বাতিঘর

সুব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়

এতক্ষণ তবু ঘটাং-ঘটাং শব্দ করে সিলিং ফ্যানটা চলছিল। এবার ক্যাঁচ করে জোর শব্দ তুলে ওটা পুরো থেমে গেল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ঘুম ভেঙে যায় রঞ্জনের। একটানা একটা শব্দের আবহে থাকতে থাকতে মস্তিষ্ক একসময় তাতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। ফলে ঘুম এসেছিল। এখন সেই আওয়াজ থামতে মাথায় আর কোনও শব্দের অনুরণন নেই। কাজেই জেগে যায়। পাশে সৌমিলিরও ঘুমের দফারফা। রঞ্জন হতাশ গলায় বলে, পাখাটা যে এত তাড়াতাড়ি যাবে, বোঝা যায়নি। এখন তো দারুণ মুশকিল হল।

যাই, পাশের ঘর থেকে টেবিল ফ্যানটা আনি। সৌমিলি ক্ষুণ্ণ স্বরে বলে।
না, না, আমি যাচ্ছি, রঞ্জন খাট থেকে নামে।


হাওড়ার শিবপুরে অন্নপূর্ণা হাউসিংয়ে চারতলায় থাকে ওরা। বাড়িটা পাঁচতলা। ওদের সাতশো স্কোয়ার ফুটের ফ্ল্যাটে আলো বাতাস অঢেল। ফলে এসি নেয়নি। কাছে গঙ্গা হওয়ায় এত হাওয়া দেয় যে, পাখাতে দিব্যি চলে যায়। তাও পুজোর পর পাখারও প্রয়োজন পড়ে না। রঞ্জন ডব্লিউবিসিএস অফিসার। রাজস্ব বিভাগে আছে। আর সৌমিলি স্থানীয় এক ইংরাজি স্কুল লিটল স্টারে পড়ায়। নেহাতই শখ। সময়টা ভালো কাটে ছোট বাচ্চাদের উজ্জ্বল সান্নিধ্যে। প্রায় আট বছর বিয়ে হয়ে গেলেও ওদের কোনও ইস্যু নেই। সৌমিলি অনেকবার বলতে ডাক্তারের কাছে গিয়েছিল ওরা। তিনি তো নানারকম টেস্ট করে রিপোর্ট নিয়ে ফের যেতে বলেছিলেন।

তবে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন স্বামী বা স্ত্রী দুজনের যে কারো ত্রুটি থাকতে পারে। এরপর টেস্ট করিয়ে ফের আবার ডাক্তারের কাছে যাওয়া আর হয়ে ওঠেনি। উদ্যোগের অভাব প্রধানত রঞ্জনের। মনের কোণে চিন্তা ঝাপটায় যদি তারই ত্রুটি বেরোয় পরীক্ষায়, তবে তা মনেতে বিশেষ দাগা হয়ে থাকবে। কী দরকার খুঁচিয়ে ঘা করার।

পাশের ঘর সামান্য ছোট, বারো বাই তেরো হবে। আলো জ্বালতে ভেতরের সব জিনিস দৃষ্টিতে ধরা দেয়। এককোণে ছোট খাট, পাশে টেবল ফ্যান। আর একপাশে শো-কেস, টেবিলে বইপত্র, খাটের পাশে বাঁকুড়া থেকে আনা ঘোড়া। দেওয়ালে রঞ্জনদের বাঁধানো ছবি টাঙানো। বিয়ের পরপরই তোলা হয়েছিল। খাটের পাশ থেকে টেবিল ফ্যান নিতে গিয়ে মেঝেতে একটা ছোট প্লাস্টিক ছেঁড়া নজরে আসে। কী ওটা ঝকমক করছে? হেঁট হয়ে প্লাস্টিকটা কুড়োতে গিয়ে রঞ্জনের মাথা ঝনঝন করতে থাকে। কন্ডোমের ছেঁড়া প্যাকেট, ভেতরের জিনিসটা নেই।

