তারাতলার ধ্বংসস্তূপে ১৫ মৃত্যু: কলঙ্কিত ‘কালী’ পুলিশের জালে, ‘সই’ কাণ্ডে এবার জেরা ফিরহাদকেও?

বিতর্কে ফিরহাদ হাকিম (AI নির্মাণ)

২৪ জুন, বুধবার। দুপুর বারোটার কিছু পরে।

দক্ষিণ কলকাতার তারাতলা। ট্রান্সপোর্ট ডিপো রোড, ব্রেস ব্রিজের কাছে। হঠাৎ বিকট গর্জন। তিনতলা নির্মীয়মাণ গুদামঘরের পুরো ছাদ ধসে পড়ল মাটিতে। ইস্পাতের কড়িবর্গা আর কংক্রিটের চাঙড় একসঙ্গে ধুলো হয়ে গেল শ্রমিকদের উপর। ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে আর্তনাদ উঠল। প্রতিবেশীরা ছুটে এলেন প্রথমে। তারপর পুলিশ, দমকল, NDRF। শেষে ডাক পড়ল সেনাবাহিনীর। বিহার রেজিমেন্টের জওয়ানরা সরঞ্জাম নিয়ে নামলেন ধ্বংসস্তূপে।

আড়াই দিন পরে মৃতের সংখ্যা ১৫। আহত ১৮। উদ্ধার অভিযান এখনও শেষ হয়নি। আহতদের চিকিৎসা চলছে এসএসকেএম হাসপাতালের ট্রমা কেয়ার সেন্টারে।


কার জমি, কার গুদাম?

যে জমিতে গুদামটি গড়ে উঠছিল, সেটা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় পোর্ট অথরিটির (SMPA)। সেখান থেকে ৩০ বছরের লিজে জমি নিয়েছিল ‘বেহারা ব্রাদার্স’। মালিক শম্ভুনাথ বেহারা। তিনি এখন গ্রেফতার। পোর্ট এলাকায় নির্মাণকাজের জন্য সাধারণত পোর্ট অথরিটির ছাড়পত্র লাগে। সূত্রের দাবি, এ ক্ষেত্রে সেই আপত্তি আসেনি। মনে রাখতে হবে, তারাতলা পড়ে কলকতা পুরসভার প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিমের বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যে।

বিধানসভায় বোমা ফাটালেন মুখ্যমন্ত্রী

ঘটনার পরদিন বৃহস্পতিবার বিধানসভায় বিবৃতি দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি জানালেন, তারাতলার ওই গুদামের নির্মাণ পরিকল্পনা পুরসভা থেকে অনুমোদন পেয়েছিল গত ১৭ জানুয়ারি। সেই নথিতে সই আছে তৎকালীন মেয়র ফিরহাদ হাকিমের। পাশাপাশি সই করেছিলেন কার্যনির্বাহী প্রকৌশলী রঞ্জন দাস, সহকারী প্রকৌশলী নির্মলেন্দু সরকার এবং সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার আমিনুর শেখ।

অধিকারীর কথায়, আগের তৃণমূল সরকার সিটি অব জয়কে সিটি অব ডেথে পরিণত করেছে। অবাধ দুর্নীতি আর তোলাবাজির জেরে। প্রয়াতদের পরিবারকে ১০ লক্ষ টাকা এবং আহতদের এক লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণাও তিনি করেন।

ফিরহাদের সাফাই

এই প্রসঙ্গে সরাসরি প্রশ্নের মুখে ফিরহাদ হাকিম বললেন, মেয়র কখনও নির্মাণ পরিকল্পনায় সই করেন না। সবিস্তারে কোনও বিষয়েও মেয়র যান না। কোনও মেয়রই করেন না এটা।

কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। নথিতে যে সই, সেটা কার? কেন সেখানে প্রাক্তন মেয়রের নাম?

কালী রহস্য

বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী একটা নামের আভাস দিলেন, সরাসরি না বলে। তিনি বললেন, KMC-তে কালীর নাম ছাড়া কোনও পরিকল্পনাই ছাড়পত্র পেত না।

সেই ‘কালী’ হলেন কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়। ফিরহাদ হাকিমের বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক বা OSD। পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের প্রাক্তন কর্মী, পরে প্রশাসনিক পরিষেবায়। ফিরহাদ মেয়র হওয়ার পর থেকেই তাঁর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সহযোগী। KMC সূত্রের দাবি, তাঁকে না জানিয়ে শহরের কোনও বড় নির্মাণের অনুমোদন হত না। MP ফান্ড এবং MLA এলাকা উন্নয়ন প্রকল্পেরও নিয়ন্ত্রণকারী আধিকারিক ছিলেন তিনি। EM বাইপাসে তৃণমূল ভবনের নির্মাণেও কালীচরণের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মুখ্যমন্ত্রী। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় পুলিশ তাঁকে আটক করেছে।

সই থাকলে গ্রেপ্তার করুন, কুণালের দাবিতে হইচই

রাজনৈতিক মহলে সবচেয়ে বড় চমক দিলেন তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষ। তিনি জানান, মুখ্যমন্ত্রীর কড়া অবস্থানকে সমর্থন করেন। তবে শুধু চার-পাঁচ জনকে গ্রেপ্তার করলে কাজ শেষ হবে না। তাঁর কথায়, মুখ্যমন্ত্রী বললেন পরিকল্পনায় প্রাক্তন মেয়রের সই আছে। তা হলে তাঁকেও গ্রেফতার করুন। শুধু ওই নথি দিয়ে রাজনৈতিক চাপ তৈরি করলে চলবে না।

এখানেই আসল রাজনীতিটা বোঝা দরকার। কুণাল ঘোষ এখন তৃণমূলের কালীঘাট শিবিরে, ফিরহাদ হাকিম রয়েছেন বিদ্রোহী ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরে। তৃণমূলের দুই বিবদমান গোষ্ঠীর এই বিভাজনের আলোয় কুণালের বক্তব্য কেবল দায়িত্ববোধের প্রকাশ নয়, দলের অন্তর্দ্বন্দ্বেরও প্রতিফলন। বিজেপির মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সুর মিলিয়ে দলীয় প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করার কৌশলও এর মধ্যে স্পষ্ট।

SIT তদন্ত, পাঁচ গ্রেফতার

কলকাতা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ বিভাগ) কুণাল আগরওয়াল জানিয়েছেন, বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) এবং ডিটেকটিভ বিভাগ মিলে যৌথভাবে তদন্ত করছে। ACP জয়সূর্য মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে SIT ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে। পাঁচ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।  পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল জানিয়েছেন, কাউকে রেয়াত করা হবে না। ফিরহাদ হাকিমকেও জিজ্ঞাসাবাদ করার দাবি তুলেছেন তিনি।

KMC-র নির্দেশ

কলকাতা পুরসভা ১ থেকে ১৬ নম্বর বরো জুড়ে সমস্ত নির্মাণকাজ ৩১ জুলাই পর্যন্ত বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে। KMC আইন, ১৯৮০-র ৩৭ নম্বর ধারায় এই নির্দেশ জারি। মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন, পূর্ববর্তী তৃণমূল সরকারের আমলে অনুমোদিত সমস্ত বাণিজ্যিক নির্মাণ প্রকল্পের অডিট হবে। বিশেষত জলাশয় ভরাট করে যেসব প্রকল্পে অনুমতি মিলেছিল। ১ অগস্ট থেকে কাজ শুরু হতে পারে, তবে অডিটে উত্তীর্ণ হলে তবেই।