আনির্বাণ চৌধুরী
একেবারে পিঠে বেঁধেছি কুলো আর কানে দিয়েছি তুলো। তাই না রে? এই যে গতকালই স্কেল পেটা করলাম। অমন শক্ত কাঠের স্কেলটা ভাঙলাম পিঠে। তাও লজ্জা হল না? লজ্জা, ঘেন্না, ভয়, তিন থাকতে নয়। এমন বেয়ারা ছেলে মেয়ে বাপের জন্মে দেখিনি বাপু। বাপ মায়ে খাতা কিনে দেয় না! কী দুঃখ ভাই বোনের! ব্যাকরণ, নামতা, জটিল বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার… সব দেওয়ালে। পাহাড়ে সানসেট, ব্যাঁকা-ত্যারা মেঠো পথ, আলং-ফালাং সিনারি তাও সেই দেওয়ালে। এ, বি, সি, ডি, ওয়ান, টু, থেকে শুরু করেছিস। দেওয়ালটাকে কী ব্ল্যাকবোর্ড পেয়েছিস? কবে ক্ষান্ত দিবি বল দেখি?
—থাক না তনু, তেমন খারাপ কাজ তো আর কিছু করেনি। দেওয়ালে একটু দাগাদাগি, এই তো? এত আগল দিতে নিলে শৈশবে শিকল পড়ানো হয়ে যাবে যে। বকলে তো। এবার একটু আদর করে দাও।
—সব বদ্ধ উন্মাদের দল! দোষ করলে নাকি আবার আদর করে দিতে হবে। বিধান দিলেন ধর্মাবতার! এই তোমার জন্য, শুধু তোমার জন্য ছেলে মেয়ে দুটো উচ্ছন্নে গেল। নিজে শাসন করবে না। আর অন্য কেউ শাসন করতে নিলেও আপত্তি। কোথায় বাবা চোখ বড় বড় করে তাকাবে আর ছেলে প্যান্ট ভিজিয়ে ফেলবে, তা নয়। এ একেবারে উল্টো পুরাণ। এমনতর বাবা জন্মে দেখিনি বাপু!
—কিন্তু ওদের উচ্ছনে যাবার বয়স কি হয়েছে তনু?
—ঘাট হয়েছে আমার। তোমার ক্ষুরে ক্ষুরে দণ্ডবৎ। এবার নাকি আবার উচ্ছনে যাবার বয়সের উপর লেকচার শুনতে হবে! আমি পারব না বাপু। ক্ষমা করো।
—আচ্ছা বাবা আমারই ভুল। প্রথম ধাক্কাতেই একেবারে ভয়ঙ্কর বকে দেওয়া উচিৎ ছিল। মেনে নিলাম। যে সে দোষ তো আর করেনি! বকেই কিন্তু দিচ্ছি এবার। এই বলে দিলাম।
—আর নাটক করে কাজ নেই। তুমি তোমার ছেলে মেয়ে নিয়ে থাক।
—‘আর আমি চললাম বাপের বাড়ি’… বোল না প্লীজ।
আর উপায়ান্তর না দেখে চোখ বড় বড় করার চেষ্টা করে বরুণ। হুঙ্কার দিয়ে বলে,
—এই যে বিহান, তরাই… ভয় নেই প্রাণে, না? মা কিন্তু ভীষণ রেগে গেছে! খুব সাবধান। আর একবার যদি প্যাস্টেল হাতে দেওয়ালের কাছে যেতে দেখেছি!
