শীতের মেঘ ও রোদ্দুর

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

অমিয় আদক

ঠাণ্ডাটা জাঁকিয়ে পড়ায় বাদ সাধছে হালকা মেঘ। মেঘেদের এই বদমায়েসিতে শীতের মেজাজ খাপ্পা। সে চাইছে ঠাণ্ডাকে জানান দিতে। বিচ্ছু মেঘের দল ঘোরতর বিরোধিতায়। ছেঁড়াছেঁড়া মেঘগুলো বন্ধুর মতো কাছাকাছি হতে চায়। উত্তুরে হিমেল হাওয়া তাদের মাঝে ঢুকছে। তাদের একসঙ্গে জুড়ে যাওয়ায় বাগড়া দিচ্ছে। দু’দিন এমনই চলে। শেষে উত্তুরে হিমেল হাওয়া খানিক দমে। সে আর মেঘেদের কাছাকাছি ভাব জমানোকে আটকাতে পারে না।

মেঘেরা কাছাকাছি। বেশি কালো মেঘ আকাশে কাছাকাছি আসার সুযোগ পায়নি। হালকা ঝিরঝিরে বৃষ্টির দু-এক পশলা ঝরে। এবার ঠাণ্ডা হাওয়া। ভিজে মাটির উপর দিয়ে বইতে থাকে। শীতের আমেজ বাড়ে। দিনের বহর ছোট। সূয্যি ঠাকুরের আকাশে থাকার সময় কম। ফি সকালেই কুয়াশার মাঝারি ঘন চাদরের আড়াল। সেই আড়াল সরিয়ে সূয্‌যি ঠাকুরের মুখ দেখাতেও দেরি। তাই, ঠান্ডাটা বেশ জাঁকিয়ে পড়ে।


এদিকে আমাদের পরীক্ষা সারা। আমরা ফুরফুরে মেজাজে। দাদু ঠাম্মির কাছে গল্প শোনার আবদার। তার সঙ্গে বাবামায়ের কাছে দাবি, কাছেই কোথাও বেড়িয়ে আসার। উমেদারি চলতেই থাকে সরাসরি। আবার দাদু ঠাম্মির কাছে জানাই, আমাদের কোথাও একটু কাছেপিঠে ঘুরে আসার বেজায় ইচ্ছে। বাবাকে একটু বুঝিয়ে বলোনা তোমরা।’ আমাদের দাদুমণি এমনিতে খুব ভালো। আমাদের ফাঁকা সময়ে মজার গল্প বলেন। আবার সেই গল্প থেকে শেখার ব্যাপারটাও বুঝিয়ে দেন। আমাদের প্রতি জেলাসি কিনা, বলতে পারছি না। আমাদের বাইরে কোথাও যাওয়ার জন্যে দাদু কোনোদিন বাবা-মাকে বুঝিয়ে বলেন না। ঠাম্মি আমাদের দাবিকে বাবামার কাছে পেশ করেন। ঠাম্মিকে আমরা বলি ‘সখী’। আমরা বলতে আমি এবং আমার চেয়ে তিন বছরের ছোট বোন অহনা। এই বছরের খাতায় আমার ক্লাস সিক্স, বোনের ক্লাস থ্রি। দু’হাজার ছাব্বিশে সেগুলো হবে সেভেন আর ফোর।

আমরা দাদুর চেয়ে ঠাম্মি-ঘেঁষা বেশি। তাই হয়তো দাদুর খানিক চাপা রাগ। আমাদের গল্প বলা ছাড়া অন্যকিছু দাবি করলেই বলেন, ‘যাও, তোমাদের সখীর কাছে গিয়ে বলো। আমার শোনার সময় নেই।’ বছর দুয়েক আগে শোনা কথাটাই এখন ঠাম্মির নাম বা সম্পর্ক হিসাবে দাঁড়িয়েছে। তাই বলে দাদুর সঙ্গে আমাদের ভালোবাসা, ভালোলাগায় ছেদ পড়েনি।

অনেক টালবাহানা কাটিয়ে দেন ঠাম্মি। আমাদের ছোট্ট বেড়িয়ে আসার অনুমতি আদায় করেই ছাড়েন। আমরাও বেজায় খুশি। সোজা কথায়, আমাদের সখীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা নেই। কেবল সখীর ছোটখাটো ফাইফরমাস খাটার জন্য এক্কেবারে হুজুরে হাজির। বাবা ছ’জনার যাওয়ার মতো একটা গাড়ি ঠিক করেন। সেই খবর শুনে ঠাম্মির অসম্মতি। তিনি বলেন, সবাই একসঙ্গে এই বছরে বেরোতে পারবো না। তোদের বাবার এ বছরে বেরোনোর ইচ্ছে নেই। বেজায় শীত। তার উপর প্রেসারটাও হাই চলছে। তাকে বাড়িতে একা রেখে কি যাওয়া যায়? তোরাই বল্‌?’

