বেলা যে পড়ে এল

অসীমকুমার মুখোপাধ্যায়

পারমিতা
‘‘অরিন্দম, তুমি কি জেগে আছো? তুমি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছো? কীকরে পাবে? আমি তো অনেক দূরে। জানো, আমার ঘরের সামনে একটা খুব বড়ো তেঁতুলগাছ আছে। বিকেলে, সকালে কতো পাখি যে এই গাছের ডালে বসে দোল খায়, গান গায়, তুমি কল্পনাও করতে পারবে না। আগে কচি তেঁতুলপাতা চিবিয়ে খেতাম, কীরকম টকটক লাগত, এখন লজ্জা লাগে, ঠাকুমা হয়ে গেছি, আর কি ওসব ছেলেমানুষি মানায়? অথচ মন তো সেই কুসুমকোমল হয়েই আছে। জানি না, আমার এইসব না বলা কথা তোমার কাছে কোনোদিন পৌঁছবে কিনা, তবু আমি বলে যাব। আর কেউ শুনুক না শুনুক, বাতাস তো আমার কথা শুনতে পাচ্ছে। শুনেছি, ফিজিক্সের প্রবোধস্যার থার্ড ইয়ারের সাউন্ড-ক্লাসে বলতেন, ‘এই পৃথিবীতে যে যতো কথা বলেছে, সব নাকি আমাদের বাতাসের স্টোররুমে জমা আছে, এমন একদিন আসবে, যখন কোনো বৈজ্ঞানিক সেইসব হারিয়ে যাওয়া কথা যন্ত্রের সাহায্যে শ্রুতিগোচর করে দেবেন, যে যার মতো কথা খুঁজে নেবে, নিজেদের কাছে সঞ্চয় করে রেখে দেবে’। তখন তুমি নিশ্চয়ই আমার সব কথা শুনতে পাবে। কিন্তু সেদিন কবে আসবে অরু?’’
পারমিতা চুপ করে তাকিয়ে আছে বাইরের জানালার কাছে চেয়ারে ঠেসান দিয়ে। তার এখন আশ্রয় হলো দোতলার জানালা। ‘ওই জানালার কাছে বসে আছে, করতলে রাখি মাথা / তার কোলে ফুল পড়ে রয়েছে, সে যে ভুলে গেছে মালা গাঁথা।’

এবার মুখে কিছু বলল না পারমিতা। মনে মনে বলতে লাগল, ‘তুমি ছিলে আমার চোখের মণি। ক্লাসের ফার্স্ট বয়। তুমি যখন ক্লাস টেনে, আমি ক্লাস এইটে। কো-এডুকেশন স্কুল। ছেলেমেয়ের ভেদ ছিল না, কতো সহজে, স্বচ্ছন্দে আমরা কথা বলতাম, গল্প করতাম। তুমি কখনও মুখ ফুটে কিছু বলোনি আমাকে, তবু আমি বুঝতে পারতাম তোমার চোখে মুগ্ধতার রেশ।
আমি ভালোবাসতে শিখে গিয়েছিলাম, তুমি তখনও নবিশ, ভালোবাসার মানেই বুঝতে না, দিনরাত শুধু পড়া আর খেলা।’
‘একদিন টিফিন পিরিয়ডে আমার শরীর খারাপ হয়ে গিয়েছিল। মেয়েদের যেটা হয়। সেটা ছিল প্রথমবার। আমি কিছুই বুঝতে পারিনি। ক্লাস টেনের সুমিতাদি বলেছিল, ‘ওয়াশরুমে গিয়ে এই প্যাডটা বেঁধে নে, আমি সঙ্গে করেই রাখি সবার জন্যে, পরে বাড়ি চলে যাবি, অরুকে আমি বলে দিচ্ছি। ও তোকে পৌঁছে দিয়ে আসবে। ‘আমি তাই করেছিলাম।’
‘ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে দেখি, সুমিতাদি দাঁড়িয়ে, পাশে তুমি, তোমার পক্ষীরাজ সাইকেল। আমি রডে বসেছিলাম।’
‘কী ভদ্রই না ছিলে তুমি। অন্য কতো কথা বলতে বলতে গিয়েছিলে, স্কুল থেকে আমাদের বাড়ি পর্যন্ত, প্রায় এক কিলোমিটার রাস্তা, কিন্তু ওই নিষিদ্ধ ব্যাপারটার কথা তোলোনি। তোমার নিঃশ্বাস আমার চুলে পড়ছিল, ভালো লাগছিল।’
আমাদের ঘরের সামনে আমাকে নামিয়ে তুমি চলে গিয়েছিলে। বলেছিলে, ‘কাল স্কুলে আসবি, তখন কথা হবে।’
তুমি তো সব কথাই কেড়ে নিয়েছিলে আমার। আমার কানে কোনো কথাই ঢুকছিল না। মা যখন জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘কী রে, পারু, স্কুল থেকে চলে এলি? কে তোকে পৌঁছে দিয়ে গেল? কী হয়েছে তোর?’
