প্রতাপগড় ফার্মে একদিন

অভিজিৎ মুখোপাধ্যায়: হরিয়ানার চরখি দাদরি-তে ‘মেটেরিয়ালস’-এর ওপরে এক আন্তর্জাতিক আলোচনাচক্রের শেষে আনুষঙ্গিক ভ্রমণে আমরা গিয়েছিলাম ঝজ্জর জেলার প্রতাপগড় ফার্মে। প্রসঙ্গত, চরখি দাদরি আগে ভিওয়ানি জেলার অন্তর্গত ছিল। ২০১৬ সালের পয়লা ডিসেম্বর তাকে আলাদা জেলা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তিনকোনা পার্ক, কলেজ রোডের ‘হোটেল লাল কেশর’ থেকে রওনা হয়ে ১৫২ ডি হাইওয়ে ধরে মসৃণ গতিতে ঠিক এক ঘণ্টা পরে পৌঁছলাম কম বেশি ৪৩/৪৪ কিলোমিটার দূরের ওই ফার্ম হাউসে।

হরিয়ানায় বড় বড় গাছ গাছালির ততটা রমরমা নেই, যতটা না আছে বিস্তারী সবুজ শস্যক্ষেত্র। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, সে রাজ্যে ৮৩.৬ শতাংশ কৃষিযোগ্য জমি এবং মাত্রই ০.৭ শতাংশ অরণ্য অঞ্চল। আরও জানা যাচ্ছে, ভারতের সামগ্রিক দানা শস্যের দ্বিতীয় জোগানদার এই হরিয়ানা রাজ্য। হাইওয়ের দু’ধারে কোথাও সবুজ, কোথাও হলুদ পাকা গম মকাই বা বাজরা উজাড় করে দিচ্ছে দিগন্ত। এই সব দেখতে দেখতেই প্রতাপগড় ফার্মের তোরণ দ্বারে পৌঁছলাম আমরা। ফার্ম হাউস চত্বরটি কিন্তু বড় বড় সবুজ বৃক্ষে সজ্জিত।

কপালে লাল তিলক পরিয়ে, ফুলের পাপড়ি ছুঁড়ে অতিথিদের আপ্যায়ন করা হয় এখানে। প্রাথমিক এই আপ্যায়ন পর্ব শেষে ভিতরে প্রবেশ করলাম আমরা। এক সাপুড়ে একটি বড় গাছের তলায় বসে বাঁশিতে মায়াবী সুরের মূর্ছনা তুলছেন। তালে তালে নাচছেনও অনেকে। ওই মায়াবী সুরে সত্যিই নাচতে ইচ্ছে করে৷হরিয়ানার সংস্কৃতিকে একত্রে তুলে ধরার প্রয়াস করা হয়েছে প্রতাপগড় ফার্মে। ঝজ্জর জেলায় ২৮ একর জায়গা জুড়ে এই ফার্ম হাউস এক আদর্শ ইকো ট্যুরিজম্-এর উদাহরণ।


উদ্যোক্তারা অবশ্য এই প্রচেষ্টাকে ‘ফার্ম ট্যুরিজম্’ নামে অভিহিত করছেন। বিগত ১৫ বছর ধরে এই প্রয়াসটি চলছে। হরিয়ানার শিল্প সংস্কৃতি, দৈনন্দিন যাপন, খাদ্যাভ্যাস ইত্যাদি সাধারণ্যে তুলে ধরার লক্ষ্যে সেখানকার এক কৃষিজীবী তাঁর কৃষিজমির একটি বড় অংশ, প্রায় ২৮ একর পরিমাণ জমিতে, এই ফার্ম হাউসটি তৈরি করেন। স্থানটি ছুটির দিনের এক আদর্শ পিকনিক স্পট হিসেবেও খুব জনপ্রিয়।হরিয়ানার গ্রামীণ সংস্কৃতির প্রদর্শন ছাড়াও ছোট এবং বড়দের বিনোদন বা মনোরঞ্জনের একাধিক আয়োজন রয়েছে এখানে।

