রূপতাপস

নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায়

রাজযোগ, মানে রাজচক্রবর্তীযোগ লেখা আছে তোমার কপালে, মুখ দেখলেই বোঝা যায়… ডা. সেনগুপ্তর মুখ ঘরের ম্লান আলোতে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে, যেন কোন গোপন আবিষ্কারের আনন্দে।
—কী যে বলেন, মাথামুণ্ডু নেই কোনও। রাজযোগ আর রাজচক্রবর্তীযোগ এক জিনিস হল? কল্যাণের চোখে কৌতুক।

যাকে নিয়ে এসব কথাবার্তা, কল্যাণের সেই বন্ধু রূপম ততক্ষণে উঠে গিয়ে জানলার সামনে দাঁড়িয়েছে। দিগন্তবিস্তারী কুয়াশার নির্মোক ভেদ করে দেখা যায়, আকাশের তারা যেন দলে দলে নেমে এসেছে মর্ত্যে, মর্ত্যশিখায় নক্ষত্রেরা নানান আকারে জ্বলছে। এসব আসলে শৈলশহরের আলো। পর্বতের পটভূমি লৌহ–কালো, আকাশ কৃষ্ণকালো, কিন্তু সহসা দেখলে নক্ষত্র আর মানুষের ঘরবাড়ির আলো আলাদা করা যায় না। ডা. সেনগুপ্ত নিজের গ্লাসে তরল আগুনে পরিমাণ মতো জল মেশাতে মেশাতে অধৈর্য ভাবে বললেন, আঃহা, আমি যেটা মিন করছি, সেটা ও নিশ্চয়ই বুঝেছে। রাজরাজত্ব বলতে আমরা যা বুঝি, তা ম্যান টু ম্যান ভ্যারি করতেই পারে। কেউ হয়ত পাঁচ-ছ’কাঠা জমিতে ফুলে ফলে দারুণ যত্নে স্বর্গ রচনা করে তুলল, কেউ হয়ত পাঁচ-ছ’বিঘাতেও ততখানি পারলো না। আসল কথা হল, মনের আনন্দ। নিজের মনের গভীরে যে পায় সেই পূর্ণতার স্পর্শ, তার নিজের লেভেলে তা যেমনই হোক…


রূপম চেয়ে রয়েছে জানালার বাইরে। কল্যাণের চোখে এখনও মিটিমিটি হাসি, যেন এক্ষুনি বলে উঠবে, এসব বুঝতে দায় পড়েছে! কিন্তু অতিথি হয়ে এসে ডা. সেনগুপ্তকে খামোখা রাগিয়ে দেবার কোনও মানে হয় না বলেই বুঝি বলছে না। তাছাড়া, ঠিকই তো, আড্ডাটা আরম্ভ হয়েছিল একেবারে ভিন্ন এক প্রসঙ্গ থেকে। ডা. সেনগুপ্ত ভেতরের ঘরে নিয়ে গিয়ে আলমারি খুলে দেখিয়েছিলেন তাঁর বইয়ের সংগ্রহ। ছেচল্লিশটি খণ্ডে সম্পূর্ণ হরিদাস সিদ্ধান্তবাগীশের মহাভারত তিনি যত্ন করে সাজিয়ে রেখেছেন। বলছিলেন, ভারতবর্ষের আর কী আছে রামায়ণ-মহাভারত ছাড়া? জীবনটা চারদিক থেকে দেখতে দেখতে যখনই মনে নানান প্রশ্ন জাগে, আমি রামায়ণ কিংবা মহাভারত থেকে একেকটা চরিত্র ধরে ধরে, পড়ি। …এই যেমন ধরো, রাম কিংবা যুধিষ্ঠির, তারপর বুদ্ধদেব, সবার মধ্যেই একটা কমন ব্যাপার দেখি। রাজত্ব ছেড়ে বনবাসে যাবার জন্যে এরা যেন প্রস্তুত হয়েই ছিল। সামান্য একটু ছুতোতেই, অবশ্য ছুতো বলা ভুল… যেন নিজেদের উইল পাওয়ার বা মোটিভেশান কিছুই ছিল না— বনবাসে চলে গেল। রাম যদি সত্যি সত্যি সাধারণ ভোগী পুরুষ হতেন, পিতৃসত্য রক্ষার ব্যাপারটাতে অমন গুরুত্ব দিতেন কী? ভাবুন দেখি, অধিবাস হয়ে গেছে, সমস্ত আয়োজন সম্পূর্ণ, সব এককথায় ছেড়ে দিলেন?

