প্রহরশেষের রাঙা আলোয়

কাল্পনিক চিত্র

তপন বন্দ্যোপাধ্যায়

২৫.
সুরঞ্জনা

যদি প্রেম দিলে না প্রাণে


বসন্ত এখনও তার রঙিন শরীর দুলিয়ে উঁকি দেয়নি প্রকৃতিতে৷ শীত লেগে আছে গাছের পাতায়, লোকালয়ে, বাড়িঘরের গায়ে, রাজপথে–অলিতে-গলিতে৷ বৃক্ষশাখায়, লতাপাতায় এখনও ফুলেরা রঙ মেখে হাজিরা দেয়নি, তবে রঙ লেগে আছে মানুষজনের সোয়েটার–কার্ডিগানে৷ এমন শীতের মরসুমে আজই বসন্তপঞ্চমীর অনুষ্ঠান৷

বসন্ত আসার আগেই ‘রবি–অনুরাগ’ সংস্থা অয়োজন করেছে এই অনুষ্ঠানের তার কারণ যে-তারিখে তারা অনুষ্ঠান করতে চেয়েছিল, তা দিতে পারেননি কর্তৃপক্ষ৷ বাধ্য হয়ে এমন ব্যত্যয়৷

সকাল থেকে রেওয়াজে বসেছে সুরঞ্জনা৷ গাইছিল, ‘ওরে ভাই, ফাগুন লেগেছে বনে বনে / ডালে ডালে ফুলে ফুলে পাতায় পাতায় রে, / আড়ালে আড়ালে কোণে কোণে৷’ এই গানটা গাইবে একেবারে শেষে৷ বসন্ত রাগে ত্রিতালে গীত এই গানটিতে এক অদ্ভুত দোলা আছে বসন্ত ঋতুর৷ একদিকে পাতা ঝরার সময়, অন্যদিকে ডালে ডালে অজস্র রঙিন ফুলের সমাহাার৷ ফুটছে পলাশ, ফুটছে মাদার, ফুটছে শিমুল-অশোক৷ মহুয়ার ডাল থেকে ভেসে আসে মিষ্টি ঝাঁঝালো গন্ধ৷ শাখায় ঝলমল করছে কোথাও করঞ্জা, কোথাও সজনে৷ আছে ডালে ডালে মন-পাগল-করা কৃষ্ণচূড়া৷ কোনও শাখা থেকে পাতা ঝরে পড়ছে এখনও৷ ওই পাতাগুলি একদিন শাখায় শাখায় আগমনীর গানে তাল দিয়েছিল, তারাই আজ ঝরে পড়ে আছে ধুলোয়৷ আবার অন্যদিকে নতুন পাতার উদগম হচ্ছে শাখায় শাখায়৷ আকাশ হয়ে উঠেছে রঙিন, বাতাস ছুটছে বনময়৷
আরও একটা গান বারদুয়েক গাইল :
আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে
তব অবগুণ্ঠিত কুণ্ঠিত জীবনে
কোরো না বিড়ম্বিত তারে৷৷

কয়েকদিন ধরে সুুরঞ্জনা প্রস্তুত হচ্ছে এই অনুষ্ঠানের জন্য, কিন্তু নানা কারণে তার মনে মনখারাপের আনাগোনা৷ কাল তিনটে টিকিট দিয়ে জিজ্ঞাসা করেছিল চিত্রজিৎকে, রবীন্দ্রসদনে আমার একক অনুষ্ঠান, তুমি যাবে তো? শিল্পীবন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে যেও৷
চিত্রজিৎ গম্ভীর কণ্ঠে বলেছিল, এখনও সিদ্ধান্ত নিইনি৷

সুরঞ্জনার মুখে শীতের বিষণ্ণ ছাপ, বলেছিল, থাক, যেতে হবে না৷ কী আর এমন গান গাই!
চিত্রজিৎ সেরকমই নিস্পৃহ গলায় বলল, দু’বেলা তোমার গান শুনি৷ সেই একই গান তো গাইবে৷
উত্তর শুনে আরও মেজাজে চিড় ধরে গেল সুরঞ্জনার, বলল, ঠিক বলেছ৷ তোমার ছবি আঁকা রোজ দেখি, তা হলে আর প্রদর্শনী হলে ছুটে যাই কেন দেখতে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেন বসে থাকি, ভিজিটরস রেজিস্টারে কেউ লিখতে এলে তার দিকে খাতাটা বাড়িয়ে দিই কেন!