কার্নিভাল জোন, অ্যাডভেঞ্চার জোন, কালচারাল জোন, ইন্ডোর গেমস, স্পোর্টস জোন, রুরাল গেমস, এগ্রিকালচারাল জোন, কালচারাল অ্যাক্টিভিটিজ, মন্দির ও পঞ্চবটী এবং বৈদিক গো-গ্রাম—এইভাবে সাজানো হয়েছে ২৮ একর পরিমাণ জায়গাটিকে। শহরাঞ্চলে অধুনা লুপ্ত গ্রামীণ খেলাধূলো যেমন— গুলি, ডাংগুলি, পিট্টু, লাট্টু এসবের সঙ্গেই প্রায় সব রকম ইনডোর এবং আউটডোর খেলা যেমন টেবিল টেনিস, ব্যাডমিন্টন, বাস্কেট বল, লুডো, দাবা, ক্যারাম, বিলিয়ার্ড, ক্রিকেট, ফুটবল, ফ্রিসবি, কুস্তী, তীরন্দাজি, এয়ার রাইফেল আছে।

অ্যাডভেঞ্চার জোনে বিবিধ রোমাঞ্চকর সব খেলাধুলোর আয়োজন। ট্রাম্পোলিন, চামচ গুলি দৌড়, নাগরদোলা, ময়ূরপঙ্খী, বুল রাইড, টয় ট্রেন, লেকের জলে নৌকাবিহার এসব তো ছোটদের সঙ্গে সঙ্গেই বড়দেরও কম প্রিয় নয়। আছে রেইন ড্যান্স, মাড বাথ। সব নিয়ে এখানে ১৩৫টিরও বেশি বিবিধ ক্রিয়াকলাপের আয়োজন। বলাই বাহুল্য, এক দিনে এই সব কিছু শেষ করা সম্ভব নয়।খেলাধূলো, ঘোরাঘুরি করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়লে খাটিয়ায় শুয়ে বা মোড়ায় বসে বিশ্রামের আয়োজন আছে ‘ডিজে’ প্রাঙ্গণে।

অবশ্যই সেখানে নাচেরও ব্যবস্থা আছে ডিজে-র মিশ্র সঙ্গীতের তালে তালে। বিরামহীন ভাবেই নেচে চলেছেন কিছু মানুষ।অনেক ধরনের খাদ্য সম্ভারের ব্যবস্থা ডাইনিং চত্বরে। ‘যা ইচ্ছে, যত ইচ্ছে’ অর্থাৎ আনলিমিটেড খাদ্যের ছাড়পত্র আছে এই ফার্ম হাউসে প্রবেশের টিকিটের সঙ্গেই। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত একনাগাড়ে ঘোরাঘুরি, ১৩৫টিরও বেশি বিবিধ ক্রিয়াকলাপে যেমন খুশি অংশগ্রহণ, ব্রেকফাস্ট, দ্বিপ্রাহরিক আহার ছাড়াও যা কিছু খাওয়া দাওয়া নিয়ে প্রবেশ মূল্য যথাক্রমে ১০ বছরের উর্ধ্বে ১৩২০ টাকা এবং ১০ বছরের নীচে ৭৪০ টাকা। দলবদ্ধ ঘোরার জন্যে কিছু ছাড়ের ব্যবস্থা হতে পারে।

প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে প্রথমেই আমরা চলে এলাম ডাইনিং চত্বরে। উদ্দেশ্য, ব্রেকফাস্ট সেরে নেওয়া। পুরি সব্জি, ছোলে বাটোরে, ফুচকা, ভেলপুরি, দই বড়া, পাপড়ি চাট, মুড়ি মশলা, মিক্সড পাকোড়া, গরম জিলিপি, চা, ছাছ, নিম্বু শিকঞ্জী, বা আরও অনেক কিছু। পাশাপাশি দু’টি ছাউনিতে দু’জনা হরিয়ানভি মহিলা কাঠের চুল্লিতে তৈরি করছেন যথাক্রমে গুলগুলে বা আটার পিঠে, বাজরে কি খিচড়ি, সাদা ননী সহযোগে বাজরে কা রোটি, মকাই কা রোটি, লাসুন চাটনি আর অনবদ্য দেশি গুড়।দ্বি-প্রাহরিক মেনুতেও এই সব কিছুর সঙ্গেই রুটি, ভাত, চাউমিন, পনীর, ডাল, রসগোল্লা, গোলাপজামুন, গাজর বা সুজির হালুয়া ইত্যাদি।