হয়তো ব্যবহার হয়েছে, কেবল খালি প্যাকেট রঞ্জনের বুক খালি করে দেয়। ওটা কি ওখানেই রেখে দেবে যেমন ছিল? পরক্ষণেই মনে হয় প্যাকেট নিশ্চয়ই সৌমিলি ভুল করে ফেলে রেখেছে। মানে এটার আর কোনও অস্তিত্ব নেই ওর কাছে। এখন যদি খালি প্যাকেট সে ফেলে রেখে যায় তবে সৌমিলি যখন সেটা নজর করবে তখন সারাক্ষণ চিন্তা করবে, রঞ্জন দেখে ফেলেছে কি না। তার চেয়ে যেটা ভুলে গেছে তা ভুলেই যাক। এইরকম চিন্তা ঝটিতে মাথায় খেলে যেতে সে প্যাকেটটা কুড়িয়ে নিয়ে পাজামার পকেটে চালান করে। পরে সুবিধেমত পাচার করা যাবে।

টেবিল ফ্যান চালু হতে খানিক বাদেই ঘুমিয়ে পড়ে সৌমিলি। কিন্তু রঞ্জনের চোখের পাতা আর জুড়তে চায় না। এমন এক দৃশ্য তার গোচরে এসেছে যে, খানখান হয়ে যাচ্ছে হৃদয়ের অন্তরস্থল। চেঁচিয়ে উঠতে ইচ্ছে করছে আবার পরক্ষণে মনে হচ্ছে সত্যিসত্যি সৌমি এমন কাজ করবে? সন্তান তো অনেকেরই হয় না। তারা কী সবাই এমন দ্বৈত জীবনযাপন— আর ভাবতে পারে না।

এবার তাহলে দত্তক নিতে হবে, যা একদম তার না পসন্দ। আচ্ছা, লোকটা কে হতে পারে? স্কুলেরই কেউ হবে হয়তো। ওই লিটল স্টারের পাইন বলে যে লোকটি আছে— ওহ্‌, মহা ধড়িবাজ একটা। সবসময় চোখমুখে কথা বলছে, পৃথিবীর সব জ্ঞান যেন ওর করায়ত্ত। বেটা বোধহয় ওই স্কুলের মালিক, যা কেউকেটা হাবভাব? একদম পছন্দ হয়নি রঞ্জনের। কিন্তু করবেই বা কী? সারাদিন বাড়িতে বসে সময় কাটাবে কী করে সৌমিলি? এটা তো আয়ের জন্য নয়, বাচ্চাদের নিয়ে মেতে থাকা। আর সেই মেতে থাকাতেই মাত হয়ে গেল রঞ্জন। ওহ্‌, কী যে হবে।

চিন্তায় ছটফট করতে করতে বিছানায় উঠে বসে একসময়। সন্তর্পণে মেঝেতে নেমে গুটিগুটি পায়ে বারান্দায় যায়। চারতলার উপরে বলে ঘরের দরজা খোলাই থাকে। ফাঁকা বারান্দায় বেশ হাওয়া খেলছে। রাত এখন কত? দুটো বেজে গেছে নিশ্চয়। বারান্দার রেলিঙের ধারে গিয়ে আড়মোড়া ভাঙে। দৃষ্টি মেলে দেয় দূরে। তখন নজর করে সামনের মাঠে বেঞ্চিতে কে যেন ঘুমুচ্ছে। ওদের হাউসিংয়ের পর ফুট দশেক চওড়া রাস্তা পেরিয়ে একটা পার্ক।

এখন প্রায় সব পার্ক সুন্দর করে সাজানো। দেখলে বোঝা যায় যত্নআত্তি হয় নিয়মিত। রাতে আলোও জ্বলে। ভাল করে দেখতে বোঝে লোকটা পার্কের পাহারাদার। কিছুদিন আগে ওর বউ মারা গেছে। পার্কেরই এক কোণে ঘুপচি ঘরে থাকে। সেখানে গরমে হয়তো ঘুম আসছিল না, তাই বাইরে বেঞ্চিতে শুয়ে পড়েছে। বিশাল মাঠে একলা এক মানুষ! কী ভীষণ নিঃসঙ্গ! নীচে ওই মানুষ আর চারতলার ওপর এই আর এক মানুষ। দু’জনই যে একা, ভয়ানক একা। নীচের ওই পাহারাদারের সঙ্গে বড় একাত্ম বোধ করে রঞ্জন। সহমর্মিতায় ভরে ওঠে মন। গভীর দীর্ঘশ্বাস পড়ে তার। ধীরে ধীরে ঘরে ফেরে।

