প্রবীর সরকার: সুইজারল্যাণ্ড, ফ্রান্স, ইতালি, অষ্ট্রিয়া, জার্মানি, স্লোভেনিয়া, লিচেনস্টাইন আর মোনাকো— স্কুলবেলায় যাকে আলপাইন পর্বত বলে জেনেছি, সেই ‘আল্পস’ ছড়িয়ে আছে এই আটটি দেশে। বরফঢাকা তার সবচেয়ে সবচেয়ে উঁচু চূড়াটির নাম Mont Blanc (৪৮০৮ মি.)। আমাদের গন্তব্য অবশ্য ম্যাটেরণ, পিরামিড আকৃতির যে পাহাড়চূড়া ট্যুরিস্টদের বিচারে বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর। আকাশের নন্দনকানন, কেউ বলে ম্যাটারহর্ন স্কাই প্যারাডাইজ আবার কেউ বলে ম্যাটারহর্ন গ্লেসিয়ার প্যারাডাইস।
উচ্চতা ৩৮৮৩ মিটার, সুইস আল্পসের অন্তত তিরিশটি চোখ ধাঁধানো বরফঢাকা চূড়া দেখা যায় এখান থেকে, আর এটাই ইউরোপের সর্বোচ্চ কেবল-কার স্টেশন।ইতালি-ঘেঁসা সুইজারল্যাণ্ডের পাহাড়-ঘেরা ছোট্ট শহর জার্মাট। এখান থেকে শুরু হলো আমাদের আকাশ-যাত্রা। বাহন ‘কেবল কার’। গ্লেসিয়ারের উপর দিয়ে হাঁটতে হবে, তাই তৈরি হয়েই এসেছি। সুইডেন প্রবাসী ছেলের জ্যাকেট গায়ে, পায়ে জুতসই জুতা। পুত্রবধূ রিয়াংঙ্কা কিছু ধার দিয়েছে শাশুড়িকে, আর সাবধান করেছে, গ্লেসিয়ারে হাঁটতে গেলে নরম বরফে পা ডুবে যাবে।
হলেও তাই, কিন্তু সে কথা পরে, আপাতত কেবল-কারে ঊর্ধমুখী নাগরদোলার মতো কেবলই চলা। স্বচ্ছ কাঁচের জানালায় দেখা দিচ্ছে একের পর এক দৃশ্য। তবে পাইনের সারি সঙ্গ ছাড়ে না। নীচের দিকে স্প্রুস, ফার, ম্যাপল ছাড়িয়ে উপরে উঠতে উঠতে ধরা দিল জুনিপার, স্টোন-পাইন, রক-পাইন, ডোয়ার্ক— আরও অনেক নাম না জানা গাছ। কোথাও ঝোপঝাড়, কোথাও ন্যাড়া পাহাড়। দূরে দূরে নাম না জানা অজস্র বরফচূড়া।
এক সময় চোখ আটকে যায় ত্রিভূজাকৃতির নীল রঙের লেক-এ। এতটা উঁচুতে (শোনা গেল এর উচ্চতা ২৭৫৭ মিটার) এমন লেক সচরাচর দেখা যায় না। আমাদের ‘কেবল-কার’ চলছে সেই রিফেলসি (Riffelsee) লেকের প্রায় উপর দিয়ে। আরও একটু কাছে এসে দেখি অপূর্ব এক দৃশ্য, লেকের শান্ত জলে প্রতিবিম্বিত হচ্ছে ম্যাটারহর্ন চূড়ার স্বর্গীয় ছবি! আল্পস পর্বতে যাঁরা বেড়াতে আসেন তাঁদের অনেকরই স্বপ্ন থাকে এই প্রতিবিম্ব দেখার।
অনেকটা উপরে উঠে কেবল-কার থামল তার নির্ধারিত স্টেশনে। ম্যাটারহর্ন গ্লেসিয়ার প্যারাডাইস এখনও দূরে, আরও কিছুটা উপরে। এই পথটুকু যেতে হবে রোপ-ওয়েতে। এত উঁচুতে কেবল-কার চলে না। এবার ঝুলে ঝুলে চলা। ছোট ছোট কেবিন, খুব বেশি হলে ৬ জন বসা যায়। আমরা চারজনেই একটা কেবিন দখল করে নিয়েছি। কর্মীরা যারা উঠতে সাহায্য করছিল, তারা একটু হেসেছে, কিন্তু আপত্তি করেনি।
