প্রকৃত বন্ধু

কাল্পনিক চিত্র

দীপ্র দাসচৌধুরী

বিল্টুর চোখ জানালার বাইরে। ক্লাসের পড়ায় ওর একদম মন নেই। অঙ্কের রতন স্যার পড়িয়ে যাচ্ছেন বীজগণিতের এক জটিল সমীকরণ। কিন্তু, বিল্টুর ওসব দিকে পরোয়া নেই। বিল্টু দেখছে গাছের পাতায় কেমন রোদ এসে ঝিকিমিকি খেলা খেলছে, কেমন করে বাবুই নিজের বাসা বানাচ্ছে, কেমন করে ছেলেকে কোলে তুলে এক মা কাজে যাচ্ছেন। প্রকৃতির বিভিন্ন জিনিস দেখতে বিল্টুর খুব ভাল লাগে। জটিল অঙ্কের থেকে বিল্টুকে নিরাময় দেয় এই দৃশ্যগুলো। এগুলো দেখতে দেখতে বিল্টু হারিয়ে যায় কল্পনার জগতে।

বিল্টু স্থির চোখে দেখছে সব। হঠাৎ একটা চকের টুকরো এসে পড়ল ওর বেঞ্চে। বিল্টু সামনে তাকাতেই দেখল অঙ্কস্যার এবং সমগ্র ক্লাস ওর দিয়ে তাকিয়ে আছে। স্যার পড়াতে পড়াতে কখন থেমে গেছেন বিল্টু খেয়াল করেনি। স্যার কটমট করে তাকিয়ে আছেন ওর দিকে। ও তাকাতেই স্যার ধমকের সুরে বললেন, ‘কী রে গাধা, কোথায় তাকিয়ে আছিস এমন করে?’


বিল্টু আমতা-আমতা করে কিছু বলতে গিয়েও পারল না। ক্লাসের বাকি বন্ধুরা মুখ টিপে হাসছে। ক্লাসের ফার্স্ট বয় ঋভু হাসতে হাসতে বলল, ‘ও আকাশের মেঘ গুনছে, স্যার।’

স্যার এটা শুনে আরও রেগে গিয়ে বললেন, ‘অ্যাই বিল্টু সামনে আয়…।’ বিল্টু ধীর পায়ে এগিয়ে গেল স্যারের দিকে। তারপর স্যার আচ্ছা করে কানমলা দিয়ে ওকে ক্লাসের বাইরে বের করে দিলেন। বিল্টুর ক্লাসের বাইরে যেতে মন্দ লাগে না। সেখানে দাঁড়িয়েও ও দিব্যি নিজের কল্পনার জগতে ডুব দিতে পারে। কিন্তু ওর খারাপ লাগে অন্য জায়গায়। ক্লাসের বেশিরভাগ বন্ধুরা ওর সঙ্গে মেশে না। ওকে ক্যাবলাকান্ত ভাবে। ফার্স্ট বয় ঋভুও কোনোদিন ওর সঙ্গে মেশেনি। বরং উল্টে একটুতেই ওকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করে।

একটু পরে স্কুলে ছুটির ঘণ্টা বেজে উঠল। সবাই ব্যাগ নিয়ে লাইন করে বের হচ্ছে। এমন সময় বিল্টু দেখল একটা পাখি তার ছানাকে মুখে করে কিছু একটা খাইয়ে দিচ্ছে। বিল্টু লাইন ভেঙে গাছের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। অনেকক্ষণ ধরে দেখতে থাকল পাখিটির কার্যকলাপ। কী মুগ্ধতাই না আছে প্রকৃতির প্রতিটা কাজে! ক্লাস সিক্সের বিল্টু বিস্মিতভাবে এই সত্যকে বুঝতে পারলেও, বড়রা পারে না। তাই বিল্টুর মায়েরও ওকে নিয়ে খুব চিন্তা। ওর বাবা নেই। ওকে নিয়ে ওর মায়ের অনেক স্বপ্ন। কিন্তু প্রতিবছর বিল্টুর নম্বর ক্রমশ কমছে। টিউশন দিয়েও কোনও লাভ হচ্ছে না।

