রণজিৎ সরকার
নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না রুদ্রাক্ষ। ঠিক শুনেছে তো— নাকি এ তার ভ্রম। অসুস্থ প্রিয়জনের সুস্থতার চিন্তায় মগ্ন থাকলে অন্য সব চিন্তা গৌণ হয়ে পড়ে। আকাঙ্ক্ষা মানুষকে লাইনচ্যুত করে দিতেও পারে। জোর করে ভাবাতে পারে, যেটা সত্যি নয় সেটাও। এ ক্ষেত্রে তেমনটাই কি ঘটেছে? আরও একবার সে যেন শুনতে চাইল সেই অবিশ্বাস্য কথাটা, যা প্রমাণিত করবে, সে ঠিকই শুনেছে। বন্ধুমহলে তার এই সমস্যা নিয়ে অনেক আলোচনা করেছে, কোনো কিছু গোপন না করে। রোগ হলে চিকিৎসা করাতে হবে, এটাই সারকথা। কিন্তু বেশিরভাগ লোকই এই রোগে আক্রান্ত হলে চেপে যায়, গোপন করে। আসলে এ ধরনের কেস আমাদের সমাজে অন্যভাবে দেখা হয়। যার ফলে নানা সমস্যা অ্যারাইজ করতে পারে ভেবে এই চেপে যাবার প্রবণতা আসে। রুদ্রাক্ষ জানে সব, তবুও তানিয়ার এই অসুখটাকে আর পাঁচটা সাধারণ অসুখের মতো ভেবে নিতে অসুবিধে হয়নি। লোকেরা কী ভাববে, এ নিয়ে তার মাথাব্যথা নেই। তাই বন্ধুদের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা করতেও তার সমস্যা হয়নি। কিন্তু এই আলোচনার মাধ্যমে সে কোনো স্বস্তিমূলক জায়গায় পৌঁছতে পারেনি, বরং হতাশ হয়েছে। দুশ্চিন্তা বেড়েছে। বন্ধুরা বলেছে এ রোগ নাকি সারে না। একটা সমস্যা থেকে আর এক সমস্যা শুরু হতে থাকে। ফলে ডাক্তারি ব্যবস্থাপত্রেরও পরিবর্তন হতে থাকে। সমস্যার আর সুরাহা হয় না। বন্ধুদের কথাগুলো মেনে নিতে পারেনি রুদ্রাক্ষ। একটা দোলাচালের ভেতর মানসিক কষ্ট নিয়ে কাটিয়েছে। তানিয়ার দিকে করুণ চোখে তাকিয়ে থেকেছে। ম্লান হেসে তানিয়া বলেছে, ‘কী দেখছ গো অমন করে? আমার তো কিছুই হয়নি। অনর্থক চিন্তা করছ শুধু।’
কোনো জবাব দিতে পারেনি রুদ্রাক্ষ। অব্যক্ত যাতনা মনে চেপে রেখে আমদানিকৃত উচ্ছ্বাসে বলেছে, ‘দিনদিন বড় সুন্দর হয়ে উঠছ তানি।’
ওর শুকনো ঠোঁটে হাসির ঢেউ উঠেও যেন ওঠে না। ম্লান হাসি, আগের মত প্রাণবন্ত নয়। তবুও ইচ্ছে করছে ওর ঠোঁটে ঠোঁট রাখতে, সেই আগের মত।
দীর্ঘদিন চিকিৎসা চলছে তানিয়ার। বিলম্বিত চিকিৎসাই নাকি এই রোগের একমাত্র নিয়ম। ওষুধ খেয়ে ভালো থাকা কি ভালো থাকা? হতাশার শিকার হয়ে কতদিন এসব ভেবেছে রুদ্রাক্ষ। ওর সুস্থতার কামনায় মগ্ন থেকেছে। ফলে বিরুদ্ধ কোনো চিন্তা মস্তিষ্ক কোনোদিনই সাপোর্ট করেনি। বন্ধুদের ওই ধরনের নেগেটিভ কথা সে মনে ঠাঁই দেয়নি। ওদের সবজান্তা ভেবে এমনতর চিন্তাটাকেই বাতিল করে দিয়েছে। আজ এই মুহূর্তে ডাক্তার চৌধুরির ছুঁড়ে দেয়া কথাক’টি যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না। বারবার শুনতে চাইছে মন। অনুধাবন করতে চাইছে বক্তব্যের সত্যতা। এ এক অতর্কিত চমক বা শক— যা কিনা অনুরণিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে সমস্ত চেতনা জুড়ে।
