ঋভু চট্টোপাধ্যায়
দরজাটা খুলে বিমান কিছু সময়ের জন্যে কেমন যেন থ মেরে দাঁড়িয়ে গেল। ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা বাকি দু’জনও সেই সময় কিছুটা অপ্রস্তুত। অন্যসময় দরজা খুললেই সোনামাকে দেখতে পেত। হালকা হাসিমুখে বলত, ‘অজয় এলি, তোর মা ভালো আছে?’
বিমানের চোখে মুখে তো সেই উচ্ছ্বাস প্রকাশ পেল না। তা হলে কি আসাটা পছন্দ হয়নি? অজয়ের মাথার ভেতরে কথাগুলো বিদ্যুতের মত খেলে গেল। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তার বউ অপর্ণার মুখের দিকেও একবার দেখে নিল। ওই অবস্থাতেই মুচকি হেসে যতটা স্বাভাবিক থাকা যায় সেভাবেই জিজ্ঞেস করল, সোনামা কেমন আছে এখন?
—ভেতরে আয়, মা উপরের ঘরে, ঘুমোচ্ছে।
কথাগুলো বলে দরজাটা আরো ভালো করে খুলে দিতেই বাকি দু’জন ঘরের ভিতরে ঢুকল। বিমান দরজাটা বন্ধ করে ভিতরে এসে দু’জনকে সোফাতে বসতে বলল। ‘মিঠু কি অফিস গেছে?’
—হ্যাঁ। টানা চারদিন ছুটি নিয়েছিল। আজ একবার জয়েন না করলে অসুবিধা হবে। সরকারি হলেও কিছু রুলস তো মানতে হবে। তাছাড়া ওদের বড়সাহেব লোকটা একটু ক্রিটিক্যাল।
—মেয়ে?
—ওদের মামার বাড়িতে রেখে এসেছি। এখন তো অনেকবার যেতে হবে। এখানে কে দেখবে বল?
—আমাদের বাড়িতে একটু পাঠিয়ে দেওয়া গেলে…
—তোদের বাড়ির থেকে এটা কাছে। এই তো আজ মিঠু ফিরলে মায়ের কাছে থাকবে, তখন সন্ধ্যায় ওদের নিয়ে আসব। কিন্তু মায়ের কথা তোদের কে বলল, মানে আমি তো সেরকমভাবে কাউকে বলিনি। যে দু-তিন জন জানে তাদেরও বলতে বারণ করেছি। আসলে এই সময়টাই খুব খারাপ। মা নিজেও এত ভেঙে পড়েছে।
বিমান একটা লম্বা শ্বাস ফেলে কথাগুলো বলল। মুহূর্তের মধ্যে ঘরের ভিতরের পরিবেশটা আরো দমবন্ধকর হয়ে উঠল। তিনজনের কেউ কিছু সময়ের জন্যে কোনও কথা বলল না। বিমান ও অজয়ের বাবা দুই ভাই। এখন থেকে বছর পঁচিশ আগে এই দুই পরিবার তাদের পারিবারিক দোতলা বাড়ির পাশাপাশি দুই ঘরে খুব কষ্ট করে থাকত। শুধু ওরা দুই পরিবার নয় ওপর নিচ মিলিয়ে অজয়ের বাবার পাঁচ ভাই থাকত। ওপরে তিন জন, নিচে দু’জন, তবে সবার হাঁড়ি আলাদা ছিল। সব সময় তাদের সম্পর্ক যে মধুর ছিল, তা নয়, মাঝেমাঝেই ছোটখাটো বিষয়ে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া ঝামেলাও হত। তাও একই মায়ের পেটের ভাই তো, বিপদে আপদে সবাই সবার পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করত। এই সম্পর্কের তাল কাটল যখন অজয়ের বাবা তার কোম্পানির কোয়াটার্স পেয়ে চলে গেল। তবে প্রথমে তাদের ভাগে পাওয়া ঘরটা তালা দিয়ে এলেও পরে বিমানের বাবা একদিন তাদের কোয়াটার্সে গিয়ে কিছু কাজের জন্যে ঘরের চাবিটা নিয়ে আসে। অজয়ের বাবা বিনা চিন্তা ভাবনাতেই চাবিটা দিয়ে দেয়। তারপর থেকে তাদের সম্পর্কটা আরো ভালো হয়ে যায়। অজয়রা কোনো অনুষ্ঠানে বাড়ি এলে বিমানের বাবা-মায়ের কাছেই উঠত। কাছের মানুষ দূর থেকে এলেই যেন আরো কাছের হয়ে যায়। ছেড়ে যাওয়া ঘর আরো আপন করে টানে। এমনিভাবেই অজয়ের সোনামা তার জীবনের একটা আধার হয়ে ওঠে। বিভিন্ন কারণে বাকি জ্যাঠা-জেঠিমাদের সঙ্গে সম্পর্ক ‘ওই দেখা হলে বত্রিশ পাটি’ হয়ে গিয়েছিল।
—কার কাছে বলতে, গত সপ্তাহে এসডিও অফিসে ভাইয়ের কাছে ব্যানার্জিদের রাজীবকাকা গিয়েছিল, ওখানেই ভাইকে বলে।
—ও বুঝেছি, ওর ভাইপো বুবাইয়ের গাড়িতে একবার মাকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলাম।
—সোনামা এমনি কেমন আছে এখন?