চিত্রজিৎ একটু থতমত খেয়ে গা ঢাকা দিয়েছিল তার ঘরে৷ আর তার ঘরের দিকে তাকায়নি৷
হঠাৎ আজ সকালে চোয়ালে দাড়ির রাজ্য নিয়ে এক যুবকের আগমন চিত্রজিতের কাছে, তার সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বলে চিত্রজিৎ বলল, ঠিক আছে, তোমার সঙ্গে দেখা হবে সন্ধের পর৷

সুরঞ্জনা আরও ক্ষিপ্ত হল চিত্রজিতের কথা শুনে৷ গত বছর সুরঞ্জনার অনুষ্ঠানে যায়নি, বন্ধু ধীমানের প্রদর্শনী দেখতে যাবে বলে৷ কিন্তু সেখানেও যায়নি, সুরঞ্জনার অনুষ্ঠানও শুনতে যায়নি৷ এবারও একজন অপরিচিত যুবকের সঙ্গে ‘সন্ধের পর দেখা হবে’ বলল, মানে রবীন্দ্রসদনে যাবে না৷

চিত্রজিৎ
মনটা একেবারেই সমে নেই চিত্রজিতের৷ অলমিতিকে দু’বার রিং করেছে, দু’বারই উত্তর পেয়েছে ‘সুইচড অফ’৷ এরকমটা তো করে না অলমিতি৷ তৃতীয়বার রিং না করে একটি মেসেজ পঠাল, ‘অলমিতি, তোমাকে আমার খুবই দরকার৷ একটি একক প্রদর্শনী হচ্ছে, আজ বিকেলে তোমার উপস্থিতি বিশেষ প্রয়োজন৷ তুমি না থাকলে আমার এতদিনের ছবি আঁকাই ব্যর্থ৷’

মিনিট পনেরো পরে ফিরতি বার্তায় অলমিতি জানাল, স্যার, আমি কলকাতা থেকে কিছু দূরে আছি— এমন একটি পরিবেশে যেখান থেকে কলুষ-কলকাতায় আর ফিরতে ইচ্ছে হয় না৷ আপনি শুনলে অবাক হবেন, একটি বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়েছি, পাঁচটি তরুণী মিলে ‘পঞ্চবেণি’ নামে একটি সংস্থা তৈরি করেছে যেখানে জন্ম নিচ্ছে একটি নতুন চিত্রশিল্প৷ মধুবনী শিল্পকলা যেমন এখন পৌঁছে গেছে বৃহত্তর মানবসমাজের কাছে, তেমনই এরাও সৃষ্টি করছে যে শিল্পরীতি, তার নাম দিয়েছে পঞ্চবেণি৷ ভারী সুন্দর আর্টওয়ার্ক৷ এদের মধ্যে প্রতিভা আছে, যা নেই, তা অর্থানুকূল্য৷ আপাতত সেই দায়িত্ব নিয়েছি আমি৷ আপনার কাছ থেকে পেয়েছি চার লক্ষ টাকা, আর যে প্রদর্শনীতে আমার পাঁচটা ছবি পাঠিয়েছিলেন, তার মধ্যে দু’টি ছবি বিক্রি হয়েছে, তা থেকে পেয়েছি এক লক্ষ টাকা৷ এই পাঁচ লক্ষ টাকার তহবিল খুব কাজে লাগবে সংস্থাটির৷ ঠিক করেছি বাকি জীবন এদের সঙ্গেই থাকব৷’

চিত্রজিৎ ফিরতি বার্তায় লিখল, ‘তোমার স্বাধীনতায় কোনও হস্তক্ষেপ করতে চাইছি না৷ যে কাজে ব্রতী হয়েছ, সেই লক্ষ্যে এগিয়ে যাও৷ নতুন শিল্পরীতি তোমার তুলির স্পর্শে আরও বর্ণময় হয়ে উঠবে, এই প্রত্যাশা করি৷ কিন্তু আজ আমার একক প্রদর্শনীতে আসা চাই-ই৷ হোয়াটসঅ্যাপ মারফত প্রদর্শনীতে প্রবেশপত্র পাঠালাম৷ অবশ্যই এসো৷ অপেক্ষা করব৷’

