রাজপুত্রের দুঃখ

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

রাইপারমিতা আইচ

রোজ ঘুম থেকে উঠলেই তুতুলের ভারী কান্না পায়। চাদরের আদর ছাড়িয়ে বাবা কেমন মিলিটারিদের মত করে প্রথমে দাদাকে তুলবে ছ’টায়, তার ঠিক একঘণ্টা পরেই তুতুলকে। প্রথমবার বলবে ‘তুতুল ওঠ’। দ্বিতীয়বার গলার আওয়াজ আরেকটু চড়িয়ে বাবা বলবেন, ‘এই আমি ব্যাককাউন্ট করছি… থ্রি-টু-ওয়ান।’ ব্যাস, তার মানে উঠতেই হবে। ঘুমচোখেই বাবা ব্রাশটা ধরিয়ে দেবে। তুতুলের মা এসে একটু চুলগুলো নেড়েচেড়ে আদর করবে তারপরই ডাকবে খাবর টেবিলে ‘বাবান, বাবিন চটপট এস’। দাদার জন্য দুধ, তুতুলের জন্য কমপ্ল্যান, মা-বাবা ও ঠাম্মির জন্য চা এবং সকলের জন্য ব্রেকফাস্ট এনে বসবে মা। ব্যাস এটুকু সময় ভীষণ আনন্দ তুতুলের। পরিবারের সকলে একসঙ্গে বসে খাওয়ার মজাই আলাদা।

এরপর নীচের তলায় গেট খোলার শব্দ, মায়ের ডাক শোনা যাবে ‘আমি বেরোলাম’। তুতুল তখনো অনিচ্ছায় খায়। মায়ের ডাকটা কেমন নরম পালকের মতো তুতুলকে ভরিয়ে রাখে। আসলে মায়ের বেরনোর সঙ্গে তুতুলের দুঃখের একটা যোগসূত্র আছে।


একটু পরে বাবা বিরক্ত ভরে বলবেন, ‘চটপট চল’। দাদা জুতো পরে তুতুলকে পরাবে। টেবিলের ওপরের টিফিনবক্স দুটো আটকে, ওয়াটার বটল ব্যাগে ভরে স্কুলবাসে তুলে দেবে বাবা। ফিরে এসে নিজে অফিস বেরোবে।

এসব তুতুলের পছন্দ নয়, সপ্তাহে সাতদিন ঘড়ির এই বিচ্ছিরি টিকটিক আওয়াজ! মানেই এখন এই কর, তখন ওই কর। নড়চড় হলেই ঠামের বকা, দাদুর নালিশ। দাদা কেমন মানিয়ে নিয়েছে! তুতুল স্কুলবাসের জানালার কাঁচে নিজের মুখটা রাখে। গাছগুলো সরে যাচ্ছে স্পিডে। মেঘগুলো আজও ওর সঙ্গে ছুটছে। আকাশে বন্ধুদের পেয়ে ফিক করে হাসে সে। তারপরই উদাস হয়ে ভাবে দাদার মতো সে কেন পারছে না! গলার কাছের কষ্টের দলাটা পাক খেয়ে কেন যে শুধু ওপরে আসতে চায় তুতুল জানে না!

ক্যালেন্ডারের ওই কয়েকটা লাল কালির দিন শুধু ওর বড্ড আদরের, ওদিন মায়ের ছুটি থাকে। সকাল হলেই মা কেমন কপাল জুড়ে বড় মিষ্টি চুমুটা আঁকে, কতক্ষণ সে মার কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে থাকে। ওঠার তাড়া নেই, উঠেই পড়ার রব নেই। বদলে থাকে একথালা পেটফোলা লুচি, সাদা-আলুর তরকারি, মিষ্টি। তারপরই খেলতে যাওয়া। বাবার নতুন কেনা লাল গাড়িটায় আজকাল রাজারহাটে খোলা হাওয়ায় বাবা শরীরচর্চা করতে নিয়ে যায় তুতুল ও তার বন্ধুদের। চলে ক্রিকেট, ঘুড়ি ওড়ানো কত্ত কী!

