবনা আরও পোক্ত হয়। ১৯৫৯ সালে কলকাতায় ফিরে আসেন। ১৯৬০ সালে ‘চক্র’ নামে রিহার্সাল ক্লাব গড়ে তোলেন। শুধুমাত্র রিহার্সাল হবে, অভিনয় হবে না।
এই ছিল এই ক্লাবের শর্ত। তবে শেষমেশ তাঁর রচিত নাটক ‘বড়ো পিসিমা’ অভিনীত হয়। এরপর বেশ কয়েকটি নাটক এই ‘চক্র’ থেকে অভিনীত হয়েছিল। ‘সারারাত্তির’, ‘সলিউশন এক্স’, ‘শনিবার’, ‘রাম শ্যাম যদু’, ‘থানা থেকে আসছি’ ইত্যাদি। চক্রের সময়পর্ব ছিল ১৯৬০ থেকে ৬৩। তবে ‘চক্র’ বেশিদিন টেকেনি। ১৯৬৩ সালে তিনি টাউন প্ল্যানিং-এর জন্য ফরাসি স্কলারশিপ নিয়ে ন’মাসের জন্য ফ্রান্সে চলে যান। সেখানে থাকাকালীন তিনি বেশ কিছু নাটক লেখেন। যেমন ‘এবং ইন্দ্রজি’ৎ, ‘সারারাত্তির’, ‘বল্লভপুরের রূপকথা’ এবং ‘কবিকাহিনি’। এরপর দেশে ফিরে আসেন। দেশে ফিরে ‘বহুরূপী’ নাট্যদলের জন্য ‘প্রলাপ’ নাটক লেখেন।
বহুরূপী ‘বাকি ইতিহাস’ করেছিল। বহুরূপীর ‘বাকি ইতিহাস’ আর শৌভনিকের ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’ দেখেই তিনি প্রসেনিয়াম থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নেন। নিজের নাট্যদল তৈরির ভাবনা তাঁর মধ্যে কাজ করা শুরু করে। অবশেষে ১৯৬৭ সালে ‘শতাব্দী’ দলের জন্ম হয়। ১৯৬৮ থেকে ১৯৭০ এই দু’বছর ‘শতাব্দী’ প্রসেনিয়ামেই অভিনয় চালিয়ে যায়। ‘আবু হোসেন’ নাটকটি শতাব্দীর শেষ প্রসেনিয়াম নাটক। ১৯৭২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি আকাদেমি অফ ফাইন আর্টস-এ নাটকটি অভিনীত হয়। অঙ্গন মঞ্চের প্রথম পরীক্ষামূলক নাটক ‘সাগিনা মাহাতো’। ১৯৭২ সালের ২৪ অক্টোবর কলকাতার এবিটিএ হলে প্রথম অভিনীত নাটক।
বাদল সরকার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘১৯৭১ সালে যখন আমি সাগিনা মাহাতো লিখলাম তখনই উপলব্ধি করলাম আমার প্রসেনিয়াম থিয়েটার ছাড়ার সময় উপস্থিত। ২৪ অক্টোবর (১৯৭২) সাগিনা মাহাতো প্রথম মঞ্চের বাইরে অল বেঙ্গল টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন হলে দেখানো হল। নাটক চলাকালীন হঠাৎ আলো নিভে যায়। অন্ধকারের মধ্যেই চলল নাটক। পরে আলো ঠিক করা গেলেও নাটকে মঞ্চসজ্জার লাইট ব্যবহার করা যায়নি। এই অব্যস্থায় অগণিত দর্শক উপভোগ করলেন নাটক।
নবজাগরণের একটা ঢেউ উঠল বুঝলাম। মঞ্চসজ্জা ছাড়াও নাটক চলতে পারে। এরপর আবু হোসেন পরিপূর্ণ সাফল্যের সঙ্গে অভিনীত না হওয়ায় অর্থনৈতিক সমস্যাটা প্রকট হয়ে উঠল। তখন মঞ্চ থিয়েটারের রীতি ভেঙে আমরা থার্ড থিয়েটারের পথে এগোই। ১৯৭২ সাল থেকে আকাদেমি অফ ফাইন আর্টস-এর ঘরে অঙ্গন মঞ্চে আমাদের নাটক চলতে থাকে।‘ এরপর আকাদেমির তিলতলায় অভিনয় হয় ‘স্পার্টাকুস’ (১২ নভেম্বর, ১৯৭২)। এই নাটক দিয়েই শুরু হয় প্রতি রবিবার আকাদেমিতে অভিনয়। তারপর হয় ‘প্রস্তাব’ (৭ অক্টোবর, ১৯৭৩), ‘মুক্তমেলা’ (৪ নভেম্বর, ১৯৭৩), ‘বীজ’ (১৯৭৩) ‘স্বাধীন ভারত’ (১৯ জানুয়ারি, ১৯৭৪, কার্জন পার্ক)।