বিছানায় এসে বেশ খানিকক্ষণ পর আধোঘুমে চলে যায় রঞ্জন। অগভীর ঘুমে যত কিম্ভুত স্বপ্ন ভীড় করে আসে। একটা পিকনিক পার্টিতে গেছে ওরা স্বামী-স্ত্রী। ছড়ানো বিশাল বাগানে দারুণ ঘুরছে ফিরছে, আনন্দ করছে। বাগানে একটা বড় দীঘি আছে। সেখানে প্যাডেল বোট দেখে তো ওদের দারুণ লাগে। একে পিকনিক, তায় নৌকাবিহার! ভাবা যায় না। প্রতি বোটে ছ’জন করে নেবে। কিন্তু এই বোটে উঠতে গিয়েই সারাদিনের ভালোলাগার তাল কেটে গেল। তাদের এমনই কপাল যে, সৌমিলি একটা বোটে উঠে পড়তে সেখানে ছ’জন হয়ে গেল। অগত্যা পরের বোটে রঞ্জন। দুটো বোট চলেছে আগে পিছে। কিন্তু রঞ্জনের নৌকো কিছুতে ধরতে পারছে না আগেরটাকে। হাত বাড়িয়ে যত চেষ্টা করছে তত যেন দূরে বেরিয়ে যাচ্ছে সৌমি! আর কী ওকে ধরা যাবে না? আধো ঘুমে ঘেমে নেয়ে ওঠে রঞ্জন।

পরের সকালে রোদের ছটা মুখের ওপর এসে পড়তে ঘুম ভাঙে রঞ্জনের। উঠে বসে ঘড়ি দেখে— আটটা বেজে গেছে। আজ অবশ্য কোনও অসুবিধে নেই। রবিবার। খাট থেকে নেমে বারান্দায় দাঁড়াতে চোখে পড়ে সেই মাঠ। ওখানে আট দশটা সিমেন্টের ছাতা করা আছে। তার নীচে অনেকে বসে। আবার অন্য কেউ হাঁটছে, কেউ জগিং। সোনালি রোদে ছেয়ে আছে পুরো মাঠ। কালকের রাতের সেই ফাঁকা, নেশাড়ুর মতো একাকী চিতিয়ে থাকা মাঠকে মেলানো যায় না ঝলমলে প্রাণবন্ত এই মাঠের সঙ্গে। ওহ্‌, সে নিজেও যদি ফের ঝলমল করে উঠত সামনের ওই দৃশ্যের মতো! মনের ভেতর জমে থাকা পাহাড়ের মতো ব্যথা বেদনা যদি মিলিয়ে যেত বাষ্পের মতো! আচ্ছা, সৌমি এমন কাজ করল কেন? নিশ্চয়ই বাচ্চার জন্য— এবার দত্তক নিতে হবে— নাকি টেস্ট করে দেখবে, আজকাল তো কতকিছু উপায় বেরিয়ে গেছে। তবে সৌমিলির বাচ্চার আকাঙ্ক্ষা প্রবল। এই ব্যাপারটা করিমপুর গিয়ে প্রথম বুঝতে পারে।

আজ থেকে প্রায় বছর চার আগে নদিয়ার করিমপুরে বদলি হয়েছিল রঞ্জন। সরকার থেকে অবশ্য কোয়ার্টার দিয়েছিল। এক একটা বাড়িতে চারটে করে ফ্যামিলি থাকতে পারে এমন ব্যবস্থা ওই সব কোয়ার্টারে। তা থাকা খাওয়ায় কোনও সমস্যা ছিল না, এটা যেমন সত্যি উল্টোদিকে কলকাতার জীবনে অভ্যস্ত সৌমিলি ওইরকম পরিবেশে হঠাৎ গিয়ে একদম বেমানান হয়ে পড়েছিল।

