এক সময় ২১ জুলাই মানেই ছিল তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মসূচি। কিন্তু এ বছর ধর্মতলার বুকে বদলে গেল সেই রাজনৈতিক ছবি। তারামণ্ডলের সামনে কালীঘাট তৃণমূল কংগ্রেসের সভা, রেড রোডে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূলের কর্মসূচি এবং শহিদ মিনারে প্রদেশ কংগ্রেসের শহিদ দিবস— তিনটি পৃথক মঞ্চে পালিত হল ২১ জুলাই। আর শহিদ মিনারের সভা ঘিরে দিনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত উঠে এল হামলার অভিযোগ, কাদা-জল পেরিয়ে সমাবেশে যোগ দেওয়া কর্মীদের লড়াই এবং কেন্দ্র ও রাজ্য— দুই সরকারের বিরুদ্ধেই কংগ্রেসের তীব্র রাজনৈতিক আক্রমণ।
সকাল থেকেই পূর্ব মেদিনীপুর, নন্দীগ্রাম, চণ্ডীপুর, বোরজোড়া, কাটোয়া, ডোমকল, নোয়াপাড়া-সহ একাধিক জায়গায় কংগ্রেস কর্মী-সমর্থকদের উপর হামলা, গাড়ি ভাঙচুর ও পথ আটকানোর অভিযোগ ওঠে। প্রদেশ কংগ্রেসের দাবি, বিজেপি কর্মীরাই এই হামলার সঙ্গে জড়িত। যদিও অভিযোগের বিষয়ে বিজেপির তরফে কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
সব বাধা পেরিয়ে শহিদ মিনারে পৌঁছন কর্মীরা। কিন্তু সেখানেও ছিল আর এক পরীক্ষা। বৃষ্টিতে মাঠ জুড়ে গোড়ালি ডোবা কাদা-জল। সেই কাদা মাড়িয়েই সভাস্থলে পৌঁছতে দেখা যায় জেলা থেকে আসা কর্মী-সমর্থকদের। প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার বলেন, ‘হামলা, বাধা, কাদা-জল— কোনও কিছুই আমাদের কর্মীদের আটকে রাখতে পারেনি। যাঁরা এত প্রতিকূলতা পেরিয়ে এসেছেন, তাঁরাই কংগ্রেসের আসল শক্তি। আমি নিজেও মঞ্চে না থেকে মাঠে কর্মীদের সঙ্গে ছিলাম। কাদা-জল পেরিয়েই এই সমাবেশ সফল হয়েছে।’
সভার অন্যতম বক্তা দীপা দাশমুন্সী ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাইয়ের ঘটনাকে সামনে এনে বলেন, তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের আমলে যুব কংগ্রেস কর্মীদের উপর বর্বর হামলা হয়েছিল। তাঁর অভিযোগ, সেই সময়ের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রসচিব মনীষ গুপ্তের বিরুদ্ধে গুলি চালানোর নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ থাকলেও পরে তাঁকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠা করেন। দীপার কথায়, ‘যিনি গুলি চালানোর অভিযোগে অভিযুক্ত, তাঁকেই পরে শহিদ দিবসের মঞ্চে দেখা গিয়েছে। আমরা তখনও বিচার চেয়েছিলাম, এখনও মনীষ গুপ্তের শাস্তি চাই।’ যন্তর মন্তরের আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, মানুষের সমর্থন নিয়েই কংগ্রেস আন্দোলন চালিয়ে যাবে। ছাত্র-যুবদের প্রশ্নে রাহুল গান্ধীর ভূমিকাও তুলে ধরেন তিনি।
অধীর রঞ্জন চৌধুরী তাঁর ভাষণে বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে নিট প্রশ্নফাঁস, কোচিং শিল্প, ইতিহাস পরিবর্তন, রামমন্দিরের অনুদান এবং সোনম ওয়াংচুকের আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে তীব্র সমালোচনা করেন। একই সঙ্গে তৃণমূলকেও নিশানা করে বলেন, ক্ষমতায় এসে কংগ্রেস ভাঙার রাজনীতি করেছে তারা। তাঁর দাবি, আগামী দিনের বিকল্প নেতৃত্ব রাহুল গান্ধীই।
সভায় উপস্থিত কর্মীদের বক্তব্যেও উঠে আসে সেই রাজনৈতিক বার্তা। হাওড়ার বাগনান থেকে আসা আফরিন মণ্ডলের দাবি, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিশ্বাস করেছিলাম। এখন বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমরা রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বেই আস্থা রাখছি।’ দুর্গানগরের কোহিনূর ভট্টাচার্যের কথায়, ‘কংগ্রেস একাই লড়বে। আগে দিল্লি, তারপর বাংলাতেও কংগ্রেস সরকার গড়বে।’
হামলার অভিযোগ, কাদা-জল পেরিয়ে কর্মীদের উপস্থিতি এবং ১৯৯৩-এর স্মৃতিকে সামনে রেখে এ দিনের শহিদ মিনারের সমাবেশ থেকে নিজেদের রাজনৈতিক লড়াইয়ের নতুন বার্তাই তুলে ধরল প্রদেশ কংগ্রেস।