বুড়ো-বুড়ির বিয়ে

কাল্পনিক চিত্র

মানসী গঙ্গোপাধ্যায়

আজ বাড়িতে বুড়ো-বুড়ির বিয়ে। বিন্নি আর তিন্নি খুব উত্তেজিত। রবিবার, স্কুলের ছুটি। ঠাম্মা পাঁজি খুলে ছুটির দিন দেখে বিয়ের দিন ঠিক করেছেন। জোর তোড়জোড় চলছে। মানদাপিসি সকাল থেকে শিল-নোড়ায় কড়াইয়ের ডাল বেটে চলেছে ঘষরঘষর করে। মা একটা বড় কাঁসার থালায় তেল মাখিয়েছে, একটা বড় পরিষ্কার সাদা কাপড় আর একটা থালায় দুব্বো, সিঁদুরের কৌটো, শাঁখ সব গুছিয়ে রেডি করে রেখেছে। মানদাপিসির ডালবাটা হলে সেই এক গামলা ডালবাটা নিয়ে, মা বড় কাঁসার থালা আর সব জিনিসপত্র নিয়ে ছাদে চলল। ঠাম্মা ও বিন্নি-তিন্নি সবার পিছনে। ছাদের একপাশে সব নামিয়ে মা আর মানদাপিসি দাঁড়িয়ে রইল। অঘ্রাণ মাস,

বড়ি-হাত করার সময় বুড়োবুড়ির বিয়ে দিয়ে তবেই বড়ি দেওয়া যায়। ঠাকুমা তেল মাখানো বড় থালাটার মাঝখানে দুটো বড় বড় বড়ি তৈরি করলেন। একটার মাথায় দুব্বোর গোছা গুঁজে দিলেন, আরেকটার মাথায় সিঁদুর পরিয়ে দিলেন। মা শাঁখ বাজালো, মানদাপিসি উলু দিল। বুড়োবুড়ির বিয়ে হয়ে গেল। বিন্নি-তিন্নি হাততালি দিয়ে উঠল। ওদের খুব মজা লেগেছে। মা আর মানদাপিসি নিচে নেমে গেল। ঠাম্মা টুকটুক করে কাঁসার থালাটা ভরিয়ে তুললেন সাদা ফুলের মতো বড়ি দিয়ে। দুই বোন চুপ করে বসে দেখতে লাগল। থালাটা ভরে গেলে ঠাকুমা সাদা কাপড়টা ছাদে বিছিয়ে নিলেন। ওটাতে বড়ি দেওয়া শুরু করলে দুই বোন বায়না জুড়ে দিল— ‘ঠাম্মা আমরাও বড়ি দেবো।’ ঠাম্মা বলেন, ‘আরেকটু বড় হও, তখন দিও।’ দুই বোন নাছোড়বান্দা।
অগত্যা ঠাম্মা তাদের উৎসাহ দেখে বললেন, ‘যাও, ছাদের কলে হাত ধুয়ে হাতদুটো ভালো করে জল ঝেড়ে আমার কাছে চলে এসো। বিন্নি আর তিন্নি মহাখুশি। নিজেদের বেশ বড় বড় ভাবতে পারছে ওরা। অঘ্রাণের মিঠে রোদে পিঠ দিয়ে বসে পড়ে ওরা ঠাম্মার দুইপাশে। ঠাম্মা একটু করে ডালবাটা নিয়ে সুন্দর করে বড়ি দিচ্ছেন আর ওদিকে দুই নাতনির তা আর বড়ি হচ্ছে না, সেগুলো থেবড়ে গিয়ে বড়া হয়ে যাচ্ছে। ঠাম্মা সেদিকে তাকিয়ে বলেন, ‘উঁহু অমন নয়, আমাকে দেখো কীভাবে দিচ্ছি, তারপর দাও।’ দুই বোন ঠাম্মার বড়ি দেওয়া খানিকক্ষণ দেখে আবার শুরু করল। কিন্তু কিছুতেই ঠাম্মার মতো হয় না। ঠাম্মা ওদের দিকে মনোনিবেশ করলেন, বলে বলে শিখিয়ে দিতে লাগলেন। তাতেও হয় না। তিনি আর কিছু বলেন না। ভাবেন, যা পারে করুক। এভাবেই শিখবে আস্তে আস্তে। ইতিমধ্যে মা একবার ছাদে এলেন দেখতে। মেয়েদের কাণ্ড দেখে বকা দিলেন, ‘এ কী করছ তোমরা? সব নষ্ট করে দিচ্ছ তো! দেখো ঠাম্মারগুলো কেমন হচ্ছে, আর তোমাদেরগুলো তাকিয়ে দেখো।’


