আঁধারে আলো

সত্যরঞ্জন বিশাল

সকাল থেকেই আকাশ ভারী। ছাইরঙা মেঘের চাদরে ঢেকে আছে চারদিক। গ্রীষ্মের গুমোট ক্লান্তি যেন বাতাসে পুরু হয়ে ঝুলে আছে। সূর্য অভিমানে কোথাও লুকিয়ে পড়েছে, অথচ বৃষ্টির গন্ধও নেই। সেই ভ্যাপসা গরমে বারান্দায় এসে দাঁড়াল বেবি—যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নের গবেষক, প্রকাশ মাস্টারের ছোট বোন। সদ্য ছুটিতে বাড়ি এসেছে, কিন্তু অবসরের বদলে টুকিটাকি কাজের মধ্যেই নিজেকে জড়িয়ে রেখেছে।

হঠাৎই সে থেমে যায়। নীলু মাসি— বাড়ির পুরোনো পরিচারিকা— পাটকাঠির মোড়া টেনে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। চোখে এক অদ্ভুত শূন্যতা।
— ‘দশটা বেজে গেল, মাসি! এখনো কাউকে টিফিন দিলে না?’— বেবির কণ্ঠে একরাশ বিরক্তি।
সাড়া নেই। যেন কথাটা বাতাসে মিলিয়ে গেল।
বেবি এবার উদ্বিগ্ন হয়ে কাছে গিয়ে বসে।
— ‘মাসি, শরীর খারাপ? কী হয়েছে?’
নীলু নিচু গলায় বলে, ‘ভোর থেকে কাজ করে শরীর আর চলছে না। মাথা ধরেছে… বমি বমি লাগছে।’
বেবির কণ্ঠে এবার অনুশোচনার নরম সুর: — ‘বলোনি কেন? আমি তো ছিলাম! এত কষ্ট করার কী দরকার ছিল?’
একটু থেমে, দ্বিধায়: — ‘মাসি, সত্যি করে বলো… তুমি কি… অন্তঃসত্ত্বা?’
প্রশ্নটা শুনে নীলু চুপ করে যায়। মাথা নিচু করে বসে থাকে।


বেবি গভীর মনোযোগে তাকিয়ে থাকে। যেন সে মাসির চোখের ভাষা পড়তে চাইছে। একটু থেমে ফিসফিসিয়ে বলে, ‘মাসি, তোমার স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ নেই তো দুই বছরের উপর? তাহলে এইসব উপসর্গ কেন? সত্যি করে বলো, আমি কাউকে বলব না। বিশ্বাস করো। চলো, আমার সঙ্গে শহরে চলো, ভালো একজন ডাক্তারের কাছে যাই। কাউকে জানাতে হবে না।’
নীলু মাথা নাড়ে। ‘দিদি, কয়েকটা দিন শুধু বিশ্রাম চাই। ঠিক হয়ে যাবো।’
বেবি এবার আর নিজেকে থামাতে পারে না।
‘না মাসি, আর নয়। এখন ভুল সিদ্ধান্ত নিলে চলবে না। চলো আমার সঙ্গে শহরে। কাউকে কিছু জানাতে হবে না। শুধু মাকে বলেই বেরোবো।’