‘আর আসতে হবে না। ওষুধ আর দিচ্ছি না কেমন। তবে কোন অসুবিধা হলে যোগাযোগ করবেন।’
প্রেশার মাপতে মাপতে ডক্টর চৌধুরি বললেন, ‘প্রেশার ঠিক আছে, একদম নরম্যাল। ওজনটা একটু বেড়েছে। খেয়াল করবেন আর যেন না বাড়ে। হালকা ব্যায়াম করুন, সঙ্গে মেডিটেশান। সকাল বিকাল একটু হাঁটাহাটি করতে পারলে ভালো। ও কে।’
রুদ্রাক্ষর ধাতস্ত হতে একটু সময় লাগল। তারপর হালকা হাসির রেখা সারা ঠোঁটে ছড়িয়ে পড়ল তার। অনেকটা হালকা লাগছে এখন। আবেগঘন দৃষ্টিতে তাকাল তানিয়ার দিকে। অদৃষ্টের কোন পরিহাস সে বয়ে নিয়ে গেল এত দিন? কোন পাপের সাজা ভোগ করল সে এতকাল! ভাবতে গিয়ে বিষণ্ণতা আরও গাঢ় হল রুদ্রাক্ষর। মনে পড়ে গেল বছর তিনেক আগের কথা। যখন রোগটা ধীরে ধীরে তানিয়াকে তার অজান্তে গ্রাস করে ফেলছে। অস্বাভাবিক করে তুলছে ক্রমশ।
সকাল আটটা কী সাড়ে আটটা হবে। ছুটির দিন। তাড়া নেই কোনো। বেলা করে বাজারে গেলেই হবে। আয়েশ করে চায়ে চুমুক দেবার এটাই তো দিন। অথচ সেদিন চায়ের দেখা নেই। নিবিষ্ট মনে সেদিনের কাগজে চোখ বোলালেও মনটা পড়েছিল রান্নাঘরের দিকে। কাপে চামচ ঘুরিয় চিনি গোলার ঠিনঠিন আওয়াজ বা তানিয়ার চুড়ির মধুর শব্দ কোনটাই কানে এল না রুদ্রাক্ষর। পরিবর্তে তানিয়া স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে দ্রুত সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল। অনুযোগের সুরে বলেছিল, ‘তোমার তো ওই এক ব্যাপার। সুযোগ পেলেই হয় পত্রিকা, বই, না হয় খবরের কাগজ নিয়ে বসে যাবে। কোনো দিকে তো খেয়াল থাকে না। আরে বাবা চারাদিকের অবস্থা তো নজরে রাখবে, না কী!’
কাগজ থেকে মুখ তুলে রুদ্রাক্ষ বলেছিল, ‘কী আবার খেয়াল করব? রাখো তো, ছুটির দিন সকালে একটু মৌজ করতে দাও প্লিজ। নো অন্য কিছু। সারা সপ্তাহটা যা ঘোড়দৌড় করতে হয়, বোঝ তো! এখন এক কাপ গরমাগরম চায়ের বড় প্রয়োজন ম্যাডাম, সো প্লিজ।’
‘আরে, কী মুশকিল, রাখো তোমার চা, দেখবে এসো, পাশের বাড়ির রায়বাবু আমাদের সম্বন্ধে
যা-তা বলছে যে।’
‘যা-তা বলছে মানে, তা আবার হয় নাকি? উনি এমন কেন করবেন? ওঁর সঙ্গে তো আমাদের সম্পর্ক খারাপ নয়। তা ছাড়া উনি তো ভালো লোক, সাতে-পাঁচে থাকেন না। এমনটা কেন করবেন? যাঃ, তোমার বুঝতে কোথাও ভুল হচ্ছে!’