আমি কেঁদে ফেলেছিলাম। কোনোরকমে বলেছিলাম, ‘মা, স্কুলেই আমার শরীর খারাপ হয়েছিল। সুমিতাদি ব্যবস্থা করে, অরুদাকে দিয়ে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করল। আমি অরুদাকে ভিতরে আসতে বললাম, এল না।’
‘কতোদিনের পুরোনো কথা, যেন বাঁশির সুর হয়ে বাজছে। তুমি কোথায়, কে জানে? তুমি কি আমার ঠিকানা জানো?’
আমি এখন পঞ্চাশবর্ষীয়া। ছেলেমেয়েরা পরবাসী। একা এই সুন্দরনগর ফ্ল্যাটে থাকি। তুমি কোথায় আছো অরিন্দম?’
‘জানো, আমি এখন রাতে ঘুমোতে পারি না একটানা। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায়। আমার স্বামী ছিল খুব ভালো মানুষ, আমাকে খুব যত্ন করে রাখত। একবার আমার শরীর খারাপ হয়েছিল, তখন আমাকে চান করিয়ে, চুল আঁচড়িয়ে, কাপড় পরিয়ে ডাইনিং-এ বসিয়ে খাইয়ে দিত। চামচ দিয়ে নয়, হাত দিয়ে। আমি ভালো হয়ে উঠলাম। ও কেমন ড্যাং-ড্যাং করে চলে গেল।’
‘এখনও ওকে মাঝে মাঝে স্বপ্নে দেখি। স্বামীই হলো মেয়েমানুষের সবকিছু। ইহকাল, পরকাল। তবে এখন এই অপরাহ্ণ বেলায় তোমার কথা মনে আসছে কেন জানি না। পুরোনো দিনের কথা যেন ফিক্সড ডিপোজিটের মতো থেকে যায়।’
‘তুমি কি একবার আসবে অরিন্দম? এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়ার আগে একবার তোমার মুখটি দেখতে চাই।’


অরিন্দম
অনেকদিন তোমাকে দেখিনি। তোমার কথা মনেও ছিল না। সেদিন সুমিতার সঙ্গে দেখা হোল, আমাদের স্কুলের পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে। সুমিতাই বলল, ‘তোর পারমিতাকে মনে আছে? আমার সঙ্গে সেদিন আসানসোল বাজারে দেখা, পুজোর ক’দিন আগে। মেয়েকে নিয়ে এসেছিল বিয়ের বাজার করতে, ওর মেয়েটি খুব কৃতী, এ বছর টিসিএস-এ চাকরি পেয়েছে।’
আমি বলেছিলাম, ‘খুব মনে আছে। একদিন তোর কথায় ওকে সাইকেলে স্কুল থেকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছিলাম। ও খুব লাইক করত আমাকে। আমার আর যোগাযোগ করা হয়নি। ওর বাবার ছিল বদলির চাকরি, দিল্লিতে ট্রান্সফার হয়ে গেল।’

সুমিতা বলেছিল, ‘এখন ও নিমচায় থাকে, ওর হাজব্যান্ড মারা গেছে। ছেলে রাজস্থানে, মেয়ে উত্তরপ্রদেশে। এখন ও একা। একদিন যাবি ওর সঙ্গে দেখা করতে? আমার কাছে ওর ফোন নাম্বার আছে, সেদিনই দিয়েছিল, খুব মিনতি করে বলেছিল, ‘তুমি একদিন আসবে সুমিতাদি?’ জানিস, ওর চোখেমুখে খুব নিঃসঙ্গতা, তোরও তো স্ত্রী মারা গেছে, তুইও একা, দেখবি, এ সময় দু’জনে দু’জনের বন্ধু হতে পারবি। আমিও তোর সঙ্গে তোর গাড়িতে যাবো। আমার হাজব্যান্ড তো পঙ্গু, সবসময় ওকে চোখে চোখে রাখতে হয়। এই তো কাঁটাগড়ে থাকি, আমার কাছে একদিন আসিস, আমিই তোকে নিয়ে যাবো।’