—কেমন বলতে এই ধরনের রোগী ঠিক যেমন থাকে। হাজার রকমের সাইড এফেক্ট একে একে হাজির হচ্ছে, এটার চিকিৎসা চলছে তো ওটা খারাপ। আসলে মা নিজে বাইরের কাউকে দেখলেই কেমন হয়ে যাচ্ছে। সেই কারণেই আর…
অজয় বিমানের কথার শেষে লম্বা শ্বাসের শব্দ বুঝতে পারল। ঘরের ভিতরে আবার কিছু সময়ের জন্যে সবাই চুপ করে গেল। সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে বিমানই বলল, তোরা বোস আমি চা তৈরি করি। মিঠু নেই, তাছাড়া মা এখনও ওঠেনি। একটু আগে আমি দেখে এলাম, এই সময় লিকার চা খায়, চা করে তারপর ডাকব।
অপর্ণা সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, না-না, তুমি বোস, আমি চা করছি, আমাকে শুধু দেখিয়ে দাও।
—ঠিক আছে।
বিমান ও অপর্ণা রান্নাঘরের দিকে গেলে ঘরের ভেতরে একা বসে থাকার সময় সোনামা ও কাকুর একটা যৌথ সাদা কালো ছবি অজয়ের চোখে পড়ল। বিয়ের পরপর তোলা। এর আগেও বহুবার ছবিটা অজয় দেখেছে। যতবার দেখেছে ততবার সোনামার মাথার ঘন চুলের দিকে চোখ দুটো আটকে গিয়েছে। পাশে থাকা কাকুর মাথার চুলগুলো সেই ছোকরা অবস্থাতেই গোনা যেত। স্বাভাবিকভাবেই কাকু ও কাকিমা এক্কেবারে একটা আইরনিক্যাল জুটি লাগত। অজয়দের বাবার দিকে প্রায় সবার মাথাতেই টাক। অজয়, এমন কী বিমানেরও চুল উঠতে আরম্ভ করেছে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হল মা কাকিমা জেঠিমাদের মাথা ভর্তি চুল ছিল। সব থেকে বেশি চুল ছিল এই সোনামায়ের। শোনা যায় প্রথম দিকে তাদের বাড়িতে কোনো বাথরুম ছিল না। পুকুরে স্নান করে আসার সময় সোনামায়ের চুলের দিকে সবার চোখ পড়ত।
—উপরে চল, মা উঠে গিয়েছে, ওখানেই চা খাবো। তোরা একটু মায়ের কাছে বসে থাক, আমি মিঠুকে নিয়ে আসি।
অজয় ওঠার আগে বিমানের হাতে একটা সাদা খাম দিয়ে বলল, এই সময় তোর যা খরচ হচ্ছে সেটা অবিশ্বাস্য জানি, কিন্তু এটা মা পাঠিয়েছে, পাঁচ হাজার টাকা আছে। সোনামাকে একটু ফল বা যা খেতে দিচ্ছে সেগুলো কিনে দিবি।
বিমান খামটা হাতে নিয়ে কিছু সময় মুঠো করে রেখে টিভির নিচে রাখা টাওয়ালের নিচে রেখে দিল। তারপর বলল, আমি ভেবেছিলাম জেঠিমা আসবে…
—আসতো, ইন ফ্যাক্ট আমি বলেওছিলাম। মা রাজি হল না, বলল, কীভাবে যাবো বল, আমরা দু’জন একই দিনে এই বাড়িতে এসেছি, এত বছর একসঙ্গে থেকেছি, আমাদের মধ্যে ঝগড়া ঝামেলা যে হয়নি সেটা নয়, কিন্তু দু’জায়ে মিলেই তো সব কিছু সামলেছি। এখন ওর এমন অবস্থা কীভাবে দেখব?