প্রাণপণে চেষ্টা চালিয়েছিল ঠিকমত সংসার করার। এই ব্যাপারে অবশ্য ওদের দারুণ দেখভাল করেছিল লছমী আর করণ। রঞ্জনদের কোয়ার্টারটা ওরাই দেখাশোনা করত। বাড়ির অন্যদিকে কেয়ারটেকারের ছোট ঘরে ওরা থাকত। ওদের তখন এক ছেলে রূপ। তা সেই রূপকে দারুণ মনে ধরেছিল সৌমিলির। বছর তিনের বাচ্চাটাকে নাড়াচাড়া করে অদ্ভুত তৃপ্তি পেত। সুযোগ সুবিধে করে নিয়ে প্রায়ই লছমীর ঘরে চলে যেত। রঞ্জন বারণ করলে গভীর দৃষ্টি মেলে বলত, কী করব ছেলেটা যে বড্ড টানে!

অবশ্য লছমী বা করণের তরফে কোনও বাধা ছিল না সৌমিলির আচরণে। বরঞ্চ ওদের ছেলে যে মেমসাহেবের নেকনজরে পড়েছে তা ভেবে গর্ব হত।

তোমায় কীরকম যেন অন্যমনস্ক লাগছে। সবসময় যেন চিন্তা করছ। কী হয়েছে বলো তো? সকালের চা দিতে এসে সৌমিলি জিজ্ঞাসা করে।

অন্যমনস্ক! না না, ও তোমার দেখার ভুল। স্তিমিত হেসে স্ত্রীর কথা পাশ কাটানোর চেষ্টা করে রঞ্জন।

দেখেছি আমি ঠিকই। কী যেন ভেবে যাচ্ছ নিজের মনে, পরিপাশ সম্পর্কে কোনও হুঁশ নেই। নিজের ভাবে বিভোর হয়ে আছো। এমনকী কাল আমি বাজার থেকে কাঁচালঙ্কা আনতে বললাম তুমি প্রথমে খেয়ালই করলে না। পরে জোরে বলতে তবে বুঝতে পারলে।

আসলে, আসলে অফিসে একটা গোলমাল চলছে। তাই—। খানিক বিরতি দিয়ে যোগ করে, সেজন্যই বোধহয় অন্যমনস্ক— ও কিছু না, কিছুদিন গেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।
ঝেড়ে ফেলার মতো করে বলে রঞ্জন।

অফিসে গোলমাল? যাহ, তাহলে তো ভয়ানক ব্যাপার? সৌমিলি আঁতকে ওঠে।
না, না অত সিরিয়াস কিছু নয় বলছি তো। ও ঠিক হয়ে যাবে। রঞ্জন আশ্বস্ত করার মতো করে বলে।
ঠিক হলেই ভাল। কিন্তু আমার চোখে যে বেঠিক ব্যাপারটাই পড়ছে। সৌমি নিজের চিন্তা গোপন করে না।

ওটা বোধহয় দেখার ব্যাপার। রঞ্জনের কণ্ঠস্বরে একটু যেন শ্লেষ মিশে থাকে, আগে যখন সবকিছু ঠিক মনে হত, পরিণত দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে তা কাটাছেঁড়া করলে অনেক খুঁত বেরিয়ে পড়ে। এটা খুবই স্বাভাবিক, আর দুশ্চিন্তার জিনিস নয় মোটে। জোর করে স্বাভাবিক বললেও গলার স্বরে অন্যরকম ভাবটা এড়াতে পারে না।

তা হলেই ভালো, যাই ওদিকে আবার রান্নাটান্না, বিস্তর কাজ পড়ে আছে। কথা না বাড়িয়ে চলে যায় সৌমিলি।