—আসলে রাজার ছেলে হিসেবে তাঁদের তো পাওয়া হয়ে গিয়েছিল সবকিছুই। তাই অন্যরকম জীবন চেখে দেখতে খারাপ লাগার কথা নয়! কিছুটা অ্যাডভেঞ্চার, বা স্বভাবের ন্যাচারাল ডেভিয়েশান হতেই পারে…
পাকে পাকে ঘিরে ওঠা ধোঁয়ার মতন উঠছে নানান চিন্তার তরঙ্গ, তিনজন মানুষের কথাবার্তায় ডা. সেনগুপ্ত শেষপর্যন্ত যেন অধৈর্য হয়েই বলে উঠলেন, এনি হাউ, মুখ দেখে ভুত-ভবিষ্যৎ বলা আমার পেশা নয় বলেই খামোখা মিথ্যে বলার অভ্যেস আমার নেই। ব্যাপারটা নেশা বলতে পারো। যে জিনিসটা পুরোপুরি বিজ্ঞান নয়, মানুষ হিসেবে তাকে আমি মানতে না-ই পারি। কিন্তু ডাক্তার হিসেবে আমাকে সেই অপার্থিব অলৌকিক একটা সত্যে আমাকে বিশ্বাস রাখতেই হয়। হ্যাঁ, ডাক্তার হিসেবেই বলছি, আমার দেওয়া ওষুধে কোনও পেশেন্ট যখন ক্রমশ সুস্থ হয়ে ওঠে, সেটা ওই ওষুধের গুণ শুধু নয়, পেশেন্টের নিজের সুস্থ হয়ে ওঠার ইচ্ছে, যেভাবে সূর্যের দিকে মুখ করে একটা ফুল ফোটে…

ডা. সেনগুপ্ত ঈষৎ রঙিন হয়ে রয়েছেন বলেই হয়তো রূপম আর কল্যাণ তাঁর সঙ্গে তর্কে যাচ্ছে না। ক্রমশ তিনি বলে চলেন, বাড়িতে ভিখিরি এসেছে, তাকে ভিক্ষে দিতে গিয়ে হাতের রেখায় দেখেছি রাজচক্রবর্তীযোগ। তাকে ঘরে এনে বসিয়েছি, খাইয়ে-দাইয়ে, শুনেছি তার জীবনের গল্প। উদ্যমের অভাব যে ছিল, তা সবসময়ে বলা যাবে না… তবে জেনেটিক ফ্যাক্টর যেমন থাকে, তেমনই পরিবেশও খুব বড় ফ্যাক্টর… তবু সবচেয়ে দরকারি হচ্ছে নিজেকে নিয়ে একজন যা মনে করে, সেটাই। কে কোন অবস্থায় কতখানি সুখী। এই যেমন, আমাকেই দ্যাখো না। ফরটিনাইন রানিং, কত ফুল নিজের হাতে ফোটালাম, তবু আমি ফুল ফোটার কেমিস্ট্রি জানি না, ফিলজফি জানি না… শুধু মনে হয়, শরীরের বয়েস বেড়ে যাওয়াটা যেমন মিছিমিছি, তেমনই মেটিরিয়াল গেইন ইজ আনরিয়াল, সিগ্নিফাইং নাথিং…