এই কথা শুনে নীলু হঠাৎ ফুঁপিয়ে উঠল। তার কান্না যেন এক জমে থাকা আত্মগ্লানির দীর্ঘ উপচে পড়া ঢল।
বেবি কাঁধে হাত রেখে ধীরে ধীরে বলে, ‘তুমি কাকে দায়ী ভাবছো? কে জানে আর কে জানে না, সেটাই এখন প্রশ্ন নয়। যদি ক্লাবে কারও কানে কিছু পড়ে যায়— তখন ওরা অপমান করতে ছাড়বে না। বলবে— বাচ্চার বাবা কে? তখন? তখন কী বলবে?’
ঠিক তখনই বাইরের গলা ভেসে এল:
— ‘বেবিদি! আমি মলয়। ক্লাব থেকে বলেছে, মাসিকে নিয়ে যেতে।’
বেবি দরজার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে:
— ‘ডাকার কারণ?’
মলয় এসে দাঁড়ায়:
— ‘মাসির শরীর খারাপ— এই নিয়ে কথা হবে।’
বেবির কণ্ঠ রুক্ষ হয়ে ওঠে:
— ‘তুই ক্লাবের মুখপাত্র নাকি? বুড়ো বাপের রিকশা টানার উপার্জনে তোর পেট চলে। নিজের উপার্জনের কথা চিন্তা করেছিস কখনও? যা, গিয়ে ক্লাবকে জানিয়ে দে— মাসি কোথাও যাচ্ছে না।’
মলয় মুখ নিচু করে বলে:
— ‘সেক্রেটারি, বাবলাদা বলেছে, মাসি না গেলে ও পুরো ক্লাব নিয়ে এখানে চলে আসবে।’
এইবার নীলু উঠে দাঁড়ায়। আঁচলটা কোমরে জড়িয়ে নিয়ে বলে:
— ‘তোদের এত চিন্তা কেন? বলে দে—আমি ঠিক আছি।’
মলয় চাপা স্বরে বলে যায়:
— ‘মাসি না গেলে মাস্টার বিপদে পড়বে।’
এই কথা শুনে নীলুর চোখ ধীরে ধীরে শূন্য থেকে কঠোর হয়ে ওঠে। বেবি বাধা দিলেও সে নীরবে হাঁটা দেয় ক্লাবঘরের দিকে।
একটা সাদামাটা, খানিকটা ধুলো-জমা ক্লাবঘর। একদিকে ক্যারাম খেলা, অন্যদিকে ফুটবল নিয়ে তর্ক। সভাপতি তারাপদ এককোণে কাগজে মুখ গুঁজে বসে আছেন।
এমন সময় প্রথমে মলয়, তারপর মাথা নিচু করে ঘরে ঢোকে নীলু মাসি।
ঘরের আবহ মুহূর্তে পাল্টে যায়।
ক্যারামের গুটি ঠোকাঠুকি বন্ধ হয়, ফুটবল আলোচনাও নিস্তব্ধ হয়ে যায়। কাগজ নামিয়ে তারাপদ এক চোখে তাকায়, বাবলা দাঁত চেপে ওঠে।
সেই নৈঃশব্দ্যের ভিতরেই কেউ বলে ওঠে—
‘চেপে ধরো বাবলাদা, মিষ্টি করে বললে কাজ হবে না।’
‘প্রকাশ মাস্টার অঙ্ক শেখায় বলে ভাবছে সব হিসাব মেলাবে? এবার না হয় ভুলটা ধরিয়ে দিই।’
তারাপদ একটু গলা নামিয়ে বলে, ‘তুই যাই বলিস বাবলা, মাস্টার কিন্তু এই গ্রামের গর্ব। শুধু একটা সমস্যা— ও আমাদের পার্টির নয়। তবে সেটা সামলানো যাবে। কিন্তু তাড়াহুড়ো না করাই ভালো।’
‘গত পঞ্চায়েতে আমাদের হারের কারণ, ওই মাস্টার। শোধ নেবার উপায় একটাই—প্রমাণ। আর সেই প্রমাণ আজ আমাদের সামনে।’
মলয়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘তুই বলছিস নীলু মাসির পেটে সন্তান, এবং মাস্টারের সঙ্গেই সম্পর্ক?’
মলয় চুপ।
ঘরে তখন চাপা গুঞ্জন, জল্পনা, বিদ্বেষে ভরা কৌতূহল।
তারাপদ প্রতিবাদ করে— ‘যে ঘটনা ঘটেছে, তার বিচার যেন না হয়ে পড়ে বিচারের নাম করে প্রহসন! আগে সবটা জানি। মেয়েটি কী বলে, সেটা শুনে নেওয়া দরকার।’
কেউ যেন আর শান্ত থাকতে পারছে না। হঠাৎই কৌতুকভরা কণ্ঠে কেউ বলে বসে—
‘প্রমাণ হোক। মাস্টার তখন আমাদের ক্লাবকে স্পনসর করবে! নতুন ক্যারাম বোর্ড, ক্রিকেট কিট সব ম্যানেজ হয়ে যাবে!’