পরে কাজটাজ সারা হলে একান্তে নিজের মুখোমুখি যখন হয় সেই সময় হাজারটা চিন্তা যেন ডানা ঝাপটায় মনের মধ্যে। মুখে যতই বলুক তেমন কিছু গণ্ডগোল হয়নি, আসলে রঞ্জনের মনের ভেতরে যে দারুণ তোলপাড় চলছে, তা বেশ বোঝা যায়। অন্তত সৌমিলি বেশ বুঝতে পারে। ও কি পরশু দুপুরের ব্যাপারটা টের পেয়ে গেল? বুকে শিরশির করে ভয়ের হিমেল স্রোত বইতে থাকে। সেটাই বা কী করে হবে? কিংশুক সিগারেট খেয়েছিল, অ্যাস্ট্রে অব্দি পরিষ্কার করে ফেলেছে।

সুতরাং, সেদিক দিয়ে নিশ্চিন্ত বোধ করে সৌমি। ওহ কী যে একটা ব্যাপার ঘটে গেল। কোনওরকম ভাবনা বা প্রস্তুতির অবকাশ না দিয়ে কেমন যেন দমকা বাতাস এসে ঝাপটা মেরে গেল। চলে যাবার পর বুঝল সেই বাতাসের ব্যাপারটা। অথচ আগে একদম জানান দিল না— একেবারে অপ্রস্তুত অবস্থায় দমকা বাতাসটা তাকে পেড়ে ফেলল।

গত পরশু তাদের স্কুলের প্রতিষ্ঠা দিবস হওয়াতে বেশ খানিক আগে ছুটি হয়ে গেল। বাড়ি ফিরে এসে চান খাওয়া সেরে সবে বিছানার দিকে যাবার কথা মাথায় এসেছে ঠিক তখনই— আসলে দুপুরে একটু গড়িয়ে নিলে শরীরটা বেশ তরতাজা থাকে। এটা তার অনেকদিনের অভ্যাস। ঠিক সেই সময়েই বাইরের দরাজার কলিং বেল বেজে উঠল। আইহোল দিয়ে দেখে সামান্য সময় নিয়ে চিনতে পারে— কিংশুক। আট নয় বছর বাদে দেখা, মুখে চাপদাড়ি, চেহারায় বদল হয়েছে বিস্তর, তবু দৃষ্টি, চোখের সেই চাহনিই স্মৃতির ঝাঁপি থেকে তুলে আনে কিংশুকের পরিচয়। দরজা খুলে বলে, কী ব্যাপার? তুমি হঠাৎ?

কেন আসতে নেই? চোখ নাচিয়ে ভ্রূর একটা নিজস্ব ভঙ্গী করে কিংশুক।
আমি সেটা বলিনি। আসলে জানলে কী করে আমরা এখানে আছি? সৌমিলি জেরার মত করে বলে।

আহা, অত সব কথা দরজায় দাঁড়িয়ে বলব নাকি? লঘু স্বরে বলে কিংশুক হাসে।
ডাকলে তবে ভেতরে আসবে, এত ফরমাল কবে হলে জানি না তো। জোরালো যুক্তি জিভে এসে যেতে সৌমিলি সপ্রতিভ।

ভেতরে ছোটো ঘরে সোফায় বসতে বসতে কিংশুক বলে, আসলে সল্টলেকে এসেছিলাম কলেজের একটা কাজে। জলপাইগুড়ির এক কলেজে বটানি পড়াই এখন। তা সেই অফিসে হঠাৎ করে ইউনিভারসিটির অন্বেষার সঙ্গে দেখা। ওর সঙ্গে অনেক কথাটথার পর ওই তোমাদের ঠিকানা দেয়। তারপর তো দেখতেই পাচ্ছ চলে এসেছি।

কেমন আছি দেখতে এলে, তাই না? হঠাৎ করে সৌমির মনের ভেতরে যাচাইয়ের ইচ্ছাটা মুখে প্রশ্ন হয়ে বেরিয়ে আসে।

