বেড়ালছানা ও ছোটকাকুর দুঃখ

কাল্পনিক চিত্র

দেবকুমার সেনগুপ্ত

সাদার ওপর কালো-কালো ছোপ ধরা মোট চারটে বেড়ালবাচ্চা। সেগুলোর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে টিকলু। বাচ্চাগুলো কী সুন্দর দেখতে হয়েছে। মাত্র দু’দিন হল জন্মেছে। এখনও চোখ ফোটেনি। শুয়ে শুয়ে মায়ের দুধ খাচ্ছে।

মা-বেড়ালটা সিঁড়ির নীচে বাচ্চা রাখার বেশ ভালো একটা জায়গা পেয়েছে। চট করে কারোর চোখে পড়বে না। বাড়িতে একমাত্র টিকলুর মা জানে ব্যাপারটা। ঠাকুমা কিংবা বাবা জানে না। সে কারণেই বাড়িতে এখনও কুরুক্ষেত্র শুরু হয়নি। তবে ছোটকাকু জেনে থাকতে পারে। সিঁড়ির নীচে তার সাইকেল থাকে। বাচ্চাগুলোকে টিকলুর এত ভালো লাগছে যে, সে ভেবেই পাচ্ছে না ওরা একটু বড় হলে কীভাবে ওদের সঙ্গে সে খেলবে। তার ভাগের দুধ থেকে সে নিশ্চয়ই তাদের দেবে। কিন্তু বাবা আর ঠাকুমা জানতে পারলে কাজটা অত সহজ হবে না।


টিকলুর বাবা জানতে পারল রাতে। বাচ্চাগুলো খিদেয় মিঁউ-মিঁউ করছিল। মা-বেড়ালটা সামনে ছিল না। বেড়ালবাচ্চার ডাক কানে আসতেই টিকলুর বাবা আলো জ্বেলে সিঁড়ির নীচে গিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, ‘এখানে বেড়ালবাচ্চা এল কী করে?’
টিকলুর মা বলল, ‘দু’দিন আগেই হয়েছে। কী সুন্দর দেখতে হয়েছে, না?’
টিকলুর বাবা ঘুরে তাকাল, ‘বাড়িতে এসব রাখা চলবে না। প্যাকিং বাক্স দিয়ে আবার বেড়ালের ঘর তৈরি করে দেওয়া হয়েছে! এ নিশ্চয়ই টিকলুর কাজ। দেখাচ্ছি মজা। বেড়াল নিয়ে সময় কাটালে ক্লাস ফোর থেকে পাশ করে আর ফাইভে উঠতে পারবে ভেবেছ?’
এমন সময়ে টিকলুর ঠাকুমা ঠাকুরঘর থেকে বেরিয়ে এসে বেড়ালবাচ্চাগুলোকে দেখেই আঁতকে উঠল, ‘ওরে সব্বোনাশ, ঘরে বেড়ালবাচ্চা একবার ঢোকালে ওরা
এ-বাড়ি আর ছাড়বে না। দূর কর, এখনই দূর কর। ওর লোম পেটে গেলে যে ডিপথিরিয়া হবে রে!’

টিকলু বাবার ভয়ে তখন দোতলায় উঠে ছোটকাকুর ঘরে আশ্রয় নিয়েছে। ছোটকাকুর সামনে বাবা তাকে মারে না। বাড়িতে ছোটকাকুর সঙ্গে টিকলুর খুব ভাব। তবে কাকুর একটাই দুঃখ। অনেকদিন ধরে সে একটা চাকরি পাওয়ার চেষ্টা করছে। এখনও পায়নি। কাকুর এই দুঃখটা টিকলু ঠিকঠাক বুঝতে পারে।

পরদিন বেড়াবাচ্চাগুলোর বয়সের কথা ভেবে টিকলুর বাবা কিছুদিনের জন্য চুপ করে গেল। এরপর একদিন গভীর রাতে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। টিকলু সেদিন ছোটকাকুর ঘরে ঘুমোচ্ছে। ছোটকাকু তখনও শোয়নি। চাকরির পরীক্ষার জন্য অনেক রাত পর্যন্ত কাকু পড়াশোনা করে। প্রায় সাতাশ বছর বয়স হতে চলল তার। একটা চাকরি এখনই তার পাওয়াটা যে খুব দরকার সেটা ছোটকাকুর মুখের দিকে তাকালেই টিকলু বেশ বুঝতে পারে।

বৃষ্টির একটানা আওয়াজ ভেদ করে হঠাৎ একটা বাচ্চা বেড়ালের পরিত্রাহি মিঁউ-মিঁউ আওয়াজ শুনে টিকলুর ঘুম ভেঙে গেল। ছোটকাকু বাগানের দিকের জানলাটা খুলতেই টিকলু বুঝতে পারল এই ডাক সেই বেড়ালবাচ্চাগুলোর। বাচ্চাগুলোর বয়স তখন সবে পনেরো কি কুড়ি দিন হয়েছে। ছোটকাকু টিকলুকে সঙ্গে নিয়ে শব্দ অনুসরণ করে নীচে একতলায় নেমে এসে লম্বা বারান্দার শেষপ্রান্তের দরজাটা খুলে ফেলল। তারপর কলতলায় টর্চের আলো ফেলতেই দেখতে পেল প্রকাণ্ড সাইজের একটা হুলোবেড়াল মুখে একটা বেড়ালবাচ্চা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাচ্চাটা বাঁচার জন্য পরিত্রাহি চিৎকার করছে। ছোটকাকু হাতে লাঠি নিয়ে হুলোটার পিছনে তাড়া করতেই মুখ থেকে বাচ্চাটাকে ফেলে দিয়ে হুলোটা একলাফে পাঁচিল ডিঙিয়ে দে-ছুট। মা-বেড়ালটা উঠোনের একপাশে তখন বুক দিয়ে অন্য বাচ্চাগুলোকে আগলাচ্ছে। কাকু পরম যত্নে আহত বাচ্চাটাকে তুলে এনে মায়ের কাছে রাখল। বাচ্চাটা নড়তেই পারছিল না। বাঁচবে কি না ঠিক নেই। মা-বেড়ালটা সারা রাত ধরে বাচ্চাটার গা জিভ দিয়ে চেটে চেটে তাকে সুস্থ করে দিল। টিকলু সকালে উঠে অবাক! ছোটকাকু না থাকলে যে কী হতো সে ভাবতেই পারছে না।