থিওজফিক্যাল সোসাইটির হল ঘরে প্রতি শুক্রবার করে অভিনয় হত। সালটা ১৯৭৬ হবে। সেই সময় ‘ভোমা’, ‘মিছিল’, ‘ত্রিংশ শতাব্দী’, ‘স্পার্টাকুস’, ‘প্রস্তাব’, ‘হট্টমালার ওপারে’, ‘ক্যাপ্টেন হুররা’, ‘বাসি খাবার’, ‘সিঁড়ির’ মতো নাটক অভিনীত হয়। বর্তমানে শতাব্দীতে পুরনো অনেকে সদস্যই নেই। কালের নিয়মে কেউ দল ছেড়েছে, কারও আবার জীবন নাট্যে যবনিকা পড়েছে। তবে সাতের দশক থেকে এখন পর্যন্ত থার্ড থিয়েটারের একনিষ্ঠ সৈনিক হিসেবে রয়ে গেছেন সবার কাছে পরিচিত তপুদি বা শান্তা দত্ত।
এছাড়া কৃষ্ণাদি (কৃষ্ণা ঘোষ) এবং পাতুদি (প্রীতি দত্ত)। সত্তরের ঘরে পৌঁছেও আজও তাঁরা তরুণ, সতেজ এবং উদ্দীপনায় ভরপুর। নতুন কিছু করার তাগিদ তাঁদের সারাক্ষণ তাড়া করে ফিরছে। এই খিদে শুধু নিজেদের মনে নয়, তরুণ প্রজন্মের মধ্যেও সুচারুভাবে সঞ্চারিত করে চলেছেন তাঁরা। তাই আজকের এই কেরিয়ার সর্বস্ব, স্পট লাইটের যুগেও কিছু তরুণ মুখ বাদল সরকারের তৃতীয় থিয়েটার ভালোবেসে করছে। তৃতীয় থিয়েটারের টানে আজীবন থেকে যাচ্ছে।
১৫ বছর হয়ে গেছে ‘বাদলদা’ নেই। অনেকেই ভাবছেন কালের গর্ভে থার্ড থিয়েটার হারিয়ে গেছে, থার্ড থিয়েটার আজ মৃত। ‘থার্ড থিয়েটার’ বা ‘তৃতীয় থিয়েটার’ একটি দর্শন। দর্শনের কখনও মৃত্যু হয় না। সময়ের সরণি বেয়ে সে ঠিক নিজের জায়গা করে নেয়। আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে এই দর্শনের প্রয়োজনীয়তা আরও বেশি করে অনুভব হয়। এই দর্শন মানুষকে ভালোবাসার দর্শন, একসঙ্গে হাত ধরে এগিয়ে নিয়ে চলার দর্শন। তা কী করে হারিয়ে যেতে পারে? আজকে থার্ড থিয়েটার শুধুমাত্র ‘শতাব্দী’, ‘পথসেনা’ বা ‘আয়না’-র মধ্যে আর সীমাবদ্ধ নেই।
এই থিয়েটারের ব্যাটন তুলে নিয়েছে আজকের তরুণ প্রজন্ম। যশ, খ্যাতি, প্রতিপত্তি কিচ্ছু নেই জেনেও শুধুমাত্র কিছু করার তাগিদ থেকে এই দর্শনের সঙ্গে নিজেদের জুড়ে নিচ্ছেন। ‘চেনা আধুলি’, ‘বিসর্গ’, ‘ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়’, ‘অন্যকণ্ঠ’, ‘সংশপ্তক’, ‘অ্যাক্ট’, ‘রূপ ও রং থিয়েট্রিকাল’, ‘দিলখুশ’, ‘স্বভাব’, ‘স্বতন্ত্র উদ্যোগ’, ‘শিল্পী সেনা’, ‘মিমিক’ এই থিয়েটারের মধ্যে নিজেদের পথ চলা খুঁজে নিয়েছে। প্রতিমাসে শেষ রবিবার টালা পার্কে ‘ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়’-র উদ্যোগে বিভিন্ন দল নিয়মিত তৃতীয় থিয়েটার করে।
এছাড়া প্রতি মাসের শেষ শনিবার দক্ষিণ ২৪ পরগনার লক্ষ্মীকান্তপুরের ‘অন্যকণ্ঠ’ গ্রামে গ্রামে ঘুরে করছে নাটক-গানের উপস্থাপনা। কলকাতার রিপন স্ট্রিটের প্রসেনিয়াম আর্ট সেন্টার এবং যাদবপুরের নিরঞ্জন সদনের অঙ্গন মঞ্চে নিয়মিত হচ্ছে এই নাটক। দর্শকরা সেখানে নিয়মিত নাটক দেখতে আসছেন। বহরমপুরের ‘ব্রীহি’ গত ১৫ বছর ধরে নাট্য পরিক্রমা এবং নাট্যকর্মশালার আয়োজন করে চলেছে।
‘বাদল সরকার নাট্যচর্চা কেন্দ্র’ পাঠচক্রের সঙ্গে সঙ্গে কর্মশালা, নাটক পরিবেশন এবং নাট্যোৎসবের আয়োজন করছে। ঝাড়গ্রামের ‘প্রয়াস’ গত ১৫ বছর ধরে করে চলেছে ‘তৃতীয় থিয়েটারের উৎসব’। এছাড়াও ‘ক্যানডিড থিয়েটার’, ‘কলকাতা রঙ্গশীর্ষ’, ‘রব-অরব’, ‘ইউথোপিয়া’, ‘ইস্ট কলকাতা কালচারাল অর্গানাইজেশন’, ‘খড়দহ থিয়েটার জোন’, ‘কোরাস’, ‘ডাকঘর’, ‘সমতট’, ‘গোত্রহীন’-এর মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে থার্ড থিয়েটার ভাবনা ও দর্শন। এই দর্শন থেমে যাওয়ার দর্শন নয়, এগিয়ে চলার দর্শন।