‘আজ আমি তোমার কাছে যাচ্ছি। তোমাকে ফোন করেছিলাম। তুমি উচ্ছ্বসিত হয়েছ। প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছর পর দেখা হবে আমাদের। সুমিতাও আছে আমার সঙ্গে, ও উদ্যোগ না নিলে কোনোদিনই আমাদের দেখা হোত না। সুমিতার জীবন খুব দুঃখর, ওদের কোনো ইস্যু নেই, স্বামী কোলিয়ারির জিএম ছিলেন, এখন পঙ্গু। সুমিতাকে সবকিছু করে দিতে হয়। বড় কষ্ট হয় সুমিতাকে দেখলে। কার কপালে যে কী লেখা থাকে, কেউ বলতে পারে না। আমি অধ্যাপনা থেকে দু’বছর অবসর নিয়েছি। আগে নিজেই ড্রাইভ করতাম, এখন ড্রাইভার রেখেছি। আমরা রানিসায়র মোড়ে ঢুকছি, এবার তোমার কাছে পৌঁছে যাবো।’
বেলা এগারোটা। নিমচা হাটতলার মোড়ে পারমিতার বাড়ি। বিশাল গেটটি খুলে দিল একটি লোক, বলল, ‘আসুন।’
লোকটি বলল, ‘গিন্নিমা আপনাদের জন্যে অপেক্ষা করছেন। মায়ের তো পায়ে ব্যথা, তাই আসতে পারলেন না।’
মনে মনে ভাবলাম, বার্ধক্য তো আসবেই। তাকে এড়ানো খুব মুশকিল। আমি যোগব্যায়াম করি, একেবারে

স্বল্পাহারী, তবুও আমার
বাঁ-হাঁটুতে ব্যথা। আমল দিই না। অঞ্জনা যখন বেঁচে ছিল, তখন তেল গরম করে মালিশ করে দিত, খুব আরাম লাগত, এখন আর সেবা করার কেউ নেই। একটা ছেলে, সে রসায়নে মাস্টার্স, পিএইচডি করে বেলুড়ের রামকৃষ্ণ মঠে সন্ন্যাস নিয়েছে। সুমিতাকে সেদিন বলেছি। পাড়ার প্রতিবেশীরা জানে। মনে মনে ভাবি, কারুর ছেলে দেশরক্ষার কাজে সীমান্তে সৈনিক হয়, কেউ বা ঘর ছেড়ে সমাজ সংস্কারে পরবাসী। জীবনের কী বিচিত্র গতি! ভাবি, যে যাতে আনন্দ পায়, তাই নিয়ে থাকুক।
পারমিতাকে দেখে চিনতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল, অন্য কেউ। বললাম, ‘বোস্। তুই কি এখন ক্র্যাচ নিয়ে হাঁটিস?’
বড় দুঃখী মুখ পারমিতার, বলল, ‘কী করবো? হাঁটুতে ব্যথা। অপারেশন করিয়েছিলাম। কমেনি। এখন গা-সওয়া হয়ে গেছে।’
মনে মনে ভাবলাম, মানুষের মন বড় বিচিত্র। সবই সে সইয়ে নিতে পারে। সুখ, দুঃখ, ভালোবাসা, অপমান সবকিছু। কিছুদিন আগে এখানকার একটা পাতি কমরেড আমাকে অপমান করেছিল। ইলেকট্রিক মিটার কারচুপির দায়ে জেল খেটে এসেছে।
সুমিতা বলল, ‘আয়, আমার সঙ্গে সোফায় আরাম করে বোস্। আমি তোর গায়ে, মাথায় ভালো করে হাত বুলিয়ে দিই?’
বসল পারমিতা। দেখলাম, সুমিতা খুব আদর করে পারমিতার চুলে, কপালে বিলি কেটে দিচ্ছে। বললাম, ‘বাঃ। সুমিতা, তুই দেখছি, পার্লার খুললে অনেক খদ্দের জুটে যাবে। তবে নিশ্চয়ই পুরুষ খদ্দের নিবি না?’