সুরঞ্জনা
তৃতীয় ঘণ্টি বাজার পর পর্দা উঠল ধীর লয়ে৷ রবীন্দ্রসদনের মঞ্চে আসীন সুরঞ্জনা ও অন্যান্য শিল্পী৷ আলোমুখর প্রেক্ষাগৃহে যে-দৃশ্য দেখল তাতে বুকের ভিতর এক অদ্ভুত শিহরণ৷ নীচের তলই শুধু পূর্ণ নয়, দোতলায় যেটুকু চোখে পড়ছে, বহু শ্রোতা অপেক্ষা করছে তার গানের জন্য৷

অনেকদিন পর আবার গান গাইতে বসেছে এত বড়ো একটা অনুষ্ঠানে৷ ভাবতেই পারেনি এত মানুষ এখনও উৎসাহী৷ রত্নদীপবাবু খুব ভালো সংগঠক, শহরের চার কোণে চারটে বড়ো হোর্ডিং দিয়েছেন, তাতে অনুষ্ঠানসূচির পাশে বেশ বড়ো করে সুরঞ্জনা বসুর ছবি৷ ছবিটা খুব সুন্দর করে তোলা৷ তার ফ্ল্যাটে ক্যামেরাম্যান পাঠিয়ে ছবিটা তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন রত্নদীপবাবু৷

বড়ো বড়ো হোর্ডিং ছাড়াও কাগজে একটা বিজ্ঞাপনও দিয়েছেন, যা খুবই ব্যয়বহুল৷ তার ফলেই এত মানুষের সমগাম৷

শ্রোতাদের উপস্থিতি তাকে উৎফুল্ল করলেও অন্য একটি দৃশ্য ব্যথিত করল আরও বেশি৷ যে তিনটি টিকিট চিত্রজিৎকে দিয়ে বলেছিল বন্ধুদের নিয়ে আসতে, সেই তিনটি সিট খালি৷ সুরঞ্জনার ভিতরে একই সঙ্গে দুঃখ, ক্ষোভ ও অভিমান৷ ভেবেছিল এবার নিশ্চয় অনুষ্ঠান শুনতে আসবে চিত্রজিৎ।

সঞ্চালিকা মালবিকা সোম তখন শ্রোতাদের অভিনন্দন জানিয়ে বলতে শুরু করেছে, এবার বসন্তপঞ্চমী উপলক্ষে ‘রবি–অনুরাগ’এর নিবেদন বিশিষ্ট রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী সুরঞ্জনা বসুর একক অনুষ্ঠান৷ আপনারা হয়তো অবাক হচ্ছেন ঘোর শীতের মধ্যে কেন বসন্তপঞ্চমীর অনুষ্ঠান৷ সত্যিই এক অবাক-করা ঘটনা৷ তবে প্রকৃত তথ্য এই যে, সুরঞ্জনা বসু ঘোর জ্যৈষ্ঠের দিনে রবীন্দ্রনাথের গান গেয়ে বৃষ্টি নামিয়েছিলেন এ-বছরই৷ এবার উনি রবীন্দ্রগান গেয়ে বসন্তকে নিয়ে আসতে চাইছেন নির্দিষ্ট সময়ের আগেই৷ সবাই জানেন, শীত হল স্বার্থপর দৈত্যের ঋতু, যখন বৃক্ষসমূহ থাকে নিষ্প্রভ, শাখায়-শাখায় বর্ণময় ফুলেরা থাকে ঘুমিয়ে, তখন সুরঞ্জনা বসু যে–গানগুলো গাইবেন, তাতে বসন্তসেনা রঙিন পশরা নিয়ে নেমে আসবে পৃথিবীতে৷
অমনি প্রেক্ষাগৃহে তুমুল হাততালি৷

সুরঞ্জনা বিস্মিত হচ্ছিল সঞ্চালিকার কথা শুনে৷ অস্বস্তিও হচ্ছিল তার গানে সত্যিই কি বসন্তসেনা আসতে পারেন! একটার পর একটা বসন্তের গান গেয়ে পারবে কি বসন্তকে নিয়ে আসতে?
তখনও সামনের সারির সিটগুলো ফাঁকা রয়েছে দেখে খুব ব্যথিত হচ্ছিল সুরঞ্জনা৷ চিত্রজিৎ এতখানি নিষ্ঠুর না-হলেও পারত আজ।

