মোটা বেতনের চাকরির প্রতিশ্রুতি। বিদেশে গিয়ে স্বচ্ছল জীবনের স্বপ্ন। আর সেই স্বপ্নকেই হাতিয়ার করে নিয়োগ এজেন্সির আড়ালে চলছে প্রতারণা, অত্যাচার এমনকি মানব পাচারের অভিযোগ। শুধু মহিলারাই নন, এই চক্রের ফাঁদে পড়ছেন পুরুষরাও। সম্প্রতি কলকাতার একাধিক ঘটনায় সেই আশঙ্কাই আরও জোরালো হয়েছে। একবালপুরের দুই যুবককে তুরস্কে মোটা বেতনের চাকরি দেওয়ার টোপ দিয়ে পরে উজবেকিস্তানে পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে ঠাকুরপুকুরের একটি প্লেসমেন্ট এজেন্সির বিরুদ্ধে। এরপরে কোনোমতে কলকাতায় ফিরে থানায় অভিযোগ করেন দুই যুবক। অবশেষে পুলিশ ভুয়ো এজেন্সির দুই অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করেছে।
অভিযোগ, প্রত্যেকের কাছ থেকে দু’লক্ষ টাকা করে নেওয়া হয়। পরে তাঁদের জানানো হয়, তুরস্কের বদলে উজবেকিস্তানে চাকরি দেওয়া হবে। হোয়াটসঅ্যাপে ভুয়ো ভিসার নথি পাঠিয়ে পাসপোর্টও নিয়ে নেওয়া হয়। দিল্লিতে পাসপোর্ট হাতে পাওয়ার পর যুবকেরা দেখেন, তাঁদের পর্যটন ভিসায় উজবেকিস্তানে পাঠানো হচ্ছে। সেখানে গিয়ে ভিসা বদলে দেওয়া হবে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু উজবেকিস্তানে পৌঁছনোর পরই পরিস্থিতি বদলে যায়। অভিযোগ, মোটা বেতনের চাকরির পরিবর্তে তাঁদের ডেলিভারি বয়ের কাজ করতে বাধ্য করা হয়। দিনে একবেলা খাবার দেওয়া হত। এমনকি ভিসার নথিতে যে হোটেলের নাম দেওয়া হয়েছিল, সেটিও ভুয়ো বলে জানতে পারেন তাঁরা। ওই হোটেলে থাকার জন্যও নিজেদের টাকা খরচ করতে হয়। পর্যটন ভিসায় কাজ করার অভিযোগে এক যুবককে গ্রেপ্তারও হতে হয়। শেষ পর্যন্ত পুলিশের ঝামেলা এড়াতে দালালের সাহায্যে চোরাপথে উজবেকিস্তান থেকে কাজাখস্তানে পালিয়ে যান তাঁরা। সেখানে কিছুদিন আত্মগোপন করে থাকার পর কোনোমতে কলকাতায় ফেরেন।
এরপর টাকা ফেরত চাইতে ঠাকুরপুকুর ওই এজেন্সির অফিসে গেলে তাঁদের হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। এমনকি পুলিশ মিথ্যা অভিযোগ করে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা হয় বলেও দাবি যুবকদের। শেষ পর্যন্ত একবালপুর থানায় এজেন্সির তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেন তাঁরা। যেহেতু এজেন্সির অফিস ঠাকুরপুকুর এলাকায়, তাই একবালপুর থানার পুলিশ জিরো এফআইআর করে মামলা ঠাকুরপুকুর থানায় পাঠায়।
কলকাতা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (অপরাধ দমন) কুণাল আগারওয়াল জানিয়েছেন, এই ঘটনায় দু’জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের তিনদিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছে আদালত। ভুয়ো এমপ্লয়মেন্ট এজেন্সির বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপের প্রস্তুতি নিচ্ছে লালবাজার।
সম্প্রতি তামিলনাড়ুতে মোটা বেতনের চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে এক যুবতীকে বাংলাদেশে পাচারের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ, তাঁকে সেখানে আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়। কোনোমতে পালিয়ে গিয়ে বাংলাদেশের গোপালগঞ্জের একটি হাসপাতালে ভর্তি হন ওই যুবতী। সেখান থেকেই ভাইকে ফোন করার পর বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।
পরপর এই ধরনের ঘটনায় প্রশ্ন উঠছে, কী ভাবে একের পর এক ভুয়ো নিয়োগ এজেন্সি তৈরি হচ্ছে এবং বিদেশে চাকরির নামে প্রতারণার জাল ছড়াচ্ছে। চাকরির সন্ধানে থাকা যুবক-যুবতীদের অসহায়তার সুযোগ নিয়ে কখনও তাঁদের কাছ থেকে মোটা টাকা নেওয়া হচ্ছে, কখনও জাল নথিতে বিদেশে পাঠানো হচ্ছে, আবার কখনও তাঁদের কার্যত পাচার করা হচ্ছে। এর ফলে বিদেশে চাকরির প্রলোভনে পা দেওয়ার আগে নিয়োগকারী সংস্থা, ভিসা এবং চাকরির যাবতীয় নথি যাচাই করার বিষয়ে সতর্কতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাও ফের সামনে এসেছে।