দুইবোনে ফ্যালফ্যাল করে একবার মা, একবার ঠাম্মা আর একবার বড়ির দিকে তাকাতে থাকে। ঠাম্মা বলেন, ‘আঃ বউমা, বকছ কেন? ওরা কখনও আমার মতো পারে? এভাবেই শিখবে। ওদের বকে নিরুৎসাহিত কোরো না।’ দুইবোন মহাখুশি। মা তাও বলেন, ‘আপনি আর আশকারা দেবেন না তো, মা। বড়ি দেওয়া শিখেই বা কী হবে ওদের? যা শিখলে কাজ দেবে সেটাই ভালোভাবে শিখুক বরং।’ মা চলে গেলে দুইবোনে আবার মহা উৎসাহে বড়ি দেওয়া শুরু করল ঠাম্মার সঙ্গে। সাদা কাপড় ভরে উঠতে লাগল বড়িতে। সুন্দর শুঁড়তোলা ঠাম্মার বড়িগুলোতে সেজে উঠতে লাগল কাপড়ের টুকরোটা। বিন্নি-তিন্নির বড়িগুলো একটা কোনায় ধেবড়ে গায়ে গায়ে মাখামাখি হয়ে পড়ে রইল। ওরা মনখারাপ করে ঠাম্মাকে বলল, ‘ও ঠাম্মা, তোমার বড়িগুলো কী সুন্দর হচ্ছে আর আমাদেরগুলো দেখো।’ ঠাম্মা একটু হেসে বলেন, ‘আমি যখন প্রথম বড়ি দিই আমারগুলোও অমন হচ্ছিল। আমি তো খুব ছোট বয়সে বিয়ে হয়ে এই বাড়িতে এসেছি, তাই সব শিখেছি আমি আমার শাশুড়িমায়ের কাছে। তিনি কখনও বকতেন না, উৎসাহ দিতেন। উনি যদি বকতেন তাহলে ভয়ে ভয়ে আমি আর শিখতেই পারতাম না। তোমরাও করো, যেমন পারো, তবে ভাল করার চেষ্টা করো। চেষ্টা করলেই পারবে। ঠাম্মার কথা শুনে দুইবোন দ্বিগুণ উৎসাহে শুরু করে দিল বড়ি দিতে।

দুইবোনে নিজেদের মধ্যে কম্পিটিশন লাগিয়ে দিল। বিন্নি বলে, ‘তোর থেকে আমারটা ভালো হচ্ছে’, আবার তিন্নিও তাই বলে। ঠাম্মা মুখ টিপে হাসেন। তবে সত্যি করে ওদের বড়িগুলো আগের থেকে ভালো হতে লাগল। ওরা খুব খুশি। ঠাম্মা ওদের জন্য খানিকটা জায়গা ছেড়ে দিয়ে বললেন, ‘তোমরা দু-জনে মিলে এই অবধি দাও, বাকিটা আমি দিচ্ছি।’ অবশেষে সাদা কাপড় ঠাম্মার শুঁড় তোলা বড়ি ও বিন্নি-তিন্নির বড়ায় ভরে উঠল। ঠাম্মা নাতনিদের নিয়ে নিচে চললেন তবে তাদের ওপর দায়িত্ব রইল মাঝে মাঝে ছাদে উঠে লক্ষ্য রাখা কাকপক্ষীতে মুখ দিচ্ছে কিনা। তাহলে এত পরিশ্রম পণ্ডশ্রম হয়ে যাবে। দুইবোন মহা-উৎসাহে লাঠি নিয়ে বারেবারে ছাদে হাজির হয় আর ঠাম্মাকে গিয়ে খবর দেয়। রোদ পড়ে এলে ছাদে গিয়ে দেখে একটা হনুমান ছাদের পাঁচিলে বসে বড়ি ভর্তি কাপড়টা হাতে নিয়ে তার থেকে বড়ি খুলে খুলে খাচ্ছে। ওরা হৈ-হৈ করলে বাবা ছুটে আসেন ছাদে। দেখে তিনি হেসে বলেন, ‘হনুমান বুড়োবুড়ির বিয়ের নেমন্তন্ন খাচ্ছে।’ বাবাকে দেখে হনুমান বড়ির কাপড়টা নিয়ে পাশের বাগানের সজনে গাছে গিয়ে বড়ি খেতে লাগল। মা করুণ মুখে কাঁসার থালাটা নিয়ে বিন্নি-তিন্নিকে নিয়ে নিচে নেমে গেলেন।
সব শুনে ঠাম্মা হায় হায় করে উঠলেন।