সুমিতা বলল, ‘তোর দোষ নেই। বয়স হলেই পুরুষ, রমণীর মুখের আগল থাকে না, ভাল্‌গার হয়ে যায়। তুইও হয়েছিস।’
কাজের মেয়েটি লুচি, আলুর দম, মিষ্টি এনে সেন্টার টেবলে রাখল। পারমিতা বলল, ‘এ হোল বন্দনা, আর ওর স্বামী, যে তোমাদের রাস্তা দেখিয়ে নিয়ে এল, সে হলো সনৎ, বহুদিন হলো ওরা আমাদের কাছে আছে। ওদের ছেলে কলেজে পড়ে।’
বললাম, ‘আজকাল আমি তো এসব খাই না। শুধু ফল আর ছানা খেয়ে থাকি, তবে আজ সব খেয়ে নেবো। তোর অনারে।’
সুমিতাও কোনো ওজর করল না। আমার মনে হচ্ছিল, এইসব মুহূর্তগুলো জীবনের অমূল্য সম্পদ। আমাদের বয়স হচ্ছে। এবার বেলা পড়ে আসছে। নদী ডাক দিচ্ছে। পাখিরা কোলাহল করতে শুরু করেছে। আমি এখন ওদের ভাষা বুঝতে পারি।
পারমিতা বলল, ‘বন্দনা, গাড়িতে যে ড্রাইভার বসে আছে, তাকে ভিতরে ডেকে নিয়ে আয়। জলখাবার দে তাকে।’
সনৎ ট্রেতে কফি নিয়ে এল। এখন হেমন্তকাল, অঘ্রাণের ষোলো তারিখ। বেশ হিমেল রেশ আছে বাতাসে।
অনেক কথা। পুরোনো দিনের। নতুন দিনের। সুখ ও দুঃখের। ভালোবাসার। বললাম, ‘এবার আসি? পরে আবার আসবো।’

পারমিতা ও অরিন্দম
অরিন্দম : আজ না বলেই তোর বাড়িতে চলে এলাম। তোকে খুব চমক দিতে ইচ্ছা করছিল।
পারমিতা : বেশ করেছো। উঠোনে দাঁড়িয়ে কেন, উঠে এসে বারান্দায় সোফায় বসো। এক্ষুণি বন্দনা চলে আসবে।
অরিন্দম শ্লথগতিতে উঠে এল বারান্দায়। সোফায় বসল। সকাল ছ’টা। আজ সে স্কুটি চালিয়ে চলে এসেছে।
পারমিতা চেয়ে আছে। অরিন্দমও। এমন মৌন চেয়ে থাকার সময় দু’জনে দু’জনের মুখই দেখে না, অন্য কিছু দেখে।
অরিন্দম বলল, ‘কী দেখছিস অমন করে?’
‘দেখছি তুমি এখনও কতো সুন্দর। বাষট্টি বছর বয়সেও তোমার রূপ ফেটে পড়ছে।’
হোঃ হোঃ করে হেসে উঠল অরিন্দম। বলল, ‘তুইও তো খুব সুন্দর। সুচিত্রা সেনের মতো।’
‘ঠাট্টা করছো? উনি তো শুধু রূপে নয়, অভিব্যক্তিতে ছিলেন সুন্দর। তাই ওঁর প্রতি শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে।’
‘সেটা তুই ঠিকই বলেছিস। বাইরের রূপে কেউ সুন্দর হয় না, ভিতরের স্ফূরণ চাই। সুন্দর কি নিজেকে চেনে?’
ক্রাচ নিয়ে উঠতে যাচ্ছিল পারমিতা। অরিন্দম বলল, ‘কী হলো, এতো ছটফট করছিস কেন?’
‘তেমন কিছু নয়, দেখতে যাচ্ছিলাম, বন্দনা এখনও এল না কেন?’
‘বন্দনা এসে কী করবে?’
‘তোমাকে একটু কফি করে দিত। তুমি এই ঠান্ডাতে স্কুটি চালিয়ে এসেছো। শীত করছে না তোমার?’