চোখের দৃষ্টি আচ্ছন্ন হয়ে আসছে তাঁর, কথাও হয়ে যাচ্ছে এলোমেলো। তাই বোধহয় রূপম বলে উঠলো, এবার ওঠা যাক, রাত হল…

এই কথায় ডাক্তারবাবু যেন স্বাভাবিকত্বে ফিরলেন। ও হ্যাঁ, রাত তো হলই! যাইহোক, আই এঞ্জয়েড ইওর কম্প্যানি। কিপ কামিং, ইয়ং ফ্রেন্ডস! তবে রূপম, যা বললাম ভাই, মনে রেখো। জ্যোৎস্না রাতে, নির্জন বনপথে, পাহাড়ে কখনও একা থেকো না। তখন খাদের ধারে ঘুমন্ত দাঁড়ালে, চাঁদ ডাকবে, আয়, আয়, আয়… হাহাহাহা! হাসতে হাসতে তিনি আত্মস্থ হন, বলে চলেন, ডেকে নিয়ে যাবে, নিশিডাকের মতন অনন্ত সেই আকাশ… বললাম না, এজিং ইজ নাথিং, মেটিরিয়াল গেইন ইজ নাথিং! অ্যাট লিস্ট, ইয়ু শুড বি অ্যাকম্পানিড বাই ইয়োর বেটার হাফ… হাহহাহহা… ওকে, মাই ইয়ং ফ্রেন্ডস…

হাড় হিম করা ঠাণ্ডা রূপম আর কল্যাণকে জড়িয়ে ধরে বাইরে বেরোতেই। এলোমেলো এতরকম ভাবনা মাথায় পাক দিচ্ছিল যে কল্যাণ আপনমনে বলতে গিয়েও বলল না, একা একা থাকতে থাকতে ডাক্তারবাবুর মাথাটা বোধহয় খারাপই হয়ে গেছে। এমন খ্যাপাটে গোছের লোক বলেই প্রথম বউটা মরে বেঁচেছে, অনেকে বলে সুইসাইড। দু’বছর আগে আবার বিয়ে করলেন, তা সে বউও তো থাকে দূরে, প্রায় আলাদাই বলতে গেলে…


সুন্দর কোনও জায়গায় বেড়াতে গেলে, কল্পনা করো খুব জ্যোৎস্নার রাত, সামনে বরফ ঢাকা পাহাড়… তখন কী হবে? সাধারণ শহুরে ট্যুরিস্ট যারা, তাদের নিশ্চয়ই খুব ভালো লাগবে, দু-এক কলি গান গেয়ে উঠবে, কবিরা মনের মধ্যে সেই দৃশ্য রেখে কোনও অনুভূতি জড়িয়ে কবিতা লেখার চেষ্টা করবে। কিন্তু সাধকদের ক্ষেত্রে? হয়তো পতন হবে তাঁদের। পতন মানে, আমি বলছি ভোগ… শরীরের খিদে। নেহাতই বস্তুবাদী ব্যাপার, সেক্স-টেক্স, তাই না?… তানপুরায় হাত রেখে ওস্তাদজি লজ্জা লজ্জা মুখ করে যেভাবে সেক্স-টেক্স কথাটা বললেন, তাতে রূপমের বেজায় হাসি পেয়ে গেল। ছাত্রছাত্রীরা বোকা বোকা চোখে চেয়ে রয়েছে। আচ্ছা, গানের ক্লাস কি এমনই জায়গা, যেখানে ছেলেমেয়েরা ভুলে যায় যে কখন হাসতে হয় আর কখন হয় না?