এখন দেড়-দু’মাসের বেড়ালছানাগুলোর কত রকমসকম। সারা বাড়ি, উঠোন লাফিয়ে বেড়ায়। একটা ছোট প্রজাপতি গাছে বসলেই হলো। ওমনি সামনের দু’পায়ের থাবা উঁচিয়ে তার দিকে ধাওয়া করবে। টিকলু একটা কাগজের বল বানিয়ে দিয়েছে। সেটা নিয়ে বাচ্চাগুলো ফুটবল খেলে বেড়ায় সমস্ত উঠোন জুড়ে।

এর মধ্যেই একদিন ছোটকাকু কলকাতা গিয়েছে চাকরির একটা পরীক্ষা দিতে। টিকলু স্কুল থেকে এসেই মাঠে ফুটবল খেলতে চলে গিয়েছিল। সন্ধেবেলা ঘরে ফিরে দেখল বেড়ালবাচ্চাগুলো কোথাও নেই।

মা-বেড়ালটা ‘ম্যাঁও-ম্যাঁও’ করে ডেকেই চলেছে। নিশ্চয়ই বাচ্চাদের ডাকছে। টিকলু অনেক খুঁজেও তাদের হদিশ পেল না। অনেকক্ষণ পরে মায়ের কাছে জানতে পারল যে কাজটা ঠাকুমার। আজ সকালে ঠাকুরঘরে ঢুকে একটা বেড়ালবাচ্চা নাকি পুজোর এক-গামলা দুধে মুখ দিয়ে দিয়েছে। তাই দুধওয়ালা মধুকে ডেকে এনে ঠাকুমা বাচ্চাগুলোকে রেলস্টেশনে ফেলে দিয়ে আসতে বলেছে। মধু টাকার লোভে সেই কাজ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে। শুনেই টিকলুর হাত-পা অবশ হয়ে এল। এতক্ষণে বাচ্চাগুলোকে স্টেশনের হিংস্র কুকুরগুলো কামড়েই হয়তো মেরে ফেলেছে। দুঃখ জানানোর মতো টিকলু সামনে কাউকে পেল না। মাও কেমন যেন উদাসীন হয়ে আছে। রাতে ছোটকাকুকে দেখেই সে সব কথা খুলে বলল। শুনে ছোটকাকু হো-হো করে হেসে টিকলুর গাল টিপে বলল, ‘তোর ছোটকাকু থাকতে কেউ তোর বেড়ালবাচ্চাদের গায়ে হাত দিতে পারবে না।’
টিকলু রেগে গিয়ে বলল, ‘ইশ, মধুকাকু যখন স্টেশনে বাচ্চাগুলোকে ফেলতে গেছে তুমি তো তখন কলকাতায় পরীক্ষা দিচ্ছ।’

‘মোটেই না, আমি তখন স্টেশনে ট্রেন ধরব বলে দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ দেখি মধু ব্যাগ হাতে স্টেশনের পাশে ঝোপের মধ্যে কিছু ফেলছে। সামনে গিয়ে নজরে এল আমাদের বেড়ালবাচ্চাগুলো ঝোপের মধ্যে লাফাচ্ছে। আমি মধুর কাছে সব শুনে ওকে ধমকে বাচ্চাগুলোকে ওর বাড়িতে নিয়ে যেতে বললাম। আমার দেরি হয়ে যাচ্ছিল বলে আর বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পারিনি। ওদের দুধ খাওয়ানোর টাকাও দিয়েছি মধুর হাতে। তোর কোনও চিন্তা নেই। বাচ্চাগুলোকে মধু সারাদিন অনেক দুধ খাইয়েছে।’
টিকলুর চোখ চকচক করে উঠল, ‘বাচ্চাগুলো এখন কোথায়?’
‘পরীক্ষা দিয়ে ফেরার পথে আমি মধুর বাড়ি থেকে ওদের নিয়ে এসেছি। তুই স্যারের কাছে পড়াশোনা করছিলি বলে ডাকিনি। দেখগে যা, ওরা এখন মায়ের কোলে বসে বসে দিব্যি আদর খাচ্ছে।’
‘কতক্ষণ ওদের দেখিনি। আমাকে এক্ষুণি একবার দেখাও।’
ছোটকাকু বলল, ‘চল আমার সঙ্গে।’

তিনতলায় ছাদের চিলেকোঠায় পরিত্যক্ত জিনিস বোঝাই একটা ঘর আছে। ছোটকাকু টিকলুর হাত ধরে ঘরের আলো জ্বালতেই দেখা গেল একটা বড় থার্মোকলের বাক্সের মধ্যে বেড়ালছানাগুলো শুয়ে শুয়ে পরম নিশ্চিন্তে মায়ের দুধ খাচ্ছে। দেখতে দেখতে টিকলুর চোখদুটো জলে ভরে উঠল। তার হঠাৎ মনে হল আজকের চাকরির পরীক্ষায় ছোটকাকু পাশ করবেই। এই চাকরিটা পেলেই বেড়ালছানাগুলোর মতো ছোটকাকুরও সব দুঃখ ঘুচে যাবে।