—বিমানের চোখমুখ কেমন যেন উদাস হয়ে গেল। বিছানার পাশে থাকা জানলার ওপাশের বড় আকাশটা ছোট জানলাতে যেন ছোট হয়ে আসে। সেদিকে তাকিয়ে বিমান বলে, এক সময় এই বাড়িটা কেমন গমগম করত। আস্তে আস্তে মেজজ্যাঠা সেজজ্যাঠা, তোরা, সবাই আলাদা আলাদা হয়ে গেলি। একমাত্র বড় জ্যাঠা এই বাড়িতে থাকলেও কারোর সঙ্গে কোনও কথা বলে না। তোরা মাঝেমাঝে আসতিস, ছোটজ্যাঠা আসতো, তারপর জ্যাঠা মারা যাবার পর তোদের আসাও কমে গেল।
বিমানের কথার শেষে লম্বা শ্বাসের শব্দটা অজয়ের কানে গেল— আসলে বাবা মারা যাওয়ার পরেই অপর্ণার মিসক্যারেজ হল, শুনেছিস মনে হয়। খুব ভেঙে পড়েছিল। শরীর মন এখনো খুব অস্থির। আমি তো বাইরে কাজে চলে যাই ঘরের ভিতর থাকে শুধু মা আর ও, মন ভালো নেই। এর মাঝে সোনামার এত বড় ঘটনাটাও তোরা জানাসনি।
—আসলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পেশেন্টের রেডিয়েশন বা কেমোথেরাপি, যে কোনো একটা চলে, মায়ের ক্ষেত্রে দু’টোই একসঙ্গে চলেছে, এটাকে বলছে কেমো-রেডিয়েশন। আমরা তো কিছুই বুঝি না ডাক্তাররা যা বলছেন, তাই শুনতে হচ্ছে। এদিকে মায়ের ক্লান্তি, পেটের প্রবলেম মুখে ঘা, স্কিনে প্রবলেম, যা হবার সব হচ্ছে। সব থেকে বড় কথা হল মায়ের চুল উঠে গিয়েছে।
—মা বলছিল, পরমার একমাথা চুল ছিল, আমরা যখন পুকুর থেকে স্নান করে ফিরতাম ওর ভিজে চুলের দিকেই সবাই তাকিয়ে থাকত। কোনো যত্ন নেই, তারপরেও একমাথা চুল, কোমর ছাড়িয়ে যেত।
—ট্রিটমেন্টের পরে মা নিজেও এই কথাগুলোই বলছিল। আমি ছবি দেখিয়ে চাঁদনির ওখান থেকে চুল আনিয়েছি। কিন্তু চুল ও পরচুলের ভিতর অনেক পার্থক্য। এখন মা আগের ছবিগুলো দ্যাখে আর কাঁদে।
বিমান কিছু সময় চুপ করে থেকে আবার বলতে আরম্ভ করল, বাবা তো অনেক দিন হল চলে গিয়েছে, এখন যদি মায়েরও…। অজয় বিমানের কাঁধে হাত দিয়ে বলল, কিছু হবে না, চল সোনামাকে দেখে আসি। অপর্ণা কি চলে গিয়েছে?
—হ্যাঁ, আমার হাতে চায়ের কাপদুটো দিয়ে মায়ের কাছে গেল, তোকে তো বলে গেল।
—আমি খেয়াল করিনি।
সোনামার কাছে গিয়ে অজয়ের মনটা আরো খারাপ হয়ে গেল। বিমান মিঠুকে আনতে গেল। সোনামার চোখ মুখের নিচে কালো দাগ হয়ে গিয়েছে। ঘরটা যেন ওষুধের দোকান। অপর্ণা সোনামার পায়ের কাছে বসে চাদরের উপরেই পায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। অজয় যেতেই সোনামা একটু হাসার চেষ্টা করে খুব আস্তে এবং জড়ানো গলায় বলল, তোর মায়ের শরীর ভালো আছে?
