রূপুর সূর্য

কাল্পনিক চিত্র

সুব্রত সরকার

রূপুূদের বাড়ির সামনে সুন্দর ছোট্ট একটা পুকুর আছে। সেই পুকুরের জলে আবার কত কচুরিপানার ফুল ফুটে থাকে। নীল নীল ফুলগুলো দেখতে
খুব সুন্দর।

রূপু দিদুনের সঙ্গে গিয়ে কতবার কচুরিপানার ফুল তুলে এনে বাড়িতে পুতুলখেলা করেছে। দাদু ওর খেলার সাথী। দাদু কখনো ঘোড়া হবে। কখনো দাদু ডাকাত, আবার কখনো দাদু ভূত হয়ে ভয় দেখাবে। দাদু অনেক ছড়াও জানে। পুতুলের বিয়ের গান জানে। দিদা গল্প বলতে পারে খুব ভালো। ঠাকুরমার ঝুলির কত গল্প রূপু দিদুনের কাছে শুনে শুনে মুখস্থ করে ফেলেছে।


মা তো জানে না এ কথা। রূপু যে কচুরিপানার ফুল নিয়ে এসে খেলে। তাহলে খুব বকবে। বলবে, ‘ওসব জংলা গাছের ফুলে একদম হাত দিবি না। হাতে ইনফেকশন হবে। স্কিন ডিজিজ হবে।’ বাবা খালি বলে, ‘ওই ডোবাটার জন্যই বাড়িতে যত মশা, মাছির উপদ্রব। আর হেলে সাপের জ্বালাতন।’
‘পুকুরকে ডোবা কেন বলে দাদু’, রূপু দাদুকে একদিন প্রশ্ন করে। দাদু হেসে বলেছিল, ‘পুকুরের ভাইকে ডোবা বলে। পুকুর হল বড়। ডোবা হল ছোট।’
‘ও!’ রূপু খুব খুশি হয়ে বলেছিল, ‘এই ডোবা-ভাইটা খুব ভালো। ও আছে বলে আমি কত কচুরিপানার ফুল পাই। ওখানে গেলে কত ফড়িং দেখি।’
দিদুন বারান্দায় রোদ্দুরে বসে উল বুনছিল। রূপুর কথা শুনে বলল, ‘তোমার ডোবা-ভাই আর বেশিদিন থাকবে না।’
‘থাকবে না!.. কোথায় চলে যাবে ডোবা-ভাই?’ রূপু মন কেমন করে জানতে চায়।
‘সহদেবের মা বলছিল, এ ডোবা নাকি ভরাট হয়ে যাবে এবার।’
‘তোমার সহদেবের মা সবজান্তা!’ দাদু হঠাৎ কেমন রেগে গিয়ে বলল।
রূপু দাদু-দিদার এই সব কথা ঠিক যেন বুঝতে পারে না। খুব অসহায় হয়ে বলে, ‘ও দাদু, ও দিদুন তোমরা কী বলছো আমাকে ভালো করে বলো না!’

একদিন সত্যি সত্যিই রূপুর শখের ডোবাটা হারিয়ে গেল। একটু একটু করে মাটি ভরাট করে ওটা একটা জমি হয়ে গেল প্রথমে। পাশে ছিল খালি একটা জমি। ডোবা ভরাট হয়ে ওটার সঙ্গে জুড়ে একটা লম্বা জমি হয়ে গেল।

রূপু আর দিদুনকে নিয়ে কচুরিপানার ফুল তুলতে যায় না। দাদু বারান্দায় চুপ করে উদাস হয়ে বসে থাকে। আগে ওই ডোবায় কত রকম পাখি আসত। দাদু পাখি দেখতে খুব ভালোবাসে। পাখিদের চেনেও দাদু। মাছরাঙা পাখিরা সবচেয়ে বেশি আসত।

রূপুর মন খারাপ কাটানোর জন্য দিদা ওকে ছবি আঁকার খাতা দেয়। ছবি আঁকা শেখায়। ঠাকুরমার ঝুলির গল্পগুলো আবার বলে। ঈশপের গল্পগুলো পড়ে শোনায়। বীরবলের গল্পও বলে। দিদুনের মুখে গল্প শোনা খুব মজার।