তারাপদ এবার গলা শক্ত করে বলে, ‘তোরা তো শুধু এখন চাস, কে কতটা সুবিধা পাবে! ক্লাব চালাতে গেলে সম্মান লাগে, গালিগালাজ না। প্রকাশের ছোটবেলার কথা মনে নেই তোদের? গ্রামের খেলাধূলা সবই ওর চেষ্টার ফল। তারপর, ক্লাব গড়তে ওর অবদান ভূলে গেলে চলবে? এখন সেই মানুষটার বিরুদ্ধে এই অপবাদ?’
বাবলা এবার রুক্ষস্বরে বলে— ‘তারাপদদা, আবেগ দিয়ে ক্লাব চলে না। মাসি, তুমি বলো আসল সত্যি। মাস্টার কী করেছে, কতদিন ধরে?’
নীলু চুপ করে আছে। মুখে অসমাপ্ত কথার ছায়া।
বাবলা আর একধাপ এগিয়ে— ‘তুমি না বললে, আমরা ধরে নেব তুমি ভয় পেয়েছো। আমরা পাশে আছি। চাকরি জুটিয়ে দেব, টাকা দেব। শুধু সত্যি বলো।’
সবার চোখ তখন এক জায়গায় নিবদ্ধ—নীলু মাসির মুখে। সে চোখ তুলে তাকায় না, কিন্তু হঠাৎই কাঁপা গলায় বলে ওঠে—
‘মলয়রা আমাদের প্রতিবেশী। আমি কাজ পেয়েছিলাম মলয়ের বাবার কথায়। ভালো ঘর, ভালো মাইনে দেবে— এই আশ্বাসেই এসেছিলাম। এর জন্য মলয়কে প্রতিমাসে টাকা দিতে হয়। আর মলয়ের বাবা! আমি জানতাম না, কাজ চাইলে রাতে এক বিছানায় কাটাতে হয়।’
ঘর নিস্তব্ধ হয়ে যায়। মলয় গলা চড়িয়ে প্রতিবাদ করে— ‘মিথ্যে! আমাদের ফাঁসানো হচ্ছে!’
কিন্তু ততক্ষণে ঘরে অন্য সুর।
নীলু ধীরে ধীরে বলতে থাকে— ‘মলয়দের কথা শুনে, এতদিন সব সহ্য করেছিলাম, কিন্তু আজ যখন শুনলাম— দেবতার মতো মাস্টারকে ফাঁসানো হচ্ছে, তখন আর পারলাম না। উনি আমায় সম্মান দিয়েছেন— ভাত কাপড় দিয়েছেন।’

নীলু ধীরে ধীরে ক্লাবঘর থেকে বেরিয়ে যায়। হাঁটার ভঙ্গিতে যেন পাল্টে গেছে জীবন। সে মাথা উঁচু করে চলে যায়। পেছনে পড়ে থাকে নিস্তব্ধতা। শুধু ভেসে আসে তার শেষ কথা:
— ‘আমি আর ভয় পাই না। সত্যি বলার পর বুকটা হালকা লাগছে। খুব হালকা…’

বাবলা চুপ করে বসে, মলয়ের চোখ কপালে, তারাপদর কণ্ঠে এক অদ্ভুত আশ্চর্য স্তব্ধতা। ‘অন্ধকার যত গভীর হোক, আলো ঠিক জন্ম নেবে। আর সেই আলো আসবে সেই মুখ থেকে, যাদের চোখে স্বপ্ন নেই, কিন্তু বুকভরা সাহস আছে। আজ নীলু শুধু প্রতিবাদ করেনি— ও আমাদের আয়না ধরে দিয়েছে।’
তারাপদ ঘর থেকে বেরিয়ে যায়, পিছনে পড়ে থাকে একরাশ হতভম্ব মুখ।