—হ্যাঁ, ভালো।
—অপর্ণার ব্যাপারটা বিমানের মুখে আগেই শুনেছি, ওকে ভালো করে ডাক্তার দেখা, পারলে বাইরে গিয়ে দেখিয়ে নিয়ে আয়। কোথাও একটু ঘুরতে নিয়ে যা। এর মাঝে চেষ্টা করে যা। দু’বার এভাবে মিসক্যারেজ হল, ব্যাপারটা তো ভালো নয়। তোর মায়েরও তো একটা নাতি নাতনির শখ আছে। ছোড়দা চলে যাওয়ার পর তোর মাও তো একা হয়ে গেল।
অজয় একটা লম্বা শ্বাস ফেলে সোনামার কথা শুনে যাচ্ছিল। সোনামা তখন ফেলে আসা দিনের স্মৃতিচারণ করে যাচ্ছে। সেই অজয়ের মায়ের সঙ্গে এক মাইল দূরে পুকুরে স্নান করতে যাওয়া থেকে আরম্ভ করে ঘরের সবাইকে লুকিয়ে সিনেমা দেখতে যাওয়া, সব কথা এক এক করে ছবির মত ভেসে বেড়াতে আরম্ভ করল সোনামার ঘরের ভিতরে। অজয় নিজেও স্পষ্টভাবে সব ছবি দেখতে পেল। মা-বাবা, বাকি সব জ্যাঠা জেঠিমা সবাই যেন চারপাশে দাঁড়িয়ে বসে হেসে কথা বলে জন্ম দিল নতুন সময়ের। সোনামা কিছু সময় পরে থেমে গেলেও অজয় বুঝতে পারল তার চোখে জল এসে গিয়েছে। অপর্ণা সোনামার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। সোনামা অপর্ণার ডান হাতটা চেপে ধরে বলল, তোর শাশুড়ি আমার চুল বেঁধে দিত, বিকালে তেল লাগিয়ে দিত। আজ দেখ আমার মাথায় চুলই নেই।
—সোনামা ওইরকম ভাববে না। এখন ওষুধ চলছে তাই, সব ঠিক হয়ে যাবে।
—তুই আমার একটা কাজ করবি অজয়।
—কেন করব না, বল।
—নিচে একটা ছবি আছে, আমি আর তোর কাকা, বিয়ের পরেই তুলেছিলাম। দেখবি টিভির শোকেশে রাখা আছে। আমার চুলটা সামনের দিকে করে ছবিটা তুলেছিলাম। ওটা একটু এনে দিবি। বিমানকে কত করে বলি। এনে দেয় না, বলে ছবিটা দেখলে নাকি আমার মন খারাপ হবে তাতে শরীর খারাপ হবে। কিন্তু তুই বল আমার ওই কালো মেঘের মত চুল এক ঝটকায় শূন্য হয়ে গেল এটা ভাবলে মন খারাপ হবে না। তাও ছবিটা দেখলে…।
অজয় ঘরের ভিতরে ঢুকে সেই ছবিটা লক্ষ্য করেছে। সত্যি সোনামার মাথা থেকে কালো ঝরনা নেমে আসত, আর সেখানে খেলা করত সোনামার হাসি, মজা ঠাট্টা ইয়ার্কির মুহূর্তগুলো।
অজয়ের চোখ দুটোও ছল-ছল করে ওঠে— বিমান কিছু বলবে না তো?
—ও জানতেই পারবে না। আমি একটু দেখেই আবার তোকে দিয়ে দেব। তুই বিমান ফেরার আগেই রেখে চলে আসবি। অজয় ঝাপসা চোখেই অপর্ণার দিকে তাকিয়ে বলে, তুমি একটু বোস, আমি নিচের থেকে ছবিটা নিয়ে আসি।
অজয় নিচে নামে। ছবিটা হাতে নেয়, কিন্তু সিঁড়ি দিয়ে উঠতে যাবে এমন সময় বাইরের দরজা খুলে বিমান আসে সঙ্গে মিঠু। অজয় থমকে যায়, তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে বিমান ও মিঠু আর তার হাতে ধরা থাকে সেই ফটো। সেখানে কাকার পাশে বসে সোনামা। সোনামার চুলের গোছাটা ঢেউয়ের মত সামনের দিকে ছড়ানো থাকে। অজয়ের চোখ দুটো সেই ঢেউয়ের ভেতর আটকে যায়।