মাঠে বড্ড মজা, মাথাটা মনে হয় দূর আকাশ ছুঁয়ে যায়। প্লেনগুলো একলাফে যেন ছুঁয়ে ফেলে ওরা। তুলতুলে মেঘগুলো সূর্যের আলো মেখে মাঠের ঘাস-ফুলের সঙ্গে কেমন লুকোচুরি খেলে। কতরঙের ফড়িং এখানে। তুতুল কয়েকবার ওদের ল্যাজে সুতো বেঁধে উড়িয়েছে। আদুল গায়ে ওর বয়েসের কয়েকটা ছেলে দূরে দাঁড়িয়ে ওদের এসব ফ্যালফ্যাল করে দেখে! ওদের জন্য মন কেমন করে তুতুলের। একটা ছেলে এসে একদিন বড্ড চোখ রাঙিয়েছিল, ‘এই ফড়িংগুলোকে তুমি রোজ সুতোয় বাঁধো কেন? ছেড়ে দাও। ওর ব্যথা লাগছে।’ বলেই চলে গিয়েছিল ছুটে। দূরের সবুজে মিশে গিয়েছিল ছেলেটা।

তুতুল বাবাকে বলে ওর নতুন জামা থেকে কয়েকটা ওদেরকে এনে দিয়েছে। এখন ওরাও বন্ধু, একসঙ্গে খেলতে আসে মাঠে।

পুজো প্রায় এসে গিয়েছে। আর তিন সপ্তাহ, মা বলছিল। তিন সপ্তাহ মানে টুয়েন্টি ওয়ান ডেজ, টুইঙ্কল মিস শিখিয়েছেন স্কুলে। এবারও বাবা-মাকে প্রমিস করিয়েছে তুতুল ওই মাঠের সব বন্ধুদের জন্য আরো কয়েকটা জামা কিনবে পুজোয়।

‘কমপ্লেক্সে প্যান্ডেলের বাঁশ বাঁধা চলছে, আজ স্কুল ফেরত দেখেছি জানো মা।’ তুতুল হাসছে, মাকে গল্প বলছে, চারজনে টিভি দেখছে একসঙ্গে। মা-বাবা অফিস থেকে ফিরে মুড়িমাখা, চা খাচ্ছে। ঠাম বলে দাদাও নাকি বড়, তাই এমন মশলামুড়ি দাদাও খাচ্ছে। আমি হরলিক্স। বাবা রাগী গলায় অর্ডার ছুঁড়লেন— ‘অনেক দেরি হলো, চটপট রেডি হও, পড়াবো।’ দাদা উঠে গেল। একদম ভালো লাগে না এসব। তুতুল মাথাটা হেঁট করে চোখের জল আটকে কোনোমতে উঠে যায়।

দু-পা গিয়ে থামে, ফিসফিসে গলায় কথার আওয়াজ ভেসে আসছে! ‘কী বলছে মা! সে কি একটু দাঁড়াবে! বড়দের কথা শুনছি দেখলে আমাকে তো সকলেই বকবে।’ নিজের মনে তুতুলের ঠিক-বেঠিকের যুদ্ধ চলে।

হ্যাঁ সে ঠিক শুনেছে, মা বলছে, পুজোয় প্রায় সব ক’দিনই তার স্পেশাল ডিউটি। মা পুলিশ যে। বাবা, ঠাম সবাই গভীর আলোচনা করে মাকে কী যেন বলছে। কিন্তু তুতুল! তার কথা একবারও মনে পড়ল না মায়ের! সে পর্দার আড়াল থেকে বেরিয়ে কান্না জুড়ল। বেঁধে রাখা চোখের জল ক্ষোভ মেশানো স্বরে ঝরছে গলা দিয়ে। চোখ দিয়ে নামছে অভিযোগ, অভিমান।

‘না মা, আমি এ অন্যায় মানবো না। তুমি আমাকে ঠকিয়েছ। স্কুলে বন্ধুদের মায়েরাও চাকরি করে, অমন বিচ্ছিরিভাবে লাল দাগ দেওয়া পুজোর দিনগুলোয় কেউ অফিস যায় না। আমাকে একা করে যাও তুমি! বোঝ না আমার দুঃখ! পুজোতে সবাই যখন নতুন জামা পরে মা-বাবার হাত ধরে ঠাকুর দেখবে, আমি!’
‘তোমার অফিসের স্যারেরা
এত নিষ্ঠুর কেন মা?

আমি প্রেসিডেন্টকে চিঠি লিখবো পুজোয় তোমার ডিউটি করা চলবে না। রাগে লাল হয়ে ক্রমাগত ফোঁপাচ্ছে সে। সবার সঙ্গে আড়ি।’

এরপর তুতুল সোজা বুকসেল্ফ থেকে লাল কালির মার্কারটা এনে ক্যালেন্ডারে বড় করে সব ঘর ক্রস করছে। গায়ের জোরে ভরছে লাল দিয়ে। ‘দেখো মা, তোমার সবদিন ছুটি। সব লাল করেছি আমি। তুমি আর কোনোদিন অফিস যাবে না।’ নোনাজলে ভেসে যাচ্ছে চোখ। ছোট্ট শরীরটা ভিজে গেছে ঘামে। ঘটনার আকস্মিকতায় সক্কলে বিস্মিত! ঘরে পিনপতন নীরবতা। শুধু কড়িকাঠ থেকে একটা টিকটিকি ডেকে উঠল ‘টিক্ টিক্’।