ইতিহাসের জীবন্ত দলিল শিবসাধন দে-র ‘স্বাধীনতা সংগ্রামে হাওড়া’

বাংলার দুই প্রাচীন জনপদ কলকাতা ও হাওড়া। সুপ্রাচীন কাল থেকেই প্রসিদ্ধ ছিল এই দুই জনপদ। সম্পদের আকর্ষণে যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন জাতি যেমন ভারতে এসেছে, ঠিক তেমনি ভাবে বাংলার এই দুই জনপদে ব্যবসা-বাণিজ্যের টানে তারা ঘাঁটি গেড়েছে। শক, হুন, পাঠান, মোগল এদেশে এলেও তাঁরা এদেশকে আপন করে নিয়েছে। ভারতের সংস্কৃতির সঙ্গে মেলবন্ধন ঘটিয়েছে নিজেদের সংস্কৃতির। প্রথমে এদেশে এসেছিল পর্তুগিজ। তারপর তাঁদের হাত ধরে ভারতে প্রবেশ করে ফরাসি এবং ইংরেজ।

১৭৬৫ খ্রিষ্টাব্দে দেওয়ানী লাভের অনেক আগেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দিল্লির সম্রাট ফররুখশিয়ারের কাছ থেকে হুগলি নদীর পশ্চিম তীরের ৫টি গ্রাম-সালিকা (সালকিয়া) হারিরাহ, কাসুন্দিয়া, রামকৃষ্ণপুর এবং বাত্তার (বেতর) চাওয়ার মাধ্যমে হাওড়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে বসতি স্থাপন ও বাণিজ্যিক নিয়ন্ত্রণ নেয়। হাওড়া অঞ্চলটি হুগলি নদীর তীরে অবস্থিত হওয়ায় এটি ব্রিটিশ পণ্য পরিবহন এবং কলকাতা বন্দর সংলগ্ন এলাকার বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

১৯০৫ সাল। কেটে গেছে প্রায় দেড়শো বছর। সারা দেশজুড়ে ব্রিটিশ বিরোধিতা তুঙ্গে। স্বাধীনতা পেতে মরিয়া ভারতবাসী। আর বাংলা থেকে গর্জে উঠছেন বিপ্লবীরা। দেশকে স্বাধীন করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ তাঁরা। অন্যদিকে বাংলাকে ভাগ করে স্বাধীনতার কোমর ভাঙতে চাইছে ব্রিটিশ। ব্রিটিশের এই চক্রান্ত ধরে ফেলেছিলেন বিপ্লবীরা। বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় বাঙালিরা। আর এখান থেকেই শুরু হচ্ছে  হাওড়ার বিশিষ্ট লেখক তথা গবেষক শিবসাধন দে-র নতুন গবেষণার্ধী বই ‘স্বাধীনতা সংগ্রামে হাওড়া’। ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর। রাজপথ সেদিন প্রতিবাদের জনসমুদ্রে ভরে গিয়েছিল।


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিবাদ জানিয়ে একে-অপরের হাতে রাখি পরিয়ে দিচ্ছেন। বাড়িতে বাড়িতে পালিত হচ্ছে অরন্ধন। সারা বাংলাদেশজুড়ে আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে আর তার প্রথম শহিদ হন সম্ভবত হাওড়ার ১২ বছরের নাবালক দ্বারিকানাথ ঘোষ। শিবপুর বিশপ কলেজের অন্তর্গত সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের অধ্যাপক দ্বিজদাস দত্তর পুত্র উল্লাসকরের পিতার ল্যাবরেটরির মধ্যে বোমা-বানানো হয়। উল্লাস কর এবং হেমচন্দ্র কানুনগোর তৈরি বোমা দিয়ে  ক্ষুদিরাম বসু এবং প্রফুল্লচাকিকে পাঠানো হয়েছিল বিচারক কিংসফোর্ড সাহেবকে হত্যা করতে।

আমতার রসপুরের হাবুমিত্র রডার অস্ত্রলুণ্ঠনে জড়িত থাকা কিংবা বালেশ্বরের বুড়িবালামের তীরে বাঘা যতীনের ইংরেজ পুলিশের সঙ্গে মুখোমুখি লড়াইয়ের পূর্বে হাওড়ার বাগনানে তাঁর অবস্থান কিংবা চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের নেতা মাস্টারদা সূর্য সেনের হাওড়ার বুকে আত্মগোপন করে থাকা লেখকের বইতে ধরা পড়েছে। ১৯২১ সালে আইসিএস-এর চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে ভারতের বোম্বাই বন্দরে পৌঁছলেন সুভাষচন্দ্র বসু। দেশে ফিরেই গান্ধীজির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তিনটি প্রশ্ন রেখেছিলেন তিনি।

দু’জনের সাক্ষাতের সেই বর্ণনা রয়েছে লেখকের বইতে। গান্ধীজি ১৯২০ সালে নাগপুরের কংগ্রেস সম্মেলনের পর থেকে অবিরাম প্রচার করে আসছিলেন যে ১৯২১ সালের মধ্যেই ভারত স্বরাজ লাভ করবে। কীভাবে স্বরাজ লাভ সম্ভব সে বিষয়েই তিনটি প্রশ্ন করেছিলেন নেতাজি। কংগ্রেস দল প্রতিষ্ঠিত হলেও ১৯২১ সালেও তৃণমূল স্তরে কংগ্রেসের সে রকম সংগঠন গড়ে ওঠেনি। কংগ্রেসের কিছু পরিচিত নেতার মুখ ও গুটিকয়েক নেতার মধ্যেই তা সীমাবদ্ধ ছিল। কংগ্রেসকে হাওড়া জেলায় তৃণমূল স্তরে পৌঁছতে হরেন্দ্রনাথ ঘোষের যে অবদান ছিল ‘হাওড়ার স্বাধীনতা সংগ্রাম’ বইতে তা বিস্তারিত ভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।

শূন্য থেকে শুরু করে কংগ্রেসকে হাওড়া জেলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পৌঁছে দিয়েছিলেন হরেন্দ্রনাথ ঘোষ। কৃষক আন্দোলন এবং শ্রমিক আন্দোলনে হাওড়ার ভূমিকার কথাও ফুটে উঠেছে লেখকের এই নতুন বইতে।  প্রথম সংগঠিত কৃষক আন্দোলন হাওড়াতেই হয় এবং কংগ্রেস নেতা হরেন্দ্রনাথ ঘোষের নেতৃত্বে সেই আন্দোলন হয়েছিল। পরে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ফরওয়ার্ড ব্লক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন এবং দ্বিখণ্ডিত ভারবর্ষের স্বাধীনতা অস্বীকার করেছিলেন হরেন্দ্রনাথ ঘোষ।

১৯৪৭ সালে ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা প্রাপ্তির দিনে ফরওয়ার্ড ব্লক দল হরেন্দ্রনাথ ঘোষ, দ্বিজেন্দ্রনাথ বসুর নেতৃত্বে কলকাতার বুকে এবং হাওড়া তথা বাংলার সর্বত্র প্রতিবাদ শোভাযাত্রা সংগঠিত করেন। রামগড়ে সুভাষচন্দ্রের আপোষ বিরোধী সম্মেলনে হাওড়ার ভূমিকাও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুভাষচন্দ্র বসুর ডাকা শেষ আন্দোলন হলওয়েল মনুমেন্টে হাওড়া জেলার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বইয়ের একদম শেষে রয়েছে বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামীদের জীবনী।

৪৯ তম আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে হাওড়ার বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক শিবসাধন দে-র নতুন বই ‘স্বাধীনতা সংগ্রামে হাওড়া’।  স্বাধীনতা সংগ্রামে হাওড়া জেলার না জানা অনেক ছোট-বড় কাহিনি ধরা পড়েছে লেখকের কলমে। লেখকের গবেষণা এবং নিরলস প্রচেষ্টা ফুটে উঠেছে বইয়ের প্রতিটি অধ্যায়ে। স্বাধীনতার সংগ্রামের অনেক ইতিহাস যা আজও অপঠিত তা পাঠককে পড়ার সুযোগ করে দিয়েছেন গবেষক তথা লেখক। স্বাধীনতা আন্দোলনের পাশাপাশি কংগ্রেসের সংগঠন, নেতাজি এবং কংগ্রেসের সম্পর্ক বুঝতে সাহায্য করে এই বই। ১৯০৫ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত সময়কাল বইয়ে ধরা পড়েছে।

ফলে এই বই বর্তমান সময়ের রাজনীতিকে বুঝতেও সাহায্য করে। যা এই সময়ে দাঁড়িয়ে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান সময়ের রাজনীতি কোন খাতে গড়াচ্ছে বা কৃষক ও শ্রমিক আন্দোলেনর রূপ সেই সময়ের গর্ভে লুকিয়ে ছিল। যা লেখক খুব সুন্দর ভাবে বর্ণনা করেছেন। এক কথায় বলা যায় অতীত আর বর্তমানের মধ্যে যোগসূত্র ঘটিয়েছে ‘স্বাধীনতা সংগ্রামে হাওড়া’। এশিয়ান পাবলিকেশন থেকে এই বই প্রকাশিত হয়েছে এবং কলকাতা বই মেলার ১৮৩ নম্বর স্টলে বইটি পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া গবেষকের লেখা অন্যান্য বইগুলি হল ‘বিপ্লবী হরেন্দ্রনাথ ঘোষ ও সমকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট’, ‘ছাত্রবেলায় সুভাষচন্দ্র’।

সম্পাদিত বইগুলি হল ‘সুভাষবাদ’ এবং ‘ব্যাঘ্রকেতন ঐ ওড়ে’।  সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর লেখক বই লেখায় মনোনিবেশ করেন এবং সুভাষবাদ সম্পাদনার মাধ্যমে বইয়ের জগতে প্রবেশ ঘটে। এছাড়া অবসর জীবনে ‘অন্য পৃথিবী’ পাক্ষিক পত্রিকায় বকলমে সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। দুই তরুণ গবেষক সৈকত নিয়োগী ও সৌম্যব্রত দাশগুপ্তর দাবিতে এবং নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলা তথা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস পৌঁছে দেওয়ার তাগিদে গবেষক শিবসাধন দে-র প্রচেষ্টা ‘স্বাধীনতা সংগ্রামে হাওড়া’।