প্রাতঃরাশ সেরেই পাশের ছাউনির সামনে রাখা মোড়ায় বসে পড়লাম। আরও কিছু মানুষজন জড়ো হলে দুই রাজস্থানী মহিলা শুরু করলেন তাঁদের ঐতিহ্যগত পুতুলনাচের আসর। একে একে সারা হল তাঁত বোনা, হরিয়ানার ঐতিহ্যবাহী পাগড়ি পরে ছবি তোলা, চোঙা লাগানো টিনের বাক্সের সামনে উবু হয়ে বসে লেন্সে চোখ লাগিয়ে বায়োস্কোপ দেখা, হাল চালানো, ছাগল ছানা খরগোশ কোলে নিয়ে যথেচ্ছ ছবি তোলা ইত্যাদি। গ্রামীণ সব ধরনের কর্মকাণ্ডের প্রদর্শন রয়েছে এখানে।শৈবা, বিপাশা, ফ্লাইং ফক্স, ডেজার্ট ফক্স ইত্যাদি বিবিধ নামের ১০টি উটের দল এবং বাদল, গোরা, হীরা, মোতি নামের বলদ- বাহিনী রয়েছে ভ্রমণার্থীদের সেবায়।

তেমনি যন্ত্রচালিত ট্র্যাক্টর দারা এবং বলবান। একটু ভুল বলা হল। মরুভূমিতে দৌড়ে চলা উট নয়, এখানে আছে উটনি, মানে মেয়ে উট। এরা দৌড়তে পারে না। উটের পিঠে চড়া, উটে টানা গাড়িতে চড়া, গরুর গাড়ি, ট্র্যাক্টর চড়ার পরে এবার বৈদিকগো-গ্রাম। রাধাকৃষ্ণের মন্দির, নিধুবন ঘুরে নিজ হাতে গরুদের ঘাসপাতা রুটি খাওয়ানো, ষাঁড়, মোষ এবং উটের খামার দেখে আবার অন্যান্য চত্বরে। এই ফার্ম হাউসে সব ধরনের খাদ্য সম্ভার প্রস্তুত হয় নিজেদের চাষ আবাদে উৎপন্ন সামগ্রী দিয়ে। আছে বিবিধ প্রকারের ভেষজ উদ্যান, গোবর গ্যাস প্ল্যান্ট। দেশি গরুর দুধে প্রস্তুত ঘিয়ের মূল্য লিটার প্রতি ১৭৫০ টাকা, ভঁয়শা ঘি ১১৫০ টাকা।

নারী পুরুষ, বাচ্চা বুড়ো নির্বিশেষে সারাদিনের বাঁধনহীন উচ্ছ্বলতায় ভেসে দিনটা নিমেষে কখন যে অতিক্রান্ত হয়ে যায়, টেরই পাওয়া যায় না। দিগন্তে লাল আভা ছড়িয়ে ক্রমে পশ্চিমে ডুবতে থাকে সূর্য। শহুরে কর্মব্যস্ত জীবনের থেকে একটা পুরো দিন আলাদা করে নিয়ে নির্ভেজাল হরিয়ানভি সংস্কৃতি তথা বাঙালির গ্রামজীবনের সঙ্গে বহুলাংশে মিল থাকা এক ফার্ম ট্যুরিজমে কাটিয়ে শরীর ও মন বেশ চাঙ্গা হয়ে ওঠে। সন্ধ্যা নামতে আমরা এবার ফিরে চললাম ঘরে।

প্রয়োজনীয় তথ্য:
ফার্মটি এপ্রিল থেকে জুন— এই তিন মাস বন্ধ থাকে। দিল্লি থেকে ৬৩ কিলোমিটার, গুড়গাঁও থেকে ৫৫ কিলোমিটার, ঝজ্জর জেলার বাস এবং রেল স্টেশন দূরত্ব যথাক্রমে ৭ এবং ৬ কিলোমিটার।