সঞ্চালিকা মাইক্রোফোন তার সামনে দিতেই সুরঞ্জনা বলল, মালবিকা যে স্বপ্ন ছিটিয়ে দিয়ে গেল শ্রোতাদের চোখে, তেমনটি কি সত্যিই হয়! তবে আজ কিছু বসন্তের গান গাইব। সৃজন রবীন্দ্রনাথের, আমি তাঁর একনিষ্ঠ সেবক৷ আমাদের কর্মমুখর দিন শুরু হয় তাঁর গান দিয়ে, দিন শেষও হয় তাঁর গান দিয়ে৷ তিনি যে আমাদের ভাসিয়ে দিয়েছেন সুরের সমুদ্রে৷ মানুষের জীবনে এমন কোনও আনন্দ নেই, এমন কোনও প্রেম নেই, যা তাঁর সুরের বেদনায় গভীর হয়ে হৃদয়কে ডুবিয়ে দেয় না৷ এমন কোনও যন্ত্রণা বা দুঃখ নেই, যা তাঁর গানে অমৃত হয়ে ওঠে না৷ তারই মধ্যে কোনও বিশেষ গান আমাদের হৃদয়ে সুরের আশ্চর্য মিলন ঘটিয়ে ধ্বনিত হতে থাকে শিরায় শিরায়৷ কথা আর সুরের মিলনে এক অলৌকিক ধ্বনিতে বাজতে থাকে মানুষের মন৷ আসলে তাঁর গান এমনই সুদূরপ্রসারী, যাতে সুর ছাড়াও মনে থাকে গানের কথার অর্থময় দ্যোতনার জন্য৷
কথাগুলো শেষ করে সুরঞ্জনা শুরু করল:
আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে
তব অবগুণ্ঠিত কুণ্ঠিত জীবনে
কোরো না বিড়ম্বিত তারে৷৷

আপনারা জানেন, এই গানটি ব্যবহৃত হয়েছে রাজা নাটকে৷ যেখানে ঠাকুরদা বলছেন ছেলেদের, ‘ধর তো রে ভাই, তোদের সেই দরজায় ঘা দেবার গানটা ধর৷’ কবি বলছেন, ‘একি নিবিড় বেদনা বনমাঝে / আজি পল্লবে পল্লবে বাজে’৷ মানুষের ভিতরের সন্ধান করতে বাইরের অন্বেষণের রূপকে সাজিয়েছেন কবি৷ ‘মোর পরাণে দক্ষিণ বায়ু লাগিয়ে’— দক্ষিণ বায়ু সে তো মনেরই আন্দোলন৷

প্রেক্ষাগৃহের আলো নেভা, সামনের সারিতে কেউ একজন কি এসে বসল! সুরঞ্জনা চোখ তীক্ষ্ণ করে দেখল, সে চিত্রজিৎ নয়৷ তা হলে কি চিত্রজিৎ নিজে না এসে অন্য কাউকে টিকিট দিয়েছে!
সুরঞ্জনা পরের গান ধরল :
আজি কমল মুকুল দল খুলিল, দুলিল যে দুলিল—
মানসসরস রসপুলকে পলকে পলকে ঢেউ তুলিল৷৷

গানটিতে বিরাজ করছে এক অদ্ভুত চঞ্চলতা, মনের গভীরে ঢেউ তুলছে কমলমুকুল দল৷ সেই সুগন্ধে মগ্ন হয়ে পড়ছে, আনন্দে মূর্ছা যাচ্ছে মৃদু বাতাস৷ মধুময় ছন্দে মৌমাছি মুখরিত করে তুলছে গুনগুন গুঞ্জনে৷
বসন্ত তো শুধু একটা ঋতুই নয়, বসন্ত ভালোবাসার প্রতীক৷ প্রেমের প্রতীক৷ গাছে গাছে নতুন পাতা, নতুন কুঁড়ি, নতুন ফুল৷ কত রঙের ফুল, কত রকমের ফুল৷ বসন্তের অন্য পরিচয়— বসন্ত প্রেমেরও প্রতীক৷ পুরোনোকে নতুন রঙে রাঙিয়ে দিতে এসেছেন ঋতুরাজ৷

বসন্ত তো শালের জঙ্গলে আসে, সেগুনের বনে আসে, বসন্তের শুরু থেকে গাছের শাখায় শাখায় সবুজ কচি পাতা৷ শালগাছ ভরে যায় শালফুলে৷ নরম, ঘিয়ে-রঙা শালফুল যেন ছোটো ছোটো নাকছাবি৷ ভোরের আলোয় হাজার হাজার শালফুল ঝলমল করতে থাকে।