কিন্তু, রূপম নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারছে না। ওস্তাদজি ততো প্রবীণ নন। বয়েস বছর পঞ্চাশের নীচেই। রূপমকে চেনেন। বউকে রূপম নিতে আসে গানের ক্লাস থেকে কোনও কোনও রবিবার, জানেন তিনি। এলেবেলে দু-চারটে কথাবার্তা হয়। কিন্তু এখন, ক্লাস শেষ হবার মুখে নিজের খিলখিলিয়ে ওঠা হাসি কোন কথার স্রোতে যে ভাসিয়ে দেওয়া যায়, সহসা সে বুঝতে পারে না। বেমক্কা ওর নানান কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। ছাত্রছাত্রীরা ঘরে না থাকলে না হয় বলে ওঠা যেত, সে কী মশাই, ওই ঠাণ্ডার মধ্যে সেক্স জাগবে? বেশ তো, না হয় জাগলই, কিন্তু তারপর? পতন মানে কীসের পতন? কোত্থেকে? উত্থান পতনের গ্রাফ কে আঁকে?

হঠাৎ রূপমের মনে হল, এই যে নানান বয়েসের ছেলে ও মেয়েরা গান শিখতে এসেছে, এরা গানের বিপরীত জগতে বসবাস করে বলেই যেন এসেছে ওস্তাদজির কাছে। পতন ছাড়া জীবন ওদের কিছুই দেয়নি। গানের কাছে হয়তো ওরা তাই উত্তরণ বা উত্থান খোঁজে। কিন্তু ওস্তাদজির কথার মানেটা কী দাঁড়ালো? নাকি বুঝে গেছেন, এদের কারুর দ্বারাই
গান-টান হবে না, তাই উনি একটু মজা করতে চাইছিলেন? হয়তো রূপম সবটা শোনেনি।

সে যেমনই হোক, রূপম লক্ষ্য করে, ওর বউ নবমীতার মুখে একটা মিষ্টি হাসি স্থির হয়ে আছে। যাক, স্বস্তি। এই হাসির স্বাভাবিকতাটুকু দেখবে বলেই তো এত দৌড়োদৌড়ি— মধুপুর কিংবা মায়াপুর, মনের ডাক্তারের চেম্বার থেকে গানের ক্লাস। এবং এইভাবেই, একজনের মুখে হাসি ফোটাতে গিয়ে, আরেকজনের ক্রমশ শ্রান্ত হয়ে পড়া। স্বামী মানেই যেন আসামি, ডাক্তার, উকিল, পুলিশ, সবার কাছে। ডাক্তারদের বকুনির যে কতরকম স্ববিরোধী ধরন! শরিরী আধিব্যাধি ঘেঁটে কেউ বলেন, আপনারা এখনও চাইল্ডলেস কাপল কেন? মিনমিন করে রূপম যদি জবাব দেয়, বউ ইস্যু চায়নি, ডাক্তার খেঁকিয়ে ওঠেন, চায়নি মানে? বললেই হল? আপনি পুরুষমানুষ নন? নিজের ওপর আস্থা নেই? ন্যাচারাল কোর্সে কিছু না হওয়াটাই খারাপ, বুঝলেন?

পৌরুষ প্রকট হলে যখন গড়বড় হয়েছে কিছু, তখন আরেক ডাক্তার ধমকেছেন, আরেকটা বিয়ে করার ইচ্ছে হয়েছে বুঝি? এই ওষুধগুলো খেতে যদি ভুলভাল হয়, ইউ উইল বি রেস্পন্সিবল, মনে রাখবেন!

এতসব ওষুধ খাওয়াদাওয়ায়, দেখা গেল লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি। শুধু তো নবমীতা নয়, ওষুধ গিলতে হয়েছে রূপমকেও। সেটাই নাকি নিয়ম। স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে ধ্যানে ঈশ্বরসাধনার মতন। অমনই এক মিটিঙে ডাক্তারবাবু তাঁর অবিবাহিতা সহকারিণীর পাশে দম্পতিকে বসিয়ে নবমীতাকে শুধিয়েছিলেন, কী মনে হয়? সেক্সটা একটু কমেছে? নবমীতা খিলখিল করে হেসে উঠেছিল। যেন বোঝাতে চাইছিল, যা বলেছি আগের দিন, ওর সেক্সটা অস্বাভাবিক বেশি, তা ভুল, ভুল, ভুল… স্বাভাবিক ব্যাপারকে মাঝেমাঝে অস্বাভাবিক করে দেখাই আমার অসুখ…

