নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায়
শালিক পাখি, ওই দেখা যায় তিনটে, চারটা… পাঁচটা। পাঁচটা? আরও নিশ্চয়ই থাকতে পারে ঝোপে ঝাড়ে, ডালপালায়! হঠাৎ ছোটবেলার একটা ছবি মনে পড়তেই কিশলয় ফিক করে হেসে ফেললো। স্কুলের বন্ধুদের কেউ একজন যেন বলেছিল, শালিকরা জোড়ায় জোড়ায় থাকে। মাত্র পাঁচটা হতেই পারে না। এদিক সেদিক চেয়ে দ্যাখ, অন্তত আরেকটা… ছয়টা থাকতেই হবে!
‘…হ্যাঁ, তার মানে তিনগুণ আনন্দ! টু ফর জয় যদি প্রবাদ হয়, তাহলে সিক্স ফর এক্সটাসি!’ নবেন্দু নতুন শিখেছে শব্দটা। চান্স পেয়েই প্রয়োগ করলো। হেসে উঠলো সবাই—
একদম অন্য ছবিও কিশলয়ের মনে আসে পাশাপাশি। এই মাঠে, ঠিক এই জায়গাটাতেই। ক্লাস সিক্সের ফাইনাল পরীক্ষার রেজাল্ট বেরনোর দিন, ঘুম থেকে উঠে বারান্দায় এসেই দেখল, তিড়িক তিড়িক লাফাচ্ছে একটামাত্র শালিক, একা একা। মন খারাপ হয়ে গেল এতটাই, যে মনে হল, ক্লাস সেভেনে প্রমোশান পাবো তো? জিওগ্রাফিতে ও ফেল করতেই পারে। স্যারের চোখদুটো সবসময়েই কেমন লাল লাল। দেখলেই ভয় করে। ক্লাসে মন বসে না। অঙ্ক নিয়ে তো আরও গণ্ডগোল, বিষয়টাকে প্রথম থেকেই ভয় পেয়ে এসেছে… মা আরও ভয় দেখাচ্ছেন, সেভেনে উঠলেই অঙ্কের জন্য টিউটর রেখে দেবেন বলে। সেভেনে আগে উঠুক তো!
সব ব্যাপারে সবসময়ে উত্তেজিত হয়ে থাকা মায়ের স্বভাব। আর কারও মা হলে কিশলয় কাছেই ঘেঁষত না! বাবাকে কথাটা বলতে, হোহো করে হেসে উড়িয়ে দিতে চেয়ে বুঝিয়েছেন, মা আসলে ব্যাঙ্কে কাজ করেন তো… সারাদিন অঙ্ক করতে হয় বলে মাথাটা গরম হয়ে থাকে। তার ওপর ব্যাঙ্কে এখন কাজ বেশি, লোক কম…!
কিশলয়ের ওসব বোঝার কথা নয়, কিন্তু ব্যাঙ্কের ভেতর কয়েকবারই ও ঢুকেছে, ক্লাস ওয়ান টু থ্রির ছোটবেলাতেও। চিড়িয়াখানায় কতরকম জীবজন্তু ও দেখেছে খাঁচার মধ্যে, আর ব্যাঙ্কে আস্ত দুটো মানুষ! মামাবাড়িতে গিয়ে কথাটা ও যেভাবে বলেছিল, তাতে বড়রা হাসাহাসি করেছিলেন খুব। কেউ বোঝেননি যে কিশলয় আসলে নিজের ভয়টাই বলতে চাইছে। চিড়িয়াখানার প্রাণীরা তো একই জায়গায় থাকে, যাকে বলে এনক্লোজার। কিন্তু খাঁচার এই মানুষগুলোই যে রাস্তাঘাটে, বাসে-ট্রেনে, মলে-বাজারে, ফ্ল্যাটে-ফ্ল্যাটে থাকছে… চিৎকার চ্যাঁচামেচি করছে!
কিশলয়ের মনের কথা, ওই বাড়িতে, হয়তো বুঝতেন শুধু ওর কুট্টিমামা। বুঝিয়েছিলেন, সবাই তো আর ব্যাঙ্কে কাজ করতে যায় না! অফিসের কাজ, দেশের কাজ কতরকমের হয়। তোর বাবাকেই দ্যাখ না, কত ছেলেমেয়েদের পড়ান…
‘উঁহু! বাবা তো গল্প করেন! আমার চেয়ে অনেক বড় ছেলেমেয়ে ওরা, দেখেছি, বাড়িতেও আসে কেউ কেউ…’
‘ধুসস! আসলে কেউ বড় হয়না, বড়োর মতন দেখায়!’ কুট্টিমামা বলেই চলেন, ‘ছেলেটা খুব ভুল করেছে শক্ত পাথর ভেঙে, মানুষ ছিল নরম, কেটে ছড়িয়ে দিলে পারতো… কেমন গল্প গল্প লাগে না? শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের নাম শুনেছিস? বড় হয়ে…’
—‘জানি। বাবা তো এমন গল্পের মতন, কবিতার মতন কতো কী শোনান আমাকে, কিন্তু কবে যে বড় হব!’