আর পারে না বরুণ। চেপে রাখা হাসির বুদবুদেরা নাক মুখ দিয়ে সোডার ঢেঁকুরের মতো অট্টহাসি হয়ে বার হয়ে আসে। খিলখিলিয়ে ওঠে বাচ্চারা। হাসির কোরাসে যোগ দেয় তন্ময়ী।
এসব যেন পূর্বজন্মের কথা। বিহান, তরাইয়ের ক্লাস টু। হঠাৎ অনবধানে চোখ চলে গেছিল দেওয়ালে হেলান দিয়ে একাকী, নিঃসঙ্গ দাঁড়িয়ে থাকা বাসন্তী রং পাহাড়টার দিকে। একলা পাহাড় কেমন সবার সাথে মিলে মিশে কাটিয়ে দিল প্রায় এক দশক! বয়স হয়েছে তার। চোখে ধরা পড়ে। কমলা ঘেঁষা জ্বলজ্বলে ক্রোম ইয়েলো আজ বয়সের ভারে ম্রিয়মাণ লেমন ইয়েলো। কেন যে চোখ যায়নি এতদিন? বুড়ো পাহাড়ের সামনে গিয়ে দাঁড়ায় বরুণ। গায়ে হাত বুলিয়ে দেয়। বিহান, তরাই দেওয়ালের গায়ে আঁকিবুঁকি কাটে না আর। বড় হয়ে যাচ্ছে দুজনেই। সময়ের একটু আগে আগেই যেন। মন ভারি হয়। পাহাড়ের গায়ে ক্রোম ইয়েলো প্যাস্টেল বুলিয়ে ঝলমলে করে তোলার সাধ হয় বরুণের। জানতে পারলে ছেলে মেয়ে হেসে খুন হবে। তনু বলবে, ‘বুড়ো বয়সে ভীমরতি’। সত্যিই বোধহয় এবার বুড়ো হল বরুণ। বুড়ো হলে নস্ট্যালজিয়া মাকড়সার লালার মতো আদর করে ছুঁয়ে দিয়ে যায়। দুর্ভেদ্য জাল বিছিয়ে ফেলে চারপাশে। বরুণ বেশ টের পায় আজকাল।
২
—না, না এ বাড়ি ভাড়া হবে না তনু।
—এত বড় বাড়ি খালি পড়ে থাকবে? ভুত বাঁদরের আস্তানা হবে তো! গুন্ডা মস্তানের আড্ডা হবে!
—মাঝে মাঝে আমরা আসব তো। ছুটির দিনে। সবাই মিলে। দারুন মজা হবে। বেশ একটা পিকনিক পিকনিক ব্যাপার।
—ফুর্তির প্রাণ গড়ের মাঠ। তোমার এই সব উদ্ভট বুদ্ধিগুলো কবে একটু কমবে বলো দেখি?
—বড় বড় কর্পোরেটদের দেখো কেমন ফসাফস ফ্ল্যাট কিনছে। এক নিউটাউনেই এখানে ওখানে সেখানে। বাঘা বাঘা ফ্ল্যাট। সব ফার্নিশড। একটাতে নিয়মিত থাকে। বাকিগুলো সব এ-আই-আর-বি-এন-বি নাকি ও-ওয়াই-ও… কাদের যেন দিয়ে রাখে। মাস গেলে মোটা টাকা।
—এই তো পথে এসেছ বাপু। তাবড় তাবড় বড়লোকেরা ভাড়া দেয় আর আমরা ভাড়া দিলেই আপত্তি!
—পুরোটা তো বলতে দেবে, নাকি? ওই সব বড়লোকের দল তাদের ঐ বাড়িগুলোতে ভাড়া না থাকলে মাঝে মাঝে গিয়ে থাকে। কেমন থ্রিলিং না? জীবনটা আর একঘেয়ে হয়ে যেতে পারে না। তাই তো আমাদের ফ্ল্যাট কেনার সময়, মনে নেই?
—কী মনে নেই?
—জিজ্ঞাসা করল না ‘থাকবেন, নাকি ইনভেস্টমেন্ট’?