অনেক পেশেন্ট দেখতে দেখতে, অনেক কঠিন জটিল সংকট শুনতে শুনতে, বেশিরভাগ ডাক্তার এসব সূক্ষ্ম সমস্যা কখনও বোঝেন না। মানসিক রোগ মানে একসময়ে অনেকে ভাবতো, পাগল। সচেতনতা কি এখনও বেড়েছে? তাই ‘পাগলের ডাক্তার’ নিজেকে মনে করেন পাগলদের রাজা, অর্থাৎ পাগলশ্রেষ্ঠ! রূপমের অমনই ধারণা হয়েছে। ওসব গোলমেলে জায়গায় আরোগ্য না খুঁজে বরং গানবাজনার আসর, নিদেনপক্ষে কাছেপিঠে কোথাও বেড়াতে গিয়ে পানভোজন করা অনেক ভালো। যে আনন্দ নিতে জানে, তার আবার অসুখ কোথায়?
তবু, কখন অন্যমনে, প্রায় অকারণ, রূপম বউয়ের মুখের হাসি নিভে যেতে দেখেছে। সে বড় ভয়ংকর সময়। অকারণ বিষাদে সেসময়ে নবমীতা ঘরের কোণে বসে কাগজ ছেঁড়ে। কাপড় ছিঁড়ে কুটিকুটি করে। তালা খুলতে গিয়ে, চাবি হাতে না নিয়ে, ফস করে দেশলাই জ্বালায়। প্রথম প্রথম রূপম রেগে যেত। ভয় পেত। আত্মীয়রা বলতেন, মেনে নাও, মেনে নাও। মেয়ে হিসেবে নবমীতা এমনিতে তো খারাপ নয়। ধরে নাও না, আরও কত খারাপ ব্যাপার তো হতে পারতো!

নবমীতার দাদা বুঝিয়েছিলেন, প্রথম কিশোরী হয়ে ওঠার সময়ে খারাপ কিছু অভিজ্ঞতা এই সাময়িক বিষাদ আচ্ছন্নতার পেছনে রয়েছে। সময়ে সব ঠিক হয়ে যাবে।

ঠিক কিন্তু হল না কিছুই। বরং নবমীতা দিনে দিনে আরও নীরব হয়ে যেতে থাকলো। আত্মীয়স্বজন ক্রমে সবাই আঙুল তুলল রূপমেরই দিকে। তুমি দায়ী, তুমিই! যথাসময়ে সন্তান কেন দাওনি? কেন কঠোর হওনি, যখন দরকার?

কখনও বা মনে হয়েছে, ঘাড়ে বয়ে আনা এসব অশান্তির থেকে, বউ একেবারে না থাকাই ছিল ভালো। কিন্তু বিধবা মা-ই যে ব্যাকুল হয়েছিলেন বেশি, ছেলের বিয়ের ব্যাপারে! শেষপর্যন্ত, গতবছর মা চলে যাবার পর বিষম এক বিষণ্ণতার বোধে যখন জীবন আক্রান্ত, রূপম দার্জিলিঙের কলেজে বদলি নিয়ে চলে এল। সহকর্মী অধ্যাপকরা কেউ কেউ ঠাট্টা করেছিলেন, বলেন কি মশাই? পড়ানোতে এত আগ্রহ? কেউ বা বলেছিলেন, যান— এখন তো অল্পবয়েস, কিন্তু দেখবেন, পড়াতে পড়াতে যখন দিতে চাইবেন গভীর কিছু, তখন বুঝবেন, নেবার কেউ নেই… আরে, ওসব জায়গায় কি আর রিসেপটিভ ছাত্র মেলে?