‘আরে বিল্টুবাবু, তুম ইহা ক্যায়া কর রহে হো’— দারোয়ান শিবুকাকুর ডাকে বিল্টুর হুঁশ ফিরল। বিল্টু বলল, ‘না কাকু আসলে একটা…।’ বিল্টুকে শেষ করতে না দিয়েই শিবুকাকু বললেন, ‘আরে জলদি যাও ঘর, স্কুল কা সব বাচ্চালোগ বহত পহলেই নিকাল গ্যায়া।’

বিল্টু এটা শুনেই দৌড় লাগাল বাড়ির উদ্দেশে। ওর বাড়ি স্কুল থেকে বেশি দূরে নয়। পায়ে হেঁটে পনেরো মিনিটের মতো। বিল্টু হাঁটতে হাঁটতে এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে বাড়ি ফিরছিল। হঠাৎ দেখল এক জায়গায় ভিড় জমেছে। বিল্টু কৌতূহলবশত ছুটে গেল সেখানে। গিয়ে চমকে উঠল। ক্লাসের ফার্স্ট বয় ঋভু পড়ে আছে মাটিতে, পাশে পড়ে রয়েছে ওর সাইকেল। ঋভুর সঙ্গে কিছু একটা দুর্ঘটনা ঘটেছে, সেটা বিল্টু বুঝতে পারল। ঋভু নিজের বাঁ হাতটাকে ডান হাত দিয়ে ধরে খুব কাঁদছে। আর ওর পায়ের দিকটাও বেশ কেটে গেছে। এত লোকের ভিড়ে ঋভু আরও ভয় পেয়ে গেছে। বিল্টু ঋভুকে এই অবস্থায় দেখে জিজ্ঞেস করল, ‘কী রে ঋভু, তোর কী হয়েছে?’

ঋভু বিল্টুকে দেখে যেন বুকে বল পেল। এতক্ষণ ধরে যে ভয়ের মধ্যে ও ছিল, তা বিল্টুকে দেখে কিছুটা কেটেছে। বিল্টুকে দেখে ঋভু বলল, ‘একটা বাইক বেকায়দায় সামনে এসে পড়েছিল। আমি বাঁচাতে গিয়ে পড়ে গেছি। আমার হাতটা বোধহয় ভেঙে গেছে! আমি সাইকেল চালাতে পারব না। কী করে বাড়ি যাব?’

ভিড়ের মধ্যে থেকে একটি লোক বলল, ‘তোমার বাড়ির ঠিকানা দাও, দেখছি কী করা যায়। অন্তত গার্জেনের ফোন নম্বরটুকু দাও। তুমি তো ঠিক করে কিছুই বলতে পারছ না।’

এটা শুনে বিল্টু বলল, ‘আমি ওর বাড়ি চিনি। ওকে সাইকেলে বসিয়ে আমি নিয়ে যেতে পারব।২ একবার ঋভুর জন্মদিনে ওর বাড়ি গিয়েছিল বিল্টু। তাও দু’বছর আগে। সেটা বিল্টুর মনে আছে।
লোকটি বলল, ‘পারবে তো ওকে চাপিয়ে নিয়ে যেতে? দেখো, ফেলে দিও না।’ বিল্টু আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ইতিবাচক মাথা নাড়াল। তারপর সামনের ওষুধের দোকান থেকে সবাই মিলে ঋভুকে হাতে ব্যান্ডেজ করে দিল সাময়িকভাবে, আর পায়েও কিছুটা মলম লাগিয়ে দিল। প্রাথমিক চিকিৎসার পর বিল্টু ঋভুকে সাইকেলের পেছনে বসিয়ে নিয়ে গেল বাড়ি অবধি। ঋভুর মা-বাবা ঋভুর এই দশা দেখে প্রথমে শিহরিত হলেও পরে বিল্টুকে অনেক অনেক ধন্যবাদ দিলেন। ঋভুও বুঝল বিল্টু ওর প্রকৃত বন্ধু। সবাই পড়াশোনায় সমান হয় না, কিন্তু তা বলে কাউকে নিয়ে ঠাট্টা করতে নেই। নিজের কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হল ঋভু। বিল্টু ছেলে হিসেবে খুব ভাল। ঋভু মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল যে কোনদিন বিল্টুর সঙ্গে বন্ধুত্ব নষ্ট করবে না এবং ওকে নিয়ে হাসাহাসিও করবে না। আজ থেকে বিল্টু ওর বেস্ট ফ্রেন্ড, জীবনের প্রকৃত বন্ধু।