—আমি কেন আমার চোদ্দ পুরুষের সাধ্য নেই যে তোমার সঙ্গে কথায় এঁটে ওঠে।
—একটা অজন্তা স্টোভে কেরোসিন তেল ভরে রেখে যাব। এসে ভাতে ভাত ফুটিয়ে নেব। আলু সেদ্ধ, ডিম সেদ্ধ, ঘী, কাঁচা লঙ্কা… আহা। সব্বাই মিলে ‘মিশন ঘর পরিষ্কার’! ঝুলঝাড়া, ফিনাইল, ডেটল… সে একেবারে ধুন্ধুমার কান্ড। যাকে বলে ধামাকা।
বাড়ি ছাড়ার আলোচনাটা উঠলেই মনে মনে কেমন ধরাশায়ী হয়ে যায় বরুণ। একটা হাহাকার দাবানল হয়ে জ্বলে ওঠে মনের মধ্যে। অনির্বাপনীয়। ধিক ধিক, দাউ দাউ। জ্বলন চলতে থাকে। দেওয়াল, মেঝে, আসবাব। কত ছুঁয়ে থাকা। বেঁধে বেঁধে থাকা। স্পর্শসুখ। বেশিটাই আজ অদৃশ্য। সামান্য কিছু হয়তো বা দৃশ্যমানও। পড়ার ঘরের দেওয়ালে দাদার আঁকা সরস্বতী আজও জীবন্ত। পেনসিলের আঁচড়েরা হাল্কা হয়ে এসেছে।। সময়ের অলঙ্ঘ্য পা ফেলা। দাদা নেই কত দিন। দেহ চলে গেছে, পট রয়ে গেছে। দক্ষিণের বড় ঘরের জানলার বাঁ পাশে বিহান তরাইয়ের বড় হওয়ার খতিয়ান লেখা আছে। অনুপুঙ্খ। ওদের ক্লাস ওয়ান হবার পর থেকে প্রতি ছ’মাসে একবার ঐ দেওয়ালে পিঠ দিয়ে দাঁড়াতে হত। সোজা মেরুদন্ড। একজন দেখে নিত অন্য জনের গোড়ালি নিবিড় ভাবে মাটি ছুঁয়ে আছে কিনা! মাথা থেকে দেওয়াল পর্যন্ত কাঠের স্কেল এক্স অ্যাক্সিসের প্যারালাল আছে কিনা। বরুণ পেনসিল দিয়ে তারিখ লিখে দিত পাশে। বাঁ দিকে বিহানের কলাম। ডান দিকে তরাইয়ের। উচ্চতা আগের বারের জায়গায় আটকে থাকলে সে কী মন খারাপ! সকাল বিকেল শশাঙ্গাসনের ধুম। হুবহু মনে আছে বরুণের। বাড়ির এই জায়গাটা তার বড় প্রিয়। মাঝে মাঝে একা একাই এই কলাম দুটোর মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়। তারিখগুলোর দিকে চেয়ে থাকে। অপলক। সময় মনে পড়ে। পুত্র কন্যার মুখের আদল মনে করার চেষ্টা করে। মনে পড়ে না। বৃথা হয়ে যায় স্মৃতিপট। ফেসবুকে সব ছবি আপলোড করে রেখেছে তনু, নিয়মনিষ্ঠ। সোশ্যাল মিডিয়া আজকাল জীবনের কন্টিনিউইটি হারিয়ে যেতে দেয় না। হারিয়ে যাবার জো-টি নেই আর।
৩
—বনশল বলছিল কাজ নাকি প্রায় শেষের দিকে, বুঝলে? যাবে নাকি একবার দেখতে? তোমার যদি কিছু অদল বদল করবার থাকে।
—আমি তো যাবার জন্য নেচেই থাকি। কিন্তু এ তো দেখি ‘ভুতের মুখে রাম নাম’।
—না, আসলে অনেক দিন যাওয়া হয়নি তো। সেই আমাদের ফ্লোরের ছাদ ঢালাইয়ের দিন শেষবার গেছিলাম। তারপর প্রায় বছর ঘুরে গেল।
—একটা এত বড় ফ্ল্যাট বাড়ি তৈরি করা তো আর চাট্টিখানি কথা নয়। ঢালাই শেষ হবার পরেও আরও কত কিছু বাকি থেকে যায়। প্লাম্বিং, ইলেকট্রিসিটি, লিফ্ট, জানলা-দরজা, ফ্লোর, ফিনিশিং…
—আসলটাই তো বললে না তনু। দেওয়াল! ইটের গাথনি, প্লাস্টর, পুট্টি, রং। দেওয়ালটাই তো সব গো। মানুষকে কেমন খাঁচায় ভরে ফেলে। সারা গায়ে ইতিহাসের আঁচড়, কামড়। কখনও বা আদর, সোহাগ। মানুষ মাথা রাখে, পিঠ ছোঁয়ায়, হেলান দেয়। আয়না আঁকা হয়। তরাই, বিহান যখন তোমার ঐ নতুন ফ্ল্যাট ছেড়ে অন্য কোনও নতুন দেশে পাড়ি দেবে তখন ঐ দেওয়ালগুলোই তো ওদের পিছুটান হবে। অমোঘ চুম্বক।
—তোমার খালি ভারি ভারি কথা। তা কবে যাবে বলো তো নতুন ফ্ল্যাট দেখতে?