বাবা মা আমতা আমতা করে বোঝানোর চেষ্টা করেন, ‘এক বেলার তো ব্যাপার। অসুবিধে হবে না। তোমরা না গেলে টুকাই আর অহনার ভালো লাগবে না। তাই বলছিলাম। ব্যাপারটা ভেবে দেখো।’ ঠাম্মি বলেন, ‘তোদের বাবাকে বুঝিয়ে বল্‌। আমার কথাকে আমলই দিচ্ছে না।’ বাবা-মা যাওয়ার আগেই আমরা দুই মক্কেল হাজির দাদুর ঘরে। আমিই জিজ্ঞাসা করি, ‘দাদু, তুমি যাবে না কেন? তাহলে আমরাও যাবো না।’
—না না। আমার জন্যে তোমাদের আটকাবে কেন? তোমরা যাও। আসলে প্রেসারটা কেন বেড়েছে, বুঝতে পারছি না। তাই যেতে চাইছি না। তাছাড়া কিছু কাজের চাপও আছে।
—কী এমন কাজের চাপ? ছোটদের ক’টা পত্রিকায় লেখা পাঠানোর ব্যাপার। একটা গল্পকে শেষ করতেই পারছি না। সেটা হলেই আপাতত মিটে যায়।
—শেষ করতে না পারা গল্পটা আমায় পড়তে দেবে দাদু?
—গল্পটা খোলাই আছে। স্ক্রোল করে পড়ে নাও।

আমি গল্পটা পড়ি। গল্পে তুতু্লদের একটা পোষা হাঁসের তিনটে ছানার একটাই বাঁচে। বাকি হাঁসেরা ডিম দেয়। তাদের ডিমে তা দেওয়ার সুযোগ দেয় না। হাঁসছানাটাই তুতুলের খেলার সাথি। সেই হাঁসছানার মাকে শেয়ালে নিয়ে পালায়। হাঁসছানাকে বাইরে আনলেও, সে কোথাও যেতে চায়না। তাই তুতুলেরও বেজায় মন খারাপ। হাঁসছানার মন খারাপের কারণে। এই পর্যন্ত গল্পটা পাই। আমি দাদুকে বলি, ‘বাকি গল্পটা কীভাবে শেষ করতে চাও?’
—সেটাই তো ঠিক করতে পারিনি।
—আমি যেটা ভাবছি, এবার সেটাই বলি। দেখো মনে ধরে কি না?
—বলো শুনি।
—তুতুলদের মা-হাঁসটা বাদে অন্য আরও হাঁস তো আছেই। তাদের সঙ্গেই ছানা হাঁসটা ক’দিন থাকলেই, ছানা হাঁসটা স্বভাবিক হয়ে উঠবে। তখন তুতুলেরও মন ভালো হয়ে যাবে।
—ইস্‌, আমি তো ব্যাপারটা মাথায় আনতেই পারিনি। এবার আমার প্রেসার নরম্যাল হবেই। ঠিক আছে। গল্পটা শেষ করি। টুকটাক ভুলত্রুটিগুলো সংশোধন করি। তাহলে মনের উপর চাপ শীতের মেঘের মতই পালাবে।
সেদিন সন্ধেতেই গল্পটা শেষ করেন দাদু। বাকি গল্পগুলোও পড়ে দেখেন। আমাকে ডাকেন, ‘টুকাই, গল্পটা ভাই পড়ে দেখো।’ আমি তো অবাক। দাদু গল্প শোনান। সেই দাদু আমাকে গল্প পড়তে বলছেন! ঘরে ঢুকতেই দাদু বলেন, ‘টুকাই, ছোটদের গল্প, ছোটদের পড়ানোই আগে দরকার। জানো, ছোটদের ভাবনায় ঢুকতে চাইলেও, পুরোটা ঢুকতে পারিনি। তুমিই গল্পের ফাঁকফোকর আমায় ধরিয়ে দিতে পারবে। হ্যাঁ, বলতেই ভুলছিলাম, তোমাদের সঙ্গে যাবো বেড়াতে।’ লজ্জিত আমি বলি, ‘ঠিক আছে দাদু।’ মনে-মনে ভাবি, দাদুর
মনের শীতের মেঘ কেটে মিঠে রোদ্দুর এলো।

ঊনত্রিশে ডিসেম্বর আমরা সবাই বেরোচ্ছি। কোথায় যাচ্ছি, ফিরে এসে জানাবো। জায়গাটা নাকি অফ
বিট ডেসটিনেশন।