‘বকবক না করে তুমি এসো তো। দেখবে চল। আমাদের বাড়িটা দেখিয়ে কী সব আজেবাজে কথা বলে যাচ্ছে তখন থেকে।’
অগত্যা উঠতে হল। ভেতরে ভেতরে একটু গরমও হয়ে উঠেছিল রুদ্রাক্ষ। এ আবার কী! তানিয়া যদি ঠিক শুনে থাকে, তাহলে সকাল সকাল রায়বাবুর এমনতর আচরণ সত্যিই তো মানা যায় না। পাশের ঘরে এল রুদ্রাক্ষ। তানিয়া আঙুল তুলে বলল, ‘দেখো, কী, বিশ্বাস হলো এবার?’
দোতালার জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়েও সহসা কিছু নজরে এল না। গন্ধরাজফুলের একটি ডাল দৃশ্যমানতা আড়াল করে রেখেছে।
‘কই, কী দেখব?’
‘আরে, কী জ্বালা! ডালটা একটু না সরালে দেখবে কী করে?’
তানিয়া সরে এল। ডালটা টেনে ধরে ঝুঁকে বলল, ‘এবারে দেখো।’
নাঃ, রায়বাবুকে ডালটা ছেঁটে দেবার কথা বলতেই হবে। ফুলের চমৎকার মন মাতানো গন্ধ মন ভাল করে দেয় বটে, কিন্তু পোকা-মাকড়— বিশেষ করে পিঁপড়ের উৎপাত সহ্য করা কঠিন হয়ে পড়ে।
রুদ্রাক্ষ জানালা দিয়ে ঝুঁকে দেখত পেল রায়বাবু সত্যিই কী যেন বলছেন লোকটিকে হাত নেড়ে নেড়ে। কিন্তু কিছু শোনা যাচ্ছিল না। তানিয়া বলল, ‘শোনো, শুনতে পাচ্ছ? মানুষ পারেও বটে! কী লাভ এ সব করে?’
রাগে গজর-গজর করতে থাকে তানিয়া। অসহিষ্ণু হয়ে ফের বলল, ‘শোনো, শুনতে পাচ্ছ নির্লজ্জের মত আমাদের এগেনস্টে চুকলি করে যাচ্ছে তখন থেকে। কিছু বলো— না হলে কিন্তু আমি এবার মুখ খুলব।’
‘শান্ত হও। উত্তেজিত হয়ো না। আমি তো কান খাড়া করেও কিছু শুনতে পাচ্ছি না।’
‘শুনতে পাচ্ছ না, অবাক করলে তুমি। আমি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি— আর তুমি পাচ্ছ না? বলিহারি কান বাবা তোমার!’
‘আরে কী জ্বালা! লোকটা তো মাছওলা। মাছ কিনছেন রায়বাবু। দর দাম করছেন হয় তো। ধুর, তুমি না অযথা মাথা গরম করছ। চলো তো, চলো। আজ লুচি বানাও, সঙ্গে কালোজিরে ফোড়ন দিয়ে ঝাল-ঝাল কুমড়োর ছক্কা।’
রুদ্রাক্ষ বসবার ঘরে ফিরে সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে আবার কাগজে মন দিল।
বেশ কিছুটা সময় চলে যাবার পরেও তানিয়ার কোনো সাড়া না পেয়ে রুদ্রাক্ষ পেপার মুড়ে সোফার ওপরে রেখে উঠে দাঁড়ালো। এই সময়ে হন্তদন্ত হয়ে তানিয়া কাছে এসে দাঁড়াল ফের। মনে হল ভীত সন্ত্রস্ত। অবাক হয়ে রুদ্রাক্ষ বলল, ‘কী হয়েছে? এনি প্রবলেম?’
‘তুমি বেরচ্ছ নাকি?’ ও রুদ্রাক্ষর বাহুমূল খামচে ধরে।
‘খবরদার তুমি বেরবে না।’
বিস্মিত রুদ্রাক্ষ বলল, ‘কেন, কী হয়েছে? তোমাকে এমন ভয়ার্ত উদভ্রান্ত লাগছে কেন?’
‘পাড়াতে মার্ডার হয়েছে একজন। পুলিশ ভ্যান দাঁড়িয়ে আছে বাইরে। খবরদার বাইরে বেরবে না। তোমাকে ওরা অ্যারেস্ট করে নিয়ে যাবে। মা গো কী হবে!’