নিশ্চয়ই বুঝেছিল, আমরা দূর দেশের পথিক। কেবল-কারের মতো রোপ-ওয়েও আসলে স্বচ্ছ কাচের একটা ঘেরাটোপ। চারদিক দিয়েই দেখা যায়। তবে এখন চোখের সামনে কেবলই পাহাড়। কাছের পাহাড় ধূসর, দূরের পাহাড় বরফ-সাদা। এখান আর গাছ-গাছালি নেই। ‘রোপ-ওয়ে’কে এখানে বলে ‘গন্ডোলা’। আকাশগঙ্গার সে তরণী এক সময়ে তীরে অবতরণ করল। জায়গাটা যেন একটা বড় কোনও টার্মিন্যাল স্টেশন।
মাথায় এখনও ছাদ আছে, তাই ঠাণ্ডা অসহ্য নয়। অর্ধচন্দ্রকৃতি জায়গায় বাইরে, মানে পাহাড়ের দেশে যাবার তিনটে দরজা। খানিক দ্বিধা করে ঢুকে গেলাম একটার মধ্যে। পরে দেখেছি, সবদরজাই শেষে পৌঁছে দেবে সেই গ্লেসিয়ারের রাজ্যে, যাকে বলে স্কাই প্যারাডাইস। কিন্তু স্বর্গে যাবার সেই রাস্তাটিই বড় বিস্ময়ের।বাঁদিকের গোল দরজা দিয়ে ঢুকে গেলাম ভিতরে। আঁকা বাঁকা সরু গুহাপথ। পুরো পথটাই বরফে ঢাকা, যেন বরফ খুঁড়ে তৈরি হয়েছে পথ। দু’দিকের দেওয়াল, ছাদ সবই নিরেট বরফের।
কনকনে ঠাণ্ডা, পথের দৈর্ঘ খুব কম নয়, একটু দূরে দূরে বিশ্রাম নেবার জন্য বসার জায়গা, তার উপরে তুলার মতো আস্তরণ। কোথাও খানিকটা প্রশস্ত স্থান, সেখানে স্বচ্ছ বরফ খোদাই করে মূর্তি গড়া হয়েছে। ঈগলের মতো পাখি, নেকড়ে, কুকুরের দল, ষাঁড়ের লড়াই, অচেনা কিছু পশুপাখি, মানুষ— এমনকি যীশুর মূর্তিও রয়েছে। প্রতিটি মূর্তিই মসৃণ, অত্যন্ত সূক্ষ্ম কারুকার্য। শিল্পীদের নাম লেখা নেই। মনে মনে প্রণত হই অজানা ভাস্করদের কাছে।
এমনি তিনটি গুহাপথ আছে ম্যাটারহর্ন গ্লেসিয়ার প্যারাডাইসের প্রবেশপথে। কোনও কোনও জায়গায় একটি পথ গিয়ে মিশেছে অন্যটির সঙ্গে। ভেতরে কৃত্রিম আলো। চলতে চলতে এক সময় পথের শেষ প্রান্তে দেখা দেয় আলোর দিশা। আমরা এবার গ্লেসিয়ারের সামনে। এই গ্লেসিয়ার দর্শন, গ্লেসিয়ারের উপরে হাঁটা বা ‘স্কি’ করা বহু পর্যটকের স্বপ্ন। এখন চারদিকে বরফের রাজ্য, এক পাহাড় থেকে বরফের ঢেউ নেমে গেছে আরেক পাহাড়ে। আবার হয়তো তেমনি ঢেউ তুলে উপরে উঠে মিশেছে আরেক পাহাড়ে। সাদা বরফের উপরে রোদের তীব্র বিচ্ছুরণ।
একটানা বেশিক্ষণ তাকানো যায় না, চোখ ধাঁধিয়ে যায়। দূরে, বহুদূরে পিঁপড়ের মতো মানুষের সারি। দু’-হাতে সরু ধাতব মাথাওয়ালা লাঠি, পায়ে বিশেষ ধরণের জুতো। বরফে পা’ ডুবিয়ে হেঁটে চলেছেন। দলে দলে পর্যটক নেমেছেন লম্বা নাগরাই জুতোর মতো সিন্থেটিক ‘স্কি’ পায়ে লাগিয়ে। ভারসাম্য রাখার জন্য দু’-হাতে স্টিক। সকলেরই লক্ষ্য কোনো না কোনও পাহাড়চূড়া। যেন মহাভারতের স্বর্গারোহণ পর্ব চলছে ম্যাটারহর্ন পাহাড়ে।
এ দেশে এখন গ্রীষ্মকাল, পর্যটকদের কাছে এই সময়টাই (জুন-আগষ্ট) সবচেয়ে আকর্ষণীয়। কেবল ইউরোপ নয়, সারা পৃথিবীই যেন ঠিকানা খুঁজে পেয়েছে আল্পসের এই পাহাড়চূড়ায়। আমরাও হাঁটলাম কয়েক পা’, বরফ-পিছল ভূমিতে গৃহিনীর অধঃপতনও হলো, তবু যৌবন এখানে থমকে যায় আর বার্ধক্য যেন হঠাৎ পিছনপানে ফেলে আসা যৌবনের অভিমুখী।