ঠিক তা নয়। তাহলে সত্যি করে বলি, আসলে ভালোবাসার যে রঙে আমাদের আকাশ রঙিন হয়ে উঠেছিল এখন প্রেমের সেই সূর্য অস্ত গেলেও পশ্চিম আকাশে কোনও রক্তিমাভা রেখে গেছে কিনা তাই জানতে বড় কৌতূহল হল। সেই জন্যই—

আবার সেই বড়বড় ভাষণ, সৌমিলি চোখ বড় করে, তোমার সেই কথার ধার কমেনি দেখছি।
কী আর করা যাবে, এই সব কিছু নিয়েই যে আমি। কিংশুক দুটো হাত ছড়িয়ে বলে।
বসো, চা নিয়ে আসি।

চায়ের সঙ্গে বিস্কুট আর চানাচুর বেশ তারিয়ে তারিয়ে খাচ্ছিল কিংশুক। ওর দিকে তাকিয়ে কত কথা যে ভেসে আসে— এই মানুষটাই সৌমিলির জীবনে প্রথম পুরুষ হতে যাচ্ছিল! ভাগ্যিস ঘনিষ্ঠ মেলামেশার ফলে ওর বাহ্যিক বাগাড়ম্বরের সঙ্গে ভেতরের ফাঁকির বিস্তর ব্যবধান ধরা পড়ে গিয়েছিল। কোনও নাটক সিনেমা, গল্প নিয়ে আলোচনায় সে যত পটু, আসল ব্যাপারে অর্থাৎ নিজে কোনও কিছু সৃষ্টি বা তৈরির ব্যাপারে ততটাই অপটু। একবার তো বাঁশ বলে ওর লেখা এক স্ক্রিপ্ট শুনিয়েছিল সৌমি সহ জনা পাঁচ বন্ধু বান্ধবীদের। জন্ম থেকে শেষ পর্যন্ত মানুষের কাজে লাগে বাঁশ, এই ছিল মোটের উপর বক্তব্য।

প্রথমে কঞ্চির দোলনায় শিশু দুলছে। তারপর বাঁশের ঠেলা করে সেই শিশুর অন্নপ্রাশনের উৎসবের জোগাড় আসছে। বালক বালিকা স্কুলে গেলে সেখানে বাৎসরিক উৎসবে বাঁশের ম্যারাপ। খেলার মাঠে তো বাঁশের বেড়া বা মঞ্চ অপরিহার্য। যে কোনও পুজোর সময় তো বাঁশ ছাড়া চলবে না। নতুন বাড়ি তৈরি বা পুরনো বাড়ি মেরামতির সব কাজে বাঁশের বিরাট ভূমিকা। বাঁশ নিয়ে ময়রা চলেছে মিষ্টির হাঁড়ি দুলিয়ে। এইরকমভাবে শেষ অব্দি বাঁশের অবলম্বনে চড়ে মানুষ চলেছে শেষযাত্রায়।

স্ক্রিপ্ট পড়া শেষ হলে বিজয়ীর দৃষ্টিতে উপস্থিত সবাইকে দেখে নিয়ে কিংশুক তাকে প্রশ্ন করেছিল, কী মনে হল শুনে?

মন রেখে কথার জাল বোনা সৌমির ধাতে নেই। খানিক ভেবে নিয়ে সে বলেছিল, এটা একটা ডকুমেন্টারি হতে পারে, কিন্তু কাহিনীচিত্র কোনওমতেই নয়। ফিচার ফিল্মের পরতে পরতে গল্পের যে বুনন থাকে তা এখানে কোথায়? গল্পের ওঠানামা নেই, কোনও জীবন্ত মানুষের চরিত্রের সুখ-দুঃখের কথোপকথন নেই। মোট কথা জীবনের কোনও বাঁক নেই। বাকি আর চারজনেরও তাই মতামত। এরপর থেকে তাদের আর কিছু শোনায়নি কিংশুক। ওদিকে সৌমিলি ক্রমশ বুঝতে পারে কিংশুকের প্রকৃত মানসিক গঠন। সে যেন হাউই বাজি। ভুস করে জ্বলে উঠে টুক করে নিভে যায়। জ্বালা ধরাতে পারে কিন্তু আলোর স্নিগ্ধতা নেই। তাছাড়া মুখের কথার তোড় যত ভেতরের মশলা সেই তুলনায় নেতানো। এ হল নাবালের জমি, জল গড়িয়ে যেতে পারে, কিন্তু বন্যার দু’কূল ছাপানো উচ্ছ্বাস নেই। এর সঙ্গে শখের বন্ধুত্ব চলে, সংসারের দুরূহ দায়িত্ব নেবার মত শক্তি নেই।