‘কী বাজে বকছ তানিয়া!’ ধমকে ওঠে রুদ্রাক্ষ।
‘বিশ্বাস করো বদনবাবুর বাড়ির সামনে ভীড় জমে আছে। সম্ভবত বদনবাবুই খুন হয়েছেন।’
‘সে কী! একবার তো দেখতে হয়।’
‘না না’, আর্ত চিৎকার করে ওঠে তানিয়া। ‘তুমি যাবে না বাইরে। বরং বারান্দা থেকে দেখবে চল।’
বারান্দা থেকে ঝুঁকে এদিক ওদিক চাইল রুদ্রাক্ষ। কোনো কিছু নজরে এল না। ফাঁকা রাস্তা কোথাও কিছু নেই।
‘কই, কোনো কিছু তো নেই কোথাও। চেঁচামেচি কোলাহল কোনো কিছুই তো শুনতে পাচ্ছি না। কোথায় পুলিশ ভ্যান!’
তানিয়ার দিকে সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে চাইল রুদ্রাক্ষ। উদ্বেগমিশ্রিত আবেগে ক্ষণকাল চেয়ে রইল তানিয়ার বোকা-বোকা চেহারার দিকে। ওকে দেখে মনে হল, ‘সে কী, সবই ভুল বলেছি নাকি!’ এমন গোছের মুখ। রুদ্রাক্ষর কপালে অনিশ্চয়তার ভাঁজ। এদিকে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দিন যত গড়াচ্ছে তানিয়ার অস্থিরতা বেড়েই চলেছে। আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ছে ছোট ছোট শব্দে। বিশেষ করে মোটর সাইকেলের শব্দে ভয়ঙ্কর চমকে উঠছে তানিয়া। রুদ্রাক্ষ দিশেহারা। কী করবে সে এখন? ইনটারনেট ঘেঁটে মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজের অধ্যাপক নিউরো-সাইকিয়াট্রিস্ট ডক্টর এ কে চৌধুরির নাম পেতেই তার সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে নিল দ্রুত।
‘হ্যালো, এটা কি সাইক্রিয়াটিস্ট এ কে চৌধুরির চেম্বার?’
‘হ্যাঁ। বলুন কী বলবেন।’
‘ওঁকে কি এখন পাওয়া যাবে?’
‘না, বিকেলে আসুন পাঁচটার পর। আমি পেশেন্টের নাম লিখে নিচ্ছি। হ্যাঁ, নামটা বলুন।’
নাম লিখিয়েও মনের অস্থিরতা কমছে না। সময় যেন আর কাটছে না রুদ্রাক্ষর।
তানিয়া কিছুতেই ডাক্তার কাছে যাবে না। সুস্থ মানুষ কখনো ডাক্তারের কাছে যায়! এক গোঁ তার। অনেক কসরৎ করে ভুলিয়ে ভালিয়ে আনা হল ডাক্তারের চেম্বারে। প্রাথমিক পরীক্ষা নিরীক্ষার পর ডা. চৌধুরি বললেন, ‘ডিলিউশনাল ডিস-অর্ডার।’
হতাশ হয়ে রুদ্রাক্ষ বলল, ‘কাউন্সেলিং করলে সারবে স্যার?’
‘না, সারবে না। ফিয়ার সাইকোসিস রয়েছে যেহেতু, সে ক্ষেত্রে কাউন্সেলিং করেও কাজ হবে না। ড্রাগথেরাপির ওপর ভরসা করতে হবে। ইট উইল টেক টাইম। ধৈর্য হারালে চলবে না। ডোন্ট ওয়ারি। ভালো হয়ে যাবেন আশা করি।’
তানিয়া-সহ রুদ্রাক্ষ ডাক্তারের চেম্বার থেকে বেরিয়ে এল ধীর পায়ে। তানিয়া এখন সুস্থ। দীর্ঘ পাঁচ বছরের লড়াই শেষ। ওয়েটিং জোনে অপেক্ষারত রোগীদের ভীড় দিন-কে-দিন বাড়ছে। রুদ্রাক্ষের বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। মানসিক প্রতিবন্ধকতার এই সমাজ সকলকে কোথায় নিয়ে দাঁড় করাবে কে জানে!