রূপম তর্ক করতে পারতো, গ্রহণক্ষমতাসম্পন্ন ছাত্র মানে কারা? তাদের কি কলকাতার দিকেও সেভাবে পাওয়া যায়? ভালোবেসে ইংরেজি সাহিত্য আজকাল কজন পড়তে আসে? কিছুটা জব ভ্যালু, আর অনেকটাই স্নব ভ্যালু, ব্যাস! আসলে কলকাতা ওর সহ্য হচ্ছিল না। বউয়ের থেকে আলাদা থাকাই ভালো। নিজের মনে গানবাজনার চর্চা করুক, রান্নাবান্না শিখুক। যেটুকু সময় রূপম কাছে থাকবে, সাহায্য করবে। বাকি সময়, দার্জিলিঙে, একা! মন্দ কী? কলেজের বন্ধু কল্যাণ ওখানেই পোস্টেড। ইনকাম ট্যাক্স অফিসার। লিখেছিল, চলে আয়, একসঙ্গে জমিয়ে থাকা যাবে। বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে সংসারে যখন জড়াসনি, তখন ফোর্সড ব্যাচেলরের জীবন, ভালোই। চাইলে সস্ত্রীকও আসতে পারিস… এ জায়গায় থাকা তো অনেকে হানিমুন পোস্টিং মনে করে…


শূন্যদৃষ্টিতে রূপম প্রকৃতির শুশ্রূষা খুঁজছিল। যদিও শীত প্রচণ্ড, তবু আজ ছুটির দিনটাতে দলে দলে মানুষ বেরিয়ে পড়েছে পিকনিকে। উল্লাস, হুল্লোড়ের মাঝে কিছু কিছু অসভ্যতা। অঢেল সুরাপান করে যা খুশি তাই করা, খোলা আকাশের নিচে, নদীর কাছে খানিক অবান্তর ছেলেমানুষি। প্রকৃতির এত কাছে থেকেও এরা প্রকৃতির সত্যকে ছুঁতে পারে না কেন? মেধার চর্চা নেই বলে? সমীকরণ তো হৃদয়ের সঙ্গে। এত জোরে ঝিনচ্যাক বাজনা বাজিয়ে প্রাকৃতিক শান্তি নষ্ট করারই বা মানে কী?

কল্যাণ ঘাড় কাত করে বসে বসেই ঘুমোচ্ছে। নাক ডাকার শব্দ হচ্ছে অল্প অল্প। সামনে ওর সহকর্মীটি, তারও মাথা ঝাঁকিয়ে উঠলো কয়েকবার। কল্যাণের অফিসের গাড়ি— গাড়ি চড়ে ঘুরে বেড়ানোরই কাজ ওদের; আজ ছুটির দিন বলে রূপমকেও তুলে নিয়েছে।

উঁচু-নিচু পাহাড়ি পথ তো আর নেই, মংপু থেকে রাম্ভি হয়ে নেমে দুটো দিন ওরা কাটিয়েছে কালিঝোরা ফরেস্ট বাংলোয়। আজ খুব সকালেই বেরিয়ে পড়া গেল— সেবক, মংপং ছুঁয়ে মালবাজার। সেখানকার ট্যুরিস্ট লজেই দুপুরের খাওয়াদাওয়া। কল্যাণ তারপর কয়েক চুমুক রাম খেয়েছে। আকাশটা মেঘলা, এই ছুতোয়।

অনন্তকাল যদি এভাবে দু-চোখ মেলে সামনে খুলে যাওয়া পথ দেখতে দেখতে— সামনে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কী করার আছে মানুষের? রূপমের সহসা মনে হল, সে যেন এক অক্লান্ত রূপতাপস, যতটুকু ধরা পড়ে দৃষ্টির সীমানায়, ততটুকু আনন্দের উৎসবে ও রাজা। চোখে ওর ঘুম নেই সেজন্যেই।