—সে তো গেলেই হয়, যে কোনও শনি-রবিবার। আমি শুধু দেখতে চাই জায়গাটা কতটা বদলাল। একেবারে শিকড় উপড়ে নিয়ে অন্য জায়গায় বসা তো। কতটা সময় লাগবে নতুন শিকড় গজাতে। আদৌ গজাতে চাইবে কিনা… এইসব আর কী।
—আর এই বাড়িটা নিয়ে কী ঠিক করলে? ভাড়া একেবারেই দেওয়া যাবে না। তাই তো?
—এই একটা কথা আমার রাখো তনু। মাঝে মাঝে আমরা সবাই মিলে আমাদের এই আদরের বাড়িটাতে ফিরে ফিরে আসব। ফাটিয়ে মজা করব। সব সেলফ সার্ভিস। ছোটবেলার বাড়ি থেকে চাল, ডাল, ডিম, আলু নিয়ে যাওয়া খিচুড়ি ডিমভাজা পিকনিকের মতো। তরাই বিহানদের চড়ুইভাতি কথাটার অর্থ শেখাব। দুজন মিলে। কেমন?
এই বাড়ি ভাড়া দেবার ব্যাপারটা কিছুতেই মন থেকে মেনে নিতে পারে না বরুণ। দেওয়ালেরা অন্তরায় হয়ে মাঝে এসে দাঁড়ায়। একবার একটা দেওয়ালে উই ধরল। তারপর আরও কয়েকটাতে। উই পোকার মাটি সরু রেখায় ডালপালা বিস্তার করে খুব দ্রুত উপরের দিকে উঠে যেতে থাকল। দাদার আর বরুণের কাজ ছিল রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠে সাইকেলের ভাঙা স্পোক দিয়ে খুঁচিয়ে সেই সব বাসা ভেঙে দেওয়া। দেওয়ালে তো নিছক চুনকাম। হোয়াইট ওয়াশ। পুট্টি, কন্ট্রাস্ট রঙ এসবের কৈলিন্য নেই। তাই স্পোকের খোঁচায় কেটে গিয়ে জাত যাবার ভয় ছিল না। নিশ্চিন্তে খুঁচিয়ে চলত দু’ভাই। তারপর বাবা লোক ডেকে কীসব ওষুধ পত্তর দিল। উইয়ের উৎপাত কমে গেল। দেওয়ালে সেই মাটির ফ্যাকাশে দাগগুলো আজও রয়ে গেছে। সাদা চুন রঙের উপর ধূসর মাটি রঙ আলপনা। বাবা বলত, ‘একটা স্টেবল সিস্টেমকে একেবারে বাধ্য না হলে কখনও ভেঙে ফেলবি না’। বরুণ বাড়ি ছাড়তে চায়নি। কিন্তু বারো ক্লাসের পর ছেলে মেয়ে কলকাতার কলেজে পড়তে চায়। ছোটদের স্বপ্নের ব্যাপারে সমঝোতা চলে না। বাধ্য হয়ে কলকাতা শহরে ফ্ল্যাট কেনা। কিন্তু এ বাড়িতে শুধু দুটো টাকার জন্য অন্য কাউকে থাকতে দিতে পারবে না। দেওয়াল জুড়ে দাদার শৈশব, যৌবন। নিজেরও। কত উদাত্ত হাসির প্রতিফলন। ফিরিয়ে দিয়েছে আলো। আনন্দের রেজনেন্স। কত তীব্র ব্যাথার দিনে চোখের জল শুষে নিয়েছে। নিঃশব্দে। ঋণ। অন্য লোকের হাতে কিছুতেই ছেড়ে দেওয়া যাবে না। ঠিকানা বদলের আর বেশি দেরি নেই। সুযোগও নেই। ভাই বোন দুজনেই কলকাতায় কাঙ্খিত কলেজে ভর্তি হয়েছে। পছন্দের বিষয়। ইচ্ছেপূরণের সুর ভেসে বেড়ায় বাড়িময়। তবে আনন্দের আতিশয্যে ভেসে গেলে চলবে না। এই চারটে বছর খুব দামি। সময়টুকুর ওপারে নদীর ঘাটে নৌকো বাঁধা আছে। তারপর নতুন দেশ। বাড়ি। দেওয়াল। আলো। এসব দিনে ট্রেনে যাতায়াত করার মানে হয় না। প্রতিটা মুহূর্ত হারিয়ে ফেলা সময়ের মতো দামি। আর ফ্ল্যাটও তৈরি। রেডি টু চেক-ইন। বরুণের দিল্লীতে একটা অফিস-ট্যুর পড়ে গেল। দেড় সপ্তাহ। ফেরার পর মালপত্র সিফটিং এর কাজ শুরু হয়ে যাবে।