‘তোর মাথা যেদিন আকাশ ছোঁবে! যাকগে, সেসব তো মামাবাড়ির মাঝি নাদের আলি জানে। তুই এখনই জেনে কী করবি… স্কুল-কলেজের লেখাপড়া তো আগে শেষ কর, তারপর বরং…’
কুট্টিমামা আকাশের ওপারে চলে গেছেন অসময়ে। কিশলয়ের কলেজ শেষ না হতেই। নানারকম দুষ্টুমির পাশাপাশি, তাঁর ভালো ভালো কথাগুলোও মনে পড়ে থেকে থেকে। গরমের ছুটিতে কিশলয়ের চেয়েও ছোট ছোট ভাগ্নে-ভাগ্নিদের মুখোশ পরে ভয় দেখানো, কি ঘরের মেঝেতে কালো কাগজের কুমীর ছেড়ে দেবার জন্য বকুনি খেতেন বড়দের কাছে। তবু, দুষ্টুবুদ্ধি তাঁর অফুরন্ত। মুখোশ, কুমীর, প্লাস্টিকের শাকসবজি নিয়ে খেলার পালা চুকলে, সিরিয়াস মুখে বাচ্চাদের কাছে তিনি বলতেন, এই আমি কিন্তু আমি না! দেখতে আমার মতন, কিন্তু আসলে মানুষের চেহারায় এসেছি ওই অনেক দূরের একটা গ্রহ থেকে…
নির্দিষ্ট কোনও গ্রহের নাম না করে, নিজেকে এলিয়েন কি ভুতপ্রেত বলে বোঝালে, বাচ্চারা ভয় পাবেই! বরং কিশলয় সেই রহস্য হালকা করে দিতে বলেছে, ‘হ্যাহ! তুমি আমিনা? দাদু তাহলে গফুর? মহেশ নামের গোরুটাই বা কোন খুঁটোয় বাঁধা?’ শরৎচন্দ্রের গল্প অনেকেই জানে, কিন্তু বড় হতে হতে কিশলয় বোঝে, এমন অনেক কথা উনি বলতেন, যা ছোটদের বোঝার কথা নয়!
ষাঁড়ের মতন মাথা আর ল্যাজ, কিন্তু শরীরটা মানুষের, এমন এক রাক্ষসের কবল থেকে কিছু মানুষকে বাঁচিয়ে, দূরে নির্জন দ্বীপে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন এথেন্সের রাজা থিসিয়াস। ষোলশো বছর আগেকার কথা। আসলে, ভয়ের থেকে প্রজাদের বাঁচাতে চেয়েছিলেন সেই রাজা। তাঁর সম্মানে, সেই সমুদ্রযাত্রার উদযাপন হতো প্রতি বছর। দিনে দিনে জাহাজের কাঠ পচে গেল, হাল ভাঙল, পাল ছিঁড়ল। নতুন করে বানাতে হল সবকিছু। তখন কথা উঠলো, এটা তো একদম নতুন এক জলযান। থিসিয়াসের জাহাজ কি বলা যায় একে? কিছু কিছু স্পেয়ার পার্টস থাকলেও?
ইংরেজ দার্শনিক হবস, আরও জটিল করে দিলেন ব্যাপারটা। বারোশো বছর পর। মূল কথাটা, হেরাক্লিটাস নামের দার্শনিক থেকে আজ অবধি অনেকেই বলেছেন : এক নদীতে দুবার স্নান করতে পারি না আমরা। নদীটা এক, ঘাটও একই, কিন্তু জলের স্রোত যে নিরন্তর বয়ে চলেছে! নদী যেমন নিত্য নিজেকে পাল্টে নিচ্ছে, এই আকাশ, মাটি, সসাগরা পৃথিবীও যে তাই! মানুষের প্রকৃতিও তার থেকে আলাদা হতে পারে নাকি? দুনিয়ার সবকিছু নিত্য পরিবর্তনশীল। আসল কথা হচ্ছে সমস্ত ভয় আর দ্বিধা সরিয়ে, নিজেকে নতুন করে পাওয়া… এই জনমে ঘটালে মম জনম–জনমান্তর… গানের সুরেই যদি দেখি… অকটিলিওন, সংখ্যাটা মিলিয়ন বিলিয়নের থেকে কত বেশি? সাতের পিঠে সাতাশটি শূন্য বসলে যা হয়! মনে রেখে দিয়েছে কিশলয়, কুট্টিমামা যা বলতেন। ঠিক তত পরিমাণ পরমাণুতে তৈরি আমাদের শরীর। রোজকার সমস্ত কাজকর্ম, সমস্ত চলাফেরায় সেই পরমাণু নিজেদের নিত্য পাল্টে নেয়। প্রকৃতিতে, প্রাণীজগতে এই আশ্চর্য চলাচল… কেউ কারও থেকে আলাদা নয়! সবাই আমরা থিসিয়াসের জাহাজের যাত্রী! কাজেই, আমি যে আমি নই, কথাটা কি ভুল?
তিড়িক তিড়িক লাফাচ্ছে চার-পাঁচটি শালিখ। ছোটবেলা থেকে কিশলয়ের বড়বেলা ছুঁয়ে।