দাদুর শরীরটা এখন ভালো নেই। অল্পতেই ঠান্ডা লেগে কাশি-জ্বর হয়। বারান্দায় বসে দাদু রোদ পোহায়। শরীরে রোদ লাগানো ভালো। বাড়ির বারান্দাটায় সারাদিন রোদ লুটোপুটি খায়। সামনে ডোবাটা ছিল। এখন ভরাট হয়ে গিয়ে মাঠ হয়েছে। সেখানে অনেক বাচ্চারা ফুটবল খেলে। ঘুড়ি ওড়ায়। দাদু বারান্দায় বসে ওদের খেলা দেখে, ঘুড়ি ওড়ানো দেখে খুব মজা পায়।

দিদুনের নতুন সোয়েটার বোনাটা হয়ে গেছে। এবার শীতে রূপু প্রথম ওটা পড়ে চিড়িয়াখানায় যাবে। মা বলেছে, রূপুকে ইকো পার্কে একদিন নিয়ে যাবে। বাবা বলেছে, ‘রূপু এবার শীতে একদিন আমরা লংড্রাইভে যাব।’ বাবার নতুন গাড়ি। খুব আনন্দ। সবাই মিলে বেড়াতে যাবে। বাবা লংড্রাইভ খুব পছন্দ করে।
রূপুর এখন স্কুল, ছবি আঁকা, দিদুনের কাছে ঠাকুরমার ঝুলির গল্প শোনা আর দাদুর কোলে বসে গল্প করা। এভাবেই দিনগুলো কাটে।

পুজোর ছুটিতে রূপুরা বেড়াতে গিয়েছিল ডুয়ার্সের জঙ্গলে। খুব আনন্দ করেছে সবাই। অনেক হাতি দেখেছে জঙ্গলে। কত সুন্দর সুন্দর চা বাগান দেখেছে। লিস-ঘিস এমন নামের দুটো নদী দেখেছে। চা বাগানে লুকিয়ে থাকা একটা অজগর সাপও দেখেছে। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের লোকেরা কী সুন্দর অতবড় অজগর সাপটাকে ধরে বস্তায় ভরে নিয়ে চলে গেল। রূপু দেখে তো অবাক হয়ে গেছে। কী সাহস ওদের! রূপু শুনেছে, এই অজগরকে গভীর জঙ্গলে আবার ছেড়ে দিয়ে আসবে ওরা!

ডুয়ার্স বেড়ানো শেষ করে বাড়ি ফিরে এসে রূপুরা দেখে ডোবা ভরাট হয়ে যাওয়া মাঠটায় একটা বাড়ি হচ্ছে! কেমন হঠাৎ শুরু হয়ে গেল বাড়িটা। দেখে মনে হলো বিরাট একটা ফ্ল্যাট বাড়ি হবে!

তার পর সত্যিই আস্তে আস্তে বড় একটা ফ্ল্যাট বাড়ি হয়ে গেল। বাবা বলল, ‘জি প্লাস ফাইভ।’ রূপুদের বাড়ির সামনেটা একদম ঢাকা পড়ে গেল। এখন আর আলো, রোদ, বাতাস আসে না। সারাদিন কেমন অন্ধকার হয়ে থাকে। দাদু বারান্দায় আর বসে না। দিদাও বারান্দায় বসে উল বোনে না। রূপু ছবি আঁকে ঘরে বসে। লাইট জ্বেলে। মা একদিন খুব রেগে গিয়ে বলল ‘এসব ফ্ল্যাট কী করে পারমিশন পেল?’ বাবা বলল, ‘ডোবা কনভার্ট করে বাস্তু করে নেওয়া হয়েছে নিশ্চয়ই।’

রূপু এসব কথা ঠিক বোঝে না। ওর খুব মন খারাপ হয়ে থাকে। পাশ করে নতুন ক্লাসে উঠেছে। পড়ার চাপ বেড়েছে। ঠাকুরমার ঝুলির গল্প আর শোনা হয় না। দিদুনের সঙ্গে কচুরিপানার ফুল আনার কথা তো ভুলেই গেছে।

দাদু সারাদিন কেমন চুপ করে থাকে। আলো ঝলমলে সেই বারান্দায় এখন সূর্যের আলো এসে আর পড়ে না। সূর্যকে যেন কেড়ে নিয়েছে ওই নতুন ফ্ল্যাট বাড়িটা!