‘না— রে, মনে হচ্ছে আমরা দু’জন কোনো কল্পলোকে বসে অপেক্ষা করছি। একটু পরেই আমাদের কেউ নিতে আসবে।’
হিঃ হিঃ করে হেসে উঠল পারমিতা। বলল, ‘তুমি তো কবি, গল্পলেখক, এসব উদ্ভট ভাবনা তোমার মাথাতেই আসে।’
অরিন্দম বলল, ‘এমন করে বলছিস, যেন আমার কবিতা তুই কতো পড়েছিস। একটা কবিতার চারটে লাইন বল্‌ তো?’
পারমিতা শুরু করল অনবদ্য কণ্ঠে, ‘তুমি যা দিয়েছ হাতে, অশ্রুপাতে, নীরক্ত নির্যাসে/ ঘুঁটিখেলা, সারাবেলা, খেজুরপাতার পরিধান/ অমিতলাবণ্যে ভরা বিশ্বলোকে গর্তে মুখ রেখে/ হরিণের পায়ে পায়ে করে যাচ্ছি সুখের সন্ধান।’
চোখে জল এসে গেল অরিন্দমের। যদি সুমিতা না বলত, তাহলে কোনোদিনই সে এই প্রিয় মানবীর সন্ধান পেত না।
পারমিতা বলল, ‘তোমার কবিতা শুনে তুমি কাঁদছো কেন? কী হলো তোমার? বৌদির কথা মনে পড়ে গেল নাকি?’
চোখ না মুছে অরিন্দম বলল, ‘কাঁদিনি তো? এটা আনন্দাশ্রু। তোকে দেখে, তোর সান্নিধ্য পেয়ে মনে হচ্ছে, বেঁচে আছি।’
পারমিতা গাঢ় উচ্চারণে বলল, ‘আমারও সেই একই ভাবনা মনের মধ্যে আন্দোলিত হচ্ছে। দিল্লি যাওয়ার পর ওখানে গ্র্যাজুয়েশন করে আঁকার ক্লাসে ভর্তি হয়েছিলাম। ডিপ্লোমা করেছিলাম। সুকমল বেঁচে থাকতে সংসারই করেছি। এখন মাঝে মাঝে রং তুলি নিয়ে বসি, তুমি যদি চাও, আমি তোমাকে আমার আঁকা দু’একটা ছবি দেখাতে পারি। দেখবে?’
বন্দনা ধূমায়িত কফি নিয়ে হাজির হলো। বলল, ‘আগে কফিটা খেয়ে নিন। পরে উঠবেন।’
বন্দনার দিকে চাইল অরিন্দম। চান করে এসেছে সে। অরিন্দম বলল, ‘বন্দনা, এতো সকালে তুমি চান করেছো?’
বন্দনা হেসে বলল, ‘মা-ও তো ভোরে চান করে, পুজো করে চা খায়। আমিও গিজারের জলে চান করি।’
পারমিতা বলল, ‘বন্দনা, তুই জলখাবার করে বাজার যাবি। পমফ্রেট মাছ, খাসির মাংস নিয়ে আসবি, অরুদা এখানে খাবে।’
অরিন্দম বলল, ‘কেন এমন করে লোভ ধরাচ্ছিস পারু? আমি যে তোর আদর, ভালোবাসার মান রাখতে পারবো না।’
পারমিতা হেসে বলল, ‘এই বয়সে আবার মান-অপমান। বেলা পড়ে এসেছে, সে খেয়াল আছে? অপূর্ণ সাধ পূরণ করে নিই।’
দুপুরে খাওয়ার পর অরিন্দমকে নিজের বেডরুমে নিয়ে এল পারমিতা। বলল, ‘আজ তিন বছর আমি একা। ছেলে, মেয়ে সব দূরের যাত্রী। টাকাকড়ির অভাব নেই তোমার মতো, আবার তোমার মতোই আমিও নিঃসঙ্গ। তুমি আমার সঙ্গী হবে অরুদা?’
কথা পাল্টে ফেলার জন্য অরিন্দম বলল, ‘তোর ছবি দেখাবি না?’
‘আগে আমাকে দ্যাখো, পরে ছবি দেখবে।’
পর্দা টেনে দিল পারমিতা। দেয়ালে ছবিতে একটি মুখ। খুব চেনামুখ অরিন্দমের। বলল, ‘এ কে?’
‘তুমি। এতোদিন অন্যের ছিলাম। এবার তুমি আমাকে নাও। হাতটা ধরো।’
নীরবে হাত বাড়াল অরিন্দম।