মানুষটার ভেতরের মনন তার কাছে পরিষ্কার হয়ে যেতে চুপচাপ ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিল সৌমিলি। তারপর সম্বন্ধ করে বিয়েতে রাজি হয়ে যায়। পরে একান্তে ভেবে দেখেছে একদম সঠিক সিদ্ধান্ত। রঞ্জনের কথার মধ্যে হয়ত চকমকি পাথরের ফুলকি নেই, কিন্তু ওর আছে এক শোভন ব্যক্তিত্ব। সে দায়িত্ব নিতে জানে, সংসারের শতেক ঝামেলা থেকে সরে গিয়ে নিরাপদ দূরত্ব খোঁজে না। ভার বইবার মতো মানসিক শক্তি আছে, কেবল কথার ঝিলিকে তুফান তোলার মতো তাৎক্ষণিক ঝলক নেই। প্যাঁচালো বাক্যের হাউইয়ে মোহিত করে তোলে না, কিন্তু শান্ত সাহচর্যে মন ভরিয়ে তোলে।

অফিস থেকে ফিরে চা-বিস্কুট খাচ্ছিল রঞ্জন। ওর দিকে তাকাতে অনিবার্যভাবে কিংশুকের কথা স্মৃতিতে ভাসে। রঞ্জন চানাচুর খায় না, অথচ সেটা কিংশুকের দারুণ পছন্দ। কিংশুক বাক্যের জাল বিস্তার করে, রঞ্জন ভাবের ঘেরাটোপে থাক। এছাড়া দু’জনের মধ্যে চরিত্রগত প্রচুর অমিল। রঞ্জনকে দেখতে দেখতে দিন তিন আগে ঘটে যাওয়া দুপুরবেলার দৃশ্যটা মনে ঘাই তোলে। সে বলে, জানো তো পরশুর আগের দিন দুপুরে সে এক কাণ্ড। সেদিন স্কুলের প্রতিষ্ঠা দিবস হওয়ায়—
বাক্য শেষ করতে পারে না সৌমিলি। রঞ্জন হাত তুলে তাকে কথার মাঝে থামিয়ে দিয়েছে।

দুপুরের কথা যেভাবে গুছিয়ে বলতে শুরু করেছে সৌমিলি, রঞ্জন আড়ষ্ট হয়ে যায়। মনের সেই কোন গভীরে গুমরে থাকা একটা ভয়কে যেন জাগিয়ে তোলার চেষ্টা হচ্ছে। এখন তবু একটা আড়াল আছে। রঞ্জন হয়ত ভুল দেখেছে, সেদিন কোনও ছেঁড়া প্যাকেট ছিলই না ওঘরে। এইরকম ভাবনা কেমন যেন সমুদ্রের ধারে বাতিঘরের মতো আলোকের আভাস আনে। সেই বাতিঘরের সামান্য আলোর উদ্ভাসই তো এখন রঞ্জনের সম্বল। খুদকুঁড়োর মতো সেই আলোকে জড়িয়ে ধরে আছে সে। কে আর যেচে সেই আলো নেভাতে চায়!

রঞ্জন চেষ্টা করে হাসে, এখন আর কোনও দুপুরের কথা নয়, কেবল রাতের কথা বলো। এই রজনীগন্ধার মালাটা চুলে জড়িয়ে নাও তো। দেখি কেমন লাগে। চা শেষ করে অফিসের ব্যাগ থেকে মালা বের করে স্ত্রীর দিকে এগিয়ে দেয়।
সৌমিলি তখন ভারি অবাক হয়ে রঞ্জনকে দেখেই চলেছে!