রাজ্য পুলিশে ৪৬ হাজার শূন্যপদ, ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা শুভেন্দুর! ডিসেম্বরেই ১৩৩১ নিয়োগ, জানুয়ারিতে ৪০০০

৪৬ হাজার শূন্যপদ, প্রতি এক লক্ষ মানুষের জন্য মাত্র ১০৫ জন পুলিশকর্মী! রাজ্যের পুলিশি পরিকাঠামোর এই ছবিই এ বার বদলাতে চাইছে নবান্ন।

নিয়োগ থেকে প্রশিক্ষণ, নতুন থানা তৈরি থেকে পুলিশকর্মীদের সুযোগ-সুবিধা—একাধিক ক্ষেত্রে বড়সড় সংস্কারের পরিকল্পনা ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। রাজ্য ও কলকাতা পুলিশকে ঢেলে সাজিয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করাই লক্ষ্য সরকারের।

দেশের পুলিশি পরিকাঠামোর সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের তুলনা টেনে মুখ্যমন্ত্রী জানান, সারা দেশে প্রতি এক লক্ষ মানুষের জন্য গড়ে ১১৫ জন পুলিশকর্মী নিয়োজিত রয়েছেন। সেখানে পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যাটা মাত্র ১০৫। রাজ্যে এখনও প্রায় ৪৬ হাজার পুলিশকর্মীর পদ শূন্য রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।


দীর্ঘদিন ধরে আইনি জটিলতার কারণে পুলিশে নিয়োগ আটকে ছিল বলে অভিযোগ মুখ্যমন্ত্রীর। এ প্রসঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ নিয়োগ পর্ষদের চেয়ারম্যান নীরজ কুমার সিংয়ের প্রশংসা করেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, আইনি জট কাটিয়ে নিয়োগের পথ খুলে দিয়েছে বর্তমান নিয়োগ পর্ষদ।

প্রাক্তন তৃণমূল সরকারের আমলে বিভিন্ন আইনি জটিলতার কারণে নিয়োগ প্রক্রিয়া বাধাপ্রাপ্ত হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন শুভেন্দু। বিশেষ করে ওবিসি সংক্রান্ত কলকাতা হাই কোর্টের নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে রাজ্যের মামলা করার কারণে নিয়োগে জটিলতা তৈরি হয়েছিল বলে জানান তিনি।

মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, বর্তমান রাজ্য সরকার সুপ্রিম কোর্টে দায়ের করা সেই মামলা প্রত্যাহার করেছে। ২০২৪ সালে কলকাতা হাই কোর্টের দেওয়া নির্দেশ মেনে নেওয়ার ফলেই নিয়োগের জট কাটানো সম্ভব হয়েছে।

আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই রাজ্যে আরও নিয়োগ হবে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। শুধু পুলিশ নয়, বন দফতর এবং দমকলেও নিয়োগের দায়িত্ব দেওয়া হবে পুলিশ নিয়োগ পর্ষদকে।

এ প্রসঙ্গে উত্তরপ্রদেশের উদাহরণ টানেন শুভেন্দু। তাঁর বক্তব্য, গত চার বছরে উত্তরপ্রদেশে পুলিশে ৯০ হাজার নিয়োগ হয়েছে। উত্তরপ্রদেশ পারলে পশ্চিমবঙ্গ কেন পিছিয়ে থাকবে? নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখার জন্য পুলিশ নিয়োগ পর্ষদকে নির্দেশও দিয়েছেন তিনি।

চলতি বছরের ডিসেম্বরেই রাজ্যে ১৩৩১ জন সাব-ইনস্পেক্টর ও অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব-ইনস্পেক্টর নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি, ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে ৪০০০ পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

গত ১৫-২০ বছরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ থাকায় অনেক প্রার্থীর বয়স পেরিয়ে গিয়েছে। সেই বিষয়টি মাথায় রেখে নিয়োগের ক্ষেত্রে বয়সের ছাড় দেওয়ার কথাও বিবেচনা করার নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

এ ছাড়াও ২৪৭ জন সাব-ইনস্পেক্টর, ১১১৪ জন মহিলা সাব-ইনস্পেক্টর, ৪৭৪৯ জন এসভিআরএফ কর্মী এবং ২০০০ জন দমকলকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন তিনি।

শুধু কর্মী নিয়োগ নয়, পুলিশের পরিকাঠামো উন্নয়নেও একগুচ্ছ পদক্ষেপের কথা ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। পুলিশ কল্যাণ প্রকল্পের আওতায় ১১২টি গাড়ির সংখ্যা বাড়ানো হবে। রাজ্যে নতুন থানা তৈরি এবং পুরনো পুলিশ ব্যারাক সংস্কারের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।

রাজ্যের ৪৫২টি থানায় জিম, জল পরিশোধক যন্ত্র এবং জেনারেটরের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা রয়েছে। দ্রুত এই কাজ শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

কলকাতা পুলিশের কমিশনারকে মঞ্চ থেকেই মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ, পরিকাঠামোগত কোনও ত্রুটি থাকলে তা সরাসরি তাঁর নজরে আনতে হবে। পুলিশের কাজের পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধা উন্নত করার উপরেও জোর দিয়েছেন তিনি।

পুলিশকর্মীদের বেতন সংক্রান্ত বিষয়েও রাজ্য সরকারের ভাবনাচিন্তার কথা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। অষ্টম বেতন কমিশন নিয়ে ভবিষ্যতে আলোচনা করা হবে। তবে তার আগে বকেয়া মহার্ঘ ভাতা এবং সপ্তম বেতন কমিশনের বকেয়া মিটিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।

পাশাপাশি, পুলিশকর্মীদের প্রশিক্ষণের মান উন্নত করতেও উদ্যোগী রাজ্য সরকার। ইতিমধ্যেই দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত সমঝোতাপত্র স্বাক্ষরিত হয়েছে। আরও একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে একই বিষয়ে সমঝোতাপত্র স্বাক্ষরের পরিকল্পনা রয়েছে।

সব মিলিয়ে নিয়োগ, পরিকাঠামো, প্রশিক্ষণ এবং কর্মীকল্যাণ—এই চারটি ক্ষেত্রকে সামনে রেখেই রাজ্য পুলিশকে নতুন করে সাজানোর পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষিত নিয়োগের সময়সীমা ও পরিকাঠামো উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কত দ্রুত কার্য কর হয় তারই অপেক্ষায় বাংলার মানুষ।