আজ রবিবার। ছুটি। বাড়িতে সবাই আছে। রূপু ঘরে বসে ছবি আঁকছে। বাবা বলেছে এবার ওকে আঁকার স্কুলে ভর্তি করে দেবে। সাঁতার শেখাতে নিয়ে যাবে রকিল্যান্ড ক্লাবে। মা বলেছে, ক্যারাটেও শেখাবে। দিদুনের খুব শখ রূপু যেন গান শেখে। দিদুন গান শুনতে খুব ভালোবাসে। দাদু তেমন কিছু বলে না। একদিন শুধু বলেছিল, ‘তুমি বড় হয়ে ভালো মানুষ হও।’

রূপুর ছবি আঁকা হয়ে গেছে। আঁকা শেষ হলেই ও সবাইকে দেখাবে কী এঁকেছে। আজও আঁকা শেষ হতেই মার কাছে গেল। মা তখন ওয়াশিং মেশিনে কাপড় কাচা নিয়ে ব্যস্ত। তাই বলল, ‘তুই আগে বাবাকে দেখা। আমি পরে দেখছি।’ রূপু বাবার কাছে গেল। বাবা বলল, ‘তুই আগে দিদুনকে দেখা। আমি কাগজটা একটু দেখে নিই। শেয়ার বাজারের খবরটা জানা দরকার।’ দিদুন আর দাদু তখন ঘরে বসে টিভি দেখছিল। সিরিয়াল। রূপু ঘরে ঢুকেই গম্ভীর হয়ে বলল, ‘তোমরা কি আমার আজকের আঁকাটা দেখতে চাও?’

‘ওমা কেন চাইব না? দাও দাও দেখি’ বলে দিদুন হাত বাড়িয়ে দিল। দাদু টিভির সাউন্ড অফ করে বলল, ‘দাও, আমাকেও দাও একটু দেখি আমার রূপুসোনাবনু কী এঁকেছে?’

রূপুর আঁকার খাতাটা নিয়ে দাদু-দিদুন একসঙ্গে দেখছে। ওরা কেমন অবাক হয়ে দেখছে। বাবা হঠাৎ ঘরে এসে বলল, ‘তোমরা কী দেখছো?’
দাদু গম্ভীর হয়ে বলল, ‘রূপুর আঁকাটা দেখছি।’
‘কী এঁকেছে ও আজ?’
দিদুন বলল, ‘দেখ ও কেমন দুটো সূর্য এঁকেছে একটা আকাশে।’
‘মানে!’ বাবা হাসতে হাসতে বলল, ‘তুই জানিস না সূর্য-চন্দ্র তো একটা
করে হয়।’
রূপু কেমন গম্ভীর হয়ে থাকে। দাদু
কাছে নিয়ে বলে, ‘তুমি বলো দুটো সূর্য
কেন এঁকেছো?’
‘আমাদের বারান্দায় তো সূর্যের আলোটা আর আসে না। ওই ফ্ল্যাটবাড়িটায় সূর্যটা আটকে গেছে।’
‘মানে!’ বাবা এবার বলল, ‘তাই তুই দুটো সূর্য এঁকেছিস!’
‘আকাশে দুটো সূর্য থাকলে আমরাও আলো পাব। রোদ পাব।’ রূপু বেমালুম বলে দিল কথাটা।
দাদুর কোলে রূপু এখন বসে আছে। দিদুন আদর করে বলল, ‘তুমি এত সুন্দর করে ভাবতে শিখেছো। এতো রূপকথার গল্পের মত।’
বাবা হাসতে হাসতে চলে গেল মাকে ডেকে আনতে, ‘শুনছো তোমার মেয়ের ভাবনার কথা!’
দাদু বলল, ‘রূপুসোনাবনু, এবার থেকে তাহলে আমাদের বারান্দায় আবার রোদ আসবে?’
‘হ্যাঁ। আসবেই তো। কী মজা!’
দিদুন হাসতে হাসতে বলল, ‘দাঁড়া, আমি তাহলে বারান্দাটাকে আগে বলে আসি, তোর এই দুটো সূর্যের কথাটা। ওরও কত আনন্দ হবে!’