দিল্লীতে এবার বড্ড কাজের চাপ। ল্যাপটপ থেকে মুখ তোলার সুযোগ নেই। রাতে হোটেলে ফেরার পর বিছানাটা যেন চুম্বকের মতো টেনে নিত। এভাবে কাজ করতে ভাল লাগে না বরুণের। কোনকালেই কেজো লোকের তকমা জোটেনি কপালে। জোটার কথাও নয়। বরুণ জানে। মাঝে মাঝে চাকরিটা ছেড়ে দেবার কথা যে ভাবেনি তেমনটাও নয়। ফ্ল্যাটের লোন। বিহান তরাইয়ের লেখাপড়া। অসহায় লাগে। এই দশদিনে তনুর সঙ্গে দুবার আর তরাইয়ের সাথে একবার কথা হয়েছে। অডিও কল। কাল মুক্তি। সকালের ফ্লাইট। ছুটির দিন। ছোটদের আড়মোড়া ভাঙার আগেই ঢুকে যাবার কথা। তরাই ফোনে বিরাট সারপ্রাইজের কথা বলছিল। ভুলেই গেছিল বরুণ। আজ মনে পড়ে। বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে সম্ভাব্য তালিকাটা বানাবার চেষ্টা করে। তনু কী চুল কেটে ফেলেছে? বিহান দাঁড়ি? জলপাইগুড়ির বাড়ি থেকে ন’কাকারা এসেছে বেড়াতে। এমনটা হলে খুশির বাঁধ ভাঙত বরুণের। কিন্তু তাহলে কি ফোনে একজনেরও গলা পেত না? অনুমানে সে বরাবর কাঁচা। আজও গুলিয়ে যায় সব।
৪
কলিং বেলে তর্জনী ছোঁয়ায় বরুণ। সোনার কাঠি রুপোর কাঠি ঘুম। ঘুম চোখে দরজা খোলে বিহান। পিছনে বাকিরা। সবাই মিলে… ‘সারপ্রাইজ’…।
কখনও কখনও শুধু কপালের লাল টিপটুকু সরে গেলে মানুষটাকে একেবারে অচেনা লাগে। আটপৌরে ছাপা শাড়ি ছেড়ে ঝলমলে বিয়েবাড়ি-বেনারসির আড়ালে গেলে ঠাহর করে ওঠা কঠিন হয় বড় কাছের চেনা মানুষটাকে। বাড়ির সব দেওয়ালগুলো নানা রঙে রঙিন হয়েছে। কেউ অফ হোয়াইট, কেউ কচি কলাপাতা, কেউ বা সফ্ট বেবি পিঙ্ক। বড় ঘরের জানালার পাশে বিহান তরাইয়ের বড় হওয়ার অভিজ্ঞান দেওয়ালটার কাছে গিয়ে দাঁড়ায় বরুণ। সেই সব খুনসুটি, ঝগড়া, শশঙ্গাসন দিন হারিয়ে গেছে আলোকিত অলিভের আড়ালে। পড়ার ঘরের সরস্বতী বিদায় নিয়েছেন। এখনই যে তাঁর আশীর্বাদী হাত দুটোর বড় দরকার ছিল বিহান, তরাইয়ের। উই মাটির আলপনাদের শুষে নিয়েছে বেবি পিঙ্ক। নিজেকে অঘ্রাণের কাশবনের মতো ঋক্ত লাগে বরুণের।
—কেমন হয়েছে তো বলো? ভোল পাল্টে দিয়েছি কিনা তোমাদের পুরনো লজঝরে বাড়িটার?
—একেবারে। অনবদ্য বললে কিছু কম বলা হয়। বাড়ি ভাড়া দেবার জন্য আমার আপত্তি আমি তুলে নিলাম তনু। এমন ঝলমলে রঙিন বাড়ি লোকের পছন্দ হবেই। ভাড়াটেদের ঢল নামবে। সপ্তাহে সপ্তাহে উজিয়ে এতদূর পথ আসার আর দরকার হবে না আমাদের।