একটার পর একটা বসন্তের গান গেয়ে সুরঞ্জনা তখন বসন্তের আমেজ নিয়ে এসেছে প্রেক্ষাগৃহে৷ অনেকেই তার গানের সঙ্গে গান গাইছে, কোনও কোনও কলি যেন কোরাস হয়ে ঝরে পড়ছে প্রেক্ষাগৃহে৷ ভেবেছিল শেষ গান গাইবে, কিন্তু তার মনের ভিতর অনন্ত ক্ষোভ, ভেবেছিল শেষ গান গাইবে, ‘ওরে ভাই ফাগুন লেগেছে বনে বনে’, তা না গেয়ে হঠাৎ বসন্তের গান থেকে চলে এল তার ভিতরে উথলে ওঠা অভিমানে :
‘যদি প্রেম দিলে না প্রাণে / কেন ভোরের আকাশ ভরে দিলে এমন গানে গানে? / কেন তারার মালা গাঁথা/ কেন ফুলে শয়ান পাতা, / কেন দখিন-হাওয়া গোপন কথা জানায় কানে কানে?’
গানটি গাইতে শুরু করতেই হঠাৎ প্রেক্ষাগৃৃহের প্রবল প্রতিবাদ, এ গান গাইছেন কেন? এ তো মন-খারাপের গান, আজ শুনতে এসেছি শুধু বসন্তের গান—
বহু কণ্ঠে প্রবল হইচই৷
সুরঞ্জনা হতবাক হয়ে গান থামিয়ে দিয়ে বুঝতে চাইল শ্রোতাদের প্রতিবাদের কারণ।
প্রতিবাদ আরও মুখর হতে জ্বলে উঠল প্রেক্ষাগৃহের আলো৷ ভিতর থেকে ছুটে এসে রত্নদীপবাবু বললেন, মাডাম, ওরা বসন্তের গান গাইতে বলছে, আপনি যে গান গাইছেন তা অভিমানের গান।

প্রেক্ষাগৃহে আলো জ্বলে উঠতে সুরঞ্জনার বুকের ভিতর তোলপাড়, দেখল তিনটি সিটে বসে আছে চিত্রজিৎ, তার পাশে অলমিতি, তার পাশে সেই চোয়ালে দাড়ির-রাজ্য যুবক৷ নিশ্চয় এই যুবকটিই সৌম্য। কী আশ্চর্য, চিত্রজিৎ তা হলে এই কৃৎকৌশলেই ব্যস্ত ছিল সকাল থেকে। তাকে কিছুই বলেনি এত সব কথা। চিত্রজিৎ খুবই ব্যথিত ছিল অলমিতির জীবনে ভাঙন ধরানোয়৷ সেই অপরাধ থেকে নিজেকে মুক্ত করতে আজ মিলিয়ে দিল দু’জনকে।

সুরঞ্জনার বুকের ভিতর উথলে উঠল অনন্ত তরঙ্গরাশি, আজ তাদের জীবনে সত্যিই বসন্ত এল হৃদয়ের দু’কুল ভাসিয়ে৷ আজ তাদের আকাশে তুমুল আনন্দ, বাতাসে অজস্র হর্ষ৷ কণ্ঠে প্রবল উল্লাস মিশিয়ে গেয়ে উঠল:
‘আজি দখিন-দুয়ার খোলা—
এসো হে এসো হে, এসো হে, আমার বসন্ত এসো৷৷’
সমস্ত প্রেক্ষাগৃহে তখন জোরালো হাততালি, তার কণ্ঠে সুর মিলিয়ে শ্রোতারা তখন একযোগে গাইছে:
‘দিব হৃদয় দোলায় দোলা, এসো হে, এসো হে, এসো হে আমার বসন্ত এসো৷৷’
সুরঞ্জনা অনুভব করছে রবীন্দ্রসদনের প্রেক্ষাগৃহে রঙিন উষ্ণীষ পরা বসন্তসেনা রাশি রাশি ফুল হয়ে ভিজিয়ে দিচ্ছে অগণিত শ্রোতার হৃদয়৷

(সমাপ্ত)

অলঙ্করণ: সোময়